ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

নৌকা বাইচে সারি গান গাচ্ছেন সাইরদার

ঘটনা ১৯০৮ সালের। শ্রাবণ মাস শেষের দিকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহজাদপুরে চরম উত্তেজনা। ঘরের মহিলারা তাদের ঘরের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলছেন। কারণ একটু পর শুরু হবে নাও দৌড়ানি। নদীর চারপাশে মেলার মত বসে গেছে। ঘাট রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে রাঙা নাও। নাওয়ে সারি গানের সাইরদার গান গেয়ে মাঝিমাল্লাদের প্রাণবন্ত করে যাচ্ছে। আশেপাশের গ্রাম থেকে মানুষজন আসা শুরু করেছে। প্রতিবছরই নাও দৌড়ানি হলেও সেই বছরের নাও দৌড়ানি একটু আলাদা কারণ আখাউরার কয়েকটি পাটকল মিলে স্বর্নপদক দিবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। সবার মধ্যে উত্তেজনা কাজ করছে এইবার কোন গ্রাম স্বর্ণ জিতে নেয়। পরিস্থিতি শান্তকরার জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এতক্ষণ এই কথাগুলো বললাম কুমিল্লা জেলা গেজেটিয়ার, ১৯৮১ এর বরাত দিয়ে। এইখান থেকে বোঝা যায় নৌকা বাইচ যা আঞ্চলিক ভাষায় নাও দৌড়ানি নামে পরিচিত তা কত জনপ্রিয় এই বাংলাদেশে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আর নদীর খেলা এই নৌকা বাইচ যখন হয় তখন যেন চারদিকে উৎসব পড়ে যায়। নদীর চারপাশে মেলা বসে যায়। আর নৌকা বাইচের সময় মাঝি-মাল্লাদের বৈঠার তাল ঠিক রাখার জন্য যে গান গাওয়া হয় তা সারিগান নামে পরিচিত। এই নৌকা বাইচ থেকে সারিগানের উৎপত্তি। আর যারা সারি গান গায় তাদের সাইরদার বলা হয়। বর্তমানে এই খেলার চল একদম কমে গেছে। আমরা ধীরে ধীরে সব নদী মেরে ফেলছি। তাই আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম একটি অংশ এই নৌকা বাইচ এবং সেই সাথে সারিগান। চলুন জেনে আসি নৌকা বাইচের সোনালী সেই দিনের কথা।

বাংলাদেশে নৌকা বাইচের উৎপত্তিঃ

নৌকা বাইচ বাংলাদেশের প্রাচীনতম খেলার মধ্যে একটি। অধ্যাপক মযহারুল ইসলামের মতে বাইচ শব্দটি ফার্সী ‘বাহাছ’ থেকে এসেছে। বাইচ শদটি ব্যুৎপত্তি করেছেন এইভাবে বাহাছ>বাইছ>বাইচ>বা’চ। বাহাছ শব্দের অর্থ তর্কের প্রতিযোগিতা অথবা প্রতিযোগিতা। বা’চ শব্দের অর্থ দু বা ততোধিক নৌকার গতিশক্তির প্রতিযোগিতা। শুধু যে উৎসব পার্বণে নৌকা বাইচ হয় তা নয়, দুইটি নৌকা একত্রে চললেই আপনাতেই প্রতিযোগিতার প্রশ্ন এসে যায়।

বাংলাদেশে কবে থেকে নৌকা বাইচ খেলা শুরু হয় তা নিয়ে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে দুই ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ ওয়াকিল আহমদ নৌকা বাইচ উৎসব সন্ধান করতে গিয়ে তার ‘বাংলার লোক-সংস্কৃতি’ গ্রন্থে নৌকা বাইচের উৎপত্তি নিয়ে দুইটি জনশ্রুতির উল্লেখ করেছেন। প্রথম জনশ্রুতি জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা- যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এই থেকে কালক্রমে নৌকা বাইচের শুরু।

দ্বিতীয় জনশ্রুতি পীরগাজীকে কেন্দ্র করে। পীরগাজী নদীর ওপারে বসে এপারের ভক্তদের তাঁর কাছে ডাকছেন। গাজীর আদেশ প্রতিপালন করতে পারছে না ভক্তরা কারণ নদীর ঢেউ ভীষণা মূর্তি ধারণ করেছে। তবু ভক্তরা গাজীর আহবানে সাড়া দিয়ে ছোটে কিন্তু তীরে এসে দেখে কোন নৌকা নেই। অনেক খোঁজ করে একটি ডিঙ্গি ব্যবস্থা করলো ভক্তরা কিন্তু যতই ওপারের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় ততই স্ফীত হয়ে উঠে নদী। নৌকা ডুবে যায় যায় অবস্থা। নৌকার দুর্দশা দেখে অনেক লোক নৌকা নিয়ে ছুটে এল সাহায্য করতে। সকলে গাজীর চরণে প্রনাম করে, গাজীর নাম নিতে নিতে এগিয়ে চলল। ধীরে ধীরে নৌকা শান্ত হল। ভক্তরা নদীর ওপারে পৌছালো। শান্ত নদীতে নৌকার সারি মনের প্রশান্তিতে তখন একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে চলল। এই পাল্লার নেশা থেকেই নাকি নৌকা বাইচের উৎপত্তি।

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে নৌকাবাইচঃ

প্রাপ্ত রেকর্ড অনুযায়ী খৃষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে মেসোপটেমিয়ার লোকেরা ‘ইউফেব্রিস’ নদীতে প্রথম নৌকাবাইচের আয়োজন করে। এর কয়েক শতাব্দী পরে নীল নদেও নৌকাবাইচের আয়োজন হয়। নৌকা বাইচ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আয়োজন করা হয়ে থাকে। আধুনিককালে প্রথম নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত ১৭১৫ সালে ইংল্যান্ডে। বিশিষ্ট চিত্রাভিনেতা থমাস ডগেট টেমস নদীর মাঝিদের মধ্যে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। সেই প্রতিযোগিতা তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পরে তা নিয়মত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৮২৯ সালের দিকে ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নৌকা বাইচের আয়োজন হলে তা তরুণদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ক্রীড়া হিসেবে নৌকা বাইচ প্রায় সকল দেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়। উল্লেখ্য নৌকা বাইচ অলিম্পিকে আয়োজন করা হয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিকে আয়োজিত নৌকা বাইচের ফাইনাল খেলায় যুক্তরাষ্ট্র জিতেছে ২৬ বার, ২৫ বার পূর্ব জার্মানি এবং বৃটেন ১৪বার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে নৌকা বাইচ হয় তা আজো জনপ্রিয়। দুঃখের বিষয়ে বাংলাদেশে নৌকা বাইচ খেলা হলেও তারা অলিম্পিকে কখনো নৌকা বাইচে অংশগ্রহণ করেনি। এই বিষয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। চীনে প্রতি বছর ৫ মে ড্রাগন নৌকা বাইচ হয়ে থাকে। নৌকাগুলোর সামনের অংশ দেখতে ড্রাগনের মুখের মত। ইংরেজীতে নৌকা বাইচের নৌকাকে বলা হয় ইয়ট (Yacht)। দক্ষিণ ভারতের কেরালায় জুলাই-আগস্ট মাসে তাদের জাতীয় উৎসব ওনামে নৌকা বাইচের আয়োজন হয়। পাকিস্তানের আমলে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে নৌকা বাইচের আয়োজন হত সরকারী পর্যায়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জাতীয় পর্যায়ে নৌকা বাইচ খেলা আয়োজনের জন্য কোন উদ্যোগ নিল না। আমাদের মধ্যে দেশপ্রেমের বড় অভাব।

লেখকঃ
মোহাম্মদ আলামিন
সভাপতি
লোকসংস্কৃতি রক্ষা করি (লোরক) সোসাইটি
ইমেইলঃ alamin_ib_du@yahoo.com

আপনাদের উৎসাহ পেলে দ্বিতীয় পর্ব দ্রুত লিখবো আশাকরি 🙂