ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

প্রথমে গার্মেন্টস কর্মী হত্যার বায়বীয় গুজব এবং পরে বেতন বৃদ্ধির দাবীতে দেশের বৃহত্তর পোশাক শিল্প অঞ্চল আশুলিয়ায় গত সপ্তার গোড়ার দিক থেকে অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার কারণে শিল্প মালিকরা সে অঞ্চলের সকল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলের ফ্যাক্টরী মালিকরাও তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। শ্রমিক নামধারী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী শক্তির স্থানীয় এজেন্টদের সহিংসতার কারণে আজ কয়েকদিন ধরে পোশাকশিল্প বন্ধ থাকার কারণে আমাদের মতো একটি গরীব দেশের শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। একই সাথে পোশাকশিল্প মালিক ও শ্রমিকদেরও ক্ষতি হচ্ছে অনেক। অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশের রপ্তানী আয়ের শতকরা ৭৮ ভাগ অর্জনকারী খাতের ওপর শকুনের দৃষ্টি। সব শকুনের একই উদ্দেশ্য এ খাতটিকে ধ্বংস করে দিতে পারলেই বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে স্থবির করে দেয়া সম্ভব হবে। তাই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই শ্রমিক অসন্তোষের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে এর প্রগতির চাকাকে পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার পাঁয়তারা চলে এবং এক সময় ঠুনকো উছিলায় ভাঙচুর ও সহিংসতা শুরু হয় । যারা বা যাদের মাধ্যমে এ সহিংসতা বাঁধানোর কাজটি করানো হয় সেই সব গডফাদারা বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ কাজটি করে থাকে। এদের মধ্যে যেমন আছে বিদেশিদের স্থানীয় এজেন্ট তেমনি আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এজেন্টও। এরা শ্রমিকের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকে এরাই হলো এই সেক্টরের গডফাদার। কিন্তু এরা সবসময়ই থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বার বার আমাদের প্রধান রপ্তানী খাত পোশাক শিল্পে অরাজক পরিস্থিতি ও সহিংসতা সৃষ্টিকারী গডফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলেই তারা এ শিল্পখাতে একের পর এক সহিংসতা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে।

শ্রমিক নেতারা যে কথা বলে সাধারন শ্রমিকদের রাস্তায় নামার ইন্ধন দেয় তারা পাতি নেতাদের এই বলে মটিভেট করে যে `বাংলাদেশে শ্রমিকদের মজুরী যেখানে মাসে ৫৫ মার্কিন ডলার সেখান চীনে ২০৬ ডলার, শ্রীলঙ্কায় ১০৭ ডলার, পাকিস্তানে ৮৫ ডলার আর ভারতে ৬৫ ডলার। বাংলাদেশের শ্রমিকরা যে মজুরী পান যা খুবই বৈষম্যমূলক। আমাদের দেশের মালিকরা শ্রমিকের রক্ত শোষে নিয়ে নিজেদের ভূরি মোটা করছে আর শ্রমিকরা জীবন চালাচ্ছে খেয়ে না খেয়ে।’ নেতাদের এ মন্ত্রনা শুনে পাতি নেতারা সাধারন শ্রমিকদের মধ্যে সহিংসতা উসকে দিয়ে `মায়ের পেটে লাথি মারার মতো’ যে শিল্প তাদের ক্ষুদার অন্ন যোগান দেয় সে শিল্প কারখানায় ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এটা আমাদের কেমন ধরনের মানসিকতা ও দেশপ্রেম? এ-খাতের মজুরী কয়েকটি দেশের মজুরির সাথে যে তুলনার কথা বলা হল আপাতদৃষ্টিতে বেশ তারতম্য মনে হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তা যুক্তিযুক্ত নয়। তাদের মতে শ্রমিকের মজুরির বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করে তাদের সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী অন্যান্য দেশের চেয়ে কম হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের সক্ষমতার বিষয়টি। সক্ষমতার দিক থেকে আমাদের দেশের শ্রমিকরা অনেক পিছিয়ে। ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনক্ষমতা তিন ভাগের দুই ভাগ। তাই উৎপাদন ক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু মজুরী বৃদ্ধি করলেই চলবেনা। এক্ষেত্রে বিদ্ধমান মজুরী মোটেও কম নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের মূল্য অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মজুরী ঠিকই আছে। তবু মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে সরকার মাত্র দেড় বছর আগে পূর্বতন মজুরির চেয়ে গড়ে ৮১ শতাংশ মজুরী বৃদ্ধি করে। বিদ্যমান মজুরী কার্যকরের সময় মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছিল দুই বছরের মধ্যে মজুরী বাড়ানো হবেনা; কিন্তু বিদ্যমান মজুরী কার্যকরের দেড় বছর না যেতেই কোন অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে হঠাৎ করেই দেশের এ গুরুত্বপূর্ণ খাতটিতে সহিংসতা সৃষ্টি করে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা হল তার রহস্য বোঝা গেল না।

প্রিয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন তো যে শিল্পখাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থান করছে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রধান সেই খাতটিকে ধ্বংস করে দিলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমাদের দেশের অবস্থা? এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে যে, দেশে পোশাক শিল্পে ৪ হাজারের ও বেশী কারখানা গড়ে ওঠেছে। এতে বর্তমান কাজ করছে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক যার ৮৫ শতাংশই হলো নারী। সুতরাং দেশের তৈরী পোশাকখাত ধ্বংস হয়ে গেলে আমাদের বর্তমান বাজেটের ৩ ভাগের এক ভাগের সমপরিমান বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। এই খাতটি ধ্বংস হয়ে গেলে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আয় কমে যাবে ৮০ ভাগ। বন্ধ হয়ে যাবে পরিবহন খাতে ৬শ’ কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়। একই সাথে বন্ধ হয়ে যাবে প্যাকেজিং ও প্রিন্টিং শিল্পে এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ৫শ’ কোটি টাকার কজ। ওই রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয় গার্মেন্টস শিল্পে নিয়োজিত ৮৫ ভাগ নারীর জন্য গড়ে ওঠা ২শ’ কোটি টাকার প্রসাধন-বাণিজ্যের ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যাবে। এ-হিসাবে পোশাক শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট প্রায় তিন কোটি মানুষ বেকার হয়ে যাবে। এ-তথ্য উপাত্ত থেকে এটা স্পষ্ট এ- খাতটি ধ্বংস হয়ে গেলে দেশের কত বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে!

পোশাকশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানী ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। এ রপ্তানী আরো বাড়বে আগামী শীত মৌসুমে । আগামী শীত মৌসুমের অর্ডার জন্য বিভিন্ন দেশের বায়াররা যখন বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক এমন একটি সময়ে পোশাকশিল্পে সহিংসতা সৃষ্টি করে এ-খাতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সুনাম প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের অবকাঠামো ও শ্রমিক অসন্তোষ সম্পর্কে বায়ারদের এমন একটি নেতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে যাতে করে বায়াররা বাংলাদেশে না এসে অন্য দেশে চলে যায়। এ-বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন; বায়ার ও বিদেশী ভোক্তাদের কাছে নেতিবাচক ধারনা দিতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘনঘন শ্রম অসন্তোষ, শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয়গুলো হাইলাইটস করতেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র কাজ করছে।

সুতরাং এ-খাতটিকে সকল ষড়যন্ত্রের হাত থেকে বাঁচাতে দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিককে রুখে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে আমাদের দেশের অর্থনীতিকে কিছুতেই ধ্বংসের হাত থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।