ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

রোহিঙ্গাদের আর বাংলাদেশে আশ্রয় না দেয়ার সরকারের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা প্রেমিদের দরদ ও পশ্চিমাদের দূতিয়ালী থেমে নেই। তাই কেনাডিয়ান বেঙ্গলী টাইমসে ২৮ জুন ২০১২ প্রকাশিত আমার এ লেখাটি ব্লগ হিশেবে প্রকাশ করতে চাই।

***

জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ১৯৫৯ ও ১৯৬৭ অনুযায়ী রোহিঙ্গারা পুর্বতন বার্মা বর্তমান মায়ানমার সরকারের আক্রোশ, নির্যাতনের শিকার হয়ে সে দেশের আরাকানের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসে প্রথম আশ্রয় নেয়া শুরু করে ৯০ দশকের গোড়ার দিকে। বান্দরবান ও কক্সবাজারের সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী হিসাবে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ শুরু করে রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী মানবিক কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়। তাছাড়াও মিয়ানমারের সাথে অতীত থেকেই বাংলাদেশের ভ্রাতৃত্ব বন্ধন বিদ্যমান। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলদেশকে স্বীকৃতি দেয় বার্মা। সেই সময় থেকেই তাদের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের সূত্রেই দু’টি ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। দূর অতীত থেকেই আমাদের দেশের মানুষই ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কারণে আকিয়াব ও রেঙ্গুনে বসতি স্থাপন করে বিয়ে-শাদী করে স্থায়ী বসবাস শুরু করে সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে গেছে। আর ভৌগলিক কারণেও মিয়ানমারের সাথে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। আয়তনের দিক থেকে মিয়ানমার আমাদের দেশের চেয়ে প্রায় পাঁচগুন বড় হলেও লোক সংখ্যার দিক থেকে আমাদের দেশের’চে অর্ধেকেরও কম। দুই দেশের মধ্যে ২৭২ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত এবং ৬৩ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা রয়েছে। সুতরাং উপরোক্ত ভৌগলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণেও তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। তেমনি আবার দীর্ঘদিন থেকেই দু’দেশের মধ্যে কিছু কিছু দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে নানা ধরণের টানাপোড়েন চলছে। যে সমস্ত ইস্যু নিয়ে মায়ানমারের সাথে আমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে তার মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা, সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্যগত সমস্যা ও সমুদ্রসীমা এই কয়েকটি সমস্যা উল্লেখযোগ্য। সমুদ্র সীমার বিষয়টি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশ বিজয়ী হয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা কেন এবং কবে থেকে শুরু হলো তার একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়ার জন্য আমি এখন পাঠকদের নিয়ে যাব প্রায় তিনদশক আগে। ১৯৮২ সালে মায়ানমার সরকার; সেই দেশের নাগরিকদের নাগরিকত্বের জন্য যে তিনটি ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে তাতে রোহিঙ্গাদের কোন ক্যাটাগরির নাগরিক হিসাবেই বিবেচনা করা হয়নি। অর্থাৎ প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, প্রাকৃতিক নাগরিক ও অতিথি নাগরিক কোনটিতেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকৃত হয়নি। তাদেরকে বাংলা ভাষাভাষির কারণে বাঙালি বংশোদ্ভুত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যেমে তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা শুরু করে। ১৯৮৮ সালে ছাত্র বিক্ষোভ, ১৯৯০ সালে সাধারণ নির্বাচনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে একজোট হয়ে সরকারের এই দ্বিমুখি নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করলে সে দেশের সামরিক জান্তা ১৯৯২ সালে এক ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টি করে আরাকানকে রোহিঙ্গামুক্ত করার জন্য রাখাইনদের লেলিয়ে দেয়। সরকারের মদদে রাখাইনদের অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণের মায়ায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে থাকে। সরকারী হিসাব মতে সেই সময় প্রায় ২ লক্ষ ৫১ হাজার শরণার্থী আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। এর বাইরেও আরো অসংখ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে প্রাণে রক্ষা পায়। রোহিঙ্গাদের অত্যাচার নির্যাতন করে বাংলাদেশে পুস ইন শুরু করে। সে দেশের সামরিক জান্তার অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পুসইনের বাইরেও আরো কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে সকল সহায় সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করে। বাংলাদেশও অন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘের কনভেনশনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করে।

পরবর্তীকালে বিভিন্ন পর্যায়ে শরণার্থী প্রত্যাবাসনের আওতায় ৫১৫টি দলে ২ লক্ষ ২৯ হাজার শরণার্থী মায়ানমার ফিরে গেলেও বাদবাকিরা বাংলাদেশেই থেকে যায় এবং সরকারী হিসাবেই প্রায় ২২ হাজারেরও বেশী রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারা একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট গ্রহণ করে বাংলাদেশের নাগরিক বনে যেতে থাকে। বাংলাদেশি মানুষের সাথে রোহিঙ্গাদের চেহারা, আকৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যভ্যাস ইত্যাদি অনেক সামঞ্জস্যতার কারণে এদেশের মানুষের সাথে তাদের মিশে যাওয়া সহজ হচ্ছে। তাদের অনেকে জায়গা জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাসের মাধ্যমে চাষাবাদসহ ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে বৈবাহিক বন্ধনেও আবদ্ধ হতে শুরু করে। আর এ কাজটি তারা করে যাচ্ছে, জাতিসংঘের যে শরণার্থী বিষয়ক আইন আছে সে আইনকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বা উদ্ভাস্তু বিষয়ক আইনে বলা হয়েছে-কোনো দেশ কোনো জনগোষ্ঠীকে একবার শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে আশ্রয় দিলে ওই নাগরিক যদি পরবর্তীকালে স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরে যেতে রাজি না হয়, তা হলে তাকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবেনা। এই আইনের কারণেই প্রত্যাবাসনের বাইরের শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানো যায়নি। এখানে তারা বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠী যেমন ইসলামিক রিলিফ সংস্থা, মুসলিম এইড, এমএসএফ হলান্ড, আরটিএম ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত হচ্ছে। কঠিন মানবেতর জীবন যাপনের পরও তারা মায়ানমার ফিরে যেতে চাচ্ছে না। অথচ তাদের কারণে বাংলাদেশে নানাবিদ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ার আশংকা করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে আমাদের দেশে কি কি সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে এখানে তার ওপর কিছুটা আলোকপাত করতে চাচ্ছি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় প্রকাশিত সিরিজ প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা জানতে পারছি যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে আমরা প্রতিনিয়ত কি কি সমস্যা ও বিপর্যয়ের সম্মুখিন হচ্ছি তা ফুটে ওঠছে। তারা এখন চুরি ডাকাতি রাহাজানিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তা ছাড়াও সরকারী জমি দখল, বৃক্ষ নিধন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, খুন খারাবির মাধ্যমে দেশের আইন শৃংখলার অবনতি ঘটিয়ে যাচ্ছে। আর আশ্রয় শিবিরের বাইরে লুকিয়ে থাকা শরণার্থীরা পেটের ক্ষুদা নিবারনের জন্য নানা ধরণের অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। টেকনাফ-উখিয়ার আশ্রয় শিবির গুলোতে অপরাধী ও সন্ত্রাসিদের আশ্রয় দিয়ে দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে মুখ্য ভুমিকা রাখছে। তারা এখানে একটি মৌলবাদী দলের হয়ে তাদের পারপাস সার্ভ করে যাচ্ছে। এই চক্রটিই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরীতে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ওই পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গারা নানা ধরনের অপকর্ম করে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এমনকি তাদেরকে বাংলাদেশের ভোটার করে ন্যাশনাল আইডি কার্ডেরও ব্যবস্থা করে দিচ্ছে ঐ মহলটি। এই জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাখাওয়াত হোসেন নিদ্দিষ্ট কোনো একটি গোষ্ঠীকে সতর্ক করে হুশিয়ার উচ্চারণ করে বলতে হয়েছে যে, ‘রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে কেউ বা কোনো গোষ্ঠী সাহায্য করছে এমন প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

যা হোক, ক্রমবর্ধমান হারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার জেলা ও এর অধিনস্থ উপজেলা সমুহ, বিশেষ করে টেকনাফ উখিয়া উপজেলায় সামাজিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুধুমাত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাই নয় সাথে সাথে ধর্মীয় বিভেদের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন মসজিদে ইমাম ও মুয়াজ্জিন এবং কাওমী মদ্রাসায় যারা চাকুরী করে তাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা শরণার্থী। সেই সব রোহিঙ্গা ইমাম মোয়াজ্জিন ও কাওমী মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে স্থানীয়দের মধ্যে যে কোন সময় সংঘর্ষ লেগে যেতে পারে। তা ছাড়াও ঐসব ইমাম মোয়াজ্জিনরা স্থানীয় জামায়াতের আদেশে-নিষেধে ও পরামর্শে সরকারের বিভিন্ন জন সচেতনতামূলক কাজের প্রচারনা থেকে বিরত থেকে সরকারের প্রতি এক ধরণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে ও পিছ পা হচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো বর্তমান বিশ্বের কোনো দেশেই শরণার্থী সমস্যা এমন প্রকট আকার ধারণ করেনি। যেমনটা করেছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে। আমাদের দেশের মানুষ শরণার্থীদের প্রতি বিশেষ ভাবে সহানুভুতিশীল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি আমাদের ওপর একটা অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে গণহত্যা অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে প্রায় এককোটি বাঙালিকে ভারতের শরণার্থী হতে বাধ্য করেছিল। সুতরাং আমরা জানি শরণার্থী জীবনের কী কষ্ট, কী ক্লেদ, কী ভয়ানক মর্মযাতনা। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু জ্ঞানপাপী রাজনীতিক, লেখক, সাংবাদিক, ও মধ্যরাতের টকশোওয়ালারা মিয়ানমারের জাতিগত দাঙ্গাকে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে বলতে চাচ্ছে, যে আমরাও তো এক সময় ভারতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নিতে হয়েছে, তা হলে মিয়ানমায়ের শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে সমস্যা কোথায়? আমি ওইসব জ্ঞানপাপীদের বলতে চাই। জাতিগত দাঙ্গা আর মুক্তিুদ্ধ এক কথা নয়, আর শরণার্থী হিশেবে ভারতে আমরা ছিলাম মাত্র নয় মাস। কিন্তু মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আমাদের দেশে আছে প্রায় ৩ দশক ধরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এমন একজন মানবতাবাদী নেতা ছিলেন বলেই দেশ স্বাধীন হবার স্বল্প সময়ের মধ্যে ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১ কোটি বাঙালি শরণার্থীকে একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি কিন্তু মিয়ানমার সরকার দীর্ঘদিন থেকে শরণার্থী সমস্যাটি কোনো সমাধান না করে ঝুলিয়ে রেখেছে।

আমাদের দেশের যেসব মাসি’রা রোহিঙ্গাদের চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম করে সরকারের সমালোচনায় মত্ত রয়েছেন, বা গভীর রাতের টকশো মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে শুধু একটি প্রশ্ন রাখতে চাই-রোহিঙ্গাদের নিয়ে আগের সমস্যাই যেখানে বহু ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে সেখানে মিয়ানমারে সম্প্রতি সৃষ্ট জাতিগত দাঙ্গায় আক্রান্ত, বিতারিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার জন্য সীমান্ত খুলে দিলে আমাদের কি অবস্থা হবে? যারা আজ মিয়ানমারের জাতিগত দাঙ্গায় বিতারিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার জন্য সরকারকে দোষারোপ করে বক্তব্য, বিবৃতি দিচ্ছে টিভি পর্দায় ওদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় ওরা কারা? কি ওদের রাজনৈতিক পরিচয়? এই মাসিদের মধ্যে জামায়াতে ইসলাম সবচেয়ে বেশী অপপ্রচার ও গুজব ছড়াচ্ছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর, প্রতিবেদন ও সংবাদচিত্র থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা-রাখাইন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে পূঁজি করে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা সীমান্ত পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটাতে নানা ধরনের অপপ্রচার, গুজব, ও কাল্পনিক কাহিনী প্রচার করে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমাদের বিক্ষুব্দ করে তোলার যত রকমের চেষ্টা আছে করে যাচ্ছে তার প্রমাণও অনেক আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রমাণটি হলো- টেকনাফ-উখিয়ার সীমান্ত অঞ্চলসহ কক্সবাজার জেলা জুড়ে জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা পোষ্টারিং করে বাংলাদেশেসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের সহানুভূতি পেতে মসজিদে মসজিদে নামাজের পর রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের বিভিন্ন সংবাদচিত্র ও ভিডিও ক্লিপ প্রচার করে চলেছে। তারা কক্সবাজার জেলার আনাচে-কানাচে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা-রাখাইন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কিছু চিত্র সংবলিত প্রচারে ধর্মপ্রিয় মুসলিম বলে লেখা পোষ্টারে সুপার ইম্পোজ করে ১ হাজাররেরও বেশি রোহিঙ্গা হত্যা, ১১টি মসজিদ ও দুই লক্ষাধিক গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার কাল্পনিক কাহিনী প্রচার করছে। সে দেশের মংডুতে টেকনাফে স্থাপিত বাংলাদেশের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক কাজ করায় অতি উৎসাহী কিছু আরএসও নেতা মোবাইলে ছবি তুলে মেমোরিকার্ড পাঠিয়ে দিয়েছে জামায়াত-শিবির এবং আরকান বিদ্রোহী গ্রুপ আরএসও নেতাদের নিকট। তারা রাতারাতি রঙিন পোস্টার বের করে ছড়িয়ে দিয়েছে কক্সবাজার জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। যা একটি দেশদ্রোহী কাজ ও আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি চরম হুমকী হিশেবে কাজ করছে।

প্রিয় পাঠক ওইসব অপপ্রচারের পাশাপাশি দেমপ্রেমিক প্রতিটি মানুষ ও বিভিন্ন গণমাধ্যম এর প্রতিবাদে সোচ্চার। বাংলাদেশের যে চিহ্নিত রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য ‘মায়ের চেয়ে মাসি’র দরদ’ দেখাচ্ছে তাদের অবগতির জন্য আমি দেশের দুইটি জনপ্রিয় দৈনিকের সম্পাদকীয় নিবন্ধের অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি। প্রথমেই ১৬ জুন ২০১২ দৈনিক বাংলাদেশ সময়-‘মিয়ানমার সরকারকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে-রোহিঙ্গারা এদেশের নাগরিক নয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলেছে,‘…মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এদেশের কোনো নাগরিক নয়। বাংলাদেশ এদের কোনো দায়ভার বহন করেতে পারেনা।…তিনদশক ধরে বাংলাদেশে ক্রমাগতভাবে রোহিঙ্গাদেও অনুপ্রবেশ চলছেই। বিভিন্ন সূত্রমতে এদের সংখ্যা বর্তমানে ৮ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। আগে এরা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শরণার্থী ক্যাম্পে থাকতো। ক্রমান্বয়ে এরা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করে। …বাংলাদেশ মানবিক দিক দেখিয়ে থাকতে দেবে এমনটি যুগের পর যুগ চলতে দেয়া যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নয়। এখন বাংলাদেশকে এ জন্য ভয়াভহ মাসুল দিতে হচ্ছে …সৈকতে ও উপকূলে ন্যাক্কারজনকভাবে এদের মেয়েরা দেহব্যবসা করছে।…মিয়ানমার সরকারই এদের সমস্যার সমাধান করবে। এদের বাংলাদেশে ঢুকতে না দেয়াটাই উচিত। এদের নিয়ে আমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে।’

১৭ জুন ২০১২ দৈনিক জনকন্ঠ ‘রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ’ শিরোনামের সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলেছে,‘…জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বিদেশী চাপ সত্বেও বাংলাদেশ নতুন করে রোহিঙ্গা উদ্ভাস্তুদের গ্রহণ করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় বহন করে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই আর মিয়ানমার ফিরে যায়নি। মিয়ানমার সরকার বহুবার প্রতিশ্র“তি দেয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়নি। …মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত দাঙ্গার স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক কিছু করার আছে। বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে তাদের উচিত এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা এবং তাদের ওপর কুটনীতিক চাপ বৃদ্ধি করা।’

প্রিয় পাঠক, এইতো গেল দেশের দুইটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় নিবন্ধের কথা; এখন চলুন কক্সবাজার, টেকনাফ ও উখিয়ার সাধারণ মানুষ, পেশাজীবী ও জনপ্রতিনিধিরা পুনরায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে কি বলেন একটু জেনে নিই। তাদের মতে বাংলাদেশে পুনরায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করলে সীমান্ত এলাকা আরো বেশি অস্থির হয়ে ওঠবে। টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ শফিক মিয়া বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে আলাপকালে বলেন,‘রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের জন্য বিপজ্জনক। কক্সবাজার টেকনাফ ও উখিয়াসহ সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান ও জঙ্গীতৎপরতাসহ নানা অপরাধ আরো বেড়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা-রাখাইন জাতিগত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে পূঁজি করে দুএকটি রাজনৈতিক দল, এনজিও এবং কিছু জঙ্গী সংগঠন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়দানের জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, মুসলিম এইড, এসিএফ, আরটিএম, রোহিঙ্গা জঙ্গী সংগঠন আরএসও এবং এআরএনওসহ আরও কয়েকটি সংস্থা উখিয়া ও টেকনাফে শরণার্থী ক্যাম্পে প্লেকার্ডসহ নানা অপপ্রচার চালিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদেও বিক্ষুব্দ করে তুলছে।’ টেকনাফ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এইচএম ইউনুছ বাঙালি বলেন, ‘দেশের সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা, দেশপ্রেম লেখা, শ্রমবাজার, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী সব কিছুর জন্যই হুমকী এই রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ দাঙ্গা নিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অবশ্যই রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিরোধ করবোই।’ এ প্রসংগে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুল আলমের অভিমত হচ্ছে মানবতার অজুহাত তোলে কিছুতেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া যাবেনা। এমনিতেই বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নানামুখী তৎপরতার কারণে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি উল্টো সরকারী হিসাবে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ৫ লক্ষ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর দাবী জানান। তিনি তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গারা এ দেশে থাকলে আমাদের নতুন প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে।’ উখিয়া উপজেলার সংবাদকর্মী এম বাশার চৌধুরীর বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কিছু চিহ্নিত এনজিও কাজ করে। ওইসব এনজিওর কর্মকর্তা কর্মচারীরা মনে করেন, দেশে রোহিঙ্গা থাকলে তাদের চাকুরী থাকবে, অন্যথায় তাদের চাকুরী থাকবেনা। তাই তারা নিজেদের চাকুরীর স্বার্থে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ সমর্থন করে বিভিন্ন ক্যাম্পেইনে শরীক হচ্ছে।’ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও উখিয়ার হলিদিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন চৌধুরী মিন্টু বলেন,‘মিয়ানমারের জাতিগত সংঘাত ওই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এটাকে কেন্দ্র করে চিহ্নিত একটি গোষ্ঠী ও দেশী-বিদেশী চক্র রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকানোর চেষ্টা করছে। তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলে যত অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে, এর ৯০ ভাগ অপরাধের সাথেই রোহিঙ্গারা জড়িত।’ কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি ফজলুল কাদেও চৌধুরী বলেন, ঢাকা ও বিদেশে বসে যারা মানবতার কথা বলা শুরু করেছেন, তাদের একটি সপ্তাহের জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেড়ানো জরুরী। রোহিঙ্গাপ্রীতির মানবতার কারণে এ অঞ্চলের মানবতাই আজ লুন্ঠিত। তিনি নতুন করে আর কোনো রোহিঙ্গাকে স্থান না দিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান করা সব রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর দাবী জানান।’

সবশেষে এই বলেই লেখায় ইতি টানবো- মানবিকতা ও মানবাধিকারের কথা বলে অন্য যারা সরকারকে দোষ দিচ্ছে তারা হয়তো বিষয়টির গভীরে প্রবেশ না করেই মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের ওই মুখচেনা গোষ্ঠী ও পশ্চিমাদের মতোই। এদের একদল চাচ্ছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে সরকারকে সীমাহীন সমস্যায় ফেলা ও বাণিজ্য করা। আর পশ্চিমারা চাচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখভালের উছিলায় বঙ্গোপসাগরে একবার ঘাটি করতে পারলে তাদের আর তাড়ায় কে! তখন বাংলাদেশকে আবারো নব্য উপনিবেশ বানিয়ে তেল-গ্যাস সম্পদসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ লুপাটের অবাধ সুযোগ পাবে; তা না হলে তাদের যদি এতই দরদ উথলে ওঠে তা হলে মিয়ানমার সরকারকেইতো তারা জাতিগত দাঙ্গা বন্ধের চাপ দিতে পারে তা না দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন কেন? এতেই বোঝা যায় তাদেও উদ্দেশ্য ভাল নয়। আমরা আশা করবো দু’টি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে ব্যাপক কুটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করবেন। এই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের জিইয়ে রাখা রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধান হবে অন্যদিকে আমাদের মতো বহু সমস্যায় জর্জরিত দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ফিরে আসবে শৃংখলা। তবে একটি কথা, বাঙালিরা আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিশেবেই পরিচিত তাই আমরা যতই গরীব হই না কেন কারো দাদাগিরি বা চোখ রাঙ্গানিকে মোটেই আমরা পরোয়া করি না।