ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

নৌকা বাইচ

বাইচের নৌকাঃ
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকার প্রচলন আছে। এগুলোর আকার ও আকৃতি ভিন্ন। যেমন- বজরা, কুশা, সাম্পান, পাতাম, সোরঙ্গী, ডিঙ্গি, ফিনিস, পানসি, ছিপ ইত্যাদি। তবে বাইচের নৌকার জন্য বিখ্যাত হল সোরঙ্গী নৌকা। ছিপ নৌকা দিয়েও খেলা হয়। এই নৌকা গুলো চিকন ও লম্বা হওয়ায় খুব দ্রুত সামনে এগিয়ে যেতে পারে। বাইচের নৌকা নির্মানের উপযুক্ত কাঠ হচ্ছে ‘জারই’। তবে এই কাঠের সংকটের কারণে সবধরনের কাঠ ব্যবহার করতে দেখা যায়। নৌকার সামনের গুলুইটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। কখনো ময়ূরের মুখ, রাজহাঁস বা পক্ষীর মুখ আঁকা হয়। কখনো উড়ন্ত পরী, পদ্মফুল, জোড়া চোখ, লতাপাতা আঁকা হয়। নৌকাটিকে যথাসম্ভব আকর্ষনীয়ভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়।

সোরঙ্গী নৌকার আদর্শ দৈর্ঘ্য ৬০ হাত। যারা নৌকা বানায় তাদের বলা হয় ‘ছুতার’ আঞ্চলিক ভাষায় ‘হুতার’। নৌকা নির্মান নিয়ে আছে বিভিন্ন লৌকবিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠান। যারা হিন্দু ছুতার তারা নির্মানের পূর্বে ‘বিশ্বকর্মা’র নামে ভক্তি ও পুজা দেন। বিশ্বকর্মা হচ্ছেন দেবশিল্পী। হিন্দুদের বিশ্বাস তাঁর কৃপাতে জন্ম নেয় মানুষের মনে শিল্পকলার জ্ঞান। আর মুসলমানরা গাজী-কালুর নামে সিন্নি বিতরণ করে। মানুষের মাঝে বিশ্বাস হচ্ছে গাজী-কালুর নাম নিয়ে নৌকা চালালে নদীতে কোন বিপদ আসার সম্ভাবনা কম।

মানুষদের মাঝে বিশ্বাস আছে যে নৌকার কাঠে দোষ থাকলে নৌকা ‘দেওয়ালা’ হয়ে যায়। নৌকা হারিয়ে যায় আবার ফিরে আসে। তাই নৌকা বানানোর পূর্বে কাঠের তক্তা পরীক্ষা করা হয়। নৌকার তক্তা পরীক্ষা করার জন্য প্রতিটি তক্তার সামনে কুপি ধরা হয়। যদি কোন তক্তার সামনে কুপি নিভে যায় তাহলে সেই তক্তায় দোষ আছে। তখন সেই তক্তা আর ব্যবহার করা হয় না। নৌকা বাইচের নৌকা যারা বানায় তাদের কাজকর্ম কমে যাওয়ায় তারা অন্য পেশায় ঢুকে যাচ্ছে। ফলে অভিজ্ঞ নৌকা নির্মাতার লোকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে আয়োজিত নৌকা বাইচঃ
বাংলাদেশে প্রধানত হাওড় অঞ্চলে নৌকা বাইচ হয়ে থাকে। শ্রাবণ-ভাদ্র নৌকা বাইচের মৌসুম হলেও বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে নৌকা বাইচের আয়োজন হয়ে থাকে। পাকিস্তান আমলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতে ১৪ আগস্ট উৎসব লেগে যেত। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এই অঞ্চলে হত সবচেয়ে বড় নৌকা বাইচ। এখানে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন জেলা প্রশাসক। ধারাবাহিকভাবে এই আয়োজন অনেক বছর চললেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তা আয়োজিত হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একসময় শ্রাবণ সংক্রান্তি ও ১ ভাদ্রে নৌকা বাইচের আয়োজন হত। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও সংগঠকের অভাবের ফলে তা আর নিয়মিত হয়নি।

কিশোরগঞ্জের নিকলীর নৌকা বাইচের সুনাম ছিল সর্ব বিস্তৃত। এছাড়াও সোনাইজানী নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন হত। জনশ্রুতি আছে এই সোনাইজানী নদীতেই নৌকা বাইচের উৎপত্তি। কিশোরগঞ্জ নিবাসী মোঃ রাইয়ানের কাছ থেকে জানা যায় সোনাইজানী নদীর তীরে অবস্থিত শ্রী চৈতন্যদেবের আখড়ায় মনসা দেবী মনুষ্য রুপে এসেছিলেন। তখন ঘাটের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দুইজন জেলে তাকে দেখে ফেলে। তাঁর রুপে মুগ্ধ হয়ে জেলে দুইজন একসাথে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। তিনি কার প্রেমের প্রস্তাব গ্রহণ করবেন? পরে তিনি বলেন লাল গোসাইয়ের আখড়া থেকে নৌকা বেয়ে চৈতন্য দেবের আখড়ায় আসার জন্য। পরে নৌকা বেয়ে জেলে দুইজন একসাথে নৌকা ঘাটে ফিরে। পরে মনসা দেবী কারো প্রেমে সাড়া দেননি। তবে জেলেদের সুন্দর প্রেমকে অমর করে রাখতে ও তাদের প্রেমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর সোয়াইজনী নদীতে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেন মনসা দেবী।

বাংলাদেশের যেখানে নদী আছে সেখানেই নৌকা বাইচের আয়োজনের খবর পাওয়া যায়। নৌকা বাইচ নিছক শুধু খেলা নয় এটি মানুষদের মিলন স্থল। নির্মল বিনোদনের জন্য আশেপাশে গ্রামের সবাই নৌকা ঘাটে মিলিত হয়। তারা যে নৌকার সমর্থক সেই অঞ্চলের নাম চিৎকার করে তাদের অনুপ্রানিত করে। গানের সুর আর বৈঠার ছন্দ সবার মনকে আলোড়িত করে।

বাংলালিংক এর কল্যাণে নৌকা বাইচের আয়োজন আবার চোখে পড়ছে। তবে সেটা শুধু একটি অঞ্ছলেই সীমাবদ্ধ থাকছে। রবি শঙ্কর মৈত্রীর গ্রন্থনা ও পরিকল্পনায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জের সোনাইজানী নৌকা বাইচের আয়োজন নিয়ে বলা হয়। সেখানে নৌকা বাইচের আয়োজন পুনর্জীবিত করার জন্য দাবী করা হয়। স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘বাংলাভিশন’ এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে কিশোরগঞ্জের সোনাইজানী নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করে। তবে তা একবার আয়োজন করলে চলবে না। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। একসময় নৌকা বাইচে পুরসকার হিসেবে দেয়া হতো কাঁসার কলস, থালা বাসন, সীল্ড। এখন দেয়া হয় টিভি। এই পুরস্কারের পরিমাণ বাড়াতে হবে, করতে হবে জাতীয় কমিটি।

বাইচের গানঃ
এমন কোন দেশ আছে যে দেশে গরুর গাড়ি থেকে নতুন ধারার গান সৃষ্টি হয়, নৌকা বাইচ থেকে নতুন ধারার গান সৃষ্টি হয়? সেই দেশ শুধু বাংলাদেশ। এত গর্বের দেশ বাংলাদেশ। অথচ আমরা সম্পদের আকড়ে বাস করে এই সম্পদ কাজে লাগাতে পারছি না। নৌকা বাইচের সময় মাঝিদের বৈঠার তাল ঠিক রাখার জন্য একধরনের গান গাওয়া হয় যা সারি গান নামে পরিচিত। এই সারি গান নৌকা বাইচের প্রাণ। প্রতিটি নৌকায় একজন সাইরদার থাকে। যে সারি গান গায় তাকে সাইরদার বলা হয়। সারিগানকে কেউ কেউ কর্মসঙ্গীত বলেছেন।

জারি গানের মত সারি গানেও একজন বয়াতি ও দোহার থাকে তবে এখানে দোহার হচ্ছে সকল মাঝি-মাল্লা। তারা সবাই তাল মিলায় এবং একসাথে গানের সাথে ‘হেইয়ো হেইয়ো’ আওয়াজ তোলে। সারি শদের অর্থ দল বা শ্রেনী। সারিগান শ্রেনীবদ্ধ একদল কর্মরত মানুষের সমবেত সঙ্গীত। কর্মজনিত শ্রম লাঘব, উৎসাহ ও উদ্দীপনার জন্য সমবেত কন্ঠে এই গান গাওয়া হয়। সারিগান ভক্তিমূলক, প্রেমমূলক, কখনো হাস্যরসাত্মক হয়ে থাকে।
সারি গানের একটি নমুনা-

“হেইয়ো হেইয়ো হেইয়ো…
সামাল সামাল সামাল ধরে
সামনে তরী বাইয়ো
হেইয়ো হেইয়ো…
বেলা গেল সন্ধ্যা হইল
কালো মেঘে গগন খাইলো হৈ…
থাইকা থাইকা গর্জে দেয়া
তীরের পান ধাইয়ো……”

নৌকা বাইচে যে সারি গান গাওয়া হয় তাঁর মধ্যে প্রাণের ছোঁয়া থাকে। যে নৌকাটি সুন্দর এবং নৌকা বাইচে এগিয়ে থাকে তারা এই গান ধরে-

“শিয়াল তুই বাঘ চিনিস না,
বাঘের হাতে পড়লে শেষে করবে তোরে দই টানা।“

তখন কাছাকাছি প্রতিপক্ষও কম যায় না তারা তখন গান ধরে-
“এজিদ পালা পালারে…
ময়দানাতে এলো হানিফা।”

নৌকা বাইচের এই গানগুলো মুখে মুখে প্রচলিত। এই গানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ এর ব্যবস্থা না করা হলে আমরা হারিয়ে ফেলবো আমাদের লোকসঙ্গীতের সমৃদ্ধ একটি ধারা সারি গান।

শেষ কথাঃ
কাজী নজরুলের ভাষায় বলতে চাই-
“আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে?”

আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে এখন বিশ্বায়নের থাবা আক্রমণ করেছে। বিজাতীয় সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় সত্তার জন্য হুমকি হয় দাঁড়িয়েছে। সংস্কৃতি একটি দেশের পরিচয়। আমরা যদি নিজেদের পরিচয় এভাবে নষ্ট করে ফেলি তাহলে আর কিছুদিন পর কুমার বিশ্বজিৎ এর গানের মত বলতে হবে-“একদিন বাঙ্গালি ছিলামরে…”

দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণের প্রচেষ্টা –‘লোকসংস্কৃতি রক্ষা করি (লোরক) সোসাইটি’ এই সংগঠন তরুণদের সংগঠন যারা দেশকে নিজের পরিচয়ে সামনে এগিয়ে নিতে চায়। তরুণদের বলবো আপনারা জেগে উঠুন এবং লোরকের পতাকাতলে যোগ দিন যদি আপনারা সত্যিকার অর্থে ভালোবেসে থাকেন।

লেখকঃ
মোহাম্মদ আলামিন
সভাপতি
লোকসংস্কৃতি রক্ষা করি (লোরক) সোসাইটি
ইমেইলঃ alamin_ib_du@yahoo.com