ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমরা সবাই কম বেশী অবগত যে, তিন মাস আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট শেখ হাসিনার সরকারকে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়ে সরকার পতনের এক দফার কঠোর কর্মসূচি দিয়ে ১০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলো। সেই ঘোষণার অংশ হিশেবেই ১১ জুনের ১৮ দলীয় গণসমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া যে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করলো তাকে অনেকেই `পাহাড়ের মূষিক প্রসব’-এর সাথে তুলনা করে চায়ের কাপে আলোচনার ঝড় তোলছেন। ১১ জুনের ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতা কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিলো। তারা হয়তো ভেবেছিল আল্টিমেটামে ভীত হয়ে সরকার তাদের সব দাবী মেনে নেবে। কিন্তু তাদের ঘোষিত এ কর্মসূচি সরকারের মধ্যে আগাগোড়াই ডেমকেয়ার ভাব লক্ষ্য করা গেছে। এ প্রেক্ষিতে ১১ জুনের পর বিএনপি নের্তৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট যে আরো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করবে তা নিয়ে দেশের মানুষ ভীষণ শঙ্কিত ছিল। মানুষের এ ভাবনার পেছনে কারণও ছিলো। কেননা এ কর্মসূচি নিয়ে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের এমন প্রচারণা ছিল যে, ১০ তারিখের মধ্যে তাদের সব দাবী-দাওয়া মেনে পদত্যাগ না করলে ১১ জুনের মহাসমাবেশ থেকে কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে গণআন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টি করবে যাতে সরকার পালাবার পথ পাবে না। এ কর্মসূচি ঘোষণার পর ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা এতটাই চাঙ্গা হয়ে ওঠেছিল যে ১১ জুনের গণসমাবেশে সামনের দিকে বসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে শক্তি প্রদর্শনের কয়েক দফা মহড়া হয়ে যায়।

কিন্তু এত ঢাকডোল পিটিয়ে গণসমাবেশ করে `গরম ঘোষণা দিয়ে যে নরম কর্মসূচি’ ঘোষণা করলেন এতে ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীরা খুশি তো দূরে থাক চরম হতাশ হয়েছেন। কেননা আগামী তিন মাসে কয়েকটি বিক্ষোভ মিছিল ও জনসমাবেশ ছাড়া তেমন কোনো কঠোর কর্মসূচি নেই। যারা আশায় ছিল আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের একটা এসপারওসপার হয়ে যাবে এমন নরম কর্মসূচি দেখে তারা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। তাই এ নিয়ে ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে `গরম ঘোষণার নরম কর্মসূচি ‘নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

কেউ কেউ বলছেন, সরকারের দমননীতির কারণেই কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ থেকে পিছু হঠাৎ হয়েছে তাদের জোট নেত্রীকে। কেউ বলছেন সীমাহীন সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা। তাদের মতে এ সংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই সরকারের বিরুদ্ধে এতসব ইস্যু পেয়েও কাজে লাগানো যায়নি। হরতালের ডাক দিয়ে কিছু সংখ্যক মধ্যমসারির নেতা পল্টনের দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে
পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির চোর টম এন্ড জেরি খেলায় মেতে ওঠা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। এসব কারণে ফ্লপ হচ্ছে আন্দোলনের সব কর্মসূচি। আবার দলের মধ্যে যারা মডারেট বলে পরিচিত তাদের ধারণা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সরসরি বিএনপির অবস্থান গ্রহণ করার কারণে কোন দল করেনা এমন প্রগতিশীল যুবসমাজ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলেই আন্দোলনে জন সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারছেনা বিএনপি। আবার বিএনপির ভেতর গোপন ক্রিয়াশীল একটি গ্রুপ তারেক-কোকোর দুর্নীতি, নির্বাসনে তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের খবরাখবর বিএনপিকে অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। সর্বোপরি বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টির কারণেও আন্দোলন বেগবান করতে পারছেনা ১৮ দলীয় জোট। আবার দলের নীতিনির্ধারকদের কারো কারো মতে বিভিন্ন দাতাদেশ ও প্রভাবশালী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দূতিয়ালি ও চাপে এ ত্রিশঙ্কু অবস্থা।

এ অবস্থায় আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের মতামত হচ্ছে- দলের এই সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে যেখানে আন্দোলনই জমানো যাচ্ছেনা সেখানে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সৃষ্টি করাতো সুদূরপরাহত। আমরা মনে করি এ সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ আছে আর মাত্র ১৮ মাস। সুতরাং কাজেই এ সময়ে আন্দোলন আন্দোলন খেলায় শক্তিক্ষয় না করে জনগণকে কিভাবে আস্থায় নিয়ে আগামীতে ক্ষমতায় ফেরার ব্যবস্থা করা যায় তার চেষ্টা করা। বিশ্ব রাজনীতিতে এটা আজ স্পষ্ট যে নির্বাচন ও জনগণকে আস্থায় নেয়া ছাড়া অন্য কোনো শর্টকাট পথে আর কেউ কোনদিন ক্ষমতায় যেতে পারবেনা । তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকাররের বিষয়টি যেখানে উচ্চআদালতে মীমাংসিত সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জেদ ধরে না থেকে কিভাবে আগামী নির্বাচনকে অর্থবহ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা যায় তা সরকারের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ফয়সালা করতে হবে। এটাই এখন একমাত্র পথ।