ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

২০০৫ সাল। চার দলীয় জোটের দু:সহ শাসনামল। ৬৩ টি জেলায় সিরিজ বোমা হামলা করেছে ইহুদী ‎খ্রিষ্টানদের দোসর জেএমবি সন্ত্রাসীরা। সাম্রাজ্যবাদের মিশন বাস্তবায়নকারীরা মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের ‎সাধারণ মুসলমানদের রক্তে আঁকতে চায় সাম্রাজ্যবাদের মানচিত্র। জনপদের পর জনপদ কেঁপে উঠে ‎বোমার বিধ্বংসী উল্লাসে। শান্তির ধর্ম ইসলামকে সন্ত্রাসী রূপে উপস্থাপিত করতে এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে ‎মেতে উঠে এই জঙ্গীগোষ্ঠি। কোরআনের অসংখ্য আয়াতে বর্ণিত সন্ত্রাস নির্মূলের হাতিয়ার ইসলামের পবিত্র ‎বিধান জিহাদকে উপস্থাপন করে এই ভয়ংকর সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাসের এক ঘৃণ্য চিত্রে। সাম্রাজ্যবাদ খৃষ্টানদের ‎এই দালালরা সাধারণ মুসলমান হত্যা করে সাজতে চায় পবিত্র মুজাহিদ। পাকিস্তানের মত গোটা ‎বাংলাদেশকে অচল রাষ্ট্রে পরিণত করে আমেরিকানদের হামলা আর নগ্ন নাক গলানোর পথকে করতে চায় ‎সুগম। সাধারণ মুসলমানদের চোখে চির সম্মানের পাত্র হাক্কানী ওলামায়ে কেরামদের দাঁড় করায় ‎আসামীর কাঠগড়ায়। যেই আলেমদের দেখলে সাধারণ জনতা সালাম দিয়ে ভক্তি দেখাতো, ঐ হিংস্রদের ‎ঘৃণ্যতার কারণে সেই আলেমদের মানুষ দেখতে থাকে অন্য নজরে। কেউবা অপমান করতেও পিছপা ‎হয়না। এই সময়টা ছিল ওলামায়ে কেরামের জন্য বড় বেদনার, বড় কষ্টের। ‎

এমনি এক জটিল সময়। আমি তখন জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের ছাত্র। মাগরিবের পর যাচ্ছি মালিবাগ ‎রেলগেট থেকে মালিবাগ মোড়ের দিকে। রেলগেট থেকে উঠলাম গ্রামীন বাসে। গাড়িতে উঠে দেখি ‎মহিলাদের সিটের সামনে একটি সিট খালি। ওখানে বসলে সামনে বসা সম্মানিতার পায়ে আমার পা লেগে ‎যাবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তাই আমি ভাবলাম, অল্প একটু পথ বসার দরকার নাই। দাঁড়িয়েই যাই।

কন্ট্রাকটর ছেলেটার বয়স খুবই কম। বেশি হলে ১২ থেকে ১৩ বছর হবে। সে ড্রাইভারের পিছনে বসা ‎লোকটাকে বলল-“আপনি ওখানে বসুন (মহিলাদের সিটের সামনের সিটে) আর হুজুরকে এখানে বসতে ‎দিন।” ছেলেটা কথাটা ভালমত শেষ করতে পারেনি, লোকটা ঠাস করে এক চড় মেরে দিল পিচ্চিটার গালে, ‎‎“তোর কত বড় সাহস? আমাকে জায়গা ছাড়তে বলছিস? বেয়াদব!”‎ ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ভ। একি করল এই লোক? এই সামান্য কথা বলে এই নাবালক ছেলে ‎কী এমন অপরাধ করেছে যে, তাকে এত জোরে চড় খেতে হল? ‎

মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার। পরিবেশ আমার অনুকূলে না। বাধ্য হয়ে চুপ রইলাম। পিছন থেকে ‎একজন বলে উঠল সাথে সাথে-“মুরুব্বী ঠিকই করেছেন, ভাল হইছে”। এবার আর নিজেকে শান্ত রাখতে ‎পারলাম না, মন্তব্যকারীর দিকে ফিরলাম-“কি ভাই একটা নাবালক ছেলে, যে এখন খুন করলেও ‎বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী যার ফাঁসি হবেনা, সে সামান্য একটা কথা বলল, আর তাকে এত জোরে চর ‎মারা হল, আর আপনি একজন বয়স্ক লোক হয়ে এটা সাপোর্ট করলেন কিভাবে?”‎

‎-আমি সাপোর্ট করলাম কে বলল?‎

-“ঠিকই করেছেন” বলা আর সাপোর্ট করার মাঝে পার্থক্য কী? আমাকে বলুন তো?‎

চুপ হয়ে গেল লোকটা। পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠল-হুজুর আপনি এত বড় কথা বলবেন না, ‎আপনাদের মুখে এত বড় কথা মানায়না,”‎
‎-“কেন?” মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আমার।

-“আপনারা বলেন একটা করেন আরেকটা।”‎

-“আপনি কী বলতে চাইছেন? বুঝিয়ে বলেন।” আমি বুঝতে পারছিলাম সে কী বলতে চায়। চেটাং চেটাং ‎করে লোকটা বলল-“আপনারাই তো শায়েখ আব্দুর রহমান আর বাংলা ভাই”।

আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বললাম-“আচ্ছা! আমি শায়েখ ‎আব্দুর রহমানের মত দাড়ি রেখেছি বলে, আর তার মত পায়জামা পাঞ্জাবী পড়েছি বলে যদি আমি শায়েখ ‎আব্দুর রহমান হই তবে আপনি “কালা জাহাঙ্গীর,” পোশাক আর শারিরিক বৈশিষ্টে এক বলে যদি আমি ‎বাংলা ভাই হই তবে আপনি কালা জাহাঙ্গীর। কারণ তার চেহারা আর আপনার চেহারা তো একই। তার ‎মুখে দাড়ি নেই, আপনার মুখেও দাড়ি নেই। সেও প্যান্ট শার্ট পড়ে আপনিও তাই। আপনি সন্ত্রাসী মুরগী ‎মিলন, আপনি এরশাদ শিকদার, আপনি হিটলার, আপনি বুশ শ্যারনের মত জঘন্য সন্ত্রাসী। কারণ তাদের ‎চেহারা আর পোশাক আর আপনার পোশাকে তো কোন পার্থক্য নেই।” এক শ্বাসে কথাগুলি বলে ‎থামলাম। পুরো গাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে আমার প্রতিকূল হতে থাকা পরিস্থিতিটা আমার অনুকূলে ‎চলে আসে। সবাই বকাবকি করতে থাকে ঐ ফালতু মন্তব্যকারী লোকটিকে লক্ষ্য করে। ‎

ইতোমধ্যে গাড়ি মালিবাগ মোড়ে চলে আসে আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়ি এক রাশ হতাশা নিয়ে। কথার ‎যুদ্ধে হয়তো সাময়িক বিজয়ী হয়েছি। কিন্তু তৃণমুল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছা ইসলামের বিরুদ্ধে এই ভয়ংকর ‎ষড়যন্ত্র রুখে কী দিতে পারলাম? চোখ থেকে মনের অজান্তে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। যেই লোকটি ‎ইসলামিক পোশাক পড়েছি বলে ঘৃণ্য দৃষ্টিতে তাকাল, মন্তব্য করল তীর্যক। কটাক্ষ করল স্পষ্ট ইসলামকে। ‎এই লোকটা একজন মুসলমান। মৃত্যুর সময় তার সৎকার করতে ছুটে যেতে হবে তার আত্মীয়দের ‎একজন আলেমের কাছেই। তার স্ত্রী বৈধ হবার জন্য ডেকে আনবে একজন আলেমকেই। ধর্মীয় কোন ‎বিষয় পালন করতে সঠিক সমাধান জানার জন্য যেতে হবে তার একজন বিজ্ঞ আলেমের কাছেই। ‎সমাজের চোখে এই আলেমদের ঘৃণার পাত্র বানাতে পারলে একজন মুসলমান কত দ্রুত দ্বীন থেকে ছিটকে ‎পড়বে, একথা আমরা না বুঝলেও ইহুদী খৃষ্টান সাম্রাজ্যবাদ গোষ্টি ঠিকই বুঝে। তাই কি কৌশলে ‎ইসলামের নামে মুসলমান হত্যা করে আলেম সমাজকে কলুষিত করছে। কে বুঝাবে তাদের? এ যে ‎ইসলামের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র।

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশী বিধান পবিত্র কুরআন যেখানে স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে-“অযথা একজন মানুষ ‎হত্যা করা তেমন গোনাহ যেমন গোটা পৃথিবীর মানুষ করা।” সেখানে গ্রামে গঞ্জে সাধারণ মুসলমানকে ‎হত্যা করে যারা ইসলামের নামে চালাতে চায় তারা কতটা ইসলাম বিদ্বেষী তা আশা করি একজন সাধারণ ‎মুসলমানও বুঝে ফেলার কথা। মসজিদের মিম্বার থেকে প্রতি জুমার দিন খতীব সাহেব শোনায় শান্তির ‎বাণী-“কাউকে কষ্ট দেয়া হারাম। মানুষ হত্যা করা জঘন্য গোনাহের কাজ, তোমাকে কেউ গালি দিলেও ‎তাকে আঘাত করনা, তার জন্য দুয়া কর।” সেই ওলামাদের প্রমাণিত করা হচ্ছে ঘৃণ্য সন্ত্রাসীরূপে, হিংস্র ‎খুনী রূপে। এটা যে সাম্রাজ্যবাদের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র এটা কী আমরা বুঝি? আল্লাহ তায়ালা আমাদের ‎সহীহ বুঝ দান করুন। ইসলামের ধারক বাহক ও দ্বীনের সঠিক ব্যাখ্যাকারী ওলামাদের অপমান করে ‎আখেরাতের পথকে দুর্গম করা থেকে আল্লাহ আমাদের হিফাজত করুন। ‎