ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

গল্পটা নাকি ২০১১ সালের। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ওই বছরের জানুয়ারি মাসে ভারত সফরে যান। ওই সময় ভারতের সাথে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে, উভয় দেশের যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালনের একটি চুক্তি অন্যতম। এখন চুক্তিটি বাস্তবায়নের পথে রামপালে চালু হতে যাচ্ছে কয়লা-বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই চুক্তির বিরোধিতা করে, ২০১৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সাত দফা দাবি নিয়ে, সুন্দরবন অভিমূখী লং মার্চ ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনের শুরু হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ‘সুন্দরবন ঘোষণা’র মাধ্যমে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয় বাংলাদেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি (এ লেখায় কমিটিকে সংক্ষেপে- রক্ষা জাতীয় কমিটি’ লেখা হবে)।

হয়তো এ বছর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ আন্দোলন অন্তত চতুর্থ বর্ষপূৃতি পালন করবে এবং গত আগস্টে ছিল, রক্ষা জাতীয় কমিটির উনিশতম প্রতিষ্ঠাবর্ষ। যদিও এসব আন্দোলন ইতোমধ্যে ঘরে ওঠে গেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ হয়তো ৪/৫টি কিংবা ১৯/২০টি ঈদুল আযহা পেরিয়ে এসেছে। দেশে-বিশ্বে যা-ই ঘটুক না কেন, কোরবানি ঈদের সময় বাংলাদেশের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। এ সময়, শ্রেণি-পেশা-চেতনা-লক্ষ্য-আদর্শ-আন্দোলন সবকিছু হয়ে ওঠে গরু-ছাগল-ভেড়াকেন্দ্রিক। ডান-বাম-মধ্যম-কবি-শিল্পি সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন পশু কোরবানির ঈদোৎসবে! গরু-ছাগলের সাথে সেলফি তোলার প্রচলণও আছে। অর্থাৎ, তখন সুন্দরবনের বাঘ রক্ষার চেয়ে গরু-ছাগল হত্যায় ত্যাগের মহিমা ফুটে ওঠে। তাই আন্দোলনের বছরগুলোর কথা আলাদা, এ বছর বাঘ রক্ষার সুন্দরবনীয় ঝামেলামুক্ত ব্যক্তি-পারিবারিক জীবনে ওই আন্দোলণের প্রণেতাসহ কর্মীরা কি অন্তত একটি ছাগলকে রক্ষা করতে পারবেন? সম্ভবত, ২০১৬ এর এপ্রিলে রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, প্রকল্পটি বন্ধ করার জন্য সরকারকে ওই বছরের ১৫ মে পর্যন্ত সময়সীমা বেধে দিয়েছিলেন। সাফ সাফ কথা ছিল- সুন্দরবন ধ্বংস করে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়।

বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বলে খ্যাত বাগেরহাট জেলার সুন্দরবনের রামপালে একটি ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত সরকারি অনুমোদন লাভ করেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (এনটিপিসি) এর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০১২ সালের জানুয়ারী মাসে। যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়- বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)। ২০১৩ সালে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের অবকাঠামো ও কারিগরি স্থাপনা নির্মাণের জন্য ভারতের, ভারত হেভি ইলেকট্রিকেলস লিমিটেড (বিএইচআইএল) এর প্রতিনিধি ও বিআইএফপিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দরদাতা ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিএইচআইএল ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির আগে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়নের শর্তে ১৬৮ কোটি ডলারের প্রকল্পটি লাভ করে। যন্ত্রপাতিসহ আনুসাঙ্গিক আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএইচআইএল কর অবকাশ সুবিধাও লাভ করবে। উল্লেখ্য, প্রকল্পটির জন্য, বাংলাদেশ সরকার ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট (এক্সিম) ব্যাংক থেকে ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে। মালিকানায় অংশীদারিত্ব ৫০-৫০ হলেও ঋণের বোঝা বাংলাদেশ ঘাড়ে পেতে নিয়েছে। এছাড়াও, কোন কারনে, প্রকল্পটি বন্ধ বা লোকসানের মুখে পড়লে এর দায়ভারও বাংলাদেশের। এই বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কি পরিমান অবদান রাখবে তার নিশ্চয়তা না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত যে, এটি দেশের অপূরণীয় ক্ষতি সম্পন্ন করবে। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে ১৪২ টন সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্ষাইড নির্গত হবে।বিদ্যুৎ সরবরাহের কি হবে তা না জানলেও বিষাক্ত গ্যাস পাওয়া যাবে প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে।
এ প্রেক্ষিতে, রামপালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে প্রকল্পটি বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ এবং সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভূক্ত করার প্রস্তাব গৃহিত হয়ে থাকলেও, গত ৫ জুলাই ২০১৭ তারিখে, বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪১ তম সভায় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে আপত্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে জাতিসংঘের ওই সংস্থাটি। বিষয়টি এমন যেন, সুন্দরবন যখন থাকবেই না, তখন এর ঝুঁকি বা অঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিবেচ্য নয়। সহজভাবে বললে, জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংস্থার ভূমিকা নিয়ে সচেতনমহলে নানান প্রশ্নের উদয় হয় এবং জাতিসংঘ কোন সার্বজনীন কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান নয়। জাতিসংঘ বিশ্বে, দেশ ও জাতিসমূহের শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সংগঠন বলে অজস্র প্রমাণ চলমান রয়েছে।

তাই বাংলাদেশের ক্ষতির চেয়ে শক্তিশালী দেশের লাভ নিশ্চিত করার একটি কাগুজে এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ভাগ্য ও উন্নতির নির্ণায়কও নয়। তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে একদা জ্বলে ওঠেছিল এদেশের শিক্ষিত-সচেতন-সংস্কৃতিমনা-বুদ্ধিজীবরা, যাদেরকে জাতির ভাগ্য রক্ষাকারী বলা যায়। বাংলাদেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সহ বিরোধীতাকারী বিভিন্ন সংগঠনের প্লাটফর্ম- সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি’র পাশাপাশি বাম ছাত্রসংগঠন ও সংস্কৃতি-নাট্য সংগঠনগুলো আলাদা আলাদাভাবে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্ঠা করে। এ বছরের জুলাই পর্যন্ত আন্দোলনের তীব্রতা থাকলেও ইউনেস্কো’র আপত্তি প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে আন্দোলনে ভাটা পড়ে। কেউ কেউ বলেন, আন্দোলনকারীদের মুখে যেন চুনকালি পড়েছে।

বিশেষ করে, ১৯৯৮ সালের আগষ্টে জন্ম নেয়া ‘জাতীয় স্বার্থে তেল গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি’ যা কালান্তরে ২০০২ সালে ‘তেল গ্যাস সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’ যা অদ্যাবধি সর্বশেষ ফুলবাড়ীয়া কয়লা প্রকল্পের বিরোধিতার প্রয়োজনে ‘খনিজ’ শব্দটি যুক্ত হয়ে ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’র আন্দোলন যখন থেমে যায় তখন বিরোধিতা করার বিশেষ আর কেউ থাকে না। কারন, জাতীয় সম্পদ রক্ষায় জনগণের পক্ষে সরকারের বিরোধিতা করার জাতীয় দায়িত্ব ওই কমিটির হাতে। বিষয়টি নিয়ে, ঘরে বসে সাক্ষাৎকার, প্রেস কনফারেন্স ও লিখিত বক্তব্য প্রদানের ধারা কিছুদিন অব্যাহত থাকলেও বেশিদিন নয়, নতুন ইস্যু সামনে আসে। উচ্চ আদালত চত্বরে গ্রিক দেবীর মূর্তি অপসারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মূদ্রা চুরি ও সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে চলমান সংকটের সুযোগে রামপাল কাহিনী বিস্মৃত। ষোড়শ সংশোধনীর মত জাতীয় সংকটের কাহিনীকে ম্লান করে দিতে কোরবাণীর ঈদ আসার দরকার ছিল। এখন কোন রাজনীতি নয়। গরু-ছাগলের চালান, নাড়ীর টানে ঘরে ফেরার আয়োজনে ব্যস্ত বাংলার ধর্মপ্রাণ মানুষেরা। কিছুদিনের জন্য সকলেই মুসলমান হয়ে ওঠেন। অস্থির বাঙালি ঈদের সময়ে আরো বেশি অস্থিরতায় ভোগে। ফলে দেশের জাতীয় সম্পদ লুন্ঠন ও জাতীয় সংকট সৃষ্টির ঘটনা মনেমগজে কোন চাপ রাখে না। এভাবেই একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে থাকবে হয়তো। এমতাবস্থায়, সুন্দরবন বাঁচাও তথা সকল প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ ও কর্মীবৃন্দের নিকট বিনীত জিজ্ঞাসা- ‘সুন্দরবনের বাঘ-কুমির রক্ষার শপথের মহিমায় অন্তত একটি ছাগল-ভেড়া-গরু’কে রক্ষা করতে পারবেন কি?’