ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

ব্যারিষ্টার রফিকুল হক আজকাল মাঝেমধ্যেই মিডিয়ায় নানা ধরনের বক্তব্য প্রদানের কারণে আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছেন। আলোচিত হচ্ছেন বিএনপি’র নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কাছে আর সমালোচিত হচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছে। কিছুদিন আগে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী এমপিদের গালমন্দ করে তিনি আওয়ামী ঘরাণার লোকদের বিরূপ সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। আর বাহবা কুড়িয়েছিলেন বিএনপি ঘরাণার লোকদের। ইদানিং আবার তিনি আগবাড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছেন। ব্যারিষ্টার রফিক-উল-হক স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে এ্যার্টনী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যতটা না পরিচিতি লাভ করেছিলেন তা থেকে বেশী পরিচিতি লাভ করেছিলেন ওয়ান ইলেভেনের পর দুই নেত্রী হাসিনা খালেদার মামলা পরিচালনা করে। সেই কারণে তিনি সে সময় মোটামুটি হিরো বনে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক/এগারোর পর দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শুরু হওয়ার পর অনেকটা বিরোধী দলের নেতার ভুমিকায় অবতীর্ণ হন তিনি। কখনো প্রয়োজনে আবার কখনো অপ্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য বর্তমান সরকারকে নছিয়ত করে মিডিয়ায় বক্তব্য প্রদান শুরু করেন। এতে বিএনপির হাততালী পেলেও উচ্চাদালত কর্তৃক অবৈধ ও বাতিলকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে প্রচারনায় অংশ গ্রহণ ও বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলসহ গণঅনশন কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে সরবত খাইয়ে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার অনশন ভাঙানোর পর থেকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই পরিস্কার হয়ে যায় এবং নিয়মিত বিএনপির ঘরাণার বুদ্ধিজীবীদের আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিরোধী দলের নেতাদের মতো সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সমালোচনা করে পত্র-পত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন।

তবে সব চেয়ে বড় শিারোনাম হয়েছেন ড. ইউনূসের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকার ও মন্ত্রীদের সমালোচনা তাঁকে আরো পাদপ্রদীপের নিচে নিয়ে আসে। এই মাত্র কিছুদিন আগে ড. ইউনুসের সমালোচনা করায় শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়াকে ‘ড.ইউনুসের নখের যোগ্য নয়’ এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে ‘বেকুব’ বলে গালমন্দ করেছেন। তাঁর এ গালমন্দ নিয়ে দেশে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে অনেক। ওনার মতো একজন শ্রদ্ধাভাজন মুরব্বি পেশাজীবীর মুখ থেকে অন্য শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ-সব উচ্চারণ শুনে সচেতন নাগরিকরা যেমন বিব্রত হয়েছে তেমনি সরকার পক্ষের লোকজন তাঁর প্রতি বিরূপ ওঠেছেন। তিনি সবাইকে কম কথা বলার উপদেশ দিয়ে নিজেই বেশি কথা বলে ইমেজ হারানোর পথে।
অনেকেই বলাবলি করছেন-ইদানিং তাঁকে মিডিয়া ফবিয়ায় পেয়ে বসেছে। তাই তাকে এখন প্রায়ই বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশো’ মাতিয়ে সরকার ও জনগণকে উপদেশ খয়রাত করে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া কাদের সিদ্দিকী, কল্যাণ পার্টি ওয়ালাদের নিয়ে একক বক্তৃতার অনুষ্ঠানও করে বেড়াচ্ছেন মাঝে মাঝে। কিছুদিন আগে এমনই এক একক অনুষ্ঠান নিয়ে একটা মজার ও হাস্যকর খবর পড়েছিলাম একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকায়। খবরটির শিরোনাম ছিল: ‘একক অনুষ্ঠানে একক শ্রোতা’ খবরট এখানে উদ্ধৃত করছি-‘মুক্ত চিন্তা ফোরাম নামের একটি সংগঠন রাজধানীর পুরানা পল্টনে ফটোজার্নালিষ্ট এ্যাসোসিয়েশনের মিলনায়তনে হত্যা, গুম, অপহরণ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময় ছিল পৌনে ১১ টা। ব্যারিস্টার রফিকুল হক সেখানে উপস্থিত হন নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগে। কিন্তু মিলনায়তনের দর্শক শ্রোতা সারিতে দু’জন শ্রোতা থাকায় অনুষ্ঠান শুরু হয় ১১ টায়। এ সময় ও শ্রোতার সংখ্যা ছিল ৭-৮ জন । এ দৃশ্য দেখে মঞ্চে ওঠে চেয়ারে বসেই আয়োজকদের উদ্দেশ্যে রফিক-উল-হক বলে ওঠেন, ভালই হলো একক বক্তৃতার অনুষ্ঠানে একক শ্রোতা।’ তিনি আজকাল যে সব কথা বলছেন তাঁর এ-সব বক্তব্য ও কথায় একপক্ষ হাততালি দিলেও অন্য পক্ষ হচ্ছে নাখোশ। এ-নিয়ে এখন তাঁর ইমেজ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যারিষ্টার রফিক-উল-হক একজন বিজ্ঞ আইনজ্ঞ; আপনাকে জ্ঞানদানের ধৃষ্টতা আমার নেই। তবু তাঁর কাছে জানতে ইচ্ছে করে আন্তর্জাতিকতার কথা বাদ দিলাম, দেশের কোনো সংঘাত, সংঘর্ষ, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সমস্যা নিরসনে কি কোনোকালে কোনো ভূমিকা রেখেছেন? বা বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ বিগ্রহ, জাতিতে জাতিতে হানাহানি সংঘাত প্রতিরোধে কোনো টু শব্দ কি করেছেন? তা ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-, একুশে আগস্ট নৃশংস গ্রেনেড হামলা, বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বোমা হামলাসহ এসএমএস কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টার, মমতাজউদ্দিনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা সাংবাদিক বালুসহ বিভিন্ন সাংবাদিক হত্যাকা-ের কি প্রতিকার চেয়েছেন? বা দেশের ভেতর বোমা হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা যে এত মানুষ হত্যা করলো বা বিচারালয়ে বোমা মেরে দুই বিচারককে হত্যা করলো এর কি কোনো প্রতিকার চেয়েছিলেন? বা চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে আপিনি কি কোন জোরালো ভূমিকা রেখেন? আমরা কিন্তু আপনার পক্ষ থেকে দেশ-জনতার পক্ষে কোন আয়োজনে আপনাকে কখনো দেখেছি বলে মনে করতে পারছিনা।

এরশাদ সরকার পতনের মাধ্যমে এ্যার্টনী জেনারেলের পদ হারানোর পর থেকে আইন পেশার বাইরে রাজনীতির মাঠে ব্যারিষ্টার রফিক-উল-হককে কতবার দেখেছে? কিন্তু হঠাৎ করে বলতে গেলে একেবারে শেষ বয়সে এসে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে ওনার আক্রমনাত্মক বক্তব্য-বিবৃতি, কেউ না চাইলেও গায়ে পড়ে বা আগবাড়িয়ে দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপ আয়োজনে নিনিয়ানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, দেশের রাজনীতি নিয়ে এতো দৌঁড়ঝাপ দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ কিন্তু বাঁকাচোখে দেখছে। সেই বাঁকাচোখের দেখা এখন কপালে ওঠেছে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে মুক্তচিন্তা ফোরাম আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে আগবাড়িয়ে আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার ইচ্ছা পোষণের পর। সেই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের ‘নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হওয়ার প্রস্তাবে আপনি রাজি আছেন কি-না’ এমন এক প্রশ্নের জবাবে ব্যারিষ্টার রফিক-উল-হক বলেন,‘যদি সে রকম অকেশন আসে দেশের জন্য, দুই পার্টির জন্য সব ধরনের রেসপন্সিবিলিটি নিতে রাজি আছি।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর সেদিন রাত দশটার মধ্যেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অন্যতম নীতি নির্ধারক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ব্যারিষ্টার রফিক-উল-হকের মতোর বিজ্ঞ ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের প্রধান হলে আমাদের আপত্তি নেই। এবং পর দিন জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবিধানিক অধিকার ফোরামের এক আলোচনা সভায় এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন,‘সঙ্কট উত্তরণে ব্যারিষ্টার রফিকের পরামর্শ শুনুন’ জাতীয় বক্তব্যে এ বিতর্কের পালে আরো বাতাস লাগে। ড. খন্দকার মোশাররফের এ অনাপত্তির কথা শোনে ব্যারিষ্টার হক যখন উত্তেজনায় টকবক করছিলেন তখনই তাতে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুব-উল-আলম হানিফ। তিনি ব্যরিষ্টার রফিক-উল-হকের এ প্রস্তাব বা ইচ্ছা পোষণের বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন,‘আগামী সরকার হবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনেই। তাঁর মতো একজন প্রবীণআইনজীবীর কাছ থেকে এ অসাংবিধানিক দাবীর প্রতি সমর্থন ও প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার খায়েস জাতি আশা করেনি। তিনি আরো বলেন,‘ওয়ান ইলেভেনের পর দেশের দুই নেত্রীর মামলা পরিচালনা করে তিনি নন্দিত হয়েছিলেন। কিন্তু বিগত সময়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনশন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ‘আমাদের নেত্রী, আমাদের নেত্রী, আমাদের নেত্রী’ বলে ব্যরিষ্টার রফিক-উল-হক তাঁর নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। ব্যারিষ্টার রফিক-উল-হকের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায় সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার ইচ্ছা পোষণের ব্যাপরে আমেরিকায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অধিবেশনে যোগদান করতে যাওয়া ও সেখানে অবস্থানরত প্রবাসীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, আমরা আর কোন অসাংবিধানক ও অনির্বাচিত ব্যক্তির হাতে দেশের নির্বাচনকালীন শাসনভার ছেড়ে দিতে রাজি নই। তাছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ায় এখন কোন অনির্বাচিত ব্যক্তির সরকার প্রধান হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তিনি ব্যরিষ্টার হকের প্রতি ইঙ্গিত করে স্বভাবসুলভ চুটকি কেটে বলেন-গ্রামের হাটে এক লোক সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে হঠাৎ বললেন-‘মুই কার খালুরে’।

বাজারে এখন একটি কথা বেশ চাউর হচ্ছে যে, কোনো বিশেষ মহল থেকে নাকি ব্যারিষ্টার হককে এমন সিগনাল দেয়া হয়েছে যে তারা আগামীতে ক্ষমতায় যাবেই এবং ক্ষমতায় গেলে এমাজউদ্দিন ও মনিরুজ্জামান মিয়াকে বাদ দিয়ে তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানাবে। সে আশ্বাসের প্রেক্ষিতেই জনাব ব্যারিষ্টার হক এমন বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তা তিনি করতই পারেন এটা তাঁর গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার। তাই বলে তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের মুখ থেকে বিতর্ক সৃষ্টি করে এমন উচ্চারণ শুনলে আমাদের সকল আস্থার জায়গাটি যে নষ্ট হয়ে যায়! আমাদের আস্থা ও ভরসার জায়গাটি নষ্ট করবেন না ব্যারিষ্টার সাহেব।