ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
??????????????????????

সময়টা ছিল ২০১৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের মহামান্য বিচারপতি আমার উকিল সাহেবের সাথে আক্ষেপ করে বলেছিলেন এ দেশকে দুই ঘন্টায় সঠিক জায়গায় আনা যায় যদি উকিল,পুলিশ, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক- এ চার পেশার সবাই একই ছাদের নিচে একসাথে মিলেমিশে কাজ করে। উনি কেন একথা বলেছেন এর উত্তর না খুঁজে বরং চলুন একটু ভেবে দেখি সত্যিই কি এক ছাদের নিচে উপরে উল্লেখিত পেশার সবাই একসাথে কাজ করা সম্ভব? যদি হয় তাহলে ভালো, যদি না হয় তাতেও ক্ষতি নেই। যেভাবে চলছে চলতেই থাকবে। আমি এর কোনটাই  আর হতে চাই না বরং ব্লগার হয়েই থাকতে চাই। এ কারনে যে, এইসব মহান পেশার গুরু দায়িত্ব পালন আমার দ্বারা সম্ভব না।

মাননীয় বিচারক অভিজ্ঞ না হলে এমন সময় উপযোগী মন্তব্য করতে পারতেন না।উনি এক কথায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন। অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের কমবেশি সবার জীবনে আছে। কেউ স্বীকার করেন, কেউ করেন না। আমারটা আমি আজকে বলছি। কিছু কাজ করার আগে মনে হয় কাজটি একদম সহজ। কাজটি করার সময় বোঝা যায় যে আসলে কতটুকু সহজ। আমার বেলায় এরকম অভিজ্ঞতার শুরুটা হয়েছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে। যখন আমি জীবনে প্রথম জয়দেবপুর থানায় সাধারন ডায়েরি করতে যাই। আমার কারণ শোনার পর ডিউটি অফিসার আমার হাতে একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে উনার নাম বলে উক্ত নাম্বারের লোকের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। উনি যে নম্বর দিয়েছিলেন, সে পেশায় একজন রাইটার। এই রাইটার কোন বই বা নাটক লিখেন তেমন রাইটার না। বরং উনি যা লিখেন তা আমার মত যারা ডায়েরি করতে যান তাদের জীবনের চরম বাস্তব ও সত্যি ঘটনাগুলি সুন্দর ও ছোট করে একপাতায় লিখে দেন। আপনার বা আমার জীবনে যা ঘটতে বছর লেগেছে উনি তা পাঁচ মিনিট শুনে দুই মিনিটে এক পাতায় সংক্ষেপে লিখে দিবেন। এসব রাইটারদের লেখার কদর আমাদের থানাগুলিতে বেশি এবং তা জলদি গ্রহন করা হয়।

যদি আপনি বা আমি নিজেরা লিখে নিয়ে যাই তাহলে নানা রকম কথা বাদ দিয়ে দেওয়া হবে। এতে কোন ভুল নেই, কারন রাইটার সাহেবকে যে টাকা আপনি বা আমি দিচ্ছি সেখান থেকে একটা অংশ যে পাঠিয়েছে তার জন্য তুলে রাখা হয় আর যারা অংশ নেন না তারা তাদের নিজেদের মামলার কাজগুলো বিনে পয়সায় করিয়ে নিবেন এই রাইটারদের দ্বারা। মামলার চার্জশিট পর্যন্ত এই রাইটারদের দিয়ে লেখানো হয়। অফিসার শুধু স্বাক্ষর করে আদালতে জমা দিয়ে দেন।

রাইটার ভাইকে আমার এক পাতার জন্য ১০০০ টাকা দিতে হলো। রাইটারদের ফি সাধারণত ৫০০ থেকে শুরু করে তা ৫০০০ টাকা পর্যন্ত হয় এবং এ টাকার অংক নির্ধারিত হয় ঘটনার গুরুত্বের উপর। রাইটার সাহেবগন এতো বেশি কাজ করেন বা পান যে উনাদের একের অধিক সাহায্যকারি আছেন। পরে দেখেছি থানার সামনে থেকে শুরু করে রেল লাইনের বস্তিঘর ভাড়া নিয়ে তারা রাইটারের কাজ করছেন।কেউ কেউ এতো স্মার্ট যে সামনে রাখা কম্পিউটারে ফাইল করে রেখেছেন শুধু চাহিদামত বাদির নাম,বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর বদলে প্রিন্ট করে দিয়ে টাকা নিয়ে নিচ্ছেন।

অনিয়মের শুরুটা হয় এখান থেকেই যা পরে আরও বিস্তৃতি লাভ করে।যেমন, রাইটারের কাছ থেকে ছাপা হওয়া কাগজ নিয়ে যাবেন থানায়। যদি আগের অফিসার থাকে তাহলে কোন কথা নেই, যদি অন্য কেউ থাকে তাহলে এই কাজটির পুনরাবৃত্তি করতে হতে পারে। কেন তা বললে শুধুই সময় নষ্ট করা হবে, পাঠক বুঝে নিবেন।

যা হোক, ডায়েরি নিয়ে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকতে হলো নম্বরের জন্য। যদিও অনেক সময় নম্বর দিয়ে দেয়। কিন্তু দেয় না কে এই ডায়েরির তদন্ত করবে তার নাম ও মোবাইল নম্বর। আগেই বলেছি ঘটনার গুরুত্বের উপর নির্ভর করবে টাকার অংক ও ভোগান্তি। যদি গন্ধটা ভালো হয় খাবার না জানি কত মজা! কোন অফিসার তদন্ত করবেন তা ডিউটি অফিসার নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে তিনি তার ভালোলাগা বা গ্রুপের কাউকে দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আসল কথা মুরগি একদিনে না খেয়ে কিভাবে প্রতিদিন খাওয়া যায় তার উপায় ও পাত্র বের করা। অবশ্য দেশি মুরগি হলে ডিউটি অফিসার নিজেই নিজের নাম লিখে দেন, তদন্ত তিনিই করবেন।

যখন ডায়েরি নম্বর ও মোবাইল নম্বর পেয়ে গেলাম। সাথে সাথে উনাকে ফোন দিলাম। তিনি জানালেন উনি এখন ব্যস্ত আছেন দুয়েক দিনের মধ্যে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিবেন।বুঝতে বাকি রইল না উনি কী চান। অবশেষে দরদাম ঠিক করে অপেক্ষা করতে লাগলাম উনি কবে তদন্তে আসবেন। আর ভাবছিলাম এ কেমন দেশ ও আমিই বা কেমন নাগরিক? কার কাছে যাবো? আদৌ কোন ফলাফল পাবো কিনা?

৩০ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে পেয়েছি এই দেশ।  যদি কেউ আজকের এই অবস্থার আন্দাজ করতে পারতেন তাহলে হারানো জীবনের সংখ্যা কি এতো হতে পারতো? খোদা না করুক আবার যদি ভবিষ্যতে এরকম যুদ্ধের সূচনা হয় তাহলে কয়জন অংশ নিবেন? মুক্তিযোদ্ধায় নাম লিখাবেন কয়জন? আর রাজাকার হবেন কয়জন আমি জানিনা।

আসল কথায় আসি উনি যখন তদন্ত শেষ করে চলে যাবেন, ঠিক তখনি যাওয়ার সময় বলে গেলেন আমাকে থানায় এজাহার জমা দেওয়ার জন্য। আমি সাধারন ডায়েরি করতে যে ঝামেলার সম্মুখীন হয়েছি তা চিন্তা করে এজাহার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু না দিয়ে উপায় ছিল না। এক সময় বাধ্য হয়েই এজাহার দিয়েছি। এজাহার দিয়েও যে লাভ হয়েছে তা কিন্তু না। দেওয়ার ৩ মাস অতিক্রম হওয়ার পরেও নিয়মিত মামলা না হওয়ায় বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছি। কিন্তু ভুল হয়েছে মামলাতে পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করা। আর এ কারনে আজও আমার মামলার তদন্ত ও চার্জশিট উপস্থাপন করেনি পুলিশ। এখন কথা হচ্ছে আমি কী করব বা কী করা উচিৎ?

আমার গত দেড় বছর থানা পুলিশ ও আদালত পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তা যদি না বলি তাহলে আমার মনে শান্তি পাবো না। অনেককে দেখেছি বছরের পর বছর ঘুরে কোন প্রতিকার বা ন্যায় বিচার না পেয়ে বাদি ও বিবাদী উভয়ে মিলে আপোস মিমাংসা করেছেন। কেন করেছেন তা নিয়ে না ভেবে বরং এতে কী লাভলোকসান হচ্ছে তা নিয়ে ভাবা উচিৎ। এতে যে ভুক্তভোগী সে বিচার না পেয়ে আইন ও দেশের বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারাচ্ছেন ও নিরবে আল্লাহ্‌র কাছে বিচার দিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। এখন আল্লাহ্‌ যে বিচার করবেন তা হয়তো উনি দেখে যেতেও পারেন আবার নাও পারেন।কিন্তু আল্লাহ্‌ যে বিচার করবেন তা কিন্তু নিশ্চিত এতে কোন সন্দেহ নেই। অন্যদিকে যে বিবাদী মানে ক্ষতিকারক উনি দিব্যি বুক ফুলিয়ে সমাজের প্রভাবশালী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ও আরেকটি অন্যায়কর্ম করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কারন তিনি জানেন আইন বা আদালত তার কিছুই করতে পারবে না। টাকা খরচ করে বা তদবির করে যেভাবেই হোক তিনি পার পেয়ে যাবেন।

তাহলে পাঠক ফলাফল কি দাঁড়ায়? অনেকে মনে করেন ন্যায় বিচার পেয়েছেন, কিন্তু সেই ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তা কিন্তু একবারও বলেন না।কারন কাঠখড় পুড়িয়ে আংশিক ন্যায় বিচার পেয়ে তাতেই উনি খুশি। উনার এই খুশি অন্যকে উৎসাহিত করে ঠিকই, কিন্তু সেই কাঠখড় পোড়ানোর সামর্থ্য অন্যের নাও থাকতে পারে,সে ক্ষেত্রে তার কী করনীয়? তাহলে কি আমরা এইসব জিডি ও এজাহার করব না? এগুলি না করলে তদন্ত হবে না। অপরাধীরা কি কোন শাস্তি পাবে না? আমরা কি শুধু আল্লাহ্‌র কাছে বিচার দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকব? এতে জাতির বা দেশের কি উপকার হবে?