ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

‘কালের কণ্ঠ’ জন্ম থেকেই এদেশের প্রথম সারির পত্রিকা। প্রথম দিন থেকেই এদেশের লোভী জনগণ তাদের কাছে ধরাশয়ী। কেজি পৃষ্ঠার কেরামতিতে জাতি আজ মুগ্ধ। যেখানে ‘প্রথম আলো’ ৮ টাকায় ২০ কিংবা ২৪ পৃষ্ঠা, সপ্তাহে ২টি ম্যাগাজিন আর ৮ পৃষ্ঠার ক’টি ব্রডশিট দিয়ে ক্ষ্যান্ত হয়। সেখানে ‘কালের কণ্ঠ’ ৮ টাকায় ৩২ পৃষ্ঠা, সপ্তাহে ৩-৪টি তুলনামূলক বড়ধরনের ম্যাগাজিন দেয়। এছাড়া সৌজন্যমূলক ৩ সংখ্যায় ৭২ পৃষ্ঠার বিশাল অ্যামাউন্ট। জনগন আর যাবে কই! হুমড়ি খেয়ে পড়ল পত্রিকাটির ওপর। ক’দিনে তারা দখল করল প্রথম সারির পত্রিকার মর্যাদা। অস্বীকারের জো নেই- ঝকঝকে ছবি, উজ্জ্বল শুভ্র পৃষ্ঠা ও ‘খারাপ না’- মেকআপও সফলতার একটি কারণ।

বিগ বাজেটের আরেকটি পত্রিকা ‘সকালের খবর’। এটা কিন্তু পাঠকের কাছে কোনো পাত্তাই পায়নি। বাধ্য হয়ে পত্রিকাটি এখন দাম অনেক কমিয়ে দিয়েছে। ‘আওয়ামী মিডিয়া বর্ধিতকরণ’ প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনা-কাঞ্চিতে আরও যেসব পত্রিকা কেবল শিশুকাল অতিবাহিত করছে­, তাদের কথা এখানে উল্লেখ করলাম না। ব্যতিক্রম শুধু ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’। সচেতন সকলেই জানেন, এটা ‘কালের কণ্ঠ’-এর সতীর্থ। এটাতে কেজি পৃষ্ঠার কেরামতি নাই সত্য, কিন্তু কম টাকায় বেশি পাওয়ার লোভ আছে। তাই এটাও পাঠক বেশ খেয়েছে, খাচ্ছে।

যুগান্তর, সমকাল, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, ইনকিলাব- প্রথম সারির এই পত্রিকাগুলো কোনো ‘ম্যাজিক’ বা ‘কেরামতি’ দেখাতে না পারলেও ৮ টাকায় ২০ বা ২৪ পৃষ্ঠা পাঠককে উপহার দেয়। এদেরকে তাই ‘প্রথম আলোর’ অনুগামী বলা যায়। ‘নয়া দিগন্ত’ ৭ টাকায় ১৬ পৃষ্ঠা দিলেও দাম বাড়িয়ে সেটা ৮ টাকা করা হয়েছে। পৃষ্ঠা বাড়েনি। সবচেয়ে বেশি টাকার পত্রিকার নাম হচ্ছে ‘আমার দেশ’। ৮ টাকায় ১৬ পৃষ্ঠা ছিল। গত ডিসেম্বর থেকে পত্রিকাটির দাম আরও ২ টাকা বেড়েছে। ১০ টাকায় এখন ১৬ পৃষ্ঠা। টাকার সঙ্গে পৃষ্ঠার কত নির্মল গড়মিল!

অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে- ৮ টাকায় ৩২ পৃষ্ঠা দিয়ে ‘কালের কণ্ঠ’ প্রথম সারির মর্যাদা পেয়েছে। আর ‘আমার দেশ’ ১০ টাকায় ১৬ পৃষ্ঠা দিয়েও প্রথম সারির পদমর্যাদা লাভ করেছে। আরও অবাক হতে হয় একারণে যে, শিক্ষিত ও অধিকাংশ সচেতন মানুষও ‘আমার দেশ’-এর পাঠক। ‘আমার দেশ’-এর অনলাইন পাঠক সংখ্যা এর প্রমাণ বহন করে। বস্তুত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পত্রিকাগুলোর অনলাইন পাঠক সংখ্যা দেখেই অনুমান করা যায়, সত্যিকার শিক্ষিত সচেতন ও বোদ্ধা পাঠকগণ কোন পত্রিকায় বেশি । এটা বেশ কয়েকটি কারণের উপর নির্ভরশীল। প্রথমত, কম্পিউটারে ব্রাউজিং করার স্বচ্ছলতা এদেশের খুব কম মানুষের আছে। দ্বিতীয়ত, মোবাইলে পত্রিকা পড়ে, এমন পাঠক সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। তৃতীয়ত, স্বচ্ছলতা যাদের আছে, তাদের অনেকেই অনুন্নত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ও শিক্ষার অভাবে ব্রাউজিং এর কথা মাথায়ও আনে না। চতুর্থত, নিয়মিত কিংবা অনেক বেশি ব্রাউজিং যারা করে- ফেসবুক, টুইটার কিংবা এই পর্ণোগ্রাফির যুগে তাদের মাঝেও পত্রিকার পাঠক হাতে গোনা কয়েক জন মাত্র। আর অবশ্যই এরা খুব সচেতন, বুদ্ধিমান, বোদ্ধা ও সত্যিকার শিক্ষিত। উল্লেখ্য, দৈনিক হিট করা হিসেবে দুই বছর যাবত ‘আমার দেশ’-এর পাঠক সংখ্যার কাছাকাছিও কেউ ঘেঁষতে পারেনি। প্রিন্ট সংস্করণ প্রচারেও ‘আমার দেশ’ প্রথম পাঁচ-এর একটি। উপরন্তু পৃষ্ঠা ও অর্থের এই বিশাল পার্থক্য এবং যোজন যোজন দূরত্ব সত্ত্বেও প্রথম পাঁচ-এর সঙ্গে ‘আমার দেশ’ তুমুল এগিয়ে চলছে। তেমন বিভাজন তৈরি হয়নি। বরং তীব্র প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে।

লক্ষ্য করলুম, ‘আমার দেশ’ ছাড়া প্রায় সবগুলো পত্রিকাই পৃষ্ঠা ও অর্থের মাঝে বেশ সমন্বয় বজায় রেখেছে। বলতে দ্বিধা করছি না- এটা তাদের পাঠকপ্রিয়তার অন্যতম একটি বিশেষ কারণ। ‘কালের কণ্ঠ’ ও ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ তো পাঠককে খুব দিয়েছে। তাই পাঠক এদেরকে লুফে নিতেও দেরি করেনি। স্বতন্ত্র অবস্থান শুধু দৈনিক ‘আমার দেশ’-এর। নিষ্ঠুর পাষাণের মতো পৃষ্ঠা ও অর্থের মাঝে বিশাল ফারাক রেখেছে।

তবুও এর পাঠকপ্রিয়তা তুলনামূলক অনেক বেশি। অনলাইনে সেরা, প্রিন্ট সংস্করণেও সেরাদের অন্যতম।

স্বভাবতই খটকা লাগে- স্বল্প খরচে বেশি পাওয়া এবং দারুণ মেকআপ এর কারণে পাঠকের বড় একটা অংশ ‘প্রথম আলো’, ‘কালের কণ্ঠ’ কিংবা অন্যান্য পত্রিকার ভক্ত হয়েছে। কিন্তু ‘আমার দেশ’-এর মতো নিষ্ঠুর পত্রিকার প্রতি পাঠকের এত আগ্রহ বা আসক্তির কারণ কি!

খুব উঁচু গলায় বলতে চাই, মাহমুদুর রহমান কিংবা পত্রিকাটির সততা, স্বাধীনচেতা মনোভাব, সংগ্রামী চেতনা, তুমুল আত্মবিশ্বাস, জুলুম-জালিমকে উপেক্ষা করার মতো মজবুত মনোবল- সর্বোপরি দেশ ধর্ম জাতি কিংবা সমাজের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ মুষ্টিবদ্ধ দৃঢ় অবস্থান- পত্রিকাটির সফলতার নেপথ্য কারণ।

সুতরাং ‘আমার দেশ’ আর অন্যান্য পত্রিকার পাঠক কখনও এক হতে পারে না। কেননা ওদের কেউ কেউ হয়তো বেশি পৃষ্ঠা লাভের আশায় পত্রিকা পড়ে। সুন্দর মেকআপ-গেটআপ দেখে পত্রিকা কেনে। কিন্তু ‘আমার দেশ’-এর পাঠকের কাছে কেবল নীতিগত আদর্শই মুখ্য। জনতার একান্ত কিছু নিউজ এবং পত্রিকার পাতায় নিজেদের মনের কথার প্রতিফলন দেখতেই এরা পত্রিকা পড়ে। সেজন্যে কারোই বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় যে, ১০ টাকা কেন; ২০ টাকায় ১৬ পৃষ্ঠা দিলেও পাঠকের কেউ এর থেকে বিমুখ হবে না। আসলে এখনও যারা এই সমাজে সত্য বলতে গর্ববোধ করে, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে, বাংলাদেশের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আশা রাখে- এসব পাঠক এ পত্রিকাতেই বেশি। অতীব গুরুত্বপূর্ণ এসবের কাছে টাকা কোন ছার!

প্রতিকূলতা এবং শত সংগ্রামের মাঝে ‘আমার দেশ’ নামক যে পত্রিকাটি এগিয়ে চলছে, পরোক্ষ অর্থে পাঠককে ‘তেমন কিছু’ না দিয়েও যেভাবে শুধু আদর্শ দানে পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে, পাঠকের মনে জায়গা করে নিচ্ছে- ইতিহাসের পাতায় তার মর্যাদা তো একটু ভিন্নভাবেই বিচার্য হবে। পত্রিকাটিকে তাই কালোত্তীর্ণ বলতে না পারাটাও বিবেকের সংকীর্ণতা। অন্তত আমি আর না বলে পারছি না: ‘আমার দেশ’ সত্যি তুমি কালজয়ী এক মহান পত্রিকা।

দ্রষ্টব্য : লেখাটি আমার অন্যান্য ব্লগে প্রকাশিত