ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

অন্যান্য অনেক জেলার মত নীলফামারী জেলায়ও প্রচুর লোকখেলা রয়েছে। তবে প্রকৃত পক্ষে যে খেলাটি নীলফামালরীতেই সৃষ্টি হয়েছে এমন খেলা পাওয়া খুবই কষ্টকর। কেননা লোকখেলার উৎপত্তি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া শুধু কষ্টসাধ্যই নয় অসম্ভবও বটে। জৈবিক প্রয়োজন থেকেই খেলাধুলার রীতি ও কৌশল মানুষের আয়ত্বে এসেছে। কয়েকটি খেলার আদি উৎস ও বৈশিষ্ট বিচার করলে দেখা যায় যে, পূর্বে খেলা অবসর বিনোদানের জন্য নয়, জীবকার্জন ও আত্বরক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ রূপেই গণ্য হত। লোকক্রীড়া অতীত জীবনের ছায়াপাতে সমৃদ্ধ। আদিম মানুষ পশুপাখির সাথে লড়াই করে বাঁচত। পশু ও মৎস শিকার করে আহার্য উপকরণ সংগ্রহ করত। কিন্তু বর্তমানে পশু শিকার শখে পরিনত হয়েছে। কুস্তি ও লাঠি খেলা এক সময় আত্মরক্ষারয় অত্যাবশ্যাক উপায় ছিল। পরর্বতী কালে খেলার অঙ্গরূপে অনুশীলিত হয়ে অস্তিত্ব রক্ষা করে আসছে। প্রাচীন সমাজের জীবন রক্ষার ও জীকার্জনের উপায় গুলি ক্রমশঃ ঐচ্ছিক ক্রীড়া, কৌতুক ও আনন্দ উপভোগের বিষয় হয়ে পড়েছে। (ওয়াকিল আহাম্মদ: বাংলার লোকসংস্কৃতি, পৃ-২৮৭)
তাছারা লোকক্রীড়ার উৎপত্তি নিয়ে মতান্তরতো রয়েছেই যা বর্তমানে লোকখেলার বৈশিষ্ট বলে স্বীকৃত| নীলফামারী জেলায় উৎপত্তি লাভ করেছে এমন একটি লোকখেলা লালটিকা আলোচনা করছি।

নামকরণ :
লাল+টিকা=লালটিকা, সন্ধি যোগে গঠিত শব্দ। ‘লাল’ রং বিশেষ আর ‘টিকা’ আঞ্চলিক শব্দ যার অর্থ-নিতম্ব| অর্থাৎ নিতম্ব লাল করা হয় যে খেলায় তাই ‘লালটিকা’। জেলার মধ্যেই নামে সামান্য ভিন্নতা রয়েছে। যেমন: টিকালাল, পাছালাল, পুটকিলাল ইত্যাদি।

খেলার ধরণ:
লালটিকা প্রায় সব বয়সী ছেলেদের জন্য নির্ধারিত একটি লোকখেলা। এটি একাটি বহিমাঠের এবং স্থলের খেলা। খেলার জন্য নির্ধারিত কোন পোশাকের প্রয়োজন হয়না। লোকমানুষের নিত্য পোশাক লুঙ্গি-ধুতি কোমরে বেধেঁ অথবা হাফ প্যান্ট পড়েও এ খেলা খেলা হয়ে থাকে।
খেলায় কোন বিচারক থাকে না। যে কোন খেলা স্পষ্টভাবে জমে উঠে নিয়মে-নীতি ও উপকরণের ব্যবহারের মাধ্যমে। এ দুটোর অভাবে খেলা জমে না। তবে এটি উপকরণ রহিত একটি খেলা, খেলায় ছড়ার ব্যবহার নেই তবে খেলোয়াড়েরা চোরের নিতম্বে! নিচে চাপটাঘাত করার পরে হিংসাত্মক ভাবে বলে থাকে-

‘লালটিকা লাল, লালাটিকা’।
তাছাড়া খেলায় চোর নির্ধারনের ক্ষেত্রে কখনো কখনো ছড়ার ব্যবহার হয়ে থাকে।

চোর নির্ধারন:
আগ্রহী খেলোয়ারের মধ্যে থেকে একজন চোর নির্ধারিত করা হয়। বিভিন্ন ভাবে চোর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। যেমন: আঙ্গল ফুটিয়ে, পাতা কেটে, ছড়া কেঁটে প্রতিজন গণনা করে, মাটিতে দাগ কেটে ইত্যাদি (সাধারনত অন্যসব লোকখেলায় যেমনটা দেখা যায়।)

খেলোয়ার সংখ্যা:
কমপক্ষে ৪ জন এবং উর্ধ্বে ১২ জনের মত (এর বেশি খেলোয়ার হলে বিশৃঙ্খলা হবার সম্ভাবনা থাকে)

সময়:
সময় অনির্ধারিত, সর্বসম্মতিক্রমে খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। কিংবা কেউ চোরের শাসিত ভোগ করার পর মুক্ত হয়ে সাধারন খেলোয়ার হয়ে ব্যাক্তিগতভাবে বা দলীয়ভাবে খেলা সমাপ্তির ঘোষণা দিতে পারে।

খেলার নিয়ম:
লোকখেলার সর্বত্রই নিয়মের কাঠিন্য নেই। কোথাও রীতি-পদ্ধতি ও আইনকানুন আলগা, কোথাও তা দৃঢ়বদ্ধ। তাই বৈচিত্রের দিক থেকে নাগরিক খেলা অপেক্ষা লৌকিক খেলার আকর্ষণ বেশী। লালটিকা খেলায় সর্বসম্মতিক্রমে নির্ধারিত, আনুমানিক একটি বৃত্তের মধ্যে চোরকে রেখে বিভিন্ন কলাকৌশলে সবার যোগ-সজসে চারপাস হতে চোরের টিকায় (নিতম্বে) চাপটা আঘাত কারা হয়। তবে এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম-রীতি রয়েছে। সেগুলো এরকম:
চোরকে টিকা ব্যতিত অন্য কেন অঙ্গে মারা যাবে না। যে মারবে সে চোর নির্ধারিত হবে।
চোর শুধু মাত্র বৃত্তের মধ্যে, যে কাউকে ‘পা’ দিয়ে ছুয়ে মড়া ঘোষণা করতে পারবে। কোন অবস্থাতেই অন্যে কোন অঙ্গ ব্যবহার করতে পারবে না।
নির্ধারিত বৃত্তের ভিতরে যে কেউ ঢুকে চোরকে মারতে পারবে কিন্তু চোর তাকে ‘পা’ দিয়ে ছুয়ে দিলে উদৃষ্ট ব্যক্তি চোর হবে।
ভুলক্রমে কাউকে ‘পা’ দিয়ে ছোয়া দিতে গিয়ে বা অন্য কোন ভাবে চোর যদি নির্ধারিত বৃত্তের বাহিরে চলে আসে এবং বৃত্তে প্রবেশের পূর্বেই যদি অন্য খেলায়ারেরা তাকে ধরে ফেলে, তবে তাকে ইচ্ছে মত শাস্তি দিতে পারে। তবে তা অবশ্যই টিকায় (নিতম্বে) হতে হবে। অর্থাৎ চোরকে অবশ্যই বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে নতুবা শাসিত্মর সম্ভাবনা থাকে।

খেলার বিশিষ্ট দিক:
খেলা যথেষ্ঠ মনোসংযোগ ধর্মী। চোরকে যথেষ্ঠ মনসংযোমী হতে হয়, যাতে আক্রমনকারীকে সহজেই নির্দিষ্ট করে ‘পা’ দিয়ে ছুয়ে দিতে পারে। তাছাড়া আত্মরক্ষা ও প্রতিরক্ষার পরস্পর সম্পর্ক ও সম্বন্ধ এখানে সুস্পষ্ট। সর্বপরি চালর্স ডারইউনের ‘সারাভাইবেল অব দ্যা ফিটেস্ট’ তত্ত্বের পূর্ন প্রতিফলন এখেলায় ঘটে থাকে অর্থাৎ যে মানষিক ও শারীরিক ভাবে ধৃঢ় নয় সে চোর হয় এবং শাসিত্ম ভোগ করে।

ইতিহাস ও উৎপত্তি এবং সমাজত্ত্ব :
সংস্কৃতিতে যদি সভ্যতার নির্যাস রুপে কল্পনা করা হয় তাহলে এই সংস্কৃতির অনুসঙ্গ হচ্ছে সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা, শিল্পকলা, ক্রীড়া ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রাচীনতম ধারা ক্রীড়ার অন্যতম ধারা লোকক্রীড়া, যার বেড়ে উঠার বা গড়ে উঠার শিল্পকলা ও রীতি পদ্ধতি সতঃস্ফুর্ত ও অকৃত্রিম। ফোকলোর পঠন-পাঠনের মুল লক্ষ্য হল কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে শেকড়ের সন্ধান। বিভিন্ন তথ্যানুসন্ধিৎসার ফলে লোক সংগীতের, লোক কাহিনীর বা অন্যান্য বিষয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে নানা মতবাদ পাওয়া গেলেও ফোকলোরের এই বিশেষ শাখা লোকক্রীড়ার তেমন কোন মতবাদ পওয়া যায় না। তবুও আত্মনিবেদিতপ্রাণ ফোকলোরবীদগনের আলোচনায় এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যেমন: ইতিহাসের প্রারম্ভে বিভিন্ন জীবজন্তুর ফসিল, আদিম মানুষের ব্যবহিত অস্ত্র-শস্ত্র, নিত্য ব্যবহার্য তৈজস পত্রাদি, পর্বত পৃষ্ঠের চিত্রাঙ্কন প্রভৃতি দেখে এবং অনুমানের উপর নির্ভর করে আবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জ্ঞান, সাক্ষ্য এবং প্রাচীন মন্দিরের ভাষ্কর্য, টেরাকোটা, এথলেটদের প্রতিমূর্তি, গল্পকথা, বীর-গাথা, গান, বহু আদিম খেলার তুলনামুলক আলোচনার উপর নির্ভর করে ফোকলোরবিদগণ লোকক্রীড়ার উদ্ভব সম্পর্কিত তথ্য নির্ধারণ করেছেন। অন্য অনেক লোকখেলার মত ‘লালটিকা’ শুরু হবার ইতিহাস বলা মুশকিল। তবে এই খেলা যে এখানেই উৎপত্তি লাভ করেছে তা এখানকার আদিবাসীদের স্থীর বিশ্বাস। তারা এর কোন হদিস দিতে না পারলেও বংশ পরস্পরায় এ খেলা তাদের মাঝে চলে আসছে এটা তাদের বিশ্বাস করে।
এদেশীয় লোকক্রীড়াগুলোর উদ্ভবকাল এক নয়। বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি লোকক্রীড়া অনার্য ও দ্রাবিড় যুগে উদ্ভুত হওয়া বিচিত্র নয়। লোকনাট্য লোক্রীড়ার অন্যতম উৎস, খেলার ধরণ বিবেচনায় এর উৎপত্তি লোকনাট্য থেকে হয়েছে বলে মনে হয়। তবে ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় নীলফামারী ‘রাম’পূর্ণ ভূমি ছিল এবং এখানে ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণের ধারণা প্রচলিত ছিল। (নীলফামারী জেলার ইতিহাস: মনি খন্দকার)। যার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে শহরের অদুরে ভিমের মায়ের চুলা, হরিশচন্দ্রের পাঠ, ময়নামতি দূর্গ, রাজবাড়ী (বর্তমানে যা কৃষিভূমি ইত্যাদি এখনো দেখতে পাই। তবে এগুলো সবই ইতিহাস ভিত্তিক হলেও অনুমান নির্ভর। কিন্তু এ খেলা বিশেষ কিছু দিক বিবেচনায় নিলে দেখা যায় খেলাটি বেশ প্রাচীন এবং উলিস্নখিত যে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক উপাদান রয়েছে তা সহজেই প্রাচীন বলে অনুমেয় হয়। এ খেলার উৎসমূলে ধর্মীয় প্রেরণা আছে বলে মনে হয়। ধর্মীয় বিধানে দন্ডিত হলে অব্রাহ্মণকে ব্রাহ্মণ সমাজ কতৃক প্রদত্ত শর্তসাপেক্ষে বিচিত্র শাস্তির বিধান এখেলার মধ্যমে বিধৃত হয়ে হয়েছে বলে মনে হয়।
আবার দাস প্রথা প্রচলনের দিকটিও এখানে কম বিবেচ্য নয় কারণ দাসদের ইচ্ছেমত ব্যবহারের ও পান থেকে চুন খসলেই শাস্তির বিধান এ খেলায় লক্ষ্যনীয়।
আদিম মানুষের হিংস্র স্বাপদসংকুল পর্বতারন্যের যাযাবরীয় জীবনের প্রতি পাদক্ষেপ বিপদ সংকুল হওয়ায় একদা শারীরিক শক্তির চর্চা ব্যাতীত জীবন সংগ্রামে জয়লাভের অন্য কোন উপায় ছিল না। এখেলায় সম্মিলিতভাবে বন্য হিংস্র পশুকে মোকাবেলা ও খাদ্য সংগ্রহে জীবন সংগ্রাম করার বিষয়টি এখানে বিধৃত হতে পারে। কারণ তখন জীবনটা ছিল হয় ভুড়ি ভোজের নয়তো অনাহারের। লোকক্রীড়ায় আর্যাধিকারের পরে দেখা যায়, আর্য-যুবকরা বিভিন্ন পালা-পর্বন, আনন্দানুষ্ঠান উপলক্ষে এবং আসরের ফাঁকে ফাঁকে নানান শারীরিক ক্রীড়া ও অস্ত্র পরীক্ষার ব্যাবস্থা করতো, যাতে অতীত স্মৃতি ও কল্পনা শক্তির যতেষ্ট ছাপ মেলে। এভাবেই বিভিন্ন জীবন সংগ্রামের স্মৃতিগুলো একসময় লোকক্রীড়া রূপানত্মরিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় লালটিকাকে আজ আমরা লোকক্রীড়া রূপে দেখতে পাচ্ছি। কেবল খেলার জন্যই লোক খেলাধুলার উৎপত্তি হলেও এর মধ্যে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিচিত্র উপাদান লুকিয়ে রয়েছে। সুতরাং এদেশের ফোকলোরের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির পথে এ সমস্ত লৌকিক খেলাধুলা নিয়ে আরো ব্যাপক আলোচনা ও গবেষনার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। সর্বপরি নিজে নীলফামারীর একজন অধিবাসি হিসাবে বলতে চাই এখেলা তাঁর আঞ্চলিক ঐতিহ্য যুগযুগ ধরে টিকে রাখুক এবং বিকশিত হউক।

চিত্রে: খেলা শুরুর মুহুর্তে খেলোয়ারদের যোগসাজস।

চিত্রে: খেলার আনন্দ যখন চরমে -----।

সহায়ক গ্রন্থ :
ড. আসিম দাস: বাংলার লৌকিক্রীড়ার সামাজিক উৎস
বরুনকুমার চক্রবর্তী : বাংলার লোকক্রীড়া
সামীয়ুল ইসলাম: বাংলার গ্রামীণ খেলাধুলা
ওয়াকিল আহম্মদ: বাংলা লোকসংস্কৃতি
সীমান্ত বাংলা লোকক্রীড়া: সুব্রত মুখ্যপাধ্যায়
নীলফামারী জেলার ইতিহাস: মনি খন্দকার

তথ্যদাতা:
১. মো.রুসত্মম আলী, বয়স: ৬৫ বছর, বাড়াই পাড়া, নীলফামারী।
২. মো. মনোয়ার হেসেন, পিতা: মো.রুসত্মম আলী, বয়স: ৩০ বছর, বাড়াই পাড়া, নীলফামারী।

লেখকঃ
মানিক সরকার শ্রাবণ
ফোকলোর বিভাগ (৮ম ব্যাচ)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইলঃ maniksarkar1721@gmail.কম

যেকোন বিকাশ পয়েন্টে গিয়ে রিচার্জ করে এখন আপনিও লোরকের পাশে থাকতে পারেন