ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আগামীকাল ১৪ নভেম্বর বসতে যাচ্ছে নবম জাতীয় সংসদের ১৫তম অধিবেশন। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে এ অধিবেশনেও যোগদান করবে না বিএনপির নের্তৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সাংসদরা। দীর্ঘদিন থেকে তারা সংসদ বর্জন করার কারণে জনমনে দেখা দিয়েছে হতাশা। বিশেষ করে যে সমস্ত সংসদীয় আসন থেকে বিরোধী দলীয় সাংসদরা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, সে এলাকার জনগণের হতাশা আরো বেশি। কেননা, যাদেরকে ভোট দিয়ে এলাকার উন্নয়ন ও নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলার জন্যে সংসদে পাঠিয়েছেন, লাগাতর সংসদ বর্জনের মাধ্যমে তাদের এলাকার সংসদ সদস্যরা জনগণকে তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন। বিরোধী দলীয় সাংসদরা সংসদ বর্জন করলেও বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় সুযোগসুবিধা কিন্তু ভোগ করছেন ঠিকই। শুধু বঞ্চিত হচ্ছে সেসব সংসদীয় আসনের জনগণ।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ হলো সরকার ও বিরোধী দলের সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই সরকার দেশের প্রয়োজনে বিভিন্ন আইন পাশ করবে উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে এ আইন প্রণয়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ চলবে। সরকার ও বিরোধী দল মিলে দেশের জন্য যা ভাল ও কল্যাণকর এমন আইন পাশ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। পাশাপাশি সাংসদরা তাদের এলাকার উন্নয়ন বিষয়ক নানাবিধ সমস্যা সংসদে তুলে ধরবে এটাই হলো নিয়ম। তাছাড়া সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল হলো সংসদের প্রাণ। বিরোধী দল হলো ‘ছায়া সরকার’ও। তাই বিরোধী দল ছাড়া কখনো সংসদ সার্বভৌম ও কার্যকরী হতে পারে না। সরকার যেমন আইন পাশ পরবে তেমনি বিরোধী দল এর গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবে। যে কোন বিলের ওপর আলোচনা ও বিতর্কে বিরোধীদল অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনবে। স্পিকার তা গ্রহণ না করলে এবং যথাযথভাবে আলোচনা বা বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিলে বিরোধী দল নিয়মতান্ত্রিকভাবে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট বা সেদিনের মতো সংসদ বর্জনও করতে পারে। আবার সংসদের ফিরে এসে সংসদের কাজে অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ও পরিতাপের বিষয় হলো আমাদের দেশে দীর্ঘদিন থেকেই বিরোধী দলকে নিয়মতান্ত্রিক সংসদীয় রীতিনীতির অনুশীলন করতে দেখতে পাচ্ছি না। ১৯৯১ সালের পর থেকে যে দলই বিরোধী দলে যায় তারা নানা অজুহাতে ৯০ দিনের কাছাকাছি লাগাতার সংসদ বর্জন করে আসছে, আবার ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতির কাছাকাছি আসলেই বেতন-ভাতা ও নানা সুযোগ সুবিধা জায়েজ করার জন্য এক দুইদিনের জন্য সংসদে উপস্থিত হয়ে বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে আবার নানা অজুহাত সৃষ্টি করে লাগাতর সংসদ বর্জন শুরু করে। যা কেবল গণতন্ত্রের রীতিনীতির পরিপন্থী নয় অনৈতিকও । আমাদের সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোন সংসদ সদস্য স্পিকারের অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ দিন সংসদের অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকলে আপনাআপনিই তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। শুধুমাত্র এ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কারণেই অনুপস্থিতির ৯০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে এক দু’দিনের জন্য সংসদ বর্জনকারী সাংসদরা সংসদের অধিবেশনে যোগদান করে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে থাকে। এ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হলেও সংসদ বর্জনকারী বিরোধীদলের অবস্থা দেখে মনে হয় ‘কানে দিয়েছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো’ প্রবচনটির মতো। তাদের জন্যই বোধ হয় এ প্রবচনটি বাংলাভাষায় সংযোজিত হয়েছে।

বর্তমান ৯ম জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় কে কত দিন সংসদ বর্জন করেছেন তা নিচের তথ্য থেকে জানা যাবে। বাংলাদেশে সংসদ বর্জনের ইতিহাসে চলিত সংসদের ১৪তম অধিবেশন পর্যন্ত মোট কার্যদিবস ছিল ৩২৭টি। এর মধ্যে ২৭৩ দিন সংসদ বর্জন করে বিএনপি রেকর্ড গড়েছে। কেননা, সংসদ বর্জনের ইতিহাসে এর আগে আর কোনো বিরোধী দল এতদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকেনি। বিএনপি ১৫ তম অধিবেশন বর্জন অব্যাহত রাখলে অনুপস্থিতি দিবসের সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যাবে। ৯ম জাতীয় সংসদে বিএনপি দলীয় সাংসদরা ৫৪ কার্যদিবস উপস্থিত থাকলেও বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৮ কার্যদিবস।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ৫ম জাতীয় সংসদের (১৯৯১-১৯৯৬) মেয়াদ পর্যন্ত ২৬৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ১৩৫ দিন সংসদ বর্জন করে। ৭ম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ২১৯ কার্যদিবসের মধ্যে ১৬৩ কার্যদিবস সংসদ বর্জন করে। অষ্টম জাতীয় সংসদের ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করে ২২৩ কার্যদিবস। সেই সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন ৪৫ কার্যদিবস। ৭ম জাতীয় সংসদের (১৯৯৬-২০০১) সংসদ অধিবেশনে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন ২৮ দিন। সংসদ সচিবালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় চলিত নবম জাতীয় সংসদের ১২ তম অধিবেশনের আগে সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ মার্চ অষ্টম অধিবেশনের শেষ কার্যদিবসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অধিকাংশ সংসদ সদস্য সংসদে গিয়েছিলেন। এরপর ৯ম, ১০ম ও একাদশ তিনটি অধিবেশন তারা একটানা বর্জন করেন। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি ১ম অধিবেশন শুরুর দিনে বিএনপি নেতৃত্বধীন বিরোধী দলীয় সদস্যরা অধিবেশনে যোগদান করলেও এর পরের অধিবেশনেই সংসদ বর্জন শুরু করে। এর পর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে সংসদ বর্জন অব্যাহত রাখলেও অনুপস্থিতির ৯০ কার্যদিবস পূর্ণ হওয়ার আগেই সংসদের অধিবেশনে যোগদান করে তাদের বেতন-ভাতা ও সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন।

১৯৯১ সালের পর থেকেই যে যখন বিরোধী দলে থাকে তারা বিভিন্ন উছিলায় সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি বজায় রাখে। তবে এবার সংসদ বর্জনের রেকর্ড গড়লো বিএনপি। একই সাথে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সংসদে যোগদানের দিক থেকে বেগম খালেদার জিয়ার চেয়ে বেশ এগিয়ে আছেন। দুই মেয়াদে বেগম জিয়া বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে সংসদে উপস্থিত থেকেছেন মাত্র ২৮+৮ দিন= ৩৬ দিন। পক্ষান্তরে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা দুই মেয়াদে সংসদে উপস্থিত থেকেছেন একশ’ কর্মদিবসের উপরে। সুতরাং সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি চালু হওয়ার পর সংসদ বর্জনের দিক থেকে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বিএনপি ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

সুতরাং নীতি ও নৈতিকতার দিক বিবেচনায় বিরোধী দলের (যে ই হোক) সংসদ বর্জনের রাজনীতি কতটা যুক্তিযুক্ত, তার ব্যাখ্যা চাইলে কেউ দিতে পারবেন না। যারা দেশে চালাবে, আইন করবে তারাই যদি নানা অজুহাতে আইন ভঙ্গ করে; তা হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনীতিবিদদের শ্লোগানে মানুষ বিশ্বাস করবে কিভাবে? তবে টানা বা লাগাতার যে ভাষায়ই বলি না কেন সংসদ বর্জনের ব্যাপারে একটা বিহিত করা উচিৎ। তা না হলে আগামী নির্বাচনে যারাই ভোট চাইতে যাবে তাদের কাছে আগাম অঙ্গিকার আদায় করতে হবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে আর সংসদ বর্জন করবে কি না। যারা সংসদ বর্জন করবে তাদের ভোট দেবো না আমরা।