ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আমরা মুসলমান। পৈত্রিক সূত্রে মুসলমান। বাবা-মা মুসলমান, তাই আমিও মুসলমান। কিন্তু অনেকেই ‎জানেনা মুসলমানিত্বের প্রকৃত মর্ম। ইসলামী রীতিনীতি তাই অনেক সময় আমাদের পথের কাঁটা হয়ে ‎দাঁড়ায়। যেমন “তালাক”। ‎

আমরা মুসলমান বলেই ধর্মীয় কিছু বিষয় মানতে আমরা একান্ত বাধ্য। যেমন-ছেলেদের খাৎনা করানো, ‎বিয়ের সময় দু’জন স্বাক্ষ্য রাখা, মৃত্যুর সময় ইসলামী শরীয়ত মোতাবিক কাফন দাফন ইত্যাদী। যেগুলো ‎সারা জীবন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে নাক সিটকালেও আমরা করে থাকি বা করতে বাধ্য হই। এমনি একটি বিষয় ‎হল “স্ত্রীকে তিনি তালাক দিলে তাকে আর রাখা যাবেনা,” এই বিধানটি।
একটি ধুম্রতা

মুখে তিন তালাক বললেই বিশ পঁচিশ বছরের হাজারো সুখ দুঃখের সাথি অর্ধাঙ্গিনী চিরদিনের জন্য হারাম ‎হয়ে যাবে, এই বিধানটি অমানবিক বলেই মনে হয়। এ কেমন কথা? রাগের মাথায় তিন তালাক বললাম ‎আর আমার এতদিনের জীবন সঙ্গীনী হারাম হয়ে গেল? বড়ই বেমানান লাগে কুরআনের এই বিধানটি ‎আমাদের ধর্মজ্ঞানহীন মনে। কিন্তু আসলেই কী তাই? এই বিধানটির শরয়ী প্রয়োগ পদ্ধতী কী আমরা ‎জানি? জানলে এই উদ্ভট প্রশ্নটি মনে জাগরিত হতোনা।

তালাক দেয়ার শরীয়া পদ্ধতি

তালাক ইসলামে একটি অপছন্দনীয় জায়েজ বিষয়। আল্লাহর নবী বলেন-“ইসলামে নিকৃষ্ট হালাল বস্তু হল ‎তালাক” (আল হাদীস)। তালাকের বিধান একদম না থাকলে নারীরা বা পুরুষেরা জুলুমের শিকার হত, ‎এই হিকমতে তা বৈধ রাখা হয়েছে। এটার অপপ্রয়োগ করার জন্য নয়। তালাক দেবার ইসলামী পদ্ধতি ‎সকল পাঠককে মনযোগ সহকারে পড়ার জন্য অনুরোধ করছি।

স্বাভাবিকভাবে আমরা জানি তালাক মানুষ রাগের মাথায় দেয়। রাগ উঠলে ইসলামের বিধান হল-হাটা ‎অবস্থায় রাগ উঠলে দাঁড়িয়ে যাও। তারপরও রাগ না কমলে বসে পড়। বসার পরও রাগ না কমলে শুয়ে ‎পড়। শুয়ে পড়লেও রাগ না কমলে অযু কর। অযু করার পরও রাগ না কমলে গোসল কর। তারপরও রাগ ‎না কমলে দু’রাকাত নফল নামায পড়। এর পরও যদি রাগ না কমে তবে বুঝতে হবে তার রাগ করাটা ‎যথার্থ। অযথা বা ঝুঁকের মাথায় তার মেজাজ বিগড়ে যায়নি।

স্ত্রীর উপর রাগ করলে উপরোক্ত কাজগুলি করার পরও যদি মনে হয় স্ত্রীরই দোষ, তখন স্ত্রীকে শান্তভাবে ‎বুঝাবে যে, এই ক্ষেত্রে তোমার ভুল হয়েছে, যদি তুমি না শুধরাও তাহলেতো আমরা একসাথে থাকতে ‎পারবোনা, তারপরও যদি স্ত্রী না শুধরায়, তাহলে ইসলামের বিধান হল, বিষয়টি স্ত্রীর অভিভাবকদের ‎জানিয়ে পারিবারিকভাবে তা সমাধানের চেষ্টা করবে। এরপরও যদি স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়, তাহলে ‎ইসলামের বিধান হল-স্ত্রীর বিছানা আলাদা করে দিবে, অর্থাৎ স্বামী এক স্থানে ঘুমাবে আর স্ত্রী অন্য স্থানে ‎এক বাড়িতেই। যেন উভয়ের প্রতি বিচ্ছেদের যাতনা অনূভুত হয়। এরকম করার পরও যদি স্বামীর সাথে ‎বনিবনা না হয়, তাহলে স্ত্রীর উপর যে স্বামী অসন্তুষ্ট একথা বুঝানোর জন্য স্ত্রীর গায়ে মৃদু আঘাত ‎করবে।(মৃদু আঘাত করার বিধান হল-চেহারায় আঘাত করতে পারবেনা, মাথায় আঘাত করতে পারবেনা, ‎শরীরের কোথায় দাগ হতে পারবেনা। স্পষ্ট দেখা যায় এমন কোথাও আঘাত করতে পারবেনা। বেত দিয়ে ‎আঘাত করতে পারবেনা। পাঠক চিন্তা করুন-এটা কী মূলত শারীরিক আঘাত উদ্দেশ্য না মানসিক ‎আঘাত? অবশ্যই মানসিক আঘাত উদ্দেশ্য, অর্থাৎ স্ত্রীকে একথা বুঝানো যে, আমি তোমার উপর চূড়ান্ত ‎পর্যায়ের অসন্তুষ্ট।) এরপরও যদি স্ত্রীর সাথে মিল না হয়, তাহলে ইসলামের বিধান হল-স্ত্রীকে এক তালাক ‎দিবে, তিন তালাক নয়। যেন স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হবার আগে যদি উভয়ের মাঝে বনিবনা হয়ে যায় তাহলে ‎স্ত্রীকে বিনা বাধায় ফিরিয়ে আনতে পারে। আর যদি বনিবনা না হয় তাহলে স্ত্রী এক তালাকে বাইন হয়ে ‎যাবে। স্বামীর সাথে ঘর করতে পারবেনা। এক তালাকে বাইন পতিত হবার পর যদি কখনো স্বামীর সাথে ‎একত্রিত হবার ইচ্ছে হয় তাহলে তারা উভয়ে পুনরায় মোহর ধার্য করে দু’জন স্বাক্ষ্য রেখে বিয়ে করলে ‎আবার তারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে।

এক তালাকের পর (বাইন বা রেজয়ী) আবার যদি স্বামী স্ত্রীর মাঝে সমস্যা হয়, তাহলে পূর্বে বর্ণিত ‎সবক’টি স্টেপ পেড়িয়ে এসে (অর্থাৎ প্রথমে রাগ দমন, তারপর বুঝানো, তারপর পারিবারিক মিমাংসা, ‎তারপর বিছানা আলাদা ইত্যাদী) দ্বিতীয় তালাক দেবার অধিকার স্বামীকে দেয় ইসলাম। দ্বিতীয় তালাকের ‎পর প্রথম তালাকের মত ইদ্দতের মাঝে স্ত্রীকে কোন শর্ত ছাড়াই ফিরিয়ে আনতে পারবে। আর ইদ্দত শেষ ‎হয়ে গেলে প্রথম তালাকের মত তৃতীয়বার বিয়ে করে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

দুই তালাকের পর যদি আবার সমস্যা দাঁড়ায়, তাহলে আবার সেই পূর্বের স্টেপগুলি পেড়িয়ে যখন শেষ ‎প্রান্তে এসে উপনিত হবে ইসলাম তখন স্বামীকে তৃতীয় তালাক দেবার অধিকার দেয়। আগে নয়।
বিজ্ঞ পাঠকের কাছে আমার জিজ্ঞাসা-এতগুলি স্টেপ পেড়িয়ে কেউ যদি তৃতীয় তালাক দেয় তাহলে ঐ স্ত্রীর ‎সাথে সংসার করা কী কারো পক্ষে সম্ভব? নিরপেক্ষভাবে বললে নিশ্চয় বলবেন সম্ভব নয়। এই তৃতীয় ‎তালাক দেবার পর ইসলামের বিধান হল-এই স্ত্রী এই স্বামীর জন্য চিরদিনের জন্য হারাম হয়ে গেছে। ‎এখন এই দু’জন আবার বিয়ে করলেও তা কার্যকর হবেনা। আপনারাই বলেন-ইসলামের বিধান মেনে ‎কেউ তালাক দিলে এদেশে তালাকের হার কি পরিমাণ হ্রাস পেত? আর এতকিছুর পর তালাক দেবার পর ‎ইসলামের বিধান “স্বামীর জন্য ঐ স্ত্রী হারাম হওয়ার” বিধানটি কী অযৌক্তিক? বা অমানবিক?‎

প্রসঙ্গ হিল্লে বিয়ে

হিল্লে বিয়ে ইসলাম সমর্থন করেনা। আল্লাহর নবী এক হাদিসে বলেন-হিল্লে বিয়েকারী ও যার জন্য করছে ‎উভয়ের উপর আল্লাহর অভিশম্পাত।(আল হাদিস)‎

একটি আবেদন

প্রিয় মুসলমান ভাই ও বোনেরা! আসুন ইসলামের বিধান জানি ও প্রচার করি, তবেই সত্যিকার অর্থে ‎সমাজে শান্তি আসবে। তালাক নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদ করি। তালাকের ইসলামীক ‎বিধান তৃনমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য প্রচারণা করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।