ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

ছবিতে একটা অপেন চ্যালেঞ্জের বিজ্ঞাপন দেখছেন। দিনাজপুর শহরের রাস্তায় রাস্তায় বিদ্যুৎ, টেলিফোন, গাছ বা যেকোনো ভবনের দেয়ালে অপেন চ্যালেঞ্জের অত্যন্ত নোংরা ভাষায় লিখিত ও মুদ্রিত এই আহ্বানের বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড খুব সহজে চোখে পড়ে। এখন শহরের পথ ছেড়ে গ্রামের পথে যান, দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁ, দিনাজপুর-বিরামপুর, দিনাজপুর-পার্বতীপুর সড়কগুলোর ধারে ধারে বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছে পেরেক দিয়ে আটকিয়ে দেয়া হয়েছে এসব স্থায়ি বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড। একটি গাছে দুটি কিংবা ততোধিক বিলবোর্ড লাগানো আছে। শুধু গাছে নয়, জনাকীর্ণ এলাকা হাটবাজার, রেলস্টেশন এমন কি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার আশেপাশের গাছ ও দেয়ালে শোভিত হচ্ছে এসব বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড। এগুলো স্ক্রিন প্রিন্টেড টিন প্লেট, ফাইবার ব্যানার এবং পোস্টার পেপারে ছাপানো বিজ্ঞাপন। সাইজে কোনো কোনোটি এক ফুট বাই দুই ফুট এবং সর্বোচ্চ আড়াই ফুট বাই সাড়ে তিন ফুট। লাগানো হয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে। শহরের তুলনায় গ্রামে এসবের ছড়াছড়ি বেশি। এতক্ষণে বুঝে গেছেন, এসব বিজ্ঞাপনের ভাষা ও বক্তব্য কী।

এগুলো ‘মাদ্রাজি হার্বাল, কোলকাতা হার্বাল, আয়ুর্বেদিয় বা কবিরাজি এবং হোমিও চিকিৎসা’ নামে অপচিকিৎসার সরগরম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের হেডগুলো অন্তত চার থেকে ছয় ইঞ্চি উচ্চতার বোল্ড টাইপে মুদ্রিত আর তার ভাষাও জঘন্য। উচ্চারণ করতে ঘৃণার উদ্রেগ হয় তারপরও পাঠকদের জানানোর জন্য কয়েকটি হেড উল্লেখিত হলো যেমন: অপেন চ্যালেঞ্জ ১/৪ ঘন্টার মধ্যে যৌন শিথিলতা দূর করা হয়, লুপ্ত যৌবন পুনরুদ্ধার, পুরুষের শক্তি, যৌন দুর্বলতা-টাইগার ম্যাসেজ ওয়েল ইত্যাদি। এসব বিজ্ঞাপনের নিচে যোগাযোগের জন্য বেশ বড় ফন্টে মোবাইল নম্বর দেয়া আছে।

বিগত বছরগুলোয় এরকম প্রতিষ্ঠানগুলো কাগজে ছাপানো পুস্তিকার মতো বিজ্ঞাপন রাস্তা বাজার ও অন্যান্য জনাকীর্ণ এলাকায় হাতে হাতে দিয়ে প্রচারণা চালাত। সেগুলো ছিল সাদাকালো মুদ্রণের আর সাম্প্রতিককালে সেসব রঙিণ হয়ে গেছে। এখন তার পাশাপাশি সারাদেশে কোটি সংখ্যক বাহারি ও চাটুকারি বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড শুধু গাছের জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করেনি আমাদের নৈতিকতা, সম্ভ্রম, সামাজিক পরিবেশ বিনষ্ট করে চলেছে। তাই নয়, দেশে নারী নির্যাতন ও যৌন সন্ত্রাসের নেপথ্য কারণ হিসেবেও এসব কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপন ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে।

মানুষের মন বিচিত্র। আর বিজ্ঞাপনের ভাষা ও বক্তব্য অন্তত এই দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিথ্যা ও বানোয়াট। গ্রাহককে চাটুকরি ও মিথ্যা কথায় প্রলুব্ধ করে ভুলিয়ে তার পকেট কাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। যার কারণে, বিদগ্ধজনেরা বলেন, এদেশের বিজ্ঞাপনে যদি বলা হয়, গরু গাছে চড়তে পারে তাহলে চোখ কপালে তুলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাধারণ ও অসচেতন মানুষেরা বাগাড়ম্বরপূর্ণ বিজ্ঞাপনের চতুরতা ঠিক তেমনভাবে ধরতে পারেন না। তারা খুব সহজেই প্রলুব্ধ হয়ে যান। অন্যদিকে সঠিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব, আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের ব্যক্তিরা এসব বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে রোগমুক্তির জন্য অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে অনেক কষ্টের টাকা অপচিকিৎসকেরা লুটে নিয়ে যায়।

এ কথা তো সত্য যে, বাঙালিরা সবাই চিকিৎসক। কোনো ব্যক্তি কারু কাছে কোনো এক অসুখের কথা বললেই সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন কতরকমের পরামর্শ দিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে প্রায় প্রত্যেকের মাঝে এক ধরনের মানসিকতা আছে যে, কোনো একটা অসুস্থতার কথা শুনলেই ভেবে বসেন যে, ওই অসুখটা তারও আছে। এই প্রবণতা অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অসচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি। আর এরই সুযোগে অপচিকিৎসকেরা নানান মায়াজাল বিস্তারকারী ও নোংরা কথার ফাঁদ ফেলে ব্যবসা করে চলেছে। এসব অপচিকিৎসা দূর করার জন্য সরকারের নানান বিধিবিধান আছে। কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ আমরা দেখি না। যার পরিণতিতে অপচিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের লোকঠকানো ব্যবসা চুটিয়ে করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি এদের দাপট এত বেশি হয়েছে যে, ইলেক্ট্রনিক মেডিয়াতেও তাদের সরগরম প্রচারণা দেখা যায়। বিশেষ করে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর কোনো কোনোটায় রীতিমত অনুষ্ঠান করে নানান অপচিকিৎসা ও কুসংস্কারের প্রদর্শন ও চাষ করা হচ্ছে। এদের প্রচারিত দৃশ্যাবলী এবং কথাবার্তা ক্ষেত্রবিশেষে যথেষ্ট আপত্তিজনক ও নোংরা। শুধু ভারতীয় চ্যানেল নয়, দেশীয় কোনো কোনো চ্যানেল আর্থিক সুবিধা লাভের অজুহাতে এরকম অপচিকিৎসার নোংরা বিজ্ঞাপন ঘন্টার পর ঘন্টা প্রচার করে চলেছে। আরও দেখা যাচ্ছে যে, ডিশলাইন বা ক্যাবল ব্যবসায়িরা তাদের নিজস্ব সিডি লাইন তথা চ্যানেলের মাধ্যমে পাইরেটেড ছায়াছবি, নোংরা সঙ্গীত ভিডিও প্রদর্শনের সাথে সাথে অপচিকিৎসার অত্যন্ত অশালীন ও কদর্য বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। এদের সিডি লাইন বা চ্যানেলের টিভি পর্দার ভিউএবল ফ্রেমের উপর-নিচ স্ক্রলিং করে প্রচার করা হচ্ছে অত্যন্ত আপত্তিজনক কথাবার্তা। ক্যাবল ব্যবসায়িরা কোন্‌ লাইসেন্সের শক্তিতে নিজস্ব টিভি চ্যানেল বা কার্যক্রম প্রচার করতে পারে আমরা তা বুঝে উঠতে পারি না। তারপর সেই চ্যানেলে এধরনের অপচিকিৎসার নোংরা বিজ্ঞাপন প্রচার কার্যে কিভাবে প্রশাসন মৌন সম্মতি দিয়ে চলেছে তাও বোধগম্য নয়। অভিযোগ আছে যে, প্রশাসন ম্যানেজ করেই না কি এসব চ্যানেল চালানো হচ্ছে।

ফিরে আসি, চিকিৎসার নামে বিভিন্ন অপচিকিৎসার অশালীন বিজ্ঞাপনের কথায়। শহর ও গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যেসকল গাছ রয়েছে তার মালিক সরকারের সড়ক ও জনপথ, বনবিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। সার্বিকভাবে জনগণই এসব গাছের মালিক। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের ফায়দার জন্য এসব গাছের বুকের মধ্যে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন তারকাটা দিয়ে গেঁথে দিতে পারে না। এতে যে পরিবেশের কিরূপ ক্ষতি হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। প্রসঙ্গত বলা যায়, শুধু অপচিকিৎসার নোংরা বিজ্ঞাপন নয়, প্রমুখ ডাক্তারদের, কোচিং সেন্টারের, বাণিজ্যিক সংস্থার প্রচারণা বিজ্ঞাপনও গাছের জীবনকে ‘অতিষ্ঠ’ করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিৎ হবে বিজ্ঞাপন প্রচারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আমরা মাঝে মাঝে দেখি যে, রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে নানান বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড অপসারণ করা হচ্ছে। এটি ভালো উদ্যোগ, কেননা আমাদের প্রকৃতি ও জনসংখ্যাধিক্যের দেশে প্রচারকার্যে ব্যবহৃত বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড জানমালের জন্য হুমকি হয়েও আছে। কার মাথায় কখন পড়বে ও জীবনহানি ঘটাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড স্থাপনের পূর্বেই সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। জেলা শহরগুলোয় তেমন কোনো ‘বালাই’ নেই। যার যেমন মন চাইল তেমন বিলবোর্ড যেখানে সেখানে বসিয়ে দিলো। এসব দেখা বা নিয়ন্ত্রণের সরকারি কোনো দফতর আছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে সরকারকেও ভাবতে হবে যে, শুধুমাত্র ঢাকা বা বড় বড় শহরই দেশ নয়; সমগ্র সীমারেখা মিলিয়েই দেশ। শাসনকার্যের সুষ্ঠুতা নিরূপিত হয় সমগ্র দেশে একই রূপ অবস্থা আছে কি না তার উপর।

বস্তুত সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অবহেলা, নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্নীতির কারণে যেখানে সেখানে নোংরা বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। এদের বিজ্ঞাপনের আধিক্য দেখে কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, এদেশবাসীর প্রধান ও জাতীয় সমস্যাই হচ্ছে যৌনতা অথবা তারা যৌনকাতরতায় ভোগে। ইদানীং কোনো কোনো এনজিও জনসচেতনতার অজুহাতে প্রকাশ্যে যা বলা উচিৎ নয় এমন শব্দের বহুল ব্যবহার করে বিশাল বিশাল বিজ্ঞাপন বিলবোর্ড রাস্তার ধারে, হাটে-বাজারে স্থাপন করেছে। এতে জনসচেতনতা কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে তা বলা মুস্কিল, তবে কোনো কোনো অভিভাবককে তাদের শিশু সন্তানদের ‘অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক কী’ কিংবা ‘কনডম কী’ বোঝাতে যে লজ্জায় পড়তে হচ্ছে না তা নয়। আমাদের সমাজ নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাস নয় কিংবা থাইল্যান্ডও নয় যে এত ‘উদারতা’ দেখিয়ে আধুনিকতা খুঁজতে হবে।

কথা বলছিলাম, অপচিকিৎসার নানান নোংরা বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপন বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি বিষয়ে। আমরা প্রশাসনের নিকট জানতে চাই, কোন্‌ আইন বা শক্তির বলে অত্যন্ত নোংরা ও কদর্য ভাষায় লিখিত, মুদ্রিত ও বর্ণিল বিজ্ঞাপনগুলো গাছে গাছে দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হলো? আর কী করেই বা ক্যাবল ব্যবসায়ীরা এমন বিজ্ঞাপন ইলেক্ট্রনিক মেডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করে? একটি সুস্থ সমাজের জন্য সু্‌স্থ বাতাস ও পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি এ কথা কি মনে করিয়ে দিতে হবে?