ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আবারো দেশের মালিক জনগণকে হাইকোর্ট দেখানো হলো।
একটি রিট আবেদনে মঙ্গলবার আদালত বলেছে, হত্যাকাণ্ড তদন্তে ভুল বা অবহেলা দেখা যায়নি। কিছু সংখ্যক রাজনীতিক তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করতে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করছেন। বহুল প্রচারিত ” বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাই কোর্ট বেঞ্চ” কর্তৃক ”তদন্তে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি ছাড়া প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো বক্তব্য না দিতে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মনগড়া সংবাদ প্রকাশ না করতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে তথ্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছে, “দুই সাংবাদিকের হত্যার ঘটনায় সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। এই তদন্তে কোন ধরনের ভুল বা অবহেলা আমরা দেখিনি। একাধিক তদন্ত সংস্থা এই ঘটনার পুরো সত্য বের করে আনতে কাজ করছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তদারকির কথা তুলে ধরেছে আদালত। (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২৮)”

এটি কিসের আলামত। বার বার মালিককে কর্মচারী দেখিয়ে বিরক্ত উৎপাদনের এ প্রক্রিয়ায় জনগণ হিসেবে আমি নিজেই বিরক্ত। বাংলাদেশের আইন আদালত সম্পর্কে যেটুকু শ্রদ্ধা অবশিষ্ট ছিল তা বর্তমান সরকারের আমলে আর বাকী থাকলো না। আদালত এখন রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দেয়, আদালত এখন ইতিহাস রচনা করে। আদালত সংবিধান সংশোধন করে। আদালত এখন গণরোষ থেকে সরকারকে রক্ষা করতে জনগণকে আইনের জুজুর ভয় দেখায়। কিন্তু আদালত ভুলে গেছে জনগণ হলো তার মালিক সংবিধানের সৃষ্টিকর্তা। ”The Voice of the people is Law of the land”. এটি আদালতের অজানা থাকার কথা নয়। ৭১ সহ ইতিহাসের কোন প্রাকটিক্যাল ঘটনাই আদালতের কোন ঘোষণায় সৃষ্টি হয়নি। মানুষ বা রাষ্ট্রের নাগরিক যখন বিরক্ত হয়, উত্যক্ত হয় তখন গণরোষে শুধু তখতে তাউসই নয় তখতের গোলামেরাও ভেসে যায়।

আামার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হবে? সেই ভয় আমি পাই না। আমিতো কোন রাজনৈতিক আদালত বা বিচারপতিকেই মানিনা। মানতে বাধ্য নই স্বাধীন নাগরিক হিসেবে, যতক্ষন না নিজে অপরাধ করি। নাগরিক হিসেবে আদালতের বেআইনী বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত কার্যকলাপ বা দূর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার আমার রয়েছে। আদালত নিজেই একটি আইনী গন্ডিতে আবদ্ধ, নাগরিক নয়, তাকে শুধু স্ব-আরোপিত সামাজিক নৈতিকতা মেনে চললেই হয়। । নাগরিক নিজের, সমাজের বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বিদ্রোহ করতে পারে, সশস্ত্র বিপ্লব করতে পারে, আদালত তা পারে না। সেরকম চেষ্টা করেও লাভ নেই। আদালতের এখতিয়ার ব্যবহার করে কাউকে ফায়দা দেয়ার অধিকারও আদালতের নেই। থাকা বেআইনী ও কর্তৃত্ব বহির্ভূত।

সাংবাদিক ফরহাদ দম্পতির হত্যার একবছর পরেও বিচার চালু হয় নাই। উপরন্তু সাগর-রুনী সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকান্ডের পরে বিচার ও তদন্তের দিকে সন্দেহের তীরকে বেগবান করছে। ৫০০ কোটি টাকার মাদক পাচার মামলার আসামী, কোটি কোটি টাকার ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আদালত থেকে সসম্মানে জামিন পায়, মেয়র লোকমান হত্যার আসামীরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছে।

সরকার নিজে নাগরিকদের অপরাধে বিচারে সোপর্দ না করে হত্যা করছে, গুম করছে, কিডন্যাপ করছে, নির্যাতনতো মামুলী ব্যাপার। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা সহ জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নাই। আয়ের উৎস নাই, উপরন্তু শেয়ার বাজারের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা জনগণের পকেট থেকে সরকারী + বিরোধী দলের ব্যবসায়ীরা সম্নিলিত ভাবে লুটপাট চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এগুলো আদালত দেখছে না। ফেলানীকে যখন বিএসএফ গুলী করে মেরে কাটা তারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখলো, এই আদালতের ভূমিকা তখন কি ছিল? তাবেদারী ভূমিকা দেখিয়ে সরকারের চামড়া বাঁচিয়ে নিজের জনগণের অবমাননা করেছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর প্রকাশিত ২০১০ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যদিও নির্বাহী বিভাগ থেকে বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে আলাদা করা হয়েছে, তারপরও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষই উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ দিচ্ছে। আদালতকে দলীয়করণ করায় কঠিন হয়ে পড়েছে বিরোধী মতাবলম্বীদের বিচার পাওয়া। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক স্পর্শকাতর মামলার রায় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এ ঘটনা ঘটছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরোধীদের জামিন ও ডিটেনশন দেয়ার ক্ষেত্রে। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার গত বছরের ১১ এপ্রিল ১৭ জন অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ দেয়। এদের মধ্যে দু’জনের বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ওই দুই বিচারপতিকে তত্কালীন বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিম শপথ পড়াতে অস্বীকার করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর সিনিয়র দুই বিচারপতিকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে সরকারপ্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।

যে ব্যাক্তি সঠিক কাজ করবে সে কেন সমালোচনায় ভয় পাবে? আর আদালতের বিরুদ্ধে তো কেউ কথা বলে না, বলে মানবীয় গুনাগুন সম্পন্ন কোন বিচারকের কার্যকলাপ সম্পর্কে। সমালোচনার এ অধিকার ন্যায় সংগত নইলে রাজনৈতিক আইনের ধাপ্পা দিয়ে অসৎ কোন বিচারকের দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে কোন না কোন পক্ষকে সুবিধা দেয়ার প্রক্রিয়া বহাল হবে। দেশের মালিক জনগণ হিসেবে এটা আমরা বরদাশত করতে পারিনা। কোন বিচারক দূর্নীতিবাজ হলেও তাকে কিছু বলা যাবে না, বললে আদালত অবমাননা হবে এটি আমি মানি না, জনগণও মানেনা বলেই আমার বিশ্বাস। বিচারিক এখতিয়ারের বাইরে বিচারপতিদের হাত বাড়ানোর প্রচেষ্টাও মেনে নেয়া হবে না। রাজনৈতিক জটিলতায় কোন প্রজাতন্ত্রের বিচারক রাজনৈতিক বিষয়ে বিচারিক সিদ্ধান্ত দিয়ে জনগণকে মানতে বাধ্য করবেন, এমনকি আদালতের বানানো ইতিহাস মানতে আইনী বাধ্যবাদকতার আদেশ দেবেন এটা মানা যায় না। আমি কোন ইতিহাস মানবো আর অন্যের পিতাকে আমার পিতা মানতে বাধ্য থাকবো কিনা সেই সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। এ বিষয়ে কোন বিচারপতির রায়কে আমি মূল্যহীন কাগজ মনে করি।

আসলে চেয়ারে বসলে সবাই ভুলে যায় যে অন্যেরাও আইনের ফাঁক ফোকর জানতে পারে। একটা উদাহরন দেই ব্যাখ্যাসহ, যদিও তা ভালো লাগবে না, কিন্তু বৈধ অত্যাচারীর চেয়ে অবৈধ কল্যানকারী ভালো নয় কি? সেই অবৈধকে বৈধতার উপায় কি? কিছুটা নিম্নরুপ:
আইনের দার্শনিক হ্যান্স কেলসেন (১৯৮১-১৯৭৩) লিখেছেন,… শুধুমাত্র পজিটিভ আইন-ই আইন হিসেবে বৈধ। প্রতিটি দেশের সর্বোচ্চ আইন হচ্ছে সে দেশের সংবিধান এবং এটি নির্দিষ্ট আদর্শ মোতাবেক নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ হয়। আদর্শ এমন একটি পদ্ধতি যা অন্য আদর্শ থেকে তৈরি হয়। মৌলিক আদর্শ পরিবর্তনের জন্য যদি কতিপয় ব্যক্তির একটি গ্রুপ বৈধ সরকার অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করে এবং ভিন্ন আঙ্গিকে সরকার প্রতিষ্ঠিত করে সফলকাম হয় তাহলে পূরনো আদেশের পরিবর্তে নতুন আইন কার্যকর হবে। তারা পূর্বের বিচারিক আদেশ লঙ্ঘন করতে চাইলে, নিজস্ব আদেশ অনুযায়ী নতুন আচরণগত নিয়ম নিয়ন্ত্রণ ও প্রবর্তন করে, তখন এই নতুন আদেশ বৈধ হিসেবে পরিগণিত হয়। নীতির বৈধতা সবসময় নীতির কার্যকারীতার উপর নির্ভরশীল (General Theory of Law and State, 1946)

তাই বলছি রাষ্ট্রের বেলায় জনগণ সার্বভৌম। তার এই সার্বভৌমত্বকে কোন কিছু দিয়ে খর্ব করার চেষ্টা বৃথা। রাষ্ট্রের সরকারের মূল দায়িত্ব জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। এটি নিশ্চিত করার পূর্বে অন্য কোনরুপ খবরদারী বৈধ নয়। বিবাহের পরে স্ত্রীর ভরন পোষন আর নিরাপত্তা না দিয়ে অন্য সকল সুবিধা আদায় করা যেমন বেআইনী ও অত্যাচারের সমতূল্য তেমনি জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে সরকারী দাপট দেখানোও অত্যাচার ও নির্যাতনের সমতূল্য। তাই এরুপ অবস্থায় জনগণকে হাইকোর্ট দেখানো বেয়াদবী। বার বার দেখানো গণঅবমাননা মানে দেশের মালিকের অবমাননা। এথেকে বিরত না হলে সামনে রথের চাকা জনগণই শুধু উল্টেই দেবে না, পুড়িয়ে দেবে। ভুলে যাবেন না এজাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায় সংগত।

এদিকে সরকার সমর্থক ও সরকারবিরোধীদের সমর্থক সাংবাদিকদের প্রধান সংগঠনের নেতারা এক বিবৃতিতে সাগর-রুনি হত্যা নিয়ে উচ্চ আদালতের মন্তব্য ও নির্দেশে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিা (ডিআরইউ) পক্ষে ডিআরইউ’র সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, “হাই পকার্ট তথ্য সচিবকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা প্রকারান্তরে গণমাধ্যমের উপর সেন্সরশিপ হিসেবে পরিগণিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।” সরকার আবারো আদালতকে ব্যবহার করবে গণমাধ্যমকে দমন করার জন্য।

ভাগ্যবান ড্যান মজীনা, তাকে কোন সূয়োমটো স্পর্শ করবে না, কারন তার রয়েছে কূটনৈতিক সূরক্ষা। নইলে সূপ্রীম কোর্টে প্রত্যাখাত সরকার কর্তৃক লাঞ্চিত ভুলক্রমে নোবেল (ওটা শেখ হাসিনা বা সন্তু লারমার পাওয়ার কথা ছিল) প্রাইজ পাওয়া ড. ইউনুছকে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করার খায়েসের মত ধৃষ্টতা দেখানোর কারনে একটা কিছু করেই দেখাতেন আমাদের রাজনৈতিক কোন কোন বিচারক যারা নিয়োগকারী প্রভুকে সন্তুষ্ট করতে প্রানপাত করছেন। এক্ষেত্রে ড্যান মজীনার সম্ভাব্য (কাল্পনিক) অপরাধ হতো ”কেন তিনি ইউনূসকে অপমান করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষা বুঝতে না চেয়ে পাল্টা বক্তব্য দিলেন। এটা আওয়ামের চেতনার প্রতি অবমাননা,পিতার প্রতি অশ্রদ্ধার শামীল।” তাকে রাজাকার বলা হতো কিনা জানি না (যদিও যুক্তরাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ ধরা হয়)।

যে সকল বিচারপতি নিজেদেরকে মহান বিচারক সৃষ্টিকর্তার প্রতিনিধি ভাবেন নিয়োগকর্তার প্রতিনিধি নয়। তাদেরকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। তাদের প্রতি আমার এই লেখার কটাক্ষ নয়। আমি আশাকরি তারা ক্ষুব্ধ হবেন না কোন কোন বিচারকের প্রতি কোন নাগরিকের প্রতিক্রিয়া দেখে।

—লেখক নির্বাসিত। রাজনীতিক, সাংবাদিক, প্রবন্ধকার..