ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

ভদ্রতা এবং বংশ পরিচয়। বাসের ভেতর শ্লোগানধর্মী একটি কোটেশন লেখা। আরও আছে: ধূমপান নিষেধ, অবৈধ মালের জন্য বাস কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়, আগে নামতে দিন, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি ইত্যাদি…ইত্যাদি।

মানুষের স্বভাব সুন্দরের প্রশংসা করা। সুন্দরকে ধরে রাখা। এই সুন্দরের সংজ্ঞা কী? না গাণিতিক সূত্রের মতো কোনো নির্ধারিত সংজ্ঞা নেই। বিউটি ইজ নেচার-নেচার ইজ বিউটি। কার কাছে কখন কোনটি সুন্দর তা ব্যক্তি মানসের ব্যাপার। তাই ঘুরে ফিরে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে চিনতে হলে দেখতে হয় তার বন্ধু-বান্ধব কেমন, তার রুচি কেমন। বিষয়টির একটু সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতা আমাদের অবস্থান এবং ক্ষমতার কারণে। অবস্থান ও ক্ষমতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই সকল ক্ষেত্রে ব্যক্তির ওঠা-বসা আর রুচি দেখে কারও চরিত্র বিশ্লেষণ করা যায় না। সম্ভব নয় আচরণ দ্বারা নির্ভুলভাবে বংশের ওজন করা।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। গোলাপ ফুল। সুগন্ধে সৌন্দর্যে অনুপম এক সৃষ্টি। যদি সুন্দর বলতে হয়, তাহলে গোলাপ সুন্দর। অথচ এই সুন্দরের মধ্যে যা রয়েছে তা থেকে মৌমাছি নেয় মধু আর মাকড়সা নেয় বিষ। অর্থাৎ ভালো-মন্দ মিলিয়ে সৃষ্টি। তবে ভালোর ভাগটিই বেশি। আর বেশি হয়েও এটি সবল নয়। তাই সমাজে ভালো মানুষের দাম নেই। হয়তো সকলে ‘ভালো’ বলবেন, কিন্তু তার প্রাপ্যটুকু দিতে অনেকের কুণ্ঠা। ভদ্রতা বংশের পরিচয় কি না তা এক বাক্যে স্বীকার করে নেয়া সম্ভব নয়, যেহেতু ভদ্রতারও কোনো নির্ধারিত সংজ্ঞা নেই। এই অভিব্যক্তি বর্ণনা করার মধ্যে যদি হৃদয়ের স্পর্শ থাকে, অকপট-আন্তরিক হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি ভালো। তবে সমস্যা হলো অকপটতা ও আন্তরিকতা পরিমাপের কোনো নিক্তি নেই। একজন পরিচিত ভদ্রলোক, যদি তাঁর সরলতা ভদ্রতার সংজ্ঞা হয়, একদিন দুঃখ করে বলছিলেন তাঁর মালিকের রুচির কথা। ব্যক্তিটি ট্রাকের চালক আর ট্রাকের একজন মালিক আছেন। যিনি খুব সাধ করে একজন চিত্রকর ডেকে ট্রাকের ডিজেল বা পেট্রল ট্যাংকারে লেখালেন: ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’। মোক্ষম এক শ্লোগান। ড্রাইভার ট্রাক চালান, মালিক নন। কিন্তু যখন এই বাক্যটির সঙ্গে তার সংঘাত হলো, সে মৃদু স্বরে এই অর্থহীন বাক্যটির বিষয়ে প্রতিবাদ করে বসল। কেননা মালিক বা ট্রাক কখনোই জ্বলছে না। বাহ্যিকভাবে মালিকের কোনো জ্বালাও-পোড়াও দুঃখবোধ নেই। বস্তুত মানুষ খেয়ালিও বটে। যখন তার যে শখ চাপে তখন সে তাই করে। এ নিয়ে যুক্তির কষ্টিপাথরে সবকিছুর যাঁচাই করলে সৃষ্টির কর্ম বলে কিছু থাকে না। কিন্তু তাই বলে ভণ্ডামি?

জন্ম থেকে জ্বলছি। বাক্যটি একজনের রুচিবোধ ও ব্যক্তি মানস প্রকাশ করছে। তিনি কোন ধরনের ব্যক্তি, বড় বংশের না ছোট বংশের? বংশ গোত্র ইত্যাদি মানুষের তৈরি। আচরণ আর স্বভাব হলো ভদ্রতার প্রকাশ। সমাজে অনেক লোক দেখা যায়, যারা নিষ্কম্প কণ্ঠে মিথ্যে বলছে। সম্পদ তৈরি করছে। মিষ্টি কথার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর দশজনকে ভোগাচ্ছে। এদের সামাজিক অবস্থান ও ক্ষমতা অনেক উঁচুতে-অনেক অপ্রতিরোধ্য। সাধারণ মানুষের স্পর্শ লাগলে এরা নাশিকা কুঞ্চিত করেন। কিন্তু সমাজ হতে বিশেষ সুবিধা নেয়ার জন্য সাধারণ মানুষের রাজনীতি করতে ছাড়েন না। এরা সমাজে বিশেষ মনোযোগ এবং আসন পাওয়ার জন্য সেই গরিব মানুষের বুকে বুক মেলাতে দ্বিধা করেন না। তাহলে এদের কোথায় ভদ্রতা-কোথায় এদের বংশ পরিচয়?

যদি ভদ্রতা না থাকে, না থাকে বংশ পরিচয় তাহলে সে কি মানুষ? কথাটির মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতার বিতর্ক আছে। ‘জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো’ এ কথাও যদি বলা হয়, তাহলে কর্মের ফলাফল বা পরিণতির একটি ব্যাপার স্বীকার করে নেয়া হয়। গীতা বলে, কর্ম করাই ধর্ম। ফলাফল বা পরিণতি দেখা নয়, কেননা তা ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত। কর্মের সঙ্গে বংশ মর্যাদার একটি সম্পর্ক আছে, এমন সংস্কার আমাদের সমাজে প্রচলিত। ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে। উঁচু নিচু শ্রেণির বিভেদ নেই। কিন্তু বাস্তবে কি তা দেখা যায়? জাত প্রথা মুসলমানের মধ্যে নেই, কিন্তু বাঙালি সমাজের মধ্যে এ রকম সংস্কার আছে। এর অর্থ এই নয় যে, বাঙালিরা মুসলমান হতে পারে না।

আমাদের সমাজ কাঠামোয় আশরাফ এবং আতরাফ বলে দুটো শ্রেণির অস্তিত্বের কথা সমাজবিজ্ঞানীগণ বলে থাকেন। জানা যায়, এদের ছায়া মাড়ানো গরিবদের জন্য অমার্জনীয় অপরাধ। এদের মধ্যে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তার বন্ধন, সম্পর্ক স্থাপন যাবতীয় সকল কিছু স্তরে স্তরে না মিললে সম্ভব হয় না। অথচ এদের মধ্যেও ভদ্রতার প্রকাশ প্রায় থাকে না। এক গ্রামের জনৈক ব্যক্তির কথা শুনেছি, যিনি উঁচু জাতের ‘ভদ্রলোক’। মানুষকে দুর্যোগ বা প্রয়োজনের সময় ঋণ হিসাবে টাকা ধান ইত্যাদি দিয়ে থাকেন। পরিশোধ পদ্ধতিতে ফেরৎ নেন তিনগুণ। তিনি ছেলের বিয়েতে উপহারের প্রাপ্তি বেশি হবে প্রত্যাশা করে প্রচণ্ডরকম খরচ করেন। অন্যকে উপহার দেন অনেক টাকা খরচ করে। কিন্তু মানুষকে সাহায্য করতে নারাজ। সেই অমায়িক লোকটির ভদ্রতা বা বংশ পরিচয় কোনো নিক্তিতে তুলে মূল্যায়ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বিচিত্র পৃথিবীতে বিচিত্র সব মানুষ। তাদের আচার-আচরণ, বিশ্বাস, মূল্যবোধ সব ভিন্ন ভিন্ন এবং অত্যন্ত বিচিত্র। রাস্তায় পারাপারের অপেক্ষায় একজন অন্ধকে হাত ধরে এগিয়ে দেয়া বিনম্রতার প্রতীক বা ভদ্রতার পরিচয়। কিন্তু আজকাল কয়জনে এই সেবা করেন? সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক তাই ভেঙে যেতে থাকে।

আমরা প্রতিদিনই জীবনযাত্রার জটিল ও দ্রুততম পথ পরিক্রমায় কোনো না কোনো অবস্থার মধ্যে পড়ি। সেসময় ক’জনে নিজ স্বার্থ, নিজ সুবিধা ত্যাগ করি? বাসে দুর্বল, অক্ষম, বৃদ্ধ বা মহিলা যাত্রী দেখে নিজের সীট ছেড়ে বসার সুযোগ করে দিয়েছি? আমরা মুখে প্রায়শ বলি: প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। সে কারণে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়া মানবতা। আজ কেউ সে রকমভাবে বাস বা ট্রেনে নিজের সীট ছেড়ে অন্যকে বসার সুযোগ করে দিতে আগ্রহী হলে অন্যেরা বলে বসে, ব্যাটা ভাব নিচ্ছে। মহানুভবতা দেখাচ্ছে। মহৎ সাজার চেষ্টা করছে কিংবা লোকটি বোকা ও সেকেলে গর্ধভ। বস্তুত আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতা এত প্রকট যে, নিজে বাঁচলে বাপের নাম। তাই নাম গোত্রহীন ব্যক্তিও দু পয়সার মালিক হয়ে নামের শুরুতে শেখ বা সৈয়দ অথবা শেষে চৌধুরি বা তালুকদার বসাতে উদগ্রীব। বড় বংশের সঙ্গে নিজের নাম প্রচারে অদ্ভুত আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলে এরা। আবার তারা বড় বংশের বা এমন কোন্ কাজ করেছে যে, সে নামে অভিহিত করতে হবে তার কোনো কারণও নেই।

‘জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো’ এই প্রবচনও একজনকে ভদ্র হিসেবে দাঁড় করাতে পারে না। মানুষের কর্মের মাধ্যমে পরিচিতি নেয়া অনেকটা একপেশে। কেননা কোন্ নীতিতে আবর্তিত হচ্ছে সেটি দেখতে হবে। দুঃখ, সুখ, আনন্দ বা ন্যায়ের মতো এই বিষয় বিমূর্ত। একেক সমাজে একেক সময়ে একেকরকম। মানুষের কর্ম গরু-ছাগলের মতো নয় বলে মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব। এই শ্রেষ্ঠত্ব তার জীবনে যে আদর্শ, যে নীতিকে প্রতিফলিত করে সেটি তার পরিচয় ব্যক্ত করে। ভদ্রতা নৈতিকতা রক্ষার একটি আচরণ, ব্যবহারিক কর্ম। প্রগতিশীল চেতনায় আধুনিকায়নের সঙ্গে নীতি বা সামাজিক মূল্যবোধের অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করাকে নৈতিকতা বলা যেতে পারে। সামাজিক মূল্যবোধ ন্যায়বিচারের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত জীবন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায়। এদিকে যার লক্ষ্য নেই, প্রত্যয় নেই, তিনি গরিবের ঘরে জন্ম নিক অথবা ধনীর ঘরে, সৈয়দ কিংবা চৌধুরি পরিবারের পরিচয় দেয়ার জন্য বংশের ইতিহাস খোঁজা আত্মরম্ভিতা ছাড়া কিছু নয়।

‘ভদ্রতা বংশের পরিচয়’ উক্তিটি তাহলে কী বোঝাতে পারে? জবাবের জন্য আমাদের এর ভেতরে-এর গভীরে যেতে হবে। ভদ্রতা একটি শিক্ষা। পিতা মাতার রক্তের গুণে বয়ে আসা কোনো গুণ নয়। রাক্ষসের ঘরে প্রহ্লাদ জন্ম নিয়েছিল আর মাবিয়ার ঘরে এজিদ। সমাজে একধরনের ব্যক্তি আছে যারা পরের দুঃখের কথা বলে নিজের ফায়দা হাসিল করে। এদের চিনতে হবে। এই সনাক্তকরণের জন্য আত্মানুসন্ধান চাই। আমি কতটুকু মানুষ, এই প্রশ্নে নিজের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে। কেউ কেউ নাটক লেখেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন; দরিদ্র অসহায় মানুষের কাহিনী তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ট্রফি, মেডেল, নগদ অর্থ, প্রত্যয়নপত্র, কতকিছু পেয়ে থাকেন। এসব জিনিস তাদের ড্রইংরুমে শোভা বর্ধন করে। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে পত্রিকায় সাক্ষাতকার দেন। ফটো সাংবাদিক ছবি তোলেন। সেই ছবি পত্রিকার প্রথম বা বিশেষ পাতায় বেশ গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। তারা পুরস্কারের টাকা দিয়ে দামি দামি শৌখিন জিনিসপত্র কেনেন। নিজের ও পরিবারের জীবনকে আরও সুন্দর ও সাচ্ছন্দ্যময় করে তোলেন। আর নির্মাণ বা সৃষ্টিতে যে উপকরণ তিনি ব্যবহার করেছেন, যাদের কথা তুলে এনেছেন সেই সকল মানুষের মলিন চেহারা ভুলে যান। এরা কত না দরদী, কত ভদ্র আর উঁচু স্তরের মানুষ! জনৈক বিদগ্ধ ব্যক্তির মুখে শুনেছি, ‘যারা মানুষের অসহায়ত্ব, দুঃখ, দারিদ্র, ক্লেশকে পুঁজি করে নিজের নাম আর অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবহার করেন তাদের চেহারা সাম্রাজ্যবাদীদের মতো জঘন্য কুৎসিত।’

আজকের জামানায় ‘ওয়ার্ক লাইক হর্স এন্ড লিভ লাইক হারমিট’ কেউ মানে না। তবু মানুষের হৃদয়ে একটি নীতি থাক, যা সত্য ও সুন্দরের। অন্যের কল্যাণে উৎসর্গীকৃত প্রাণের মতো। সেই আদর্শ সেই ভদ্র। নিজের চোখে যাতে কেউ নিজে খাটো না হয়, সেজন্য তার অনুসরণ বাঞ্ছনীয়। কোনোমতেই আত্মকেন্দ্রিকতা নয়। যদি বংশ পরিচয় দেয়ার মতো কিছু থাকে, তাহলে এ কথা মনে রেখেই ভদ্রতা কিংবা বংশ পরিচয়ের উক্তি উৎকীর্ণ করা ভালো। কেননা হযরত আলী (রাঃ)-র সেই উক্তি আমাদের জানা, ‘পিতা সন্তানকে যে শ্রেষ্ঠ জিনিসটি দান করেন তা হলো ভদ্রতা।’ তাই নেয়ার মতো সন্তান না থাকলে বংশ মর্যাদার কিছু নেই। আমাদের নিজের মধ্যে সে ক্ষমতার সন্ধান করতে হবে। অর্জন করতে হবে।