ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ছোট বেলায় নিষিদ্ধ খেলার মধ্যে ছিল মার্বেল খেলা, ভিডিও গেইমস খেলা। আমাদের স্কুল এর আমিনুল স্যার পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন যদি ক্লাস এর কেউ মার্বেল, ভিডিও গেমস খেলে তা ধরিয়ে যদি কেউ দিতে পারি। আমি ছোটবেলা থেকে ভালো ছেলে। যেহেতু নিষিদ্ধ খেলা তাই এই খেলা কখনো খেলা হয়ে উঠেনি। এই খেলায় মার্বেল প্রাপ্তি ও নিষিদ্ধ ছিল বলে অনেকের এই খেলার প্রতি ঝোক ছিল। কড়ি বা মার্বেল দিয়ে এই খেলা হত বলে এর নাম মার্বেল বা কড়ি খেলা নামে পরিচিত।

‘একটি রয়েল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি লজেন্স দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা …।’

ওপার বাংলার খ্যাতিমান সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেন শুধু তার ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করেছেন তাই নয়, দুই বাংলার শিশু-কিশোরদের মনের কথা বলেছেন এই কবিতাংশে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে শিশু-কিশোররা দুর্বার আকর্ষণের মার্বেল কেনার সামর্থ্য না থাকায় কতটা যে কষ্ট পেত তারই চিত্র যেন এই কবিতার লাইনগুলো। কোলকাতায় মার্বেলের অপর নাম রয়েলগুলো।

কালের পরিক্রমায় এই খেলা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই খেলার সাথে বিদেশী গলফ খেলার অনেক মিল আছে। আমাদের সরকার ভিনদেশী গলফ খেলার জন্য গলফ ক্লাব খুলেছে কিন্তু আমাদের শৈশবের মজার এই মার্বেল খেলার জন্য কোন কিছুই করেনি। পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্দ্যানের একটা বড় অংশ ঢাকা ক্লাবকে দেয়া হয়েছে গলফ খেলার জন্য। আমি আজ পযর্ন্ত কোন লক্ষণ দেখলাম না যে আমাদের গলফ খেলায় কোন ভবিষ্যত আছে। আমাদের দেশে অনেক গলফ মাঠ অযথা পরে আছে, সেগুলো সবই সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি। অনেকবার সেসবের পাশ দিয়ে গেছি, কখনো মনে পড়েনা কাউকে খেলতে দেখেছি। মাঝে মাঝে টিভিতে দেখি টুর্নামেন্ট হয়। তাতে যাদের খেলতে দেখি মনে হয়না তারা কোনদিন একটা লাঠি হাতে কোন বলে বাড়ি মেরেছেন, গলফ খেলাতো অনেক দূরের কথা। উপরন্তু যারা বল বয়, তারাই দেখাযায় সপ্তাহে একদিন খেলার সুযোগ পেয়েও দেশের জন্য ছোট খাট টুর্নামেন্ট থেকে কিছু নিয়ে আসেন। একজন ব্লগার প্রস্তাব করেছিলেন এই রকম –
“তাই আমার প্রস্তাব হল আমাদের দেশের এই সব বাবুগিরি বন্ধ করে আসল কাজ করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য গল্ফ ক্লাব বানানোর কোনই দরকার নেই। কারণ তারা খেলতেই পারেনা। বরঞ্চ তাদের জন্য গল্ফ ক্লাবের বদলে মার্বেল খেলার ক্লাব বানানো যেতে পারে, এতে জায়াগা তেমন অপচয় হবে না! যদি তারা মার্বেলও ঠিকমত না খেলতে পারে তাহলে কি হবে জানি না!”

আসুন জেনে নেই মার্বেল খেলা কিভাবে খেলতে হয়ঃ
এই খেলাটি তিন, চার, পাঁচ, বা সাতজন বন্ধু মিলে খেলা যায়। কমপক্ষে দুইজন খেলোয়াড় হতেই হবে। পরিষ্কার সমতল ভুমি এই খেলার জন্য উপযোগি। প্রথমে দুইটি একটি রেখা টানতে হবে। রেখা থেকে চার-পাঁচ হাত দূরে একটি গর্ত করতে হবে যেন একটি মার্বেল সেই গর্তে বসতে পারে। আঞ্চলিক ভাষায় রেখাটিকে ‘জল্লা’(কোথাও ‘জই’ নামে পরিচিত) এবং গর্তটিকে ‘কেপ’ বলে। জল্লার বাইরে পা রেখে প্রত্যেকে একটি করে মার্বেল কেপ এ ফেলার চেষ্টা করে। যার মার্বেল কেপ এ পড়ে বা সবচেয়ে কাছে যায় সে প্রথম দান পায়। সবাই প্রথম যে দান পায় তার হাতে ২/৩/৪টি করে মার্বেল জমা দেয়।

সে মার্বেলগুলো ছকের বাইরে বসে সামনের দিকে ওই গর্তের আশপাশে আলতো করে ছড়িয়ে দেয়। এরপর অন্য খেলোয়াড়রা একটা নির্দিষ্ট মার্বেলকে বলে ‘বাদ’। অর্থাৎ ওই মার্বেল ছাড়া বাকি যে কোন একটি মার্বেলকে অন্য একটি মার্বেল ছেড়ে দিয়ে স্পর্শ করতে হবে। যদি এমনটা পারে তাহলে ওই দান সে জিতে যায়। আর না পারলে পরবর্তী জন একইভাবে খেলার সুযোগ পায়। তবে ‘বাদ’ দেয়া মার্বেল কিংবা অন্য একাধিক মার্বেলকে ছুড়ে দেয়া মার্বেল স্পর্শ করলে ওই খেলোয়াড়কে ফাইন দিতে হয়।

এবং দান জেতার জন্য পরবর্তী খেলোয়াড় ফাইন হওয়া মার্বেলসহ সেগুলো ছড়িয়ে দিয়ে খেলতে থাকে। যে কেউ দান জিতলে আবার পুনরায় খেলা শুরু হয়। এভাবেই চলতে থাকে যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পণ করে কিংবা তার কাছের মার্বেল শেষ না হয়ে যায়। কোন কোন অঞ্চলে অবশ্য মার্বেল খেলাকে বিঘত খেলাও বলে। রাখাল বালক থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোর অন্তত ঈদের দিন মার্বেল না খেলে থাকতে পারত না। এই খেলার প্রতি টানের কারণে দেখা গেছে অনেকেই স্কুল ব্যাগের ভেতর কিংবা হাফপ্যান্টের পকেটে মার্বেল নিয়ে স্কুলেও চলে যেত। আর এজন্য অভিভাবক কিংবা শিক্ষকের হাতে কানমলা খায়নি এমন কিশোর এক সময় খুঁজে পাওয়া মুশকিলই ছিল। স্কুলে টিফিনের ফাঁকে সামান্য দূরে শিক্ষকদের চোখের আড়ালে গিয়েও শিশু-কিশোররা মার্বেল খেলায় মেতে উঠত।

লোরক সোসাইটি ইতমধ্যে আমাদের দেশীয় খেলার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। ধীরে ধীরে সেই খেলার সাথে আপনাদের পরিচয় করে দেয়া হবে। সেই সাথে সে খেলা গুলোর নিয়ম। আমাদের পরিকল্পনা আছে এই দেশীয় খেলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। আমরা চাই বহির্বিশ্ব আমাদের চিনুক আমাদের সংস্কৃতির মাধ্যমে। আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি। লোরক সোসাইটি যেন টিকে থাকে এবং তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে তার জন্য সবার সহযোগিতা (আর্থিক/শারীরিক) চাই। এই সহযোগিতা যেন শুধু মুখেই বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। আসুন দেশকে ভালোবাসি, দেশের সংস্কৃতিকে ভালোবাসি।

আমাদের ফেইসবুক ফ্যান পেইজঃ
www.facebook.com/lorokbd