ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

আমাদের জাতিগত দুর্ভাগ্য যে শুরু থেকেই শিক্ষা ও বাস্তব জীবনকে যথাযথভাবে সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি-ভবিষ্যতে করার চেষ্টাও লক্ষ্য করা যায় না। সম্ভবত সেজন্যই দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রীটি অর্জন করার পরও একটি ‘চাকরি’ না পেলে এত বছরের অর্জিত জ্ঞান আমাদের শিক্ষার্থীদের কোন সাহায্য করতে পারে না! একজন সামর্থ্যবান যুবক পরিণত হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝায় আর তিলে তিলে ধ্বংস হয় অপার সম্ভাবনা। শিক্ষার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবার ফলেই শিক্ষিত (কর্মহীন) যুবসমাজ জাতির সম্পদ হবার পরিবর্তে ‘এক নম্বর সমস্যা’য় পরিণত হয়েছে। ডেনমার্কে জন্মগ্রহণ করা একটি ছেলে বা মেয়ে (মাথাপিছু যাদের ক্রয় ক্ষমতা ৪০ হাজার ডলারের বেশি) বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজ করলে মান যায় না; কিন্তু আমাদের লোকজনের মানসম্মান (যাদের গড়ে ক্রয়ক্ষমতা একহাজার ডলারের আশেপাশে) কোন বিশিষ্ট ‘ধাতু দিয়ে গড়া’ যে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবা-মায়ের কাজে (কৃষি বা ব্যবসায়) সামান্য সহযোগিতা করলেই তা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়!

অনেকে ভাবেন আমারতো টাকা পয়সার অভাব নেই আমার সন্তান কাজ করবে কেন? লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করাটা শুধু টাকার জন্য নয় বরং তাদের কর্মদক্ষতা, মানুষের সাথে মেশা, সময়ানুবর্তিতা, দলবদ্ধ হয়ে কাজ করা ইত্যাদি বিষয় শেখার জন্যই খুব দরকার। ছোটবেলা থেকে আমরা সন্তানদের ‘বাবু’ বানানোর কারণেই তারা শিক্ষাজীবন শেষ করার পরে আর কোন ‘ছোট কাজে’ হাত দিতে পারে না। অথচ আমার ডেনিশ সহপাঠী ‘ট্যুর গাইড’ হিসাবে তার ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য স্প্যানীশ ও ফেঞ্চ ভাষা শিখছে! কারণ হিসাবে বলল, ভবিষ্যতে সে ট্যুরিজম বিষয়ক কোন প্রতিষ্ঠানের বড় এক্সিকিউটিভ হিসাবে নিজেকে দেখতে চায় কিন্তু শুরুতে নীচের লেভেলে কাজ না করলে পুরো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন কঠিন হবে! তার মা-বাবাও সেটা সমর্থন করেছেন। এবিষয়ে আলোচনায় অনেকেই বলেন, আমাদের সে সুযোগ কোথায়, থাকলে আমরাও করতাম! আসলেই কি তাই? অনেক পরিবারে ২০ বছর বয়সী সন্তানটি বাসায় নিজের কাজগুলোর জন্যও নির্ভরর্শীল সারাদিন পরিশ্রম করা মা অথবা কাজের বুয়ার ওপর, তাই নয় কি? তারা কতোটা প্রতিবন্ধী হয়ে বেড়ে উঠছে একবার ভেবেছেন?

শিক্ষা কাঠামোর পাশাপাশি আমাদের পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গিও এই সমস্যার জন্য অনেকাংশে দায়ী। লেখাপড়া শেষ করে সন্তানটি স্যুট-কোট পরে অফিসে যাবে-এই ‘মাইন্ড সেট’টা আমাদের পঙ্গু করে ফেলছে। লেখাপড়ার মূল লক্ষ্য হলো শিশুর সুপ্ত প্রতিভার যথাযথ বিকাশ সাধনে সহযোগিতা করা। জীবনের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রসমূহে সে যেন স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে পারে সে ব্যাপারে দক্ষ হতে সাহায্য করা। তারপরে যদি কারো কোন বিষয়ে বিশেষ ঝোঁক ও দক্ষতা থাকে তবে সে বিষয়ে তাকে বিশেষজ্ঞ করে তোলা। একবার ভাবুন, যে বাবা কলেজে পড়া সন্তানটির খাতা-কলম পর্যন্ত নিজে কিনে দেন এটা ভেবে যে ও এখনো ‘ছোট’; আজ রাতে যদি সেই বাবা স্ট্রোকের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন তাহলে সেই সন্তানকেই তো অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, ফার্মেসী খুঁজে বের করতে হবে; টাকা ম্যানেজ করে চিকিৎসা করাতে হবে। তাহলে এতদিন কোন কাজ করতে না দিয়ে তাকে কী পঙ্গু করে গড়ে তোলেন নি? তাছাড়া কতোদিন সে আপনার ওপর ‘নির্ভরশীল প্রাণী’ হয়ে বেড়ে উঠবে?