ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

শিরকের ইতিহাস

হযরত নূহ আ: এর সময় প্লাবণে সকল কাফের মৃত্যু বরণ করার পর সবাই ছিল মুসলমান। ‎তারপর এই মুসলমানদের মাঝে কিভাবে শিরক ঢুকল? এ ব্যাপারে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ ‎মুহাদ্দেসে দেহলবী রহ: তার সুবিখ্যাত তাফসিরের মূলনীতির গ্রন্থ “আল ফাউজুল কাবীর” ও ‎তাফসিরের বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে মুসলমানদের মাঝে শিরক প্রবিষ্ট হবার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা ‎নিম্নরূপ-‎

নুহ আ: এর মৃত্যুর পর তার তিন ছেলের বংশধর সবাই সঠিক পথে ছিল। কিন্তু তাদের মৃত্যুর ‎পর দ্বীনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমতে থাকে। ধীরে ধীরে এমন এক প্রজন্ম আসল যারা শুধু ‎এতটুকু জানে যে তারা মুসলমান। আর তাদের পূর্বসুরী ছিলেন অনেক ভাল ও বুযুর্গ। কিন্তু ‎পূর্বসূরি বুযুর্গদের কোন গুণ তাদের মাঝে ছিলনা।

সে সময় শয়তান মানুষের সুরতে এসে মানুষকে ধোঁকা দিত। একদিন শয়তান মানুষের সুরতে ‎বিশাল জুব্বা আর পাগড়ী মাথায় দিয়ে ঐ লোকদের কাছে এসে বলে-ওহে নুহ আঃ এর ‎বংশধরেরা! তোমরা কি জান? তোমাদের পূর্বসুরিদের মাঝে অনেক বুযুর্গ আর আল্লাহভীরু ‎লোক ছিলেন? ‎

তখন লোকেরা বলল-হ্যাঁ জানি। ‎
‎-তাহলে তোমাদের এই গর্ব করার মত বুযুর্গানে দ্বীনকে তোমরা ভুলে গেলে কেন?‎
‎-আপনি দেখা যায় খুব কামেল মানুষ, আপনি একটু বলে দিবেন কি আমরা আমাদের পূর্বসূরী ‎বুযুর্গদের কিভাবে স্মরণ করতে পারি?‎
‎-বলছি শোন! তোমরা তোমাদের পূর্বসূরী বুযুর্গদের ছবি বানাও। তারপর ওগুলিকে তোমাদের ‎উপসনালয়ে আর বসবাসের গৃহে রাখ। এতে তোমাদের উপসনালয় যেমন পবিত্র থাকবে, ‎তেমনি তোমাদের গৃহও থাকবে বরকতপূর্ণ।

শয়তানের এই কুপরামর্শে সাধারণ মুসলমানরা তাদের পরিত্যক্ত প্রায় উপসনালয়ে পূর্বসূরীদের ‎ছবি আঁকলো, নিজেদের গৃহেও ছবি এঁকে প্রতিদিন তাদের দেখে দেখে নিজেদের আমলী জযবা ‎উদ্দীপ্ত করত। অনেকে কাঁদতো তাদের কথা মনে করে। কিন্তু সেজদা বা কুর্ণিশ কেউ ‎করতোনা। কিন্তু পরের প্রজন্ম এসে শুরু করে দিল কুর্ণিশ। পরের প্রজন্ম সেজদা। এরপর আবার ‎শয়তান এসে তাদের পরামর্শ দিল , তোমরা শুধু ছবিকে সম্মান করছ কেন? তোমাদের পূর্বসূরী ‎বুযুর্গদের মুর্তি বানিয়ে নাও মাটি দিয়ে। ব্যস কেল্লা ফতে! মুসলমানদের মাঝে পরিপূর্ণভাবে ‎ঢুকে গেল মুর্তিপূজা।

এই হল মুসলমানদের মাঝে ঢুকে পরা মুর্তিপূজার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

এই ইতিহাস থেকে একথা স্পষ্টই বুঝা গেল যে, ব্যক্তি পূজা থেকেই মুর্তিপূজার আবির্ভাব। ‎ব্যক্তি বুযুর্গদের ভালবাসতে ভালবাসতে ভক্তির আতিশয্যে মুর্তি বানালো, মাথা নোয়াতে যখন ‎শুরু করে দিল তখন তা হয়ে গেছে শিরক আর পূজা।

বর্তমান মূর্তিপূজকরা প্রধানত মূর্তিপূজায় ৪টি কাজ করে থাকে ‎

‎১. বছরে দু’বার বড় আকারের অনুষ্ঠান করে মূর্তিকে কেন্দ্র করে, (ক) কালিপূজা (খ) দূর্গা ‎পূজা। (ছোট আকারের পূজা আরো অনেক হয়।)‎
২. মূর্তির সামনে প্রদিপ জ্বালায়।
৩. মূর্তির নামে মান্নত করে ও কুরবানী করে।
৪. মূর্তির সামনে মাথা নত করে ও সেজদা করে।

কবর বা মাযার পূজারীরা যা করে কবরকে কেন্দ্র করে

১. বছরে দু’বার ওরস ও ফাতেহা মাহফিল নামে অনুষ্ঠান করে পীর বা বুযুর্গদের কবরকে কেন্দ্র ‎করে।
২. কবরের সামনে মোমবাতি প্রজ্জ্বলিত করে নিয়মিত।
৩. কবরে শায়িত বুযুর্গের নামে মান্নত ও কুরবানী করে।
৪. কবরকে সামনে নিয়ে দুআ করে, ক্ষেত্র বিশেষে মাথানত ও সেজদাও করে।

বিজ্ঞ পাঠকের কাছে আমার জিজ্ঞাসা-মূর্তিপূজকদের মূর্তিপূজায় যে কর্মাদী করে আর আমাদের ‎দেশের ভন্ড মাজারও কবরপূজারীরা যা করে এর মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে?‎

এবার আসুন দেখি কবর পূজারীদেরর কর্মকান্ড কুরআন ও হাদিসের মানদন্ডে

১. স্বীয় কবরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান করাকে নিষিদ্ধ করে আল্লাহর নবী ইরশাদ করেন-‎
عن أبى هريرة قال قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- « لا تجعلوا بيوتكم قبورا ولا تجعلوا قبرى عيدا وصلوا على فإن ‏صلاتكم تبلغنى حيث كنتم (سنن ابى داود-كتاب المناسك، باب زيارة القبور، رقم الحديث-2044)‏‎ ‎
‎“তোমরা স্বীয় ঘরকে কবর বানিয়োনা। (অর্থাৎ কবরের ন্যায় ইবাদত-নামায, তেলাওয়াত ও যিকির ‎ইত্যাদি বিহীন করনা।) এবং আমার কবরে উৎসব করোনা।(অর্থাৎ বার্ষিক, মাসিক বা সাপ্তাহিক কোন ‎আসরের আয়োজন করনা। তবে হ্যাঁ আমার উপর দুরূদ পাঠ কর। নিশ্চয় তোমরা যেখানেই থাক না কেন ‎তোমাদের দুরূদ আমার নিকট পৌঁছে থাকে।(আল্লাহ তায়ালার ফেরেশতারা পৌঁছিয়ে দেন।)” (সুনানে ‎আবু দাউদ: হাদিস নং-২০৪৪/৪০)‎
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- রাসূলে সাঃ নিজ রওযা মুবারকে উৎসব (উরস) পালন করতে বারণ ‎করেছেন। তাহলে অন্য কে আর এমন আছে যার কবরে তা বৈধ হবে?‎
হাদিসের বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার আল্লামা মুনাভী রহঃ এই হাদিসের ব্যাক্ষা করতে গিয়ে বলেন-‎
قال المناوي ويؤخذ منه أن اجتماع العامة في بعض أضرحة الأولياء في يوم أو شهر مخصوص من السنة ويقولون هذا يوم مولد ‏الشيخ ويأكلون ويشربون وربما يرقصون فيه منهي عنه شرعا وعلى ولي الشرع ردعهم على ذلك وإنكاره عليهم وإبطاله ‏‏(عون المعبود-كتاب المناسك باب زيارة القبور-6/23)‏
‎“এ হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, সাধারণ মানুষ যারা বছরের কোন নির্দিষ্ট মাসে বা দিনে (উরসের নামে) ‎ওলীদের মাযারে একত্রিত হয় এবং বলে-আজ পীর সাহেবের জন্ম বার্ষিকী (মৃত্যু বার্ষিকী), সেখানে তারা ‎পানাহারেরও আয়োজন করে, আবার নাচ গানেরও ব্যবস্থা করে থাকে, এ সবগুলিই শরীয়ত পরিপন্থী ও ‎গর্হিত কাজ। এ সব কাজ প্রশাসনের প্রতিরোধ করা জরুরী। (আউনুল মা’বুদ-৬/২৩)‎

২. কবরের সামনে বাতি প্রজ্জ্বলন করাকে হারাম সাব্যস্ত করে রাসূলে কারীম সাঃ ইরশাদ করেন-‎
عن ابن عباس قال : لعن رسول الله صلى الله عليه و سلم زائرات القبور والمتخذين عليها ‏المساجد والسرج (سنن الترمذى- أبواب الصلاة عن رسول الله صلى الله عليه و سلم ، ‏باب ما جاء في كراهية أن يتخذ على القبر مسجدا-2/136)‏
‎“হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর নবী সাঃ অভিশম্পাত করেছেন (বেপর্দা) কবর ‎যিয়ারতকারীনী মহিলাদের উপর, এবং সেসব লোকদের উপর যারা কবরকে মসজিদ বানায় (কবরকে ‎সেজদা করে) এবং সেখানে বাতি প্রজ্জ্বলিত করে। (জামি তিরমীযী-২/১৩৬)‎
উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত করেছেন আল্লাহর নবী ‎সাঃ।

৩. আল্লাহ ছাড়া কারো নামে মান্নত বা কুরবানী করা যায়না। কারণ মান্নত ও কুরবানী হচ্ছে ইবাদত। আর ‎ইবাদত আল্লাহ ছাড়া কারা জন্য করা জায়েজ নয়। মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ ‎করেন-‎
قُلْ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (162) لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَاْ أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ (163) ‏‏(سورة الأنعام-162-163)‏
‎“আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব প্রতিপালক ‎আল্লাহর জন্যই। তাঁর কোন অংশিদার নেই। আমি তা-ই করতে আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম ‎আনুগত্যশীল। (সূরা আনআম-১৬২-১৬৩)‎
সূরা কাউসারে মহান রাব্বুর আলামীন বলেন-‎‏ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ (2)‏‎( অতএব আপনার পালনকর্তার ‎উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন। (সূরা কাউসার-২)‎
সুতরাং পীরের নামে ও মাযারের নামে মান্নত করা কি শিরকী কর্ম নয়?‎

৪. আল্লাহ ছাড়া কাউকে সেজদা করা সুষ্পষ্ট হারাম। কুরআনের অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে ‎নববী দ্বারা যা দিবালোকের ন্যয় পরিস্কার। একথা মনে হয় অন্ধ পীর ও মাজারপূজারী ছাড়া ‎সকল মুসলমানরাই জানে।

উল্লেখিত কুরআন ও হাদিসের বিবরণ মোতাবিক কবর ও মূর্তিপূজার সাযুজ্যতার মাধ্যমে ‎আমরা সহজেই অনুমান করে নিতে পারি আমাদের দেশের ভন্ড মাযারপূজারী ও ‎কবরপূজারীরা কি পরিমাণ শিরকী কর্মকান্ডে লিপ্ত।

আরবের মুশরিকদের শিরক কি ছিল?‎

মহান রাব্বুর আলামীন বলেন-‎‏ قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ ‏مِنَ ‏
الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ (سورة يونس-31)‏
‎“হে পয়গম্বর! আপনি মুশকদেরকে জিজ্ঞেস করুন যে, বল তো কে তোমাদেরকে আসমান জমিন থেকে ‎রুযী দেন? এবং কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের ‎করেন এবং কে মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তারা ‎পরিস্কার বলবে যে, মহান আল্লাহ।(সূরা ইউনুস-৩১)‎

আল্লাহ তায়ালাই মূল ক্ষমতার অধিকারী একথা আরবের মুশরিকরাও বিশ্বাস করতো, তারপরও তারা ‎কাফের কেন?‎

এই সূরার প্রথমাংশে মহান রাব্বুল আলামীন এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে-‎
وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لاَ يَضُرُّهُمْ وَلاَ يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلاء شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لاَ يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ ‏وَلاَ فِي الأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ (18)‏
আর তার (মুশরেকরা) আল্লাহ ভিন্ন এমন কতিপয়ের ইবাদত করে, যারা তাদের কোন অপকারও করতে ‎পারেনা এবং তাদের কোন উপকারও করতে পারেনা, ও তারা বলে-এরা হল আল্লাহ তায়ালার কাছে ‎আমাদের সুপারিশকারী। (হে রাসূল!) আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ তায়ালাকে এমন বিষয়ের ‎সংবাদ দিচ্ছ যা আছে বলে তিনি (নিজেও) জানেন না, না আসমানে না জমিনে! তিনি তাদের শিরকী ‎কার্যকলাপ হতে পবিত্র ও অনেক ঊর্দ্ধে। (সূরা ইউনুস-১৮)‎

বিজ্ঞ পাঠক পাঠিকার কাছে আমার আবেদন-আপনারা শান্ত মস্তিস্কে একটু ভেবে দেখুন, আমাদের দেশে ‎মাজার পূজা আর কবর পূজার নামে মুসলমানদের কিভাবে মুশরিক বানানো হচ্ছে সুপরিকল্পিতভাবে।
একবার যদি মন থেকে কেউ ঈমান আনে, আর সারা জীবন নাফরমানীও করে তবুও তার নাফরমানীর ‎শাস্তি পেয়ে জান্নাতি হবার সুযোগ আছে। কিন্তু কেউ যদি শিরক করে মুশরিক হয় তাহলে তাকে আল্লাহ ‎তায়ালা কখনো মাফ করবেন না। তার জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম। ‎
আল্লাহ তায়ালা আমাদের কবর পূজা ও মাযার পূজা এবং পীর পূজা করে মুশরিক হওয়া থেকে হিফাযত ‎করুন।

ভন্ড পীরদের কারণে সঠিক ও হকপন্থী পীর মাশায়েখগণকেও খারাপ বলা মোটেও উচিত নয়। অচিরেই ‎কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে সহিহ পীর মুরিদীর উপর একটি সমৃদ্ধ পোষ্ট দিব ইনশাআল্লাহ।

সংকলক
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
ইমেইল-lutforfarazi@yahoo.com