ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

 

বাংলাদেশির মত নাচ-গান পাগলা জাতি খুব কমই আছে। আবার এদেশের মত স্বাধীনতাপ্রিয় ও স্বাধীনতাভোক্তা নাগরিক অন্যান্য দেশে নাই বললেই চলে। ক্ষেত্রবিশেষে, বাংলাদেশের মত স্বাধীনতাবোধ ও ভোগের মাত্রা প্রকৃতিভেদে অন্যান্য দেশে অপরাধ বলে গণ্য হয়। ’মানুষ স্বাধীন হয়েই জন্ম নেয়…’ জ্য জ্যাক রুশো’র স্বাধীনতা’র সংজ্ঞার প্রথম অংশটা বাংলাদেশের মানুষেরা স্বাধীনতার এই মানে ও গানের মত মনে করে থাকেন।

বাংলাদেশের লক্ষ মানুষেরা, ঘুম থেকে ওঠে বন্দনা সেরে প্রস্তুতি নিয়ে বাড়ি থেকে কাজে বেরোবার আগে লক্ষাধিক ভূয়া লাইসেন্স, সনদ, পরিচয়পত্র ইত্যাদি, হালকা কাগজ জাতীয় নির্ভার-ওজনহীন বস্তুটি সঙ্গে নিতে পারেন। আইন-শৃঙখলা রক্ষাবাহিনীর হাজার সদস্য, চাকুরী-নিরাপত্তা-সেবার শপথ নিয়ে ডিউটিতে বের হন যা, অপরিমেয় ওজন সম্পন্ন ভারী/শূণ্য ওজনের বস্তু। রাষ্ট্রের দায়িত্বে ডিউটিরত বাহিনীসদস্য ও কাগজ বহনকারীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছেন। যে কোনো লাইসেন্সপত্রকে ‘বৈধ-অবৈধ’ বলে গ্রহণ-বাতিল করার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা ভোগ করে থাকেন রক্ষাবাহিনীর সদস্য। তেমনি, ভূয়া লাইসেন্সধারী ব্যক্তিগণও, ভূয়া কাগজপত্রকে সত্য বলে প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনে অবরোধ-হরতাল আহবান করার স্বাধীনতা চর্চা করে থাকেন। রুশো’র সংজ্ঞার পরের অংশের ’তবে সর্বক্ষেত্রে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ’ এমন বাণী অচল। ডিউটির পর রিক্রিয়েশনাল বা বিনোদনের প্রধান পছন্দ- গান, দ্বিতীয়টি- নাচ। সকল মানুষ প্রতিদিনই কোন না কোন গান গেয়ে, (গাইতে না জানলে কিংবা মুখস্ত না থাকলে শীষ দিয়ে অথবা ‘নিনি…নিনি..নি’ করে অথবা, নিজেই কথা বসিয়ে গান’র গ্যাপটা পূরণ করার স্বাধীনতা ভোগ করে) বের হন। নাচগানে এদেশের মানুষ সর্বস্ব ত্যাগ বা উজাড় করে দিতে পারে; অচেতন হয়ে যেতে পারে; এজন্য জান দেয়ার, আত্মহত্যার ইতিহাসও আছে-লক্ষ পৃষ্ঠা’র। গানকে ভালবাসেন না, বাংলাদেশে এমন নিষ্ঠুর কেউ আছেন কিনা জানা নেই; গান গাইতে গাইতে মানুষ খুনের ঘটনার প্রমাণ রয়েছে। নামকরা খুনিদের পছন্দের গান আজও আমাদের নিকট জনপ্রিয়। নাচ-গানের স্বাধীনতা রুখে দাড়ানোর আর কোন শক্তি নাই। গানকে গান ছাড়া, অপর কোন যন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে না। কাকবেলীয় বা ছোট বিষয়- এদেশের মানুষরা শপথ, ডিউটি, বিনোদন নিয়ে বের হন এবং তিনটি বিষয়ই কাগজে মূদ্রিত-লিখিতরূপ আছে এবং একই সাথে বিমূর্ত-মানসিকতার অদৃশ্যরূপী এবং মস্তিস্কচর্চা সংশ্লিষ্ট। কার্যক্ষেত্রে, এদেশের অনেকেই ওইসব চিন্তা বা মানসিকতার বিপরীতে অবস্থান করেন। দৈহিক কর্মে- দুর্নীতি, পীড়ন-লুন্ঠন ও ঘাত-আঘাতমূলক (‘প্রতিঘাত’ একটি বিলুপ্তাধীন শব্দ)।

স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের ২৪ মে তারিখে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি কাজী নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। স্বাধীন জাতির জন্য বিশ্বসমাজে পরিচিত একজন কবি রাষ্ট্র’র স্বতন্ত্র-সাংস্কৃতিক মর্যাদা আদায় করতে পারেন। ‘৭২ সালেই, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ বলে ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু কবি কাজী নজরল ইসলাম’র মত একজন বাংলাভাষাভাষী কবির বহুমাত্রিক ও পরমার্থিক মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন, এদেশের মানুষ হয়ত এখনও বুঝতে পারেননি। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়, কবির কবিতাকে রণসংগীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়, কিন্তু বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা এখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করেনি।কারণ, ইতোমধ্যে ১৯৭১ এর ৩ মার্চ ঘোষিত ইশতেহারে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ’আমার সোনার বাংলা..’ জাতীয় সঙ্গীত এর মর্যাদা পায়; ‘৭১ এর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে, গানটি গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে; ১২ জানুয়ারি ১৯৭২-এ স্বাধীন দেশের মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে “আমার সোনার বাংলা..’কে গণপ্রজাতন্ত্রী বালাদেশ’ রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে নির্বাচিত হয়। এমতাবস্থায়, জাতীয় কবির মর্যাদায় ঘোষিত কাজী নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় সঙ্গীত‘ র রচয়িতা দুইজন আলাদা ব্যক্তি হওয়ায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি অসংগত হয়ে ওঠতে পারে। কালক্রমে, ১৯৯০ সালে, সামরিক সরকারও কবিকে জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারির আদেশ হয়, কিন্তু সরকারি ওই প্রজ্ঞাপন এখনও জারি হয়নি। এদেশের পড়ালেখায়, প্রশ্ন-উত্তরে, অনুষ্ঠানে, বক্তৃতায় জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতা হিসাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি হিসাবে কাজী নজরুল ইসলাম এর নাম লেখা-বলা হয়। এ অবস্থা দর্শনে, রাজনৈতিক আলোচনার উর্ধ্বে থেকে স্বীকার্য যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্র-সংবিধান-সরকার ও জনগণের এর ঘোষণায় ও বাস্তবতায় নানারকম তালছন্দহীন অসংগতি রয়েছে; যেমন, সংবিধানের মূলনীতি চারটি পরস্পর সংগতিহীন বা সংগীতহীন।

উইকিপিডিয়া’য় উল্লেখ আছে- ‘সংগীত, এক ধরনের সুসংবদ্ধ শিল্পকলা- যা শব্দ ও নৈশব্দের সমন্বয়ে মানব চিত্তে বিনোদন সৃষ্টি করতে সক্ষম’। বাংলাভাষায়, সংগীতকে ধাতু প্রত্যয় যোগে বিশ্লেষণ করলে- সম পূর্বক ‘গৈ’ ধাতু যোগে সংগীত নিস্পন্ন হয়।‘গৈ’- অর্থ গান করা। গ্রীক ‘ম্যাজিক’ শব্দটি, ইংরেজীতে-‘মিউজিক্’ এর অর্থ সংগীতের ঐন্দ্রজালিক সংগতিতে অর্থবোধক হয়। গান মানেই মন্ত্রমুগ্ধতা, একাগ্রতা ও প্রগাঢ় চিন্তা। কোন কোন সাহিত্যের কাব্যময়তা শতকোটি মানুষকে একটি ধর্মভূক্ত করেছে। অনেক ধর্মগ্রন্থকে সাহিত্যের মর্যাদা ও স্বীকৃতির দাবিও অমূলক নয়। গানের আন্তরিকতাপূর্ণ সুনংবদ্ধতার শৈল্পিক সমন্বয় এক প্রানবন্ত অনুভূতি সৃষ্টি করে।

২০১৬ সালে, সাহিত্যে গায়ক বব ডিলান’র নোবেলপ্রাপ্তি বিতর্কিত হলেও এবং দেরিতে হলেও সাহিত্য-শিল্প চিন্তাবিদরা শেষ পর্যন্ত সংগীত‘কে সাহিত্য’র মর্যাদা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, পাথরযুগ হতে সুর ও সংগীত এর শুরু। বাংলা অঞ্চলে, আদিকাল হতে ঈশ্বর বন্দনার কীর্তন-গীত প্রচলিত।পীথাগোরাস, জ্যামিতি, সংখ্যাতত্ত্ব ও দর্শনচিন্তার এক নতুন দিগন্ত হয়ে ওঠেন।গীতবিদ্যা ও সংখ্যার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আলোচনায় বলা হয়, সংগীতের মধ্যে থাকা সংগতির মূল ভিত্তি হল- সংখ্যা।পীথাগোরাসের গনিত ও সংগীত বিষয়ক চিন্তা, দর্শনশাস্ত্রের সরলীকরণের সূত্রের গীতিময় সমাহার। মহামতি সক্রেটিস কর্তৃক বিষপান পর্বটি শিক্ষাসভ্যতা, দর্শন, ন্যায় ও সততার তাল-লয়-ছন্দ-বাণীতে এক অনবদ্য গান হয়ে ওঠে। মহামতি প্লেটো’র আদর্শ রাষ্ট্রের দার্শনিক রাজা,র যোগ্যতা নির্বাচনের শর্তাবলীর মধ্যে -‘ যিনি প্রতিদিন নব নব গান শুনেন’। দার্শনিক রাজা তৈরীর শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রাথমিক (১৮ বছর বয়স পর্যন্ত) শিক্ষাকাল এর প্রধান বিষয়- সংগীত ও ক্রীড়া শিক্ষা। নিজের বেহালা’কে নিজের `শিক্ষক’ বলে একটি বাদ্যযন্ত্রের পরম উৎকর্ষধর্মীতার স্বীকৃতি দেন মহান আলবার্ট আইনস্টাইন।গণিতের জটিলতায় ক্লান্ত বিজ্ঞানীকে ছন্দসারল্য সমাধান দিত তার প্রিয় বেহালাটি।বিশ্বমানতার এক মূর্ত প্রতীক- আর্নেস্তো চে গুয়েভারা, বালক ক্ষুদিরাম, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা রুমী’র আত্মদানের পর সবকিছু গান হয়ে ওঠেছে। ক্ষমতা ক্ষিপ্রতা ও বৈপ্লবিক প্রতিজ্ঞা প্রকাশে গানের ব্যবহারিক ও বহুমুখী উপযোগিতা শিল্পরসিকমাত্রই জ্ঞাত।

গান কোথাও প্রান, কোথাও আবার বাণ, গান ও বাদ্যের অযাচিত ও অপব্যবহার সামাজিক-দূষনের কারণও হতে পারে।আবার, ইংরেজীতে ‘গান’ মানে ‘বন্দুক’। গানের মহাবৈশ্বিক পরম বিধ্বংসী রূপের প্রকাশ রয়েছে, কলকাতার গায়ক শিলাজিৎ মজুমদার এর গানে-‘ এই গীটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে, যদি ভয় দেখাও, গুলি-গোলা আর বারুদের বাসা হতে পারে যদি চোখ রাঙাও’। পাশাপাশি গানটিতে-‘ এই গীটরিটা প্রজাপতি হয়ে যেতে পারে, যদিও ফুল ফোটাও’ এমন প্রাকৃতিক সৃষ্টিশীলতার কথা থাকলেও বাংলাদেশে তা গাওয়া হয় না। বিপরীতমুখী এই অশণিসংগীত সংস্কৃতির মূলধারায় বহমান।পীথাগোরাস, জাগতিক সংগতিকে, সংগীতের সংগতি বলে উল্লেখ করেন। আবার, প্লেটো‘র শিক্ষাতত্ত্ব বলেন- ছন্দ ও সংগীত নিয়ন্ত্রিত না হলে, সততা ও ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। কবি ও গানের কথা নিয়ে ভাবনার দিন নয়, মনে রাখার দরকার পড়ে না। ফলাফলে- পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পেয়ে থাকলেও, সমগ্র সনদ উত্তর বের করার ক্ষমতাটুকু অর্জন করার শিক্ষাটুকু করা হয়নি। গান-ছন্দ-প্রাণহীন জীবনবাহী শিক্ষার্থী এক্ষেত্রে বিফলতায় অবৈধভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে এবং সফল হলে অবৈধ অর্থ শিকারে বাধ্য হয়। এই ধারাবাহিকতায়, চিকিৎসক, বিচারক কিংবা শিক্ষকের জাল সনদ শনাক্ত হবার সংবাদ পাওয়া যায়।ধনাঢ্য ও বর্ণাঢ্য জীবনের সুখ লাভে অধিকাংশই ব্যর্থ। অথচ, দেশের সকল প্রকার নিয়োগ পরীক্ষায় সহজ-সুরেলা গান-কবিতা-সাহিত্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অন্তত পাচ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে হয়।গান-গীত-সংগীত তথা বিনোদন আক্ষরিক ও ব্যবহারিক ক্ষমতা রয়েছে। অর্থ ও সম্পদ লাভের কর্ম ও চিন্তাশক্তি দান করতে পারে।সারা জীবনে একটি কবিতা, একটি গান ও আদর্শ জীবন থেকে অর্জিত শিক্ষার মৌলিক ক্ষমতা মানুষকে জ্ঞানার্জনে প্রবৃত্ত এবং পরিবেশকে আলোকিত করে দিতে পারে। গান ও প্রাণহীন জীবনে লাভ-ক্ষতির অসৎ চিন্তা এবং এর দ্বারা সৃষ্ট অনাচার ও ক্ষতির আশংকাকে প্রতিহত করতে পারে মহাকালীয় কোন গান। তাই, শিক্ষাহীন, জ্ঞানমেধাহীন জীবনে নাম-যশ-খ্যাতি-প্রতিপত্তি লাভ, ভোগের ইচ্ছা ও অপচেষ্টা মানুষের নিকট ভিত্তিহীন ও হাস্যকর হয়ে ওঠতে পারে। এছাড়াও, এসবকে নির্বোধের মূল্যহীন ও ঠুনকো-আবেগ বলে মনে করতেন- আনপড়া ফকির লালন, বাউল শাহ করিম’র মত মহাপুরুষেরা।

বিনোদন মানেই মনোরঞ্জন নয়, শিক্ষার মাধ্যমও। সুখকর সময় যাপনে, প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্কহীন কর্মকান্ড মনোরঞ্জনী হতে পারে, কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে বিনোদন হয় না।কবি নজরুল রুটির দোকানে পড়াশুনা করতেন বলে গল্প প্রচারিত ও বিদিত।দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল গবেষণা ইনস্টিটউট রয়েছে। গান, কেবল হাসি-উচ্ছ্বাস-হুলুস্থুল-মিলন-প্রাপ্তি’র আনন্দের উৎস নয়। শোক-কান্না-বেদনা-দ্রোহ-বিদ্রোহ ও আনন্দের হতে পারে। গান মানেই শুধু শান্তি-শ্রান্তিবিলাস নয়; কখনো, যুদ্ধ-ক্লান্ত ও বিবাগীর। কমরেড চে গুয়েভারাকে ‘বিপ্লবের কবিতা’ বলা হয়। ভারতের বিখ্যাত জীবনমূখী গায়ক নচিকেতা,-“শোষকদের কালোহাত ভেঙ্গে দাও, ভেঙ্গে দাও- এই বলে চিৎকার এটাও তো গান” বলে গেয়েছেন। মারনাস্ত্র চালনাকারী দূর্ধর্ষ যোদ্ধার বীরগাথাও গান হতে পারেন, যদি তা মুক্তির জন্য যুদ্ধ হয়।সকল ব্যাকরণ,গুণ ও জ্ঞানের কেন্দ্রে গান’র অবস্থান।একজন সাহাবী ও বীরযোদ্ধা- কবি হাসাস বিন সাবিত; ভারতের মিসাইলম্যান খ্যাত বিজ্ঞানী এপিজে আব্দুল কালাম; ইতালিতে জন্ম নেওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন লেফট্যানেন্ট ও ফ্রান্সের জাতীয় কবি গীয়ম অ্যাপলিনার; ১৯ বছর বয়সে স্বাধীনতা আন্দোলনের যোদ্ধা ও তুরস্কের আপোষহীন কবি নাজিম হিকমত ছাড়াও, বাংলাদেশ, ইরান, ইউরোপ, আমেরিকার সেরা কবিদের অনেকেই ছিলেন যুদ্ধফেরত-যুদাধাহত।কবিতা ও গানের সততায়- স্বত:স্ফূর্ততায় ঋষীসম কবি-গীতিকারেরা আগ্রাসীকে প্রতিরোধ করায় জ্বলে ওঠতে পারেন, সম্মুখ যুদ্ধে রণহুংকারী হয়ে ওঠতে পারেন। মহাবিশ্ব ও জীবন থেকেই আসে উম্মাদনার মন্ত্র বা গান। তাই, শিল্প-কবিতা-সংগীত মানুষের জীবন থেকে জীবনে স্পন্দন জাগায় এবং সার্থক হতে পারে। বাউল করিম বন্ধুর জন্য কুঞ্জ সাজিয়ে রেখেছেন। অনাচারে-অন্যায়ে সেই প্রাণবন্ধুর সম্মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেন।‘জিগার করি তোমার কাছে’ গানে পরম বন্ধুর অসাম্য-অন্যায্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেন। রাখতে চাইলে নিজের সম্মান, কর সমস্যার সমাধান; বাউল আব্দুল করিম বলে, নইলে তোমার রক্ষা নাই।

অত্যাচারী প্রবল ক্ষমতাশালী রাজা কিংবা সেই প্রাণসখা যিনিই হোন না কেন, অন্যায়কারীকে প্রতিহত করার সাহস ও স্পর্ধা প্রকাশ করেন। এই বাউলের মত একই ধরনের শব্দ ও দ্রোহ প্রকাশ রয়েছে ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিক-গায়ক-পন্ডিত ড. ভূপেন হাজারিকা’র “জীবন নাটকের নাট্যকার” গানটিতে- ‘তোমাকেই বয়কট করব সবাই মিলে, এইভাবে বে-আইনী করলে’। সলিল চৌধুরীর গান- “বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা” শুধু কাব্য-ছন্দের মিলে আবদ্ধ নয়, জীবনসঙ্গীতের একাগ্রতা ও সমগ্রতা‘র অন্তমিলে গান হয়েছে।যাপিত জীবনে কবি-গায়কেরা, সময়ের সক্রিয় প্রতিবাদী সৈনিক এবং ব্যক্তিজীবনে, অন্যায়কারীকে প্রতিহত করতে জীবনবাজী রাখার মত সাহসিকতাও ধারণ করেন। ১৯১৬-এর বাউল করিম, ১৯২২-এ সলিল চৌধুরী এবং ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহন করা ভূপেন হাজারিকা ভিন্ন ভিন্ন দেশ-সমাজের বাসিন্দা হলেও এদের গানের অন্ত ও অর্থগত মিলটি চেতনা ও গানের সার্বজনীনতা প্রমাণ।কল্যানকামী চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের কোন ভৌগলিক সীমারেখা নেই বলেও প্রমাণিত হয়। গান যেমন শোষণের বিরুদ্ধে ধারালো অস্ত্র, তেমনি, শক্তিহীনকেও সবল করে তুলতে পারে- আণবিক বোমার চেয়েও বেশী। গান থাকলে শোষন ও সম্পদের যথেচ্ছ ভোগের সুযোগ থাকে না।প্রাণসঞ্চারী একটি গানের শক্তিতে, অধিকার-সচেতনতায় বিস্ফোরিত হয়ে ওঠতে পারে যেকোন কুলি-মজুর-কৃষক। তবে, সম্ভবপর সবকিছু অসম্ভব হয়ে ওঠে যদি গান থেকে প্রাণ এবং বাণীর সারতত্ত্ব-শিক্ষা অনুপস্থিত থাকে।গান থেকে মানবজাতিকে সরানো যাবে না, প্রাণ মানেই গান ও গুনগুন। গানে মাতিয়ে গানের প্রাণটুকু কেড়ে নেওয়া সম্ভব। এতে, গানও হল এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে বাজার ও সম্পদ লাভের নতুন দিক উম্মুক্ত হল। গানের বাজার নিয়ন্ত্রন করতে পারলে জোরজবরদস্তী করতে হয় না। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে’ ‘শোন, একটি মুজিবর থেকে’ ইত্যাদি বহুবার গীত হয়। অন্যদিকে, ’ফাইট্টা যায় বুকটা’, ’ও টুনির মা’ জনপ্রিয় বাংলাসঙ্গীত হয়ে যায়; রাস্তায় বখাটেদের নির্লজ্জ উত্যক্তকর শব্দগুচ্ছ- ‘কোপা শামসু’র চাহিদা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে, শব্দটির নামেই একটি বাংলাছবি মুক্তি পায়।

জীবন ও গানের চলতি ধারাবহিকতায় শিক্ষা, প্রজ্ঞা, বিজ্ঞান, পুরস্কার, বাৎসল্য এমনকি তিরস্কারকেও সূলভপণ্য হিসাবে দেখা হয়। তারপর স্বভাবতই ব্যক্তি ও জীবন এক থাকে না। একই মানুষের ব্যক্তিবোধ ও ব্যক্তিত্ববোধ থাকে আলাদা। এসব সামাজিক অসংগতি ও অবনতির লক্ষণ। অসঙ্গতিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের নজিরও আছে। যেমন অছে জাতীয় কবিকে নিয়ে। তেমনি, এদেশের জাতীয় ফল কাঠাল এবং জাতীয় বৃক্ষ- আমগাছ; জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলেও জাতীয় প্রাণী হতে পারে ছাগল, আদর্শ প্রাণী- গিরগিটি; রাষ্ট্রীয় ধর্ম- ইসলাম, জাতীয় ধর্ম- দুর্নীতি। নাগরিকগণের শিক্ষা-আদর্শ-কর্মের সংলগ্নতা না থাকায়, ডাক্তার ও হন্তারক, প্রহরী ও লুন্ঠনকারী, সাধু ও ধর্ষক, প্রকৌশলী ও অপকৌশলী, শিক্ষক ও দুগ্ধখামারীকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। বহুরূপীয় সামাজিক এই অসঙ্গতির কবল থেকে, আশ্রয় ও নিরাপত্তা লাভের নির্ভরযোগ্য কোন ব্যক্তি-সংগঠন নেই। একই ব্যক্তি প্রয়োজনমত রূপ ও আচরণ বদল করতে পারেন। লক্ষণীয় যে, চরিত্রের এই অস্পষ্ট রূপান্তর সমাজের প্রত্যেক স্তর-শ্রেণিতে আশংকাজনক ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। একমূখী নিম্নগামিতার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের তটস্থ করে রেখেছে- যা নিজভুবনে একা একা সবাই জানি। সংস্কৃতির কিকৃতিসৃষ্ট, এই একমূখী আতংক কাটিয়ে ওঠার কোন সম্ভাবনা নেই। সহজ অংক, পুলিশের বিরুদ্ধে, ছিনতাই-অপহরণ-মাদকবিক্রয়ের অভিযোগ ওঠে, অভিযুক্ত হন বা জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু, কোন দূস্কৃতিকারী, অপকর্ম ছেড়ে দুষ্ট দমন করার শপথে চরিত্র বদল করেছেন বলে শোনা যায়নি; কোন কসাই, গরু-ছাগল কাটতে কাটতে বিখ্যাত পশুমনোবিজ্ঞানী বা চিকিৎসক হয়ে ওঠেননি। শিক্ষা ও সংস্কৃতিহীন এই সামাজিক ভারসাম্যহীনতার ফলে মূর্ত -বিমূর্ত সকল কাঠামো ভেঙ্গে পড়বেই।

বালাদেশের শহরে-গঞ্জে-গ্রামে-মহল্লায় প্রতিবছর দুইবার করে মহান কবি-শিল্পী-গায়কের জন্ম-মৃত্যু দিবস পালন ও শতশত গান করা হয়ে থাকে। প্রায় সবখানেই, গীত হওয়া গানের কবি-গীতিকার-সুরকার কে বা কারা সে নামটিও উচ্চারণ করতে শুনা যায় না। ফলে, কিছুই শেখা হয় না। পক্ষান্তরে, গান ও মাহফিলের শব্দযন্ত্রের তেজস্ক্রিয়তা এবং বাদ্যযন্ত্রের বিকট আওয়াজ পরিবেশ দূষণের কারণগুলোর অন্যতম। হয়ত, ব্যক্তি প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্থতা অনুভব করেন না এবং সময়-সম্পদ ও শক্তি’র অপচয়ের দায়বদ্ধতা বহন ও আর্থিক মূল্য পরিশোধ করতে রাষ্ট্রের প্রত্যেকেই বাধ্য। কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতার শিক্ষা দিতে অক্ষম পরিবার-প্রতিষ্ঠান-সংস্কৃতি-পরিবেশ। দেশের সংগীত তথা সংস্কৃতি জগত এবং এই জগতে ‘বিশেষ অবদান’ রাখা নিয়ে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় যে, উক্ত ‘অবদান’ কি সংগীতের অমোঘবাণী’র আহবান থেকে মানুষকে দুরে রাখার কৌশলে পারদর্শীতাকে বুঝায়? ‘যত ভোক্তাপ্রিয়তা, তত উচ্চাঙ্গের সংগীত, তত পুরস্কার? গান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ নাই।আদর্শ-চেতনা প্রচার ও সামাজিক সৌজন্যতাবোধের দায় স্বীকার করার মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিকতার গান, শিক্ষা ও প্রাণশক্তিসম্পন্ন বাংলাদেশ স্বীকৃত উন্নত রাষ্ট্র না হোক সফলতার যাত্রা শুরুর স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে।