ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

দেশের ভেতর রাজনীতির বাইরে এখন সবচেয়ে তিনটি আলোচিত বিষয় রামু, উখিয়া ও পটিয়ায় বৌদ্ধবিহারে হামলা ও নাশকতা, হলমার্ক কেলেঙ্কারী ও ডেসটিনি’র কর্মকর্তাদের কর্তৃক শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং। এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে সবচেয়ে সেনসেটিভ বা স্পর্শকাতর ইস্যু বা ঘটনাটি হলো বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে রামু, উখিয়া ও পটিয়ার বৌদ্ধ বিহার বা মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নাশকতার বিষয়টি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে নাড়া দেয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার পাশাপাশি তাতে রাজনৈতিক রঙ মাখানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

আমরা সবাই জানি যে, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে খ্রীষ্টান ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বিরা হলো খুবই নিরীহ প্রকৃতির। তারা সব সময়ই চেষ্টা করে রাজনীতি ও ধর্মীয় নোংরামি থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখতে। এদের মধ্যে সবচেয়ে নিরীহ হলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিরা। তবু কেন তাদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা চালানো হলো, কেন তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে দীর্ঘদিনের বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুনামকে ধূলোয় মিশিয়ে দিল? কারার এর মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলো এসব প্রশ্ন এখন দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে ঘোরপাক খাচ্ছে।

যে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে পরিচিত, সেই পরিচিতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। এর পিছনের কাদের স্বার্থ জড়িত তা নিয়ে দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষ এর চুলচেড়া বিশেষণ করছে। এই সহিংসতার পেছনে যে রাজনীতি মুখ্য ভূমিকা পালন করছে, তা বেড়িয়ে এসেছে দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও সরকারী বেসরকারী কিছু তদন্ত প্রতিবেদনেও। যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ সরকারী ও বেসরকারী তদন্ত প্রতিবদনকে সরকারের ডিকটেড করা ড্রাপ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ঘটার প্রায় পর পরই বিএনপি নেত্রীবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায় এবং সেখান থেকে ফিরে ২ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের নেতৃত্রে ৮ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ তদন্ত কমিটি ৫ ও ৬ অক্টোবর ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করে ৬৭ পৃষ্ঠার যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর মওদুদ আহমদ দাবি করেছেন,‘তদন্ত কমিটি দলীয় হলেও তিনি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেছেন।’ কিন্তু তাঁর এ একপেশে তদন্ত প্রতিবেদন শুধু সরকার নয়, দল নিরপেক্ষ সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এর কারণও আছে-ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে মওদুদদ আহমদ এর জন্য প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ি করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরই হঠাৎ করেই তার বক্তব্যের গণেশ উল্টে যায়। এর পর তিনি বলেন,‘এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত ঘটনা। …সরকারের ইন্দনে এ হামলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন,‘বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র বানিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সরকার পরিকল্পিতভাবে বৌদ্ধবিহারগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। মওদুদ আহমদ তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলেন, ‘এ হামলার পেছনে দুইটি উদ্ধেশ্য থাকতে পারে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য দেশে অস্থিতিশীল একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে বাংলাদেশ জঙ্গিরাষ্ট্র হওয়ার ভয় দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের একটি কৌশল গ্রহণ করা। সরকার জানে সুষ্ঠু অবাদ নির্বাচন হলে তারা হেরে যাবে।’ এ রিপোর্ট যেমন কোনো মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এক প্রতিক্রিয়ায় মওদুদের তদন্ত প্রতিবেদকে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন,‘রামুর ঘটনায় খালেদা ও মওদুদের বক্তব্য গোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি তার ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়ায় আরো বলেন,‘ক্ষমতার মোহে ঘন ঘন দল পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গনে যিনি ‘ডিগবাজি মওদুদ’ নামে পরিচিত সেই ব্যারিষ্টার মওদুদের কথাবার্তা, আচরণ, কার্যকলাপ সম্পর্কে বিএনপির অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র গণতন্ত্রপ্রিয় শক্তিকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। রামুর ঘটনায় বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিএনপি নেতা ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যের জবাব দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। ‘আওয়ামী লীগ কি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ? সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে জনাব হালিফ বলেন,‘আওয়ামী লীগের কাছে সকল ধর্মের নাগরিক নিরাপদ। সকল ধর্মের মানুষও মনে করে তাদের একমাত্র আস্থার স্থল হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রতি সব ধর্মের মানুষের এ আস্থা বিশ্বাসে চিড় ধরাতেই পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।’

সরকারও প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত দলের অন্য তিনজন সদস্য হচ্ছেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা হাকিম, বান্দরবান পুলিশ সুপার ও কক্সবাজার পুলিশ সুপার। ইতিমধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে। সরকার গঠিত এ তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা অনেকটা এমন,‘ঘটনা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারার ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনকে দায়ি করে ওই তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়,‘ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুনাম নষ্টা করতে এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই নেক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। রামু, উখিয়া ও পটিয়ার বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লী পুড়িয়ে দিতে গান পাউডার ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে বলা হয়,‘গান পাউডারের মতো রাসয়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলেই স্থানীয় পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যেত।’

এইতো গেল সরকার ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রামু, উখিয়া ও পটিয়ায় বৌদ্ধবিহারে হামলা ও নাশকতা, তদন্ত প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। কিন্তু এ কয়দিনের মিডিয়া ও পত্র-পত্রিকার সংবাদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, একটি মৌলবাদী চিহ্নিতগোষ্ঠী ও তাদের পৃষ্ঠাপোষক রাজনৈতিক দলের উগ্রপন্থী নেতাকর্মীরা ‘সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেইসবুকে’ ইসলামের প্রতি অবমাননামূলক স্টেটাস ও ছবি আপলোড করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের চেষ্টাা করেছে একই সাথে দেশে ও বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংসের অপচেষ্টা হিসেবে ওইসব এলাকার বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লীকে ধ্বংসাত্বক কর্মকান্ড পরিচালনা করে। কোনো কোনো লেখকের কলাম ও আলোচনা থেকে জানা যায় যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করাসহ সরকার যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তা বিশ্ববাসী বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মীয় বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুন্ন করার জন্যই এই নেক্কারজনক হামলা চালিয়েছিল। এতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদেরও যোগসাজশ আছে। বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পূর্ব নির্ধারিত চীন সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালিয়ে বৌদ্ধ অধ্যুষিত গণচীন সরকারের কাছে নালিশ জানানোর একটা অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুনামকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতেই পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। যাতে আগামী নির্বাচনে বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলো বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

এই বলেই শেষ করতে চাই যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গোষ্ঠী সব সময়ই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এই গোষ্ঠীকে দেশের মানুষ চিনে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পরও বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সে নির্যাতনের ক্ষত এখনো দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছে। সুতরাং আগবাড়িয়ে তদন্ত কমিটি করে এবং বিতর্কীত রাজনীতিবিদের একপেশে তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে কিছুতেই মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবেনা। তাদের এ বিভ্রান্তির প্রচেষ্টা‘ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনা’র মতোই প্রতিভাত হবে।