ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বর্তমানে আমাদের দেশে মাদকের বিষাক্ত নীল থাবা এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে, এই নীল নেশার ছোবলে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ধীরে ধীরে আঁধারের তলহীন গহবরে তলিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে দিনে দিনে মাদকের ভয়াল থাবা সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে অস্থির, হতাশগ্রস্ত ও মেধাশূণ্য করে তুলছে। মাদকের নীল নেশায় আক্রান্তদের মধ্যে কিশোর, তরুণ ও যুব সমাজ ও যুব মহিলাদের সংখ্যা ৮০ শতাংশের মতো হলেও বাদ বাকি ২০ শতাংশ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার সাধারণ মানুষ। মাদকাসক্ত বিভিন্ন রোগীর কেস স্টাডি করে দেখা গেছে যে, এদের সিংহভাগই পারিবারিক নানা অশান্তি ও টানাপোড়েনের কারণে হতাশগ্রস্ত হয়ে নেশার জগতে এলেও কেউ কেউ আবার বন্ধু-বান্ধবের পাল্লায় পড়ে শখেরবসে একটু আধটু মাদক সেবন করতে করতে পরবর্তীতে পুরোপুরি নেশাগ্রস্ত হয়ে নেশার নিষিদ্ধ জগতে প্রবেশ করছে।

উঁচু তলার মানুষের কাছে নাকি নেশা করাও এক ধরনের স্টেটাস। আর যারা মাদক সেবন নিয়ে কথা বলে ও সমালোচনা করে তারা হলো সাবেকী আমলের তাদের ভাষায় ‘ব্যাকডেটেড’। তাই স্টেটাস মেনটেইন করতেই হাই সোসাইটি লোকজনদের অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও বারিধারার অনেক বাড়িতেই আজকাল মাদক সেবনের আসর বসে। সেই হাই সোসাইটির সন্তানেরাই আজকাল মা-বাবার দেখাদেখি নিজেরাও মাদকসেবী হয়ে ওঠেছে। আমাদের সমাজের নিন্ম শ্রেণী থেকে শুরু করে উঁচুতলার লোকজনও এখন রাত হলেই বিভিন্ন জায়গায় নেশার আড্ডায় মেতে ওঠে। হতাশজনক নির্গ্রিহিত জীবনের কষ্ট থেকে পালিয়ে বাঁচতে নিন্ম শ্রেণীর মানুষ নেশা করলেও উঁচু শ্রেণীর লোকদের কাছে নেশা করা রীতিমতো স্টেটাস ও আভিজাত্যের যায় এমনই একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে মাদক হিসেবে হেরোইন, চরস, গাঁজা, কোকেন, ফেনসিডিল ও হাল আমলে ‘ইয়াবা’ মাদকদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসলেও এর সাথে ইদানিং নতুন সংযোজিত হয়েছে পশু অজ্ঞান করার ওষুদ ‘ক্যাটামিন’ মানুষের জন্য প্রাণঘাতি এ ওষুধটি। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানীরা নেশার জগতে নিত্যনতুন নেশার দ্রব্যটি আমদানী করছে। নেশা করে এমন কয়েক জনের নিজেদের জবানী থেকে জানা গেছে যে, নেশার কোনো নিদ্দিষ্ট দ্রব্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে শরীরের এর কার্যকারিতা কমে যায়। তাই নেশায় আসক্তরা যেমন নতুন জিনিস খোঁজে তেমনি মাদক ব্যবসায়িরাও নতুন নতুন মাদকদ্রব্য সরবরাহ করে আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে চিরতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এ সংক্রান্ত ভয়াবহ খবরটি বেরিয়েছে ৩০ আগস্ট ২০১২ দৈনিক জনকন্ঠে “এবার নেশার রাজ্যে পশু অজ্ঞানের ওষুধ ক্যাটামিন” শীর্ষক প্রতিবেদনে মাদকদ্রব্য হিসেবে নতুন সংযোজিত পশু অজ্ঞান করার ওষুদ ‘কেটামিন’ সন্মিন্ধে যতটুকু জানা গেছে তা হলোঃ দেখতে অনেকটা চিনির মতো। চিনির চেয়ে একটু বড় দানাদার। এটি তরল অবস্থায় পান করে নেশা করা যায়। আবার ইনজেকশনের মাধ্যমেও গ্রহণ করার পাশাপাশি হেরোইনের মতো ধোঁয়া সৃষ্টি করেও নেশা করে মাদকসেবীরা। তবে বাংলাদেশে এখনো এটা উঁচুতলার গন্ডি পেরিয়ে সাধারণের কাছে পৌঁছেনি। তবে সাধারণের কাছে এটি পৌঁছলে ভয়াবহ সর্বনাশ ডেকে আনবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সম্প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে শুল্ক কর্মকর্তারা অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ২০ কেজি মাদকদ্রব্য আটক করে। এ সময় আটক হয় ইলারমুরুন্ড মারোখামুতু নামক এক ভারতীয় নাগরিকও। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায় ক্যাটামিন বাংলাদেশের নেশার জগতে প্রবেশ করানোর জন্য এ চালান আনা হয়েছে। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে‘ নেশার রাজ্যে কখন যে কোনটা স্থান করে নেয় তা বলা খুবই কঠিন। একটি নিষিদ্ধ করা হলে আরেকটি বিকল্প নেশার দ্রব্য বেছে নেয়া হচ্ছে অতি দ্রুত। এভাবেই পশু অজ্ঞান করার ওষুধ ক্যাটামিনও বাংলাদেশের নেশার জগতে প্রবেশ করেছে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে দিনে দিনে আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাদকের যে ভয়াল থাবা বিস্তার করেছে তা ভাবতেই গা শিহরে ওঠে। এ বিষয়ে সম্মিলিত সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে মাদকসেবীদের মাদকমুক্ত জীবনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানীদের ও প্রতিহত করতে হবে। কোনো সরকারের একার পক্ষে কখনো এত বড় একটি সামাজিক সমস্যা মোবাবেলা করা সম্ভব। তাই আমাদের বর্তমান প্রজন্মের যুবা ও তরুণদেরই এই ভয়াবহ সামাজিক সমস্যাটি প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। একই সাথে এগিয়ে আসতে হবে প্রত্যেক পরিবারের প্রধান মা-বাবাকে। আর একদিনও দেরি না করে আসুন সবাই মিলে আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে মাদকের নীল নেশার হাত থেকে রক্ষা করি।