ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

কাঙালিনী সুফিয়া (ছবিটি এঁকেছেন রাশেদ মাহমুদ)

ছোটবেলায় যেখানেই বায়োস্কোপ হত সেখানেই ছুটে চলে যেতেন তা উপভোগ করতে। বায়োস্কোপ, সিনেমা, যাত্রা ইত্যাদির শিল্পীদের দেখলে তার খুব হিংসে হত। মনে হত যদি তাদের মত হতে পারতেন তাহলে কতই না ভালো হত! সিনেমাতে গান গাওয়ার শখ সে ছোটবেলা থেকে ছিল। মাত্র ১৪ বছর বয়স থেকে গানের হাতে খড়ি। পরিবারের অন্য কেউ গান করতেন না। সেই সময়ের কথা যখন মেয়েদের এত স্বাধীনতা ছিল না। সমাজ, পরিবারের সকল বাধা অতিক্রম করে যে মেয়েটি মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুফিয়া নামে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন তিনি আজ সবার কাছে কাঙ্গালিনী সুফিয়া নামে পরিচিত। লোরক সোসাইটির আমন্ত্রণে কিছুদিন আগে তিনি এসেছিলেন আমাদের প্রিয় প্রাঙ্গনে। তার সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি তার কাঙ্গালিনী সুফিয়া হয়ে উঠার গল্প। চলুন জেনে নেই সেই আলাপচারিতার কিছু চুম্বক অংশ। আলাপচারিতাটি তুলে ধরেছেন- তারেকুল ইসলাম এবং ছবি এঁকেছেন- রাশেদ মাহমুদ

একনজড়েঃ
নামঃ কাঙ্গালিনী সুফিয়া
বয়সঃ আনুমানিক ৭৫-৭৭
জন্মস্থানঃ রামদিয়া, রাজবাড়ি
ভাই-বোনঃ এক বোন, এক ভাই (মোট ৩ জন)
প্রিয় খাবারঃ কাঁটা ছাড়া মাছ, বিরানী
প্রথম উপার্জনঃ ১০০০-২০০০ টাকা
যাঁর গান ভালো লাগেঃ লালন ফকির, আব্দুল আলীম
গুরুঃ দেবেন থাপা, গৌর মোহন্ত
নিজের গাওয়া প্রিয় গানঃ বুড়ি হইলাম তোর কারণে, কোন বা পথে নিতাই গঞ্জে যাই, আমার ভাঁটি গাঙের নাইয়া।
গান গাওয়া শুরুঃ ১৪ বছর বয়স থেকে
মোট রচিত গানঃ প্রায় ৫০০
প্রথম সিনেমার গানঃ রাজ সিংহাসন
ভ্রমণকৃত দেশঃ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, ভারত।
বর্তমান নিবাসঃ জয়পাড়া, সাভার, ঢাকা।

আলাপচারিতাঃ

লোরকঃ কেমন আছেন?
কা সুফিয়াঃ
আছি ঐ মোটামুটি। কিন্তু ঐ খাদ্যখানা খাইতে পারি না। ভাত বেন্ডারে দিয়ে জুস করে খাই।
লোরকঃ আপনার নাম কাঙ্গালিনী সুফিয়া হল কিভাবে?
কা সুফিয়াঃ
কাঙ্গালিনী সুফিয়া এখন জাতীয় পর্যায়ে চলে গেছে। ছোটবেলায় ডাকনাম ছিল সুফিয়া। শিল্পকলা একাডেমী থেকে নামটা এসেছে।

লোরকঃ আপনি মূলত কোন ধরনের গান করেন?
কা সুফিয়াঃ
লালন গীতি, বাউল গান, নিজের লেখা গান।
লোরকঃ একজন মেয়ে হয়ে গান গাইতেন কোন সমস্যা হয় নাই?
কা সুফিয়াঃ
সিনেমাতে গান গাইতে খুব মনে চাইত। নিজের মন থেকে গান গাইতে আইছি। শুরুতে ভয় করি নাই, এখন আর কিসের ভয়?

লোরকঃ বিদেশী গান আমাদের জন্য হুমকি স্বরূপ কিনা?
কা সুফিয়াঃ
আমি তো দেখছি অনেক গান আধুনিক গানে চলে গেছে। ব্যান্ডেও চলে গেছে। শোনেন, গুণ যার আছে, গুণ তার ডোবে না। কেউ লালনের গান একতারা দিয়েও শোনে আবার কেউ গীটার দিয়েও শোনে। এটাতে গুণ কমে যায় না। লালন বিশ্ব পর্যায়ে চলে গেছে। তিনি বিরাট ওলীর মত।

লোরকঃ এখনকার ছেলে-মেয়েরাতো লোকসঙ্গীত শুনতে চায় না, তারা বিদেশী গানের প্রতি ঝুকে যাচ্ছে। আপনার মতামত কি?
কা সুফিয়াঃ
তাতো হবেই। কলিযুগ না? তবে হ্যাঁ, যে শোনবার সে এমনিতেই শুনবে। তার কাছে লালন গাইলেও ভালো লাগবে, ভাবতত্ব গাইলেও ভালো লাগবে।

লোরকঃ আপনি কি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছিলেন?
কা সুফিয়াঃ
আমি নিজেই তো মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তির গান গাইছি। আমার ভাই ৭১-এ মারা গেছে। তবে আমি মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট পাই নাই। আমি সার্টিফিকেট আনতে যাই নাই, তাই পাই নাই।

লোরকঃ আপনিতো মাঝখানে অনেক অসুস্থ ছিলেন?
কা সুফিয়াঃ
হুম, এখনো অসুস্থ। গলায় সমস্যা। খাদ্য খানা খাইতে পারি না। বারবারতো মানুষের কাছে চাওয়া যায় না। তবে কাঙ্গালিনী সুফিয়ারে মানুষ এখনো ভালোবাসে। মাঝখানে যখন বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম তখন আমেরিকা থেকে আমার এক ভক্ত ১৩,০৫০ টাকা পাঠাইছিল।

লোরকঃ আপনার গলায় সমস্যা, গান গাইতে সমস্যা হয় না?
কা সুফিয়াঃ
না, গান আমার অন্তরের সাথে মিশে আছে। এই গান গাইয়া মরবার চাই।

লোরকঃ আপনার ছোটবেলার স্বপ্ন কি ছিল?
কা সুফিয়াঃ
ছোটবেলায় সিনেমার নায়িকাদের দেখলে মনে হত- আহারে! আমি যদি তাদের মত হইতে পারতাম তাইলে কতই না ভালো হইত। আমার সিনেমাতে গান গাওয়ার খুব শখ ছিল। তবে সেই শখ আমার পুরণ হইছে। আমার প্রথম সিনেমার গান রাজ সিংহাসন। সেখানে আমি এই গানটা গাই-
এই ঘুমতো সেই ঘুম না,
উঠো প্রভাতে জাগিয়া
…’

লোরকঃ আপনি সর্বশেষ কোন ছবিতে গাও করেছেন?
কা সুফিয়াঃ
সর্বশেষ যে ছবিতে গান করেছি তার নাম হল-‘আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে’

লোরকঃ আমরা লোকসংস্কৃতি প্রসারে লোকসংস্কৃতি রক্ষা করি (লোরক) সোসাইটি নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা লোক শিল্পীদের পাশে থাকতে চাই। আমাদের সম্পর্কে কিছু বলুন?
কা সুফিয়াঃ
এই বিষয়ে কাজ করার লোকের বড় অভাব। আপনারা কাজ করতে চান খুশি হলাম। মাঝে মাঝে গানের অনুষ্ঠান করতে হবে, আমাদের ডাকতে হবে। আমাদের গান গাইতে না ডাকলে কেমনে চলমু?

লোরকঃ আপনি এত দূর থেকে এখানে শুধু সাক্ষাৎকার দেবার জন্য এসেছেন, এরজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
কা সুফিয়াঃ
ধন্যবাদের কি আছে? আমি তো আপনাদেরই লোক। যেমন ধরেন সিলেট থেকে এক এমপি তার মেয়ের বিয়েতে গান গাইতে ডেকেছে। আমি না করি নাই। আমার না নাই। অসুস্থ শরীর নিয়া গান গাইতে চইলা গেছি।

বয়সের ভারে ন্যুজ এই শিল্পী এখনো বেশ হাসিখুশি এবং তার ব্যবহার এখনও শিশুসুলভ। কাঙ্গালিনী সুফিয়া আরো অনেকদিন বেঁচে থেকে আমাদের গান শোনান সেই কামনা করি।
(তার গলার চিকিৎসার জন্য কেউ যদি এগিয়ে আসতে চান তাহলে লোরক সোসাইটির সাথে যোগাযোগ করুন)