ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

সম্প্রতি ‘দি ওয়াল ষ্ট্রিট জার্নাল’–এ বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ করে ‘Dhaka Forceloses the grameen brand’ শীর্ষক লিখিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের অপসারিত ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ড. ইউনুসের পক্ষে প্রকাশ্য দালালিতে মেতে উঠেছেন । দালালি তিনি করতেই পারেন, এটা তার নিজস্ব ব্যাপার, কিন্তু ওই নিবন্ধে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানিয়েছেন ইউনুস ইস্যুতে শেখ হাসিনা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর মতো বাংলাদেশ সরকারকে ‘perceived as a corrupt government’ বলার মতো ধৃষ্টতা দেখাতেও কসুর করেননি। তাই আমেরিকাসহ তাদের তল্পিবাহকদের সীমাহীন বিরোধীতা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম বিরোধিতা সত্বেও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একজন নাগরিক হয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না জানিয়ে পারছিনা ।

আমরা সকলেই কম বেশী জানি যে, দেশে একটি সামরিক শাসকের সময়ে ৩০ বছর আগে গ্রামীণ ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই ড. ইউনূস এ ব্যাংকটির ব্যাবস্থাপনা পরিচালক(এমডির) দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ড. ইউনুস বাংলাদেশের তিনটি সামরিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করে গ্রামীণ ব্যাংকে একজন একনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং এ ব্যাংকটিকে সুদখোর মহাজনী প্রতিষ্ঠানে পরিনত করেছিলেন । এই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উচ্চহারে সুদ পরিশোধ করতে না পেরে কত নিরীহ অসহায় মানুষ যে, ঋণের জালে আটকা পড়ে দেউলিয়া হয়ে আত্মহত্যা করেছেন, তার সাক্ষী বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকাই। তাই এ বিষয়ে আমি আর লেখার কলেবর বাড়াতে চাইনা ।
শুধু এইটুকুই বলবো এক পর্যায়ে এসে গ্রামীণ ব্যাংক নানা অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হলে বর্তমান সরকার এ অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য গ্রামীণ ব্যাংকে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় । এবং প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই ব্যাংক আইন তোয়াক্কা না করে এক ব্যক্তির ৩০ বছরেরও বেশী সময় ধরে এমডির পদে আঁকড়ে থাকা ড. ইউনুসকে অপসারণ করে। এর পর থেকেই ড. ইউনুস তার পশ্চিমা প্রভুদের কাছে নালিশ করে এর প্রতিকার চাইতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। আর পশ্চিমারাও তাদের তাবেদার ড. ইউনুসকে নিয়ে সরকারের সাথে প্রথমে অদৃশ্য ও পরে দৃশ্যমান স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, এবং গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি হিসেবে ড. ইউনুসকে পুনর্বহালের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এ নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মাজীনা ড. ইউনুসের পক্ষে প্রকাশ্যে দূতিয়ালী শুরু করে । পরবর্তীতে হিলারী ক্লিনটনও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য চাপ সৃষ্টি করে। সরকার তাদের কথা মতো ড. ইউনুসকে গ্রামীণব্যাংক পুনর্বহাল না করার প্রতিশোধ হিসেবেই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশ সরকারের পদ্মাসেতু ঋণচুক্তি বাতিল করে দেয়।

কিন্তু হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া পদ্মাসেতু প্রকল্পে বায়বীয় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণ মঞ্জুর স্থগিত করে দেয়। বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি এডিবি, জাইকা ও আইডিবিও অর্থছাড় স্থগিত রাখে। ফলে পদ্মাসেতু তৈরী নিয়ে সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তার। সরকারও সেতু তৈরীর দৃঢ় অঙ্গিকার নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে পদ্মাসেতু নির্মাণচুক্তি স্থগিত প্রশ্নে একটি দেশবিরোধী চক্রের তৎপরতার কথা প্রকাশ হতে থাকে, যে চক্রের ইন্ধনদাতা বিগত বিএনপি জামায়াত জোট সরকার। গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যাবস্থাপনা পরিচালক নোবেল লরিয়েট ড. মুহম্মদ ইউনুছ এ চক্রের হোতা হিসাবে সব কলকাঠি নেড়ে এ ঋণচুক্তি স্থগিত রেখেছে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় যখন বিশ্বব্যাংক ঋণের টাকা ছাড়ের সাথে ড. ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে পুনঃনিয়োগের শর্ত জুড়ে দেয়। সরকার থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত দাবি জানায় পদ্মাসেতু প্রকল্পে কে বা কারা দুর্নীতি করেছে তা প্রকাশের। দুর্নীতির অভিযোগ প্রশ্নে দেশের অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে আরো একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, যে পদ্মাসেতু প্রকল্পে কোনো ঋণই ছাড় হলোনা সেখানে দুর্নীতি হয় কিভাবে? তারপরও সরকার নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণের জন্য পদ্মাসেতু প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দেখার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন দুদককে দায়িত্ব দেয়। দীর্ঘদিন তদন্ত করে দুদকের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয় যে, পদ্মাসেতু প্রকল্পে তারা কোনো দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি। এতদিনে স্পষ্ট হয়েছে আসলে দুর্নীতি-ফুর্নীতি কিছু নয়, যে ড. ইউনুস বাংলাদেশে আমেরিকার স্বার্থে কাজ করত সেই ড. ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিদায়ের পরে আমেরিকার স্বার্থ দেখার মতো এমন বিশ্বস্ত ও অনুগত এজেন্টের পতনের কারণে বর্তমান সরকারের ওপর আমেরিকা নাখোশ হয়ে তাদেরই নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের ঋণ স্থগিত করে দিয়ে এক রকমের প্রতিশোধ নিচ্ছে।
সর্বশেষ উইলিয়াম বি মাইলাম ইউনুসের পক্ষে প্রকাশ্য দালালীতে নেমে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর মতো সরকারকে দুর্নীতিবাজ বলার মতো ধৃষ্টতা পর্যন্ত দেখিয়েছেন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে মাইলামের এ ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদ ও ঘৃণা জানাই।