ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসহিষ্ণুতা, অসহনশীলতা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিরাজমান। প্রতিদ্বন্দ্বী এখন প্রতিপক্ষ শত্রু হিসেবে পরিগণিত। একই পরিবারের সদস্যরা এখন রাজনীতির কারণে বিভক্তির শিকার। ক্ষেত্র বিশেষে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। কিন্তু এ ধারার রাজনীতিতে লাভ কাদের? কারা জনগণকে একে অপরের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফায়দা লুটছে? বিএনপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত লুটেরাদের কি কিছু হয়েছিল? হয়নি। যেমনি কোন ক্ষতি হয়নি বিএনপির লুটেরাদের। আসলে ক্ষমতার কাছাকাছি বা ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের কিছু হয় না। কিন্তু তারা শত্রুতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেন জনতার মাঝে। ছড়িয়ে দেন অসহিষ্ণুতা, অসহনশীলতা যা রাজনৈতিক ফায়দা লোটায় কাজে লাগে। নইলে জনতা অকাতরে প্রাণ দেয়না রাজপথে, নিজের বুকের তাজা রক্তে তৈরি করে না নেতা-নেত্রীর ক্ষমতায় যাওয়ার সোপান।

আর রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন?

বলতেও ভয় লাগে! আমার জন্য না হোক আমার সহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে আমি শংকিত হচ্ছি এ চরম সত্যটি বলার আগে। রাজনীতি এখন দূর্বৃত্তদের দখলে। যে যত বড় দুর্বৃত্ত সে ততো বড় ক্ষমতাবান এবং বড় নেতা। এই দূর্বৃত্তরা রাজনীতির জন্য এখন মাদক ব্যবসা কে পৃষ্ঠপোষকতা করে। রাষ্ট্রীয় সম্পদকে টেন্ডারের নামে ভাগাভাগি করে। নিজেদের খাস বরকন্দাজদের নিরাপদ রাখতে বংশবদলের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত করে। আর এ সারমেয়র দল এক একটি পদে বসে হয়ে যায় রাজনৈতিক দূর্বৃত্তদের পদলেহি, ভুলে যায় জনতার কথা, ভুলে যায় গ্রামে ফেলে আসা বাল্য, কিশোর জীবনের কথা যেখানে হয়ত তার পুরোনো বন্ধুটি আজ রাজনৈতিক দূর্বৃত্তদের কারণে তার দ্বারাই প্রতিহিংসার শিকার হয়ে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি!

কিন্তু ক্ষমতা দখলের দূর্বৃত্তদের এই রাজনীতিতে, এই বিশাল রণ আয়োজন, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, রক্তপাতে জনগণের লাভ কোথায়? জনগণ তা বোঝেনা। যেমনি বোঝে না কেন সে দল করে। দূর্বৃত্তরা বোঝে তার লক্ষ্য আছে, কিন্তু জনতা জানে না, সে যে দলটির জন্য জীবন বাজী রাখছে তার আদর্শ কি, জনতার উন্নয়নে দলটির প্রতিশ্র“তি কি, কতটুকু পালন করা হয়েছে বিগত দিনে, কতটুকু পালন করা হবে আগামীতে, জনতার জন্য কেন তারা ব্যর্থ। বিগত তিন দশকে জনগণ না বুঝলেও ক্ষমতাসীনরা ঠিকই বোঝে। তাইতো ক্ষমতার সোনার চামচটি তাদের চাই।

এক জোট চায় সবকিছু তাদের সাজানো মত চলুক আর এক জোট চায় তা ভেঙে দিয়ে নিজের জয়লাভের পথটি পরিষ্কার করতে। দুই পক্ষের এ খেলায় বলি হচ্ছে নিরীহ গর্দভ কিছু জনতা। লাশ হচ্ছে তারা! জনতার লাশের ওপর দিয়ে যাদের ক্ষমতা লাভ হয়, ক্ষমতায় গেলে তাদের খবর রাখার সময়ও পায় না। তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে জনগণের উন্নয়নের জন্য না, তাদের পকেট উন্নয়নের জন্য। এক সময় যাদের পায়ে স্যান্ডেল ছিল না তারা আজ শত কোটি টাকার মালিক। তারা চিনতে পারেনা এমনকি ওই ব্যক্তিকেও যার টাকায় তার হয়ত একবেলা এমনকি অনেকদিন সংসারও চলেছে।

বাংলাদেশ এমন এক বেহেশতখানা যেখানে অবাধে লুটপাট করা যায়। কেউ বাঁধা দেয়না। যারা খুব সৎ হিসেবে নিজেদের দাবি করেন আমি দেখেছি তারা অবলীলায় অসৎ আদেশ পালন করেন। যাদের এক পা কবরে চলে গেছে তারাও নিজের বা গোষ্ঠী স্বার্থে কাজ করতে একটুও বিবেকের কাছে লজ্জা পান না।

বাংলাদেশ এখন এমন একটি দেশ যেখানে রাজনৈতিক চোরেরা বুক ফুলিয়ে কথা বলেন। ঘুষখোরেরা এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানেরা দাপটের সাথে চলে। আর পুলিশ তারাতো বলেই থাকে আকাশের যত তারা পুলিশের ততো ধারা। এরা যখন পুলিশে ভর্তী হয় এবং ট্রেইনিং নেয় তখন থেকেই তারা পুলিশ হয়ে যায় এরা তখন না থাকে মায়ের না থাকে বাবার। মিথ্যা বলতে এদের কষ্ট হয়না। ফুটপাথের ফেরিয়লার টাকা, বেশ্যার টাকা নিতে এদের কষ্ট হয়না বিবেকেও বাঁধে না। আর কহিনূর-আক্কাস মার্কা পুলিশ হলেতো তাদের কথাই নেই। কারো না কারো গোলাম (নাকি কু…?) হয়ে নিজেদের ধন্য করতে ব্যস্ত থাকেন। এরা কখনোই এদের মালিক জনগণের হতে পারে না। পুলিশ বিদেশে যায়, চাকরি করে, উন্নত সমাজ দেখে, কিন্তু দেশে এসে নিজের কুকাজে লজ্জা পায়না, একবার ভাবেও না তার সন্তানকে একটা ঘুষখোরের সন্তান হিসেবে সমাজ জানে।

রাজনীতি এখন একটি পুতি গন্ধময় স্থানে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্কুল পড়–য়া বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করি তবে এর সত্যতা পাওয়া যাবে। সবাই জানে রাজনীতি মানে টাকার উৎসস্থল।

আমি যখন বাংলাদেশে রাজনীতি করি সার্বক্ষণিক হিসেবে, আমার চারপাশের জনতা যাদের জন্য আমি কাজ করতাম, তাদের একটাই প্রশ্ন কত টাকা দিতে পারবো তাদের জন্য, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, স্থানীয় ক্লাবে, মসজিদে, মাদ্রাসাতে, গরীবের ঘরের টিন কিনে দিতে ইত্যাদি নানান প্রয়োজনে। আমি যখন তাদের বোঝাতাম, আমি যদি তোমাদের এটা দেই তবেতো তোমাদের উন্নয়ন করা হবে না। আমাকে দু’নম্বরি পথে টাকা কামাই করতে হবে। তখন আমাকে তোমাদের টাকা মেরেই নিজে বড় হতে হবে আর তোমাদের দিতে হবে। জনতার সহজ কথা টাকা চাই। টাকা নাইতো তোমাকেও দরকার নেই। তোমার মত ভালো মানুষ চাই না। যে আমাদের তাৎক্ষনিক সমস্যা মেটাতে পারবে তাকেই আমরা নির্বাচিত করব।

হায়রে জনতা!

তারা সবসময় আমার বিরুদ্ধে মহাচোরকে বিজয়ী করত। সারা দেশ জানে আমার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ধান্দাবাজ এবং দুই নেত্রীকেই ম্যানেজ করে চলেন।

এখন যদি আমরা সংকটকে বিচ্ছিন্ন করে দেখি তবে তা হবে বিশাল ক্ষতের ওপর মলমের প্রলেপের মত। বিএনপি আর আওয়ামী লীগ বা এদের দোসরদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? সবাই বিদেশী দালালীতে এক্সপার্ট, লুটপাটে সিদ্ধহস্ত, জনতার সমস্যা সমাধানের চিন্তায় উদাসীন।

গত তিনটি সংসদের একটিতেও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কোন দলই ধারবাহিক কথা বলেনি। সংসদে দুই-তিন কোটি বেকারের উন্নয়নে কথা ছিলনা। লাখ লাখ পতিতার বিষয়ে কথা ছিলনা। ভূমিহীনদের উন্নয়নে কথা ছিলনা। চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নে কথা ছিলনা। আর্সেনিকের ভয়াল ছোবল থেকে পরিত্রাণের বিরুদ্ধে কথা ছিলনা। পুলিশসহ প্রশাসনিক ব্যক্তিদের ঘুষের হিংস্র থাবা থেকে জনগণের মুক্তির বিষয়ে কথা ছিলনা। বিচার বিভাগে সরকারী হস্তক্ষেপ আর বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রিতা আর হয়রানির বিষয়ে কথা ছিল না। মাদক ব্যবসা বন্ধের বিষয়ে কথা ছিলনা। অশিক্ষার বিরুদ্ধে কথা ছিলনা। জমিদারী ট্যাক্স (প্রচলিত ট্যাক্স ব্যবস্থা ) বন্ধ করে জনগণের ভবিষ্যৎ উন্নয়নমূলক ট্যাক্স ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে কথা ছিলনা। রাস্তার টোকাই আর বস্তিবাসীর উন্নয়নে কথা ছিলনা। পরিবেশ উন্নয়নে কথা ছিলনা। রাজনৈতিক দলগুলোতে লুটেরা ব্যবসায়ীদের উন্নয়নে কথা ছিলনা, চিহ্নিত সাবেক আমলাদের অন্তর্ভূক্তির বিরুদ্ধে কথা ছিলনা।

তাহলে ছিলটা কি?

ছিল একদল কিভাবে ক্ষমতায় থাকবে আর একদল কিভাবে ক্ষমতায় আসবে এরই নীলনকশা বাস্তবায়নের নাটক। ক্ষমতা এদের কাছে জনগণ এমনকি নিজের জীবনের চাইতেও বড়। সন্তানের জীবন এদের কাছে তুচ্ছ। ক্ষমতার জন্য এরা যেকোন ভবিষ্যৎ এবং উঠতি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে একটুও চিন্তা করে না। আর রাজনীতির বেশুমার টাকার জন্য গোপনে এরা করেনা এমন কোন কাজ নেইবা সম্পর্ক রাখেনা এমন কোন খারাপ মানুষ নেই। প্রমাণ চাইলে প্রমাণ কার সম্ভব নয়। কারণ সবাই ভাত খায় তাই টাকাও খায় এটাই তাদের কথা। আর একারণেই প্রমাণ নেই। দু’পক্ষের কেউই কোন প্রমাণ জনগণকে দেবেন না কারণ তারা জানেন তারা তুলসী পাতা নন। ঝগড়া তো মাত্র সাময়িক। ক্ষমতায় গেলে প্রধান কর্তারা সব সময় বহাল থাকবেন। তাদের কোন সমস্যা নেই।

সমস্যা সকল জনগণের। আইন প্রয়োগ সব জনগণের ওপর। পুলিশী দাপট আর আদালতের খড়গ সব জনগণের ওপর, টাকায়লা আর বড় চোর রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে নয়। কোটি কোটি টাকার হেরোইন পাচার করেও কেউ জামিন পায় আর দুই বোতল ফেন্সিডিল কাছে রেখে কেউ বছরের পর বছর জেলে থাকে। জনতার বিরুদ্ধে মামলা হয় প্রমাণ ছাড়া। জনগণকেই প্রমাণ করতে হয় সে নিরপরাধ। আর বড় চোর, ঘুষখোর আমলা, পুলিশসহ বড় রাজনীতিকদের (বড় দলের নেতা) বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করে মামলা দিতে হয়। আদালতও পুলিশকে বলে না জনতার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ দিতে। চার্জশীট তৈরি হয় একজন ঘুষখোরের অনুমানের ভিত্তিতে। কিন্তু জনগণ এর বিরুদ্ধে কথা বলেনা। তারা আজো জীবন দেয় বড় চোরদের ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা তৈরি করতে। এলাকার বড় নেতা (বড় চোর) যখন তাকে পাঁচশ টাকার একটি নোট দেয় আর কাছে টেনে কথা বলে, জনতা তখন ভুলে যায় তার অধিকার আর পাওনার কথা। ভুলে যায় তার আর তার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা। ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়াইয়ের ময়দানে। জয়ী করে আনে এক মহা বড় চোর আর বাটপার কে। যে পাঁচটি বছর তাকে শোষণ করে, শাসন করে অবলিলায়।

হায়রে জনতা!

এদেশে কবে ফিরে আসবে জনতার উপলব্ধি, তার অধিকারের, তার ভবিষ্যতের, আমার জানা নেই। তবে জানি জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করতে প্রয়োজন একজন সৎ নায়কের, রাজনীতিক বা পথপ্রদর্শকের। আমি বিশ্বাস করি একদিন আবির্ভূত হবেন সেই মহান নেতা যিনি পথ দেখাবেন জনতাকে। যার নেতৃত্বে ধ্বংস হবে দেশের সকল রাজনৈতিক চোর, ঘুষখোর, লুটেরা, আমলা আর দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশসহ সামাজিক টাউট।

সময়ই নেতৃত্ব তৈরি করে দেয়-

জনতার জয় হবে সেদিন। এ খেলা থেকে কারো মুক্তি নেই আর এই আপোষের ক্ষমতার খেলায় জনতার লাভ নেই।
সুতরাং আমরা সময় নষ্ট না করে আগামীর জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি, যেন আগামীর নেতার পাশে প্রশিক্ষিত কর্মী থাকে। আমরা স্বপ্ন দেখলেও কল্পনা বিলাসী নই। আর এও জানি রাতের পরে সূর্যোদয় হতেই হবে।