ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ভুমিকা

চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধানাবলী। রোজা, ঈদ, কুরবানীসহ হজ্বের মত ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলী। সুতরাং চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে পরিস্কার ধারণা না থাকলে এই সকল বিষয়ে সমস্যা হতে বাধ্য। সুতরাং প্রতিটি মুসলমানের এ বিষয়ে পরিচ্ছন্ন জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ইসলাম একটি সার্বজনীন ধর্ম। গোটা পৃথিবীর সকল অঞ্চলের বিগত-আগত ও অনাগত সকল মানুষের জন্য কার্যকরী “স্রষ্টা” কর্তৃক নির্ধারিত একটি জীবন ব্যবস্থা।

ইসলাম কোন ভৌগলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ ধর্ম নয়, ইসলাম ধর্মকে সার্বজনীন আখ্যা দিয়ে পবিত্র কুর’আনে ইরশাদ হচ্ছে- { وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ (سبأ: 28) } অর্থাৎ আমি (আল্লাহ তা’য়ালা) তোমাকে (রাসূল সা.) সকল মানুষের জন্য সুসংবাদ দাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে প্রেরণ করেছি, যদিও অধিকাংশ লোক তা জানেনা। অন্য আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা হয়েছে-[” إن الدين عند الله الاسلام ” [ آل عمران: 19 অর্থাৎ আল্লাহ তা’য়ালার কাছে মনোনিত দ্বীন হলো ইসলাম। আর এই দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ আনুগত্য সকলের উপর আবশ্যক। যেমন পবিত্র কুর’আনে ইরশাদ হচ্ছে -{ ياأيها الذين ءَامَنُواْ ادخلوا فِي السلم كَافَّةً } [ البقرة : 208 ] অর্থাৎ তোমরা ইসলাম ধর্মে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রবিষ্ট হও।

উল্লেখিত আয়াতে কারীমার মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে, সকল মানুষের জন্য আল্লাহ তা’য়ালার মনোনিত দ্বীন হলো ইসলাম, আর রাসূল কারীম সা. কে সকল মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে পাঠানো হয়েছে, কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য বা নির্দিষ্ট মানুষের জন্য নয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই এর বিধানাবলী ও সার্বজনীন হবে, কোন নির্দিষ্ট অঞ্চল বা নির্দিষ্ট মানুষের নির্ধারিত সময় ভিত্তিক হবেনা এটাই যৌক্তিক। আর একারণেই ইসলামী শরীয়তের সকল বিধান আমভাবে বর্ণিত হয়েছে। সময়ের সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছে, কিন্তু প্রচলিত নির্ধারিত সময় নির্ধারিত করে দেয়নি, কিংবা কোন অঞ্চলের সময়ের অনুস্বরণ করার কথাও কুর’আন হাদীসের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিধানের প্রতি আমরা দৃষ্টি বুলালেই এর বাস্তবতা আমাদের চোখে ধরা পড়বে। যেমন-আল্লাহ তা’য়ালা রোজা রাখার বিধানে সময়ের সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে ইরশাদ করেন-

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ آَيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ (سورة البقرة-187)

-“সুবহে সাদিকের পর থেকে সূর্য অস্ত যাবার আগ পর্যন্ত পানাহার ও সহবাস থেকে মুক্ত থাকতে হবে।” গোটা পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য একই বিধান। এখন প্রশ্ন হলো-আল্লাহ তা’য়ালার এই বিধান পৃথিবীর সব মানুষ একই সময়ে আদায় করতে সক্ষম হবে? অবশ্যই না, কারণ পৃথিবীর সকল স্থানে এক সময়ে সুবহে সাদিক ও সূর্যাস্ত যাওয়া অসম্ভব, তাই এক সময়ে এ বিধান সবার আদায় করা সম্ভব নয়, কিন্তু একই গুন সম্পন্ন সীমায় এই বিধান পৃথিবীর সকল মুসলমানের জন্য পালন করা সম্ভব। কারণ পৃথিবীর সকল স্থানেই সুবহে সাদিক যেমন আসে, ঠিক সূর্যাস্ত ও যায়, যদিও এক সময়ে নয়। সুতরাং পৃথিবীর সব মুসলমান রোযা রাখার বিধান আল্লাহ তা’য়ালার বেঁধে দেয়া গুন বিশিষ্ট (সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকা) সীমার মধ্যে আদায় করতে কোন অসুবিধা নেই। যদিও এক সময়ে আদায় করা সম্ভব নয়, কারণ পৃথিবীর এক স্থানে যখন সূর্য উঠে অন্য স্থানে তখন অস্ত যায়, বা এক স্থানে যখন দুপুর অন্য স্থানে তখন বিকাল বা রাত। এমনিভাবে নামাযের সময়ের ক্ষেত্রে ও একই পদ্ধতী প্রযোজ্য। অর্থাৎ কুর’আন ও হাদীসে আমাল আদায়ের যেই গুন বিশিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে তা যে এলাকায় পাওয়া যাবে, সে এলাকার বাসিন্দাদের উপর সেই আমাল তখন আদায় করা আবশ্যক। যে এলাকায় সেই গুন বিশিষ্ট সীমা আসেনি তাদের উপর আবশ্যক নয়, কারণ তাহলে আল্লাহ তা’য়ালা আদেশ মানা হবেনা বরং তা মনের পূজা বা যেই এলাকার সময় হিসেবে ইবাদাত আদায় করা হচ্ছে সেই এলাকা পূজা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারেনা।

চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে শরয়ী দৃষ্টিকোণ

মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন

هُوَ الَّذِي جَعَلَ الشَّمْسَ ضِيَاء وَالْقَمَرَ نُورًا وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُواْ عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ مَا خَلَقَ اللَّهُ ذَلِكَ إِلاَّ بِالْحَقِّ يُفَصِّلُ الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ (سورة يونس-5)

তিনি ঐ সত্বা! যিনি সুর্যকে সৃষ্টি করেছেন দীপ্তিশালী ও চন্দ্রকে আলোকময়, এবং তার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন তার কক্ষপথ,যাতে তোমরা তার সাহায্যে বছর গণনা ও তারিখ হিসেব করতে পার। এগুলোকে তিনি যথার্থ কারণেই সৃষ্টি করেছেন,তিনি তার নিদর্শনাবলী বিশদভাবে ব্যাক্ষা করেছেন জ্ঞানীদের জন্য।(সুরা ইউনুস, আয়াত-৫)

মুফাসসিরীনে কিরাম উক্ত আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেন-মহান রাব্বুল আলামীন সুর্য দ্বারা দিনের সময় আর চন্দ্র দ্বারা মাস ও বছরের হিসেব নির্ধারণ করেছেন।

وقال في هذه الآية الكريمة: { وقدره } أي: القمر { وَقَدَّرَهُ مَنَازِلَ لِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ } فبالشمس تعرف الأيام، وبسير القمر تعرف الشهور والأعوام(. تفسير ابن كثير – 4 / 247)

উক্ত আয়াত ও তার তাফসীর দ্বারা একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, কোন মাস শেষ হয়েছে কী না? তা নির্ধারিত হবে চন্দ্রের দ্বারা। অর্থাৎ চাঁদের উদয় ও অস্ত দেখে নিরূপিত হবে মাস শুরু হয়েছে ও শেষ হয়েছে কী না? আর এদিকেই ইংগিত করে আল্লাহর নবী সা: বলেন

محمد بن زياد قال سمعت أبا هريرة رضي الله عنه يقول : قال النبي صلى الله عليه و سلم أو قال قال أبو القاسم صلى الله عليه و سلم ( صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته فإن غبي عليكم فأكملوا عدة شعبان ثلاثين ) )كتاب الصوم- باب قول النبي صلى الله عليه و سلم ( إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فأفطروا – صحيح البخاري – 2 / 674)

وبإسناده سمعت أبا القاسم صلى الله عليه وسلم يقول صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته فإن غم عليكم فعدوا ثلاثين (مسند أحمد – الجزء السادس العشر-16 / 91)

অনুবাদ-(১) আবু হুরায়রা রা: বলেন, আল্লাহর নবী সা: বলেছেন-তোমরা (চাঁদ) দেখে রোযা রাখ ও (চাঁদ) দেখে রোযা ভাঙ্গো,(বুখারী শরীফ-২/৬৭৪)

(২) নবী সা: বলেছেন-তোমরা (চাঁদ) দেখে রোযা রাখ ও (চাঁদ) দেখে রোযা ভাঙ্গো, আর যদি তোমাদের উপর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে তোমরা ৩০ দিন পূর্ণ কর। ( মুসনাদে আহমাদ-১৬ /৯১)

উক্ত হাদিসে নববীতে আল্লাহর নবী আমাদের মূলনীতি নির্ধারিত করে দিলেন যে চাঁদ দেখা গেলে বুঝা যাবে মাস শেষ, নতুন মাস শুরু হয়েছে। তাই রমযানের চাঁদ দেখা গেলে রোযা রাখবে আর শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলে রোযা ভেঙ্গে ফেলবে। আর দ্বিতীয় হাদিসটির দ্বারা বুঝা গেল ২৯ তারিখ চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ দিন পূর্ণ হলে মাস শেষ হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। এর কোন ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য নয়।

সুতরাং যে এলাকায় রোযা বা ঈদের চাঁদ দেখা যাবে সেই এলাকা ও তার পাশের এলাকা যার উদয়াচল এক (তথা উক্ত এলাকার সাথে সময়ের এত পার্থক্য নয় যে, সেখানে কখনো এ এলাকার মাসের হিসেবে কখনো ২৮ বা ৩১ তারিখ হয়ে যায়)তাদের জন্যই কেবল রোযা ও ঈদ আবশ্যক হবে। উদায়াচল ভিন্ন অন্য এলাকার জন্য উক্ত চাঁদ দেখার দ্বারা শরয়ী হুকুমের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব পড়বেনা।

اختلاف مطالع তথা উদায়াচলের ভিন্নতা

উদায়াচলের ভিন্নতা বলা হয় সুর্যাস্ত ও সুর্যোদয়ের সময়ের ভিন্নতার কারণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার সময়ের মাঝে একদিন বা তারচে’ বেশি দিনের পার্থক্য হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ এক এলাকায় যখন মাসের ৩০ বা ২৯ তারিখ হয়ে চাঁদ উঠছে তথা মাস শেষ হচ্ছে দূরবর্তী অন্য দেশে তখন মাসের ২৮ বা ৩১ দিন হয়ে যাচ্ছে। এরকম যদি কোন দেশের সাথে অন্য দেশের দূরত্ব হয়, বুঝা যাবে যে, এ দুই দেশের উদয়াচল ভিন্ন, এক নয়। সুতরাং এ দুই দেশের মাঝে এক দেশে চাঁদ উঠলে অন্য দেশেও চাঁদ উঠেছে বলে শরয়ী বিধান কার্যকর হবেনা।

যেমন সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের উদায়াচলের পার্থক্য আছে, অর্থাৎ সৌদির মাস আমাদের একদিন আগে বা পড়ে শেষ হয়, সুতরাং সে দেশে রোযা বা ঈদের চাঁদ উঠলে বাংলাদেশে রোযা বা ঈদ করা যাবেনা। বরং বাংলাদেশ বা পার্শবর্তী দেশে যদি চাঁদ উঠে, যাদের সাথে বাংলাদেশের উদায়াচলের পার্থক্য নেই (ভারত, পাকিস্তান, বার্মা ইত্যাদী) তবে সে দেশের চাঁদ উঠার সংবাদ যদি আমাদের কাছে শরয়ী মানদন্ডে নির্ভরযোগ্য সুত্রে পৌঁছে, তবে আমাদের দেশের হেলাল কমিটি তা গ্রহণ করে সারা দেশে প্রচার করবে। ফিক্বহী কিতাবে উক্ত বক্তব্যের পক্ষে নিম্নের ইবারত পাওয়া যায়-

هذا إذا كانت المسافة بين البلدين قريبة لا تختلف فيها المطالع فأما إذا كانت بعيدة فلا يلزم أحد البلدين حكم الآخر لأن مطالع البلاد عند المسافة الفاحشة تختلف فيعتبر في أهل كل بلد مطالع بلدهم دون البلد الآخر بدائع الصنائع -2/224-225كتاب الصوم / فصل وأما شرائطها)

أنه ليس بين تلك البلاد بعد كثير بحيث تختلف به المطالع لكن ظاهر الاطلاق يقتضي لزوم عامة البلاد ما ثبت عند بلدة أخرى فكل من استفاض عندهم خبر تلك البلدة يلزمهم اتباع أهلها ويدل عليه قوله فيلزمهم اهل المشرق برؤية اهل المغرب ” (منحة الخالق على البحر الرائق 2/271)

সারা পৃথিবীতে একই সময়ে ঈদ করার দাবী হাস্যকর

পৃথিবীর ভৌগলিক অবস্থা সম্পর্কে যার সাধারণ জ্ঞান রয়েছে সে কখনো একথা বলতে পারেনা যে, সারা পৃথিবীতে এক সময়ে ঈদ করা সম্ভব। কারণ আমরা জানি পৃথিবীতে রাত দিনের পার্থক্য কেন হয়? পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, নিজ অক্ষের উপর ও আবর্তিত হয়। পৃথিবী তার মেরু রেখার উপর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে। পৃথিবী তার মেরু রেখার চারদিকে এভাবে ঘুরে আসতে প্রায় ২৪ ঘন্টা সময় লাগে। এ চব্বিশ ঘন্টাকে বলা হয় এক দিন। পৃথিবীর এ দৈনিক গতির নাম আহ্নিক গতি। এ আবর্তের সময় পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের দিকে থাকে সে অংশে তখন দিন এবং অপর অংশে রাত হয়। আর একারণেই বাংলাদেশে যখন দিন তখন আমেরিকাতে রাত হয়। সুতরাং বাংলাদেশে চাঁদ উঠলে আমেরিকাতে ঈদ করতে হলে ঈদের জামাত গভীর রাতে করা ছাড়া কোন পথ আছে কী? আর ঈদের নামায দিনের বেলা না পড়ে রাতে পড়ার বিধান আল্লাহ প্রদত্ব না নিজে বানানো? সৌদিতে বাংলাদেশে অফিস টাইম হয়েছে বলে যে সকল রাষ্ট্রে এখনো রাত বা অফিসের সময় হয়নি তাদের ও অফিসে যেতে হবে’ এ দাবী যেমন পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয়, ঠিক তেমনি সৌদিতে বা বাংলাদেশে আল্লাহ তা’য়ালার নির্দিষ্ট কোন ইবাদতের সময় হয়েছে বলে তা যে রাষ্ট্রে এর সময় হয়নি তাদের ও তা “পালন করতে হবে” বলার কথা মানসিকভাবে সুস্থ্য মানুষ বলতে পারে? সুতরাং শুধু আবেগ নয় বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করলে এ অদ্ভূত দাবীটি হাস্যকর ছাড়া অন্য কিছু বলে মনে হয়না।
একতার ভূয়া ধোঁয়া

যারা পৃথিবীতে একই সময়ে ঈদ করার দাবী উত্থাপন করেন, তাদের একটি যুক্তি হলো, ইসলাম একতার ধর্ম, একতার মাঝেই প্রভূত কল্যাণ নিহিত। সকল মুসলমানরা এক সময়ে ঈদ বা অন্যান্য ধর্মীয় বিষয় একসাথে পালন করলে মুসলমানদের মাঝে একতার বন্ধন দৃঢ় হবে, তাই এ হিসেবে হলেও আমাদের এক সময়ে ঈদ বা অন্যান্য ধর্মীয় কাজ করা উচিত, তাছাড়া সারা পৃথিবীতে এক ঈদের চাঁদ একবারই উঠে, একাধিকবার নয় সুতরাং এক অনুষ্ঠানের জন্য উদিত চাঁদ একবারের জন্য উঠে থাকলে সবার একসাথেই অনুষ্ঠান পালন করা উচিত।

যারা এতো সুন্দর করে এ চটকদার যুক্তিটি পেশ করেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, একতার অর্থ শুধু এক সময়ে কোন কাজ করা? নাকি একই কাজ একই গুনে সবাই পালন করলেও একথার অর্থ থাকে? আপনারা কী বলতে চান-বাংলাদেশে মাগরীবের সময় হলেও সৌদিতে এখনো সময় হয়নি বলে আমরা ৪ ঘন্টা অপেক্ষা করব, আর আমেরিকার মুসলমানরা সকালবেলা পড়বে মাগরীবের নামায! একসাথে নামায পড়ে একতা প্রতিষ্ঠার জন্য?

একটি কথা যদি ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা হয় তবেই আমরা বুঝতে পারব যে, সারা পৃথিবীর মুসলমান একতাবদ্ধ হয়ে একই আমল করছে, ভিন্নভাবে নয়, এক কথায় সারা পৃথিবীর মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় বিষয় পালন করার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত একতা রয়েছে। বিষয়টি আমরা একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝতে পারি-আমরা জানি হাসনাহেনা আর রজনীগন্ধা ফুল কেবল রাতে ফুটে, সুতরাং একথা নির্ধারিত হলো যে, সারা পৃথিবীর রজনীগন্ধা আর হাসনাহেনা এক নির্ধারিত সময় তথা রাতে ফুটে দিনে নয়, এ হিসেবে তাদের মধ্যে একতা রয়েছে,সৌদিতে রাত বলে এ ফুল ফুটলো, কিন্তু আমেরিকায় দিন বলে এ ফুলটি সেখানে ফুটলোনা, এ ব্যপারে একথা কী বলা যাবে যে, আমেরিকায় হাসনাহেনা ফুল তাদের মূল গুন (রাতে ফুটার ক্ষেত্রে একতা) থেকে বিচ্যুত হয়েছে? নাকি তার অবস্থানস্থল দিন না হওয়ায় সে না ফুটে সে তার স্বমহিমায় একতাবদ্ধ রয়েছে বলা হবে? আশা করি বিজ্ঞ পাঠক সবাই একথা বলবে যে, ফুলটি আমেরিকায় দিনের বেলায় ফুটলে বরং সে তার আদর্শচ্যুত বা একতা ভঙ্গের দোষে দোষি হতো। আমেরিকায় ও একই গুনবাচক সময়ে এই ফুলটি ফুটবে, কিন্তু সৌদির সময় অনুস্বরণ করে নয় বরং তার নিজের এলাকার সময় অনুস্বরণ করে, আর তার একতার নিদর্শন এটাই।

ঠিক তেমনি আল্লাহ তা’য়ালার নবী আদেশ দিয়েছেন “চাঁদ দেখে রোজা রাখতে আর চাঁদ দেখে রোজা ভাঙ্গতে” নতুবা তোমরা ত্রিশ দিন পূর্ণ কর (মুসলিম শরীফ)। সুতরাং এই আদেশ সারা পৃথিবীর মুসলমানদের জন্য এক। সুতরাং যে এলাকায় চাঁদ দেখা যাবে, তারা রোজা রাখবে এবং ঈদ করবে, আর যে এলাকায় তা দেখা না যাবে,তারা তা পালন করবেনা। যখন তারা চাঁদ দেখবে তখন তারা রোজা রাখবে ও ঈদ করবে। সেক্ষেত্রে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা একই গুন বিশিষ্ট সময়ে আল্লাহর আদেশ পালন করে একতাবদ্ধ রইলো, অর্থাৎ সারা পৃথিবীর মুসলমানরা নবীর আদেশ একই ভাবে একই গুন বিশিষ্ট সময়ে পালন করেছে, তাহলো চাঁদ দেখে রোজা রাখলো আর চাঁদ দেখে ঈদ করলো। পক্ষান্তরে এক দেশের চাঁদ দেখার ফলে অন্য দেশে চাঁদ না দেখেও রোজা বা ঈদ করলে তারা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। কারণ তখন বলা যাবে যে, কিছু মুসলমান চাঁদ উঠেছে তাই রোজা রাখলো কিছু মুসলমান তাদের দেশে চাঁদ উঠে নাই তারপরও রোজা বা ঈদ করলো। সুতরাং একতা রইলো কোথায়?

আরো সহজভাবে বললে বলা যায় যে, সূর্য উঠলে সবাই অফিসে যাবে, সুতরাং বাংলাদেশে যখন সূর্য উঠে তখন বাংলাদেশীরা অফিসে যায়, আমেরিকায় যখন সূর্য উঠবে তখন তারা অফিসে যাবে, অন্য দেশে যখন সূর্য উঠে তখন তারা অফিসে যায়, সুতরাং একথা কী বলা সঠিক নয় যে, সারা পৃথিবীর সবাই এক গুনবাচক সময়ে অফিসে যাবার ক্ষেত্রে এক। তাদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। নাকি আমেরিকায় রাতে আর বাংলাদেশে দিনের বেলায় অফিস একই সময়ে করলে বলা হবে যে তারা অফিসের সময়ের ক্ষেত্রে এক! নাকি ভিন্ন বলা হবে?
সারকথা

সৌদি আরবের মত উদয়াচল ভিন্ন রাষ্ট্রের চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশেও রোযা ও ঈদ করার দাবী মৌলিকভাবে মুসলমানদের মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টির পায়তারা, তাছাড়া নিষিদ্ধ দিনে (রজবের ২৯ তারিখ) রোযা রাখতে হবে, আবার যে দিন রোযা রাখা ফরয (রমযানের ৩০ তারিখ) সেদিন রোযা ভাঙ্গার গোনাহে পতিত হবার জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়। তাই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন কোন মুখরোচক স্লোগানে প্ররোচিত হয়ে সুস্পষ্ট ফায়সালাকৃত দ্বীনি বিষয়ে অযথা সন্দিহান হয়ে ফেৎনায় না জড়িয়ে পড়ি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

***

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
ইমেইল-lutforfarazi@yahoo.com