ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তাদের কাছে, আমার এ লেখার কারণে যাদের আবেগে কষ্ট লাগবে এবং যারা বিশেষ দিবস উপলক্ষে অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও শত ব্যস্ততার মাঝে তার প্রিয়জনের জন্য সময় বের করে তাকে ভালবাসা প্রকাশ করেন। লেখাটির উদ্দেশ্য আমার একটি কৌতূহল থেকে, বিভিন্ন দিবসের আড়ালে আমরা আসলে প্রতারিত হচ্ছি কিনা এবং আমরা আমাদের প্রিয়জনকে ধোঁকা দিচ্ছি ও নিজেরা ধোঁকা খাচ্ছি কিনা।

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে চারিদিকে শুধু ভালবাসা আর ভালবাসা। পিতামাতা প্রতি, প্রিয়-প্রিয়ার প্রতি, সন্তানদের প্রতি, বন্ধু-বান্ধবীর প্রতি আমরা পরতে পরতে এত ভালবাসা প্রকাশ করি তার উদাহরণ সারাবিশ্বে হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ উপমহাদেশে খুব কম চলচ্চিত্র আছে যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা, পিতামাতা কিংবা ভাইবোনদের প্রতি ভালবাসা মূল বিষয় নয়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের বিষয়ের মাঝেও প্রেম-ভালবাসা চলে আসে। তাই আমাদের উপমহাদেশে প্রিয়জনের প্রতি ভালবাসা প্রকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নেয়া এবং সে দিনে ঘটা করে অভিবাদন জানানো কিংবা উপহার দেবার প্রয়োজন পরে না। আর প্রকৃত প্রিয়জনরা উপহারের আশায় বসেও থাকেন না। যদিও সামগ্রিক প্রভাবে দিনে দিনে অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। আর এ পরিবর্তনটাই চিন্তার বিষয়।

কথিত আছে, পশ্চিমা বিশ্বে পারিবারিক বন্ধন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব মজবুত নয়, সম্পর্ক সমূহ বাণিজ্যিকভাবে চিন্তা করা হয়। একটা নির্দিষ্ট বয়স পর সন্তানেরা পিতামাতা হতে আলাদা হয়ে যায় এবং প্রত্যেকে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করে। এমনকি নিয়মিত পিতামাতা ও সন্তানদের মাঝে দেখাও হয়না। এ সকল পরিবার সমূহ বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে এক সাথে কিছুটা সময় কাটায় এবং একে অন্যকে উপহার দিয়ে অভিবাদন জানায়। আর এসব অভিবাদন জানানোর মাধ্যম তথা উপহার সামগ্রী সমূহ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক পণ্য। তাই বিভিন্ন দিবস সমূহের প্রচলন সারা বিশ্বে যত ছড়িয়ে পড়বে তত বেশী ব্যবসায়ের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য অনেক বহুজাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা এবং রাষ্ট্র বিশেষ দিবস গুলো সারা বিশ্বে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে সেসব রাষ্ট্র তথা প্রতিষ্ঠান সমূহ ব্যবসায়িক প্রসারের পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি এবং আচার আচরণের প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়। আর কোন জাতি যখন নিজস্ব সংস্কৃতি এবং আচার-আচরণ বাদ দিয়ে কিংবা পাশাপাশি অন্য জাতি গোষ্ঠীর গুলো গ্রহন করতে শুরু করে, এক সময় দেখা যায় সে জাতিটি পরজাতির প্রভুত্বও মেনে নেয়।

কোন কিছু উপলক্ষে কিংবা মাধ্যমে ব্যবসা করা অথবা ব্যবসায়ের সুযোগ খোঁজা দোষের নয়, তবে মানুষের আবেগ ভালবাসাকে পুঁজি করে ব্যবসা করা এবং ব্যসায়িক স্বার্থের কথা বিবেচনা করতে গিয়ে আবেগ ভালবাসাকে লোক দেখানো বানিয়ে ফেলা কিংবা লোক দেখানো বানাতে প্রভাবিত করা অবশ্যই নৈতিক দিক হতে ঠিক নয়। দেখা গেল কোন এক ভ্যালেন্টাইন ডে তে সঙ্গীকে ঠিক মত অভিবাদন জানানো হল না কিংবা ভাল একটি উপহার দেয়া হল না, এ নিয়ে কথা কাটাকাটি, মনোমালিন্য এবং এক পর্যায়ে তিন চার বছরের সম্পর্কের ইতি। অনেকে হয়ত বলবেন এ ধরণের উপহার নির্ভর সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়াতেই মঙ্গল। আমিও তাদের সাথে একমত, তবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে ঐ ধরণের বিশেষ দিবসটিও একটা উপদ্রব। আবার এমন টা ঘটে কিনা জানিনা, ‘মা দিবসে’ মা হয়ত বলে বসলেন, “ভ্যালেন্টাইন ডে তে বউয়ের জন্য ডায়মন্ডের নেকলেস, আর আজ আমার জন্য শুধু ফেইসবুকে স্ট্যাটাস”। অন্যদিকে বউ কিংবা প্রেমিকা বলতে পারে “মা দিবসে তোমার বুড়ো মায়ের জন্য নতুন ফ্ল্যাট আর ভ্যালেন্টাইন ডে তে আমার জন্য শুধু লাল গোলাপ!”। আশা করছি এসব উপদ্রব সমূহ আমাদের সমাজে ঘটবে না, তবে ঘটতে শুরু করলেও অবাক হবার কিছু নেয়।

ঈদ, পূজা, বাংলা নববর্ষ, জাতীয় দিবস সমূহ এবং বিশ্ব জুড়ে পালিত বিভিন্ন সচেতনতামূলক দিবস সমূহ আমাদের দেশে আপামর জনসাধারণের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে পালনের চেষ্টা করা হয়। যদিও বড় একটা অংশ উৎসবের তথা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বাইরে থেকে যায় তথাপি এসব দিবস গুলো আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য কে ধারণ করে। এছাড়া এগুলো নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা সম্পর্ক কেন্দ্রিক না হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট কাউকে রাজি খুশী করানোর বিষয় জড়িত থাকে না।

যাহোক বছরে একটি মাত্র দিন বিশেষ ভাবে শুধুমাত্র মা, বাবা কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য হওয়া দোষের কিছু নয়, বরং তাঁদের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ করার এবং তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার আরও বিশেষ একটি মাধ্যম। কিন্তু যে ভাবে আমরা এসব দিবস সমূহ পালন করছি তা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলতে বাধ্য। কারো প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করলাম অথচ সে জানবেও না এবং তাকে জানানো উদ্দেশ্যও নয়, বরং যদি অন্যের বাহবা কিংবা লাইক পাওয়ার জন্য করি তবে এর মাধ্যমে মনে হয় না আমরা সে প্রিয়জনদের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা প্রকাশ করি।

আমরা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য লালনের মাধ্যমে প্রিয়জনদের প্রতি আমাদের চিরায়িত ভালবাসা প্রকাশ অব্যাহত রাখবো নাকি কালের স্রোতে ভেসে গিয়ে অন্যের পণ্য বিপণনের মাধ্যম হয়ে পরজাতির সংস্কৃতি এবং আচার-আচরণের ধারক হয়ে আমদানি করা উৎসব সমূহ পালন করে প্রীত হব তা চিন্তা করার সময় এসেছে। কেননা এখন আমরা যথেষ্ট সচেতন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বৈদেশিক কূট চাল মোকাবেলার জন্য পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী বিচক্ষণ।

বৃহত্তর পরিসর হতে কোন কিছু যদি আমাদের ক্ষুদ্রতর গণ্ডিতে কেন্দ্রীভূত করতে চায় তবে সে জিনিস হতে দূরে থাকায় শ্রেয়। এমনকি তা আপাত দৃষ্টিতে যদি সুমিষ্ট ফলদায়কও মনে হয়।