ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবীতে দেশের বর্তমান রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে । বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট বলছে নিরপেক্ষ তত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া তারা অন্য কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন তো যাবেই না বরং বর্তমান সরকার দলীয় সরকারের আড়ালে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন করতে গেলে তা তারা প্রতিহত করবে। অন্য দিকে সরকার বলছে উচ্চআদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি অবৈধ ও বাতিল হয়ে যাওয়ায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই আর সেই পদ্ধতিকে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। এ নিয়ে দেশের মানুষ দ্বিধাবিভক্ত। এই অবস্থায় ১৮ দলীয় জোট ঘোষণা করেছে ঈদের পর তারা লাগাতার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে এ পদ্ধতি মানতে বাধ্য করা হবে; না হলে সরকার পতনের এক-দফার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে টেনেহিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে নামানো হবে।

আর সরকার পক্ষ বলছে উচ্চআদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে অসাংবিধানিক কোন অনির্বাচিত সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয়। সরকার প্রধান শেখ হাসিনা বিরোধীদলকে আহ্বান জানিয়েছেন অন্তবর্তীকালীন সরকারে যোগ দিয়ে এবং নির্বাচন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করে কিভাবে আগামী নির্বাচনকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করা যায় সে ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য। কিন্তু বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য গোঁ ধরেছেন।

প্রিয় পাঠক এখন বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রেক্ষাপট নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই-১৯৯৯ সালে অক্টোবর মাসে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংযোজন করে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বৈধতা দেয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী এম সলিমুল্লাহ, রুহুল কুদ্দুস বাবু, ও মো: আব্দুল মান্নান খান তিনটি রিট আবেদন দাখিল করেন। ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াতে জোটের শাসনামলে হাইকোর্ট সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভূক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। ওই রিট আবেদনের ওপর দীর্ঘ শুনানীর পর ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের অনুমতি দেন আদালত এবং বিএনপি তাদের শাসনামলেই উচ্চআদালতে আপিল করেন। এ আপিলের ওপর শুনানিও ও হয় সেই সময়ে। কিন্তু তা নিয়ে ফয়সালা হওয়ার আগেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে মামলাটি এ অবস্থায়ই পড়ে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ রিট মামলাটি আবার শুনানীর ব্যবস্থা করা হয়। চুড়ান্ত রায় হওয়ার আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও চলে যেতে হয়। এরপর এ আপিলের ওপর ২০১১ সালের ১ মার্চ থেকে আপীল বিভাগে শুনানী হয়। শুনানী শেষে ১০ মে ২০১১ সুপ্রিমকোর্টের আপীল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে রায় দেন।

যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি এখন যে জানবাজ আন্দোলন করছে, সেই তত্ত্বাবধায় সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপি নেত্রী কি কি সমালোচনা করেছিলেন তার দিকে একটু দৃষ্টি ফেরানো যাক।

এরশাদ শাহীর পতনের পর তিনজোটের রূপরেখা অনুযায়ী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় শাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কিন্তু এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অপ্রত্যাশিত জয়লাভের পর বিএনপি সেই সময়ের শাসনামলে যেসব উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ভোট ডাকাতি ও বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থীদের জয়লাভ করিয়ে আনা শুরু হলে, বিএনপির অধীনে কোন নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হওয়ার আশঙ্কা করে বিরোধীদল আওয়ামী লীগ আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবী তোলে। এ দাবী আরো জোরালো হয় ১৯৯৫ সালে মাগুরা মডেলের উপনির্বাচনের পরে।

কিন্তু বিরোধী দলের তীব্র আন্দোলনের মুখে বিএনপি নেত্রী এক তত্ত্ব আবিস্কার করেন যা ‘শিশু ও পাগল তত্ত্ব’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি বলেছিলন, ‘নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি একটি অসাংবিধানিক পদ্ধতি। কাজেই বিএনপি কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় নির্বানের ব্যবস্থা করা যাবে না। তাছাড়া নিরপেক্ষ কোন মানুষ নেই। একমাত্র ‘শিশু ও পাগল ছাড়া, কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ এর পরও গণদাবিকে উপেক্ষা করে বিএনপি একতরফাভাবে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারী সকল বিরোধী দলের বর্জনের মুখে ভোটারবিহীন সাদেকালী মার্কা নির্বাচনের আয়োজন করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি না মানার বিএনপির অনড় অবস্থানের কারণে সম্মিলিত বিরোধীদল নির্বাচন বয়কট করে। সেই ভোটারবিহীন নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশেরও অধিক আসনে নিজেদেরকে বিজয়ী ঘোষণা করে সরকার গঠন করে। কিন্তু বিরোধী দলের কঠোর আন্দোলনে সেই সরকারের মেয়াদ একমাসও পূর্ণ করতে পারেনি।

শেষে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে নিজেদের মতো করে সংবিধানের ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ,ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি শাহাবউদ্দীন, প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ও সাইদের নির্বাচন কমিশনের ত্রিমুখী আক্রোশের শিকার হয় আওয়ামী লীগ। এই ত্রয়ীর ২০০১ সালের নির্বাচন দেশে-বিদেশে ‘শালসা’ (শাহাবুদ্দীনের শা, লতিফুর রহমানের ল এবং সাইদের সা মিলিয়ে) মার্কা নির্বাচন হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। শালসা মার্কা নির্বাচনের রেজাল্টশিট জালিয়াতির মাধ্যমে গো-হারা হারিয়ে দেয়া হয় আওয়ামী লীগকে। এ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এমনভাবেই বস্ত্রহরণ করা হয়, এরপর থেকে এই ত্রয়ী কুশীলবকে আর জনসমক্ষে সাহস করে প্রোটেকশন ছাড়া উপস্থিত হতে দেখা যায়নি।

২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে বিতর্কের সূত্রপাত করে। নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য সেই সময় বিচারপতিদের চাকুরীর বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৬৭ বৎসর করা হয়। এটা করা হয় পরিকল্পিতভাবে তাদের বশংবদ বিচারপতি কেএম হাসানকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার কু-মতলব থেকেই। ব্যারিস্টার মওদুদের পরামর্শে বিএনপি-জামায়াত একাজ করে ফেঁসে যায়। আওয়ামী লীগ এ কু-মতলব বুঝতে পেরে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করে। তারা বলে বিএনপির বশংবদ কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করা হলে আওয়ামী লীগ কিছুতেই মেনে নেবে না। কিন্তু খালেদা জিয়া কেএম হাসানকেই পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করতে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। এর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল আন্দোলন শুরু করে। বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে কেএম হাসান পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে অপারগতা প্রকাশ করলে, সংবিধানের পাঁচ পাঁচটি অপশন ডিঙ্গিয়ে বিএনপি জামায়াতের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়া হয়।

কিন্তু ইয়াজউদ্দীন আহমদের নের্তৃত্বাধীন সরকার বিএনপি-জামায়াত জোটের এবং তারেক রহমান ও হাওয়া ভবন ওয়ালাদের প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপে মেরুদণ্ডহীন কাঠের পুতুলে পরিনত হয়। তদুপরি ইয়াজউদ্দীন আহমদ নিজের নানা বিতর্কীত ভূমিকায় জনগণের আস্থা হারালে সে সরকারের বিরুদ্ধেও গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। ফলে তাঁর সরকার নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ হয়। ফলে অনিবার্য হয়ে ওঠে ওয়ানইলিভের। এ সরকার এসেও নানা বিতর্কিত কাজে জড়িয়ে পড়ে। নব্বই দিন মেয়াদের সরকার দুই বছর ক্ষমতায় থেকে পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটিকেই বিতর্কিত করে তুলে।

যে বিএনপি একদা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায় সরকার পদ্ধতিকে শিশু ও পাগলের সাথে তুলনা এ পদ্ধতিতে আসতে বাধ্য হয়েছিল, সেই বিএনপিই আজ আবার উচ্চাদালতের রায়ে অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পরও ত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল রাখার জন্য সরকার পতনের হুমকী দিচ্ছেন, তা তিনি দিতেই পারেন। তিনি যে এখন বিরোধী দলের নেত্রী।

এ প্রসংগে প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গফফার চৌধুরীর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করেই লেখার ইতি টানবো। তিনি ৯ আগস্ট ২০১২ এক শীর্ষস্থানীয় সহযোগী পত্রিকায় বলেছেন,“মিসেস খালেদা জিয়া এখন প্রত্যেক ডুবেই মুক্তা পাবেন ভাবছেন। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকে লতিফুর ও ইয়াজউদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো ম্যানুপুলেট করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আশা করছেন। যে ব্যাপারটিকে বিএনপি একাধিকবার রেপ করতে পেরেছে, ভবিষ্যতেও তা করতে পারবে বলে আশা করছে। এই ব্যবস্থাটিকে বিএনপি পরবর্তীকালে নিজেদের পোষ্য পক্ষে নিয়ে কিভাবে দুর্বৃত্তে পরিনত করে তার প্রমাণ আমরা লতিফুর ওরফে শান্তি মিয়ার এবং ইয়াজউদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেখেছি…অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ক্রিমিনাল চরিত্র সম্পর্কে বলেন, অপরাধীরা একবার যে অপরাধ করে সফল হয় তা বার বার করার জন্য উৎসাহিত হয়।” এ উদ্ধৃতি দিয়ে জনাব আবদুল গফফার চৌধুরী কি বোঝাতে চেয়েছেন কারো কারো বোধগম্য না হলেও অনেকেরই আবার বোধগম্য হবে।

পরিশেষে এই বলেই শেষ করতে চাই এই সরকারের মেয়াদ আছে মোটে এক বছরের মতো। এই সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুমকীধমকী না দিয়ে সংসদে যোগ দিয়ে যথাযথ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কিভাবে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা যায়, তার ব্যবস্থা করা। এ সময়ে আন্দোলন করে জনগণের ভোগান্তির সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছুই করা যাবেনা। সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটানোর কথা শিশু ও পাগল ছাড়া কেউ বিশ্বাসও করবেনা।