ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

দীর্ঘদিন থেকে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি স্থগিত নিয়ে সরকারের টানাপোড়ন চলছিল । তাই সরকারও অন্য কোনো দেশ বা পক্ষ থেকে পদ্মা সেতুর অর্থায়েনের চেষ্টা শুরু করে । পদ্মা সেতু অর্থায়নে এগিয়ে আসে মালশিয়া। অতি সমপ্রতি মালশিয়া চুক্তির খসড়া প্রস্তাবও দাখিল করে বাংলাদেশের কাছে । এ প্রস্তাব দাখিলের পরই বিভিন্ন মিডিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে বলতে শুনলাম `বিশ্বব্যাংক ছাড়া অন্য কারো সাথে সরকার পদ্মা সেতু ঋণ চুক্তি করলে বিএনপি তা মেনে নেবেনা ।’ বিএনপি নেতার এ বক্তব্যের দুই দিন পর এর শান ই নজুল বোঝা গেল বিশ্বব্যাংকের ঋণ চুক্তি বাতিলকরণের মাধ্যমে । বাংলাদেশের সব মানুষই এখন জানে যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের গোড়ার দিকে বিশ্বব্যাংক জাইকাসহ আরো দুএকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে পদ্মা সেতু নির্মাণের জ্ন্য চুক্তি সই করে । এর পর থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায় কিভাবে এ চুক্তি বাতিল করা যায় । এজন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে লবিষ্ট নিয়োগ করে । তাতেও কাজ না হলে এ কাজে নিয়োজিত করে গ্রামীণ ব্যাংকের অপসারিত এমডি ড. ইউুনূসকে । হিলারী ক্লিনটনের সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্কের কারণে এ র লবিং ফলপ্রসূ হয় এর পরই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে বায়বীয় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণ চুক্তি স্থগিত করে দেয় । পরবর্তীতে সরকার শত চেষ্টা করেও আর মন গলাতে পারেনি । এসব কাহিনী বেশ আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হয়ে আসছিল ।
আসুন পাঠক এ পর্যায়ে জেনে নিই বিশ্বব্যাংকের কিছু দাদাগিরির কাহিনী । বিশ্বব্যাংক তাদের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণ গেলাতে আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল অথচ গরীব দেশগুলোকেই বেছে নিচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) যেভাবে আমাদের দেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর তাদের থাবা বিস্তার করে দাদাগিরি করে বেড়াচ্ছে ও ঋণের জালে আটকে ফেলে আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে, এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? এ নিয়ে অনেক দেশই এখন ভাবতে শুরু করেছে। আবার কোনো কোনো দেশ ইতিমধ্যে এ দুইটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কবল থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করেও নিয়েছে। সেসব দেশ বুঝতে পেরেছে যে, এই দুইটি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের কাজই হল কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের জালে আটকে ফেলে দেশের অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ করে দেয়া। এখন অনেকেরই বোধোদয় হয়েছে যে, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মুদ্রানীতির কারণে অর্থনীতি গতিশীল হয় না বরং তা অর্থনীতিকে আরো গতিহীন ও সঙ্কুচিত করে ফেলে। তবুও যেসব দেশ বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন এর জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের দরবারে একবার মাথা ঢুকিয়েছে, সেসব দেশ খুব সহজে এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের ঋণচক্রের বেড়াজাল থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। শুধু তাই নয় সেসব দেশের সরকারগুলোকেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের জনস্বার্থবিরোধী শর্ত পালন করতে যেয়ে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ক্ষমতাচ্যুত পর্যন্ত হতে হয়েছে। তারা যে ঋণ মঞ্জুর করে সে ঋণের সিংহভাগই সময় মতো ছাড় না করার কারণে ঋণগ্রহীতা দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন যেমন সম্ভব হয়ে ওঠে না, তেমনি ঋণ পরিশোধ করতে যেয়ে আরো অধিক হারে ঋণের জালে আটকে যাচ্ছে তারা। ফলে এরা যে শর্ত দেয় সে শর্ত পূরণ করেই আবার ঋণের জন্য ধর্ণা দিতে হচ্ছে প্রত্যেকটি ঋণগ্রহিতা দেশকে। সেই নিরীখে উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোর কাছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এখন গ্রামের সুদখোর মহাজনের মূর্তিতে আবিভর্ূত হয়েছে। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নেতা-নেত্রীরা নির্বাচনের প্রাক্কালে বাস্তব অবাস্তব নানা ধরণের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছড়ান। সেই প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে জনগণ সে দলটিকে নির্বাচিত করে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলটি দেশীয় সম্পদের দ্বারা সেইসব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনা। তখন বাধ্য হয়েই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হাত পাতে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের কাছে । বিভিন্ন শর্ত পালনের মুচলেকা দিয়ে যে ঋণ মঞ্জুর করা হয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কনসালটেন্সি, সুদ ও বিভিন্ন সার্ভিসচার্জ পরিশোধ, বিদেশী ঋণের দায় শোধ এবং বার ভূতের লুটপাটের ফলে যা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়ে কতটুকু জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন হয় তা সহজেই অনুমেয়।
বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার সম্বন্ধে যতটুকু জানা যায়, তা হলো ১৯৪৪-এ ব্রেটন উডস সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রেখেছিল আমেরিকা। এই ব্যাংকটির সবচে বেশী শেয়ারও আমেরিকার। তা ছাড়া এর এর হেড অফিস ওয়াশিংটন ডিসিতে। এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ারও আমেরিকার। মোটকথা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিশ্বব্যাংকের মূল চালিকাশক্তি বা চাবিকাঠিই আমেরিকার হাতে। আর বিশেষজ্ঞদের মতে আইএমএফের মূল কাজ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ধনী দেশগুলোর ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ছোটখাটো সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু সত্তুর দশকে এসে সে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিওপি সমস্যা সমাধানের নামে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরকারি কর্মকাণ্ড সঙ্কুচিত ও অভ্যন্তরীণ শিল্পের বিকাশ রুদ্ধ করে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানীর বাজার সমপ্রসারিত করা । একই সাথে অন্য একটি খেলা তারা জমিয়ে তোলে, সে খেলাটি হলো সরকারি খাত, শিল্প, ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনায় সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা, বেসরকারীকরণ ও কাঠামোগত সংস্কারের নামে সরকারের ভূমিকা হ্রাস করা । এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ১৯৮২ সালে দায়ে পড়ে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল মেঙ্েিকা। সেই ঋণ তিনগুণ হয়ে ১৯৯৪ সালে এসে দাঁড়ায় ৫০ বিলিয়ন ডলারে, যার জন্য তাদেরকে সংকট উত্তরণ সহায়তা নিতে হয়েছিল। এমন পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকেও। ঋণমুক্ত হওয়ার জন্য তারা আইএমএফের ঋণ নিয়েছিল কিন্তু পরে যখন বোধোদয় হলো ততদিনে তারা ঋণে ক্রমেই আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। তখন সেসব দেশের নেতৃত্ব বিপুল ঝুঁকি নিয়ে ঋণ মুক্ত হয়েছিল।

বাংলাদেশ অর্থনীতি ও উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে গত দুই দশকে যে সফলতা অর্জন করেছে তাতে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের অবদান নাই বললেই চলে। ১৯৯০ থেকে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অর্থায়নে আত্মনির্ভরশীলতা বেড়েছে। আর বর্তমানে আমাদের দেশ যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কাছাকাছি অবস্থান করছে তার পুরো কৃতিত্বই কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকদের। একই সাথে রপ্তানী আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সরাসরি অবদান রাখছে আমাদের দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া নারী শ্রমিকেরা। রেমিটেন্স প্রবাহকেও সচল রেখে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্ত অবস্থানে তুলে এনেছে বিদেশে কর্মরত লক্ষ লক্ষ প্রবাসী। যার কারণে বিশ্বব্যাপী এতবড় অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও বাংলাদেশ এতটুকু ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, যতটুকু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো।

প্রিয় পাঠক একটি কথা হয়তো সবার জানা নেই যে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আমাদের দেশকে যে ঋণ মঞ্জুর করেছে নানা ছলছুতোয় তার সিংহভাগই ছাড় করেনি। ফলে প্রয়োজনের সময় টাকা না পাওয়াতে অনেক প্রকল্প আটকে আছে অথবা কোনো কোনো প্রকল্প ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। ইআরডির হিসেব মতে দাতাদেশ বা সংস্থার প্রতিশ্রুতির তুলনায় বৈদেশিক আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তি প্রতি বছরই কমছে। এর মধ্যে যতটুকু অর্থ ছাড় হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হচ্ছে সুদসহ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধে। তবু বাংলাদেশ কখনো কিস্তি খেলাপি হয়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যমতে চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৭ মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ঋণ ও অনুদান মিলে ১০১ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার ছাড় দিয়েছে যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সোয়া ৭ কোটি ডলার কম। এ সময়ে ৩৯৫ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। যার মধ্যে মাত্র ২২ শতাংশ ঋণ ছাড় হয়েছে। তা ছাড়াও ১৯৯৯-২০০৩ সালের মধ্যে পোভার্টি রিডাকশন এন্ড গ্রোথ ফ্যাসিলিটি কর্মসূচির আওতায় ৬২ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আইএমএফ। এই ঋণ কর্মসূচির জন্য শর্ত দেয়া হয়েছিল ভাসমান মুদ্রা বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের ১২৫ টি শাখা কমানো, রূপালী ব্যাংক বিক্রি করা, সোনালী, অগ্রনী,ও জনতা ব্যাংককে কোম্পানী করে ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেয়া প্রভৃতি। বাংলাদেশ সরকার শর্তগুলোর প্রায় সবক’টি পূরণ করলেও প্রতিশ্রুত ৬২ কোটি ডলারের পরিবর্তে ৪৯ কোটি ডলার ঋণ মঞ্জুর হয়েছিল। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে শেখ হাসিনা সরকারের চলতি মেয়াদে আইএমএফের কাছে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চায়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে আইএমএফের একটি দল বাংলাদেশ সফরে এসে শর্তের একটি তালিকা দিয়ে যায়। সেসব শর্তের বাস্তবায়নও শুরু হয়। সেইসব শর্ত পালনের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রিয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দফায় দফায় বৈঠকে মিলিত হয়ে তৈরী করে শত শত কাগজপত্র, এবং ১০০ কোটি ডলার ঋণ পাবার আশায় আইএমএফের ১৭টি শর্তের বেশিরভাগ শর্ত পূরণ করে। সেসব শর্তের মধ্যে ছিল জ্বালানী ভতর্ুকী ক্রমান্বয়ে তুলে দেওয়া, শেয়ার বাজারে ব্যাংকের অংশগ্রহণ কমানো, নতুন আয়কর ও ব্যাট আইনের খসড়া তৈরী করা। এসব রাজনৈতিক স্পর্শকাতর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে বারবার সমালোচনার শিকার হয়েছে সরকার তার পরও আইএমএফের ঋণ সোনার হরিণই থেকে গেছে। উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা বৈদেশিক দাতা সংস্থা প্রতিশ্রুত টাকা ছাড় না করে উন্নয়নের গতিকে কতটা শ্লথ করে দিচ্ছে ও মূল্যস্ফীতির জুজুর ভয় দেখিয়ে এমন সব শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে যা পালন করতেও বাধ্য করা হচ্ছে। নয়তো ঋণ মঞ্জুরী স্থগিতের হুমকীর মাধ্যমে জনবিরোধী কাজ করতে বাধ্য করছে সরকারকে। আর মাঝে মাঝেই বায়বীয় দুনর্ীতির অভিযোগ উত্থাপন করে মঞ্জুরীকৃত ঋণের আংশিক বা পুরোটাই স্থগিত করে দিচ্ছে।
পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিক একটি প্রকল্প। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে পদ্মাসেতু নির্মাণে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সেতু তৈরীর জন্য সরকার বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইডিবির সঙ্গে ২৯০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই ২৯০ কোটি ডলারের মধ্যে ১২০ কোটি ডলার বিশ্বব্যাংকের, এডিবি, জাইকা ও আইডিবির ১৫০ কোটি ডলার বাকি ৫৫ কোটি ডলার সরকারের নিজস্ব উৎস থেকে আহরণের কথা। সরকার জমি অধিগ্রহণ বিরোধ, অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ পরিশোধসহ প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণের ১০০ কোটি টাকার কাজ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকেই। কিন্তু হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাংক নিদ্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া পদ্মাসেতু প্রকল্পে বায়বীয় দুনর্ীতির অভিযোগ তুলে ঋণ মঞ্জুর স্থগিত করে দেয়। বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি এডিবি, জাইকা ও আইডিবিও অর্থছাড় স্থগিত রাখে। ফলে পদ্মাসেতু তৈরী নিয়ে সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তার। সরকারও সেতু তৈরীর দৃঢ় অঙ্গিকার নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে পদ্মাসেতু নির্মাণচুক্তি স্থগিত প্রশ্নে একটি দেশবিরোধীচক্রের তৎপরতার কথা প্রকাশ হতে থাকে, যে চক্রের ইন্ধনদাতা বিগত বিএনপি জামায়াত জোট সরকার। গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যাবস্থাপনা পরিচালক নোবেল লরিয়েট ড. মুহম্মদ ইউনুছ এ চক্রের হোতা হিসাবে সব কলকাঠি নেড়ে এ ঋণচুক্তি স্থগিত রেখেছে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় যখন বিশ্বব্যাংক ঋণের টাকা ছাড়ের সাথে ড. ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে পুনঃনিয়োগের শর্ত জুড়ে দেয়। সরকার থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত দাবি জানায় পদ্মাসেতু প্রকল্পে কে বা কারা দুনর্ীতি করেছে তা প্রকাশের। দুনর্ীতির অভিযোগ প্রশ্নে দেশের অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে আরো একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, যে পদ্মাসেতু প্রকল্পে কোনো ঋণই ছাড় হলোনা সেখানে দুনর্ীতি হয় কিভাবে? তারপরও সরকার নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণের জন্য পদ্মাসেতু প্রকল্পের দুনর্ীতির অভিযোগ তদন্ত করে দেখার জন্য দুনর্ীতি দমন কমিশন দুদককে দায়িত্ব দেয়। দীর্ঘদিন তদন্ত করে দুদকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয় যে, পদ্মসেতু প্রকল্পে তারা কোনো দুনর্ীতির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি। এতদিনে স্পষ্ট হয়েছে আসলে দুনর্ীতি-ফুনর্ীতি কিছু নয়, যে ড. ইউনুস বাংলাদেশে আমেরিকার স্বার্থে কাজ করত সেই ড. ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিদায়ের পরে আমেরিকার স্বার্থ দেখার মতো এমন বিশ্বস্ত ও অনুগত এজেন্টের পতনের কারণে বর্তমান সরকারের ওপর আমেরিকা নাখোশ হয়ে তাদেরই নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের ঋণ স্থগিত করে দিয়ে এক রকমের প্রতিশোধ নিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের দাদাগিরি ও মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণেই ২০০৭ সালে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট ড. কাজী খলীকুজ্জামান বলেছিলেন, ‘আমরা আইএমএফ চাইনা, তারা কালই চলে যেতে পারে।’ একই সময়ে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ আজকের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানও বলেছিলেন, ‘আইএমএফকে বিদায় জানানোর কথা চিন্তা করার সময় এসেছে।’

তাই সরকারেরও উচিত সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক বিশ্বব্যাংকের দাদাগিরি মেনে না নিয়ে থাইল্যান্ড মালয়েশিয়া, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইকোয়েডর, মেঙ্েিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিশ্বব্যাংকের খপ্পর থেকে বাংলাদেশেরও বেড়িয়ে আসা উচিত। বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে চীনের দিকে ঝুঁকছে আফ্রিকার দেশগুলো। ইতিমধ্যে আফ্রিকার ৪৯টি দেশ চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চায়না-আফ্রিকা ডেভলপমেন্ট ফান্ড তৈরী হয়েছে সেসব দেশের সমুদ্র ও বিমান বন্দর, সড়ক ও খনি উন্নয়নে অর্থায়নের জন্য। জাম্বিয়া, মরিশাস, নাইজেরিয়া, মিশর ও ইথিওপিয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন মডেল। সোমালিয়ার মহাসড়ক, তিউনিসিয়ার খাল ও তানজানিয়ার জাতীয় ষ্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে চীনের অর্থায়নে। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে আফ্রিকায় চীন ঋণ মওকুফ করে ১৯ বিলিয়ন ইউয়ান। এজন্য চীনের পাঁচটি ব্যাংক কাজ করছে এ অঞ্চলে।

পরিশেষে আমি একটি কথা জোর দিয়ে বলতে চাই, আমেরিকার কাছে ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র যদি গৌণ হয়ে যায়, এবং সে যদি ব্যক্তিকে গ্রামীণ ব্যাংকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে চুক্তিকৃত পদ্মা সেতুর ঋণ মঞ্জুরিতে বাধার সৃষ্টি করে থাকে তা হলে আমাদের এমন সেতুর দরকার নেই। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ আমেরিকার কাছে আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে এ আমেরিকা ১৯৭১-এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল। এই আমেরিকা বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের জন্য সব রকমের ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিল।