ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

বেশ কিছুদিন ধরেই নতুন করে আবারো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় না দেয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের মুখচেনা দুএকটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী মিয়ানমারে রাখাইনদের সাথে জাতিগত দাঙ্গায় আক্রান্ত সে দেশের রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশের বার্মা সীমান্ত খুলে না দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগসহ নানাবিধ অভিযোগ তোলে সরকারের বিরুদ্ধে এক হীন রাজনৈতিক খেলায় মেতে ওঠেছে। আমাদের দেশেরও কিছু মানুষ বোঝে না বোঝে ওই মুখচেনা গোষ্ঠীর সাথে একজোট হয়ে সরকারের সমালোচনায় সামিল হয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সমালোচনা মন্তব্র্য আবার বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায় ব্লগ লিখে সরকারের দোষারোপ করছে; যা অবশ্যই অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্খিত ও নিন্দনীয় ঘটনা। দেশপ্রেমিক একজন নাগরিক হয়ে এসব দেখে চোখ-মুখ বন্ধ করে থাকতে পারলাম না বলেই লেখার অবতারণা। কারণ দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে ১৩ নভেম্বর ২০০৯`রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা ও এর সমাধান’ এ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। সেই কলামে আমি রোহিঙ্গা শরণাথী সমস্যা এবং সমস্যার ফলে আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমরা প্রতিনিয়ত আরো কত ধরনের জটিলতা ও সমস্যার সন্মুখীন হচ্ছি তার বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলাম। কলেবর বেড়ে যাবে এ করণে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছেনা। সংক্ষিপ্ত ভাবেই আমি এখানে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করব।…।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ১৯৫৯ ও ১৯৬৭ অনুযায়ী রোহিঙ্গারা পূর্বতন বার্মা বর্তমান মায়ানমার সরকারের আক্রোশ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে সে দেশের আরাকানের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসে প্রথম আশ্রয় নিয়েছিলো ৯০ দশকের গোড়ার দিকে। ১৯৮২ সালে মায়ানমার সরকার সেই দেশের নাগরিকদের নাগরিকত্বের জন্য যে তিনটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে তাতে রোহিঙ্গাদের কোন ক্যাটাগরির নাগরিক হিশেবেই বিবেচনা করা হয়নি । মুসলিম তথা বাংলা ভাষাভাষীর কারণে তাদের বাঙালি বংশোদ্ভুত হিশেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করে। এ আন্দোলনের কারণে সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের প্রতি আরো প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে আরাকানকে রোহিঙ্গামুক্ত করার জন্য মায়ানমারের রাখাইনদের দিয়ে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টি করে আরাকানি রাখাইনদের রোহিঙ্গাদের পিছনে লেলিয়ে দেয় এবং রোহিঙ্গাদের জোর করে পুসইন করা শুরু করে। ফলে প্রাণের ভয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজার বান্দরবান সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সরকারী হিসাব মতেই সেই সময় ২ লাখ ৫১ হাজার রোহিা শরণার্থী বাংলাদেশ প্রবেশ করে। এর বাইরেও প্রায় সমানসংখ্যক শরণার্থী শিবিরের বাইরে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গোপনে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশী মানুষের সাথে রোহিঙ্গাদের চেহারা, আকৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা ও খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি অনেক সামঞ্জস্যতার কারণে এদেশের মানুষের সাথে তাদের মিশে যাওয়া সম্ভব হয়।

বহুকাল আগে থেকেই বার্মা তথা মিয়ানমারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা-বাণিজ্য, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বর্ডার ট্রেডসহ দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন সহযোগিতা চুক্তি বিদ্যমান ছিলো তাই বাংলাদেশ ও মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। এই সুযোগে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের কারণে নানাবিধ আর্ত-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি যেমনঃ চুরি-ডাকাতি, জোর করে সরকারী জমি দখল বৃক্ষ নিধন মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও রাহাজানি এবং খুনখারাবির মাধ্যমে বাংলাদেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোসহ নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এক দুঃসহ পরিস্থিতির সৃষ্ট করে। তাছাড়া বাংলাদেশের একটি চিহ্নিত মৌলবাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং সেই মৌলবাদী দলের হয়ে তাদের পার্পাস সার্ভ করতে থাকে। এই চক্রটি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরীতে সহযোগিতা করে পাসপোর্ট তৈরী করে দিচ্ছে। আর এই পাসপোর্ট নিয়ে বিভিন্ন দেশে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে ফলে বদনাম হচ্ছে বাংলাদেশের । একই সাথে আমাদের দেশের মতো একটি গরীব দেশের পক্ষে বিশাল ব্যয়ভার বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লে দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক চাপে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বিভিন্ন পর্যায়ে ২ লাখ ২৯ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিলেও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে যায়। তারা জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক একটি আইনের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে থেকে যায় । ওই আইনে বলা হয়েছে; কোনো দেশ কোনো জনগোষ্ঠীকে একবার শরণার্থীর মর্যাদা দিলে ওই নাগরিক যদি পরবর্তীকালে স্বেচ্ছায় স্বদেশে যেতে রাজি না হয়, তা হলে তাকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবেনা। রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার জেলা ও এর অধিনস্থ উপজোসমূহ বিশেষ করে টেকনাফ উখিয়া উপজেলায় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুধুমাত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাই নয়; ধর্মীয় বিভেদেরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গারা ওই অঞ্চলের বিভিন্ন মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিন এবং কওমী মাদ্রাসায় চাকুরী নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টিতে ইন্দন যোগাচ্ছে।

সুতরাং রোহিঙ্গাদের নিয়ে আগের সমস্যাই যেখানে সরকারের জন্য বহু ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে সেখানে মিয়ানমারে সম্প্রতি সৃষ্ট জাতিগত দাঙ্গায় আক্রান্ত, বিতারিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার জন্য সীমান্ত খুলে দিলে আমাদের কি অবস্থা হবে? যারা আজ মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গায় বিতারিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার জন্য সরকারকে দোষারোপ করে বক্তব্য, বিবৃতি দিচ্ছে, টিভি পর্দায় ওদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় ওরা কারা? কি ওদের রাজনৈতিক পরিচয়? আর মানবিকতা ও মানবাধিকারের কথা বলে অন্যান্য যারা সরকারকে দোষারোপ করছে তারা হয়তো বিষয়টির গভীরে প্রবেশ না করেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলছেন বাংলাদেশের ওই মুখচেনা গোষ্ঠী ও পশ্চিমাদের মতোই। এদের একদল চাচ্ছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে সরকারকে আরো সীমাহীন সমস্যায় ফেলতে, আর পশ্চিমারা চাচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখভালের উছিলায় বঙ্গোপসাগরে একবার ঘাঁটি করতে পারলে তাদের আর তাড়ায় কে !! তখন বাংলাদেশকে আবারো নব্য উপনিবেশ বানিয়ে তেল গ্যাস সম্পদসহ সব সম্পদ লুটপাটের অবাধ সুযোগ পাবে; তাই যদি তাদের ইচ্ছা না হবে তা হলে মিয়ানমারকে জাতিগত দাঙ্গা বন্দের চাপ না দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে কেন? এতেই বোঝা যায় ডাল মে কুচ কালা হায়!!!!!!!!