ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ভূমিকা

এই বিষয়টা সম্পর্কে কলম ধরার কোন ইচ্ছে আমার ছিলনা। নফল ইবাদত নিয়ে অযথা ক্যাচাল আমি মন ‎থেকে অপছন্দ করি। যেখানে এদেশের নামের মুসলমানরা ফরয ছেড়ে দিচ্ছে অহরহ। হাজারো মুসলমান ‎নাস্তিক হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে চূড়ান্ত অজ্ঞতার কারণে। হাজারো মুসলমান কুরআনের আক্ষরিক জ্ঞান থেকে ‎বঞ্চিত। কেন একজন মুসলমান অন্য ধর্মাবলম্বী থেকে আলাদা তা’ই জানেনা কোটি মুসলমান। সেখানে ‎নফল কোন আমল নিয়ে বিতর্ক করা মানে হল-ফরয সতর ঢেকে রাখা লুঙ্গি খুলে সুন্নত পাগড়ী মাথায় ‎দেবার মত আহমকী কর্ম। তারপরও যখন কতিপয় আহলে হাদিস নামের হাদিস অস্বীকারকারীদের ‎দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ চলছে দেদার। নবীজী থেকে প্রমাণিত একটি নফল আমলকে অস্বীকার করছে অযথা ‎ক্যাচাল করে। অপরদিকে রাজারবাগী, দেওয়ানবাগী, কুতুববাগী, আর আটরশী, চন্দ্রপুরী ও ‎মাইজভান্ডারীদের মত অসংখ্য মাজার -কবর এবং পীরপূজারীদের পবিত্র শবে বরাতের নামে হালুয়া ‎রুটি আর সম্মিলিত ইবাদতের মত চূড়ান্ত পর্যায়ের হীন বেদআতি কর্ম করে যাচ্ছে ধর্ম বলে। এসব দেখে ‎নিজেকে আর চুপ রাখতে পারলামনা। কলম ধরতে হল বাধ্য হয়ে।

শবে বারাআত কি?‎

‎“শব” শব্দটা ফার্সি। যার অর্থ হল-রাত। আর বরাআত এটি আরবী শব্দ। মূলত হল-‎براءت‎ যার অর্থ হল ‎‎“মুক্তি” তথা জাহান্নাম থেকে মুক্তির রাত হল শবে বারাআত। বরাত বলাটা ভুল। কারণ শবে বরাত (‎برات‎) ‎মানে হল বিয়ের রাত। সুতরাং আমরা বলব-শবে বারাআত(‎‏ شب براءت‎)‎
শবে বারাআতকে হাদিসের পরিভাষায় বলা হয়েছে “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান”(‎ليلة النصف من شعبان‎) ‎তথা শাবানের অর্ধ মাসের রাত। কেউ কেউ “শবে বরাআত” নামে হাদিসে শব্দ না থাকায় এ রাতকে ‎অস্বিকার করার মত বোকামী সূলভ যুক্তি দিয়ে থাকেন। তাদেরকে আমি বলি-আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায ‎পড়া আবশ্যক বলি কুরআন হাদিসে বর্ণিত নির্দেশের কারণে। কিন্তু কুরআন হাদিসের কোথাও কি নামাযের ‎কথা আছে? নামায শব্দটা কুরআন হাদিসের মাঝে খুঁজতে যাওয়া যেমন বোকামী তেমন শবে বারাআত ‎শব্দটা কুরআন হাদিসে খুঁজতে যাওয়াও তেমন বোকামী। আমরা যাকে নামায বলি সেই অর্থবোধক ‎কুরআন হাদিসের উদৃত শব্দ “সালাত”ই হল নামায। তেমনি আমরা যাকে “শবে বারাআত” বলি তথা ‎শাবানের পনের তারিখের রাত এই অর্থবোধক শব্দ হাদিসে পাওয়া গেলে তা’ই হবে শবে বারাআত। আর ‎এই অর্থবোধক হাদিসে বর্ণিত শব্দ হল “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান”। সুতরাং তাই হল শবে বারাআত। ‎
‎ ‎
হাদিসে শবে বারাআত

কুরআনে শবে বারাআতের কোন উল্লেখ নাই। কুরআনে কেবল “লাইলাতুল কদর” তথা “শবে কদর” এর ‎কথা উল্লেখ আছে। পবিত্র কুরআনের পঁচিশ নাম্বার পাড়ার সূরায়ে দুখানের ২ ও ৩ নং আয়াতে বর্ণিত ‎মুবারক রজনী দ্বারা লাইলাতুল কদর তথা শবে কদর উদ্দেশ্য। শবে বারাআত নয়। এটাই বিশুদ্ধ বলেছেন ‎গ্রহণযোগ্য মুফাসসিরীনে কেরাম। যার পক্ষে যুক্তিও শক্তিশালী। বিস্তারিত জানতে দেখুন-‎
১. আদ দুররুল মানসুর-৭/৪০১-৪০৭
২. তাফসীরে কাশশাফ-৪/২৭২
৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর-৭/২৪৬
৪. তাফসীরে বাগাভী-৭/২২৭-২২৮

বিভিন্ন হাদিসে শবে বারাআতের বর্ণনা এসেছে। নিম্নে একটি হাদিস উদৃত করে এ ব্যাপারে আহলে ‎হাদিসদের ইমাম শায়েখ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহঃ তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ “আস সিলসিলাতুস সাহিহাহ আল ‎মুজাল্লাদাতুল কামিলাহ” গ্রন্থে ৩ নং খন্ডে ১১৪৪ নং অধ্যায়ে ২১৮ নাম্বার পৃষ্ঠায় শবে বরাআত সম্পর্কে ‎হাদিস এনে যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তার বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হল-(অতি পন্ডিত আহলে ‎হাদিসরা চাইলে আমি মূল আরবীটাও তাদের দিতে পারি, এখানে পরিসর বড় হয়ে যাবে বলে তা উদৃত ‎করলামনা।)‎
হাদিস-“মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের নিকট আবির্ভূত হন, তারপর ‎সকল সৃষ্টিকে মাফ করে দেন মুশরিক ও ঝগড়াকারী ছাড়া। ‎
আলবানী তার সিলসিলাতুস সাহিহাহর ৩ নং খন্ডের ১৩৫ নং পৃষ্ঠায় বলেন। “এই হাদিসটি সহীহ” এটি ‎সাহাবাদের এক জামাত বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন সূত্রে যার একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করেছে। তাদের ‎মাঝে রয়েছেন # মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ # আবু সা’লাবা রাঃ # আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ # আবু মুসা ‎আশয়ারী রাঃ # আবু হুরায়রা রাঃ # আবু বকর সিদ্দীক রাঃ # আউফ বিন মালিক রাঃ # আয়েশা রাঃ প্রমুখ ‎সাহাবাগণ।
উপরে বর্ণিত সবক’টি বর্ণনাকারীর হাদিস তিনি তার কিতাবে আনার মাধ্যমে সুদীর্ঘ আলোচনার পর শেষে ‎তিনি বলেন-‎

و جملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب و الصحة تثبت بأقل منها
عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد كما هو الشأن في هذا الحديث ، فما نقله
الشيخ القاسمي رحمه الله تعالى في ” إصلاح المساجد ” ( ص 107 ) عن أهل التعديل
و التجريح أنه ليس في فضل ليلة النصف من شعبان حديث صحيح ، فليس مما ينبغي
الاعتماد عليه ، و لئن كان أحد منهم أطلق مثل هذا القول فإنما أوتي من قبل
التسرع و عدم وسع الجهد لتتبع الطرق على هذا النحو الذي بين يديك . و الله تعالى هو الموفق ‏

অর্থাৎ সারকথা হল এই যে, নিশ্চয় এই হাদিসটি এই সকল সূত্র পরম্পরা দ্বারা সহীহ, এতে কোন ‎সন্দেহ নেই। আর সহীহ হওয়া এর থেকে কম সংখ্যক বর্ণনার দ্বারাও প্রমাণিত হয়ে যায়, যতক্ষণ ‎না মারাত্মক কোন দুর্বলতা থেকে বেঁচে যায়, যেমন এই হাদিসটি হয়েছে। আর যা বর্ণিত শায়েখ ‎কাসেমী থেকে তার প্রণিত “ইসলাহুল মাসাজিদ” গ্রন্থের ১০৭ নং পৃষ্ঠায় জারাহ তা’দীল ইমামদের ‎থেকে যে, “শাবানের অর্ধ মাসের রাতের কোন ফযীলত সম্পর্কে কোন হাদিস নেই মর্মে” সেই ‎বক্তব্যের উপর নির্ভর করা যাবেনা। আর যদি কেউ তা মেনে নেয় সে হবে ঝাঁপিয়ে পড়া(ঘারতেড়া) ‎স্বভাবের, আর তার ব্যাক্ষা বিশ্লেষণ ও গবেষণা-উদ্ভাবনের কোন যোগ্যতাই নেই এরকমভাবে ‎যেমন আমি করলাম।
আল্লামা শায়েখ আলবানী রহঃ এর বিশ্লেষণ থেকে একথা নির্ধিদ্ধায় আমরা বলতে পারি হাদিস দ্বারা শবে ‎বারাআত প্রমাণিত।

এ রাতে করণীয়

এ মহামান্বিত রাতে করার মত নির্দিষ্ট কোন আমল নেই। সবাই কোথাও একত্র হয়ে সম্মিলিত কোন ‎আমলও নেই। তবে যাদের বাসা-বাড়িতে ইবাদতের কোন পরিবেশ নেই তারা মসজিদে এসে একাকি ‎আমল করতে পারে। অন্য রাতের নফল ইবাদতের মত ইবাদত করবে। যেমন-নফল নামায, কুরআন ‎তিলাওয়াত, জিকির-আযকার, দু’আ ইত্যাদী ।

এ রাতে বর্জনীয়

১. হালুয়া রুটির মত আনন্দ উল্লাসের আয়োজন। আল্লাহর কাছ থেকে মাফ পেতে হলে তার ইবাদত ‎করতে হবে, খাওয়া দাওয়ার মধ্য দিয়ে ফুর্তি করার মাধ্যমে নয়।
২. আতশবাজি করা, রং ছিটানো।
৩. সম্মিলিত কোন আমলকে এই রাতে আবশ্যকীয় মনে করা সুষ্পষ্ট বিদআত।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে দাও, যেন তা পালন করতে পারি, আর ‎মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে উপস্থাপিত করে দাও, যেন এ থেকে বিরত থাকতে পারি। ‎