ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার পরামর্শে (এসব নেতাদের অনেকেই আবার তারেক রহমানের আর্শীবাদপুষ্ট) ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে না পারার খেসারত বিএনপিকে কতদিন দিতে হবে তা-ই নিয়ে শঙ্কিত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এখন কারও ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। অবস্থায় খালেদা জিয়া এখনদলের ভেতর একমাত্র ভরসা বিএনপির ‘গোয়েবলস মেশিন’ রিজভী ও তার কিছু চেলা-চামুন্ডর ওপর আর এর বাইরে তিনি এখন নিয়মিতবিএনপি সমর্থক কিছু বুদ্ধিজীবীর পরামর্শকেঅধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে দলের ভেতর কোণঠাসা নেতাদের অভিমত। এখন যেন তিনি নিজের ছায়াকেও আর বিশ্বাস করতে পারছেন না। বিশ্বাস করতে পারছেন না দলের সমান্তরাল ক্ষমতাবান দলের সিনিয়ার ভাইস চেয়ারম্যান নিজপুত্র তারেক রহমানের ওপরও। কেননা, খালেদা জিয়া দেশের ভেতর বাইরের চাপে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আগ্রহী থাকলেও নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের ব্যাপারে তারেক রহমানের কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি নির্বাচন বর্জনের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।  

 

যাক নির্বাচন বর্জন বা প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করা এ নিবন্ধের মূল বিষয় নয়। মূলবিষয় হলো বিএনপির মধ্যে আস্থার সংকট। এ সংকট শুরু হয়েছে ওয়ান ইলেভেনের পর থেকেই। উল্লেখ্য, ওয়ান ইলেভেনের সময় তৎকালীন বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুইয়া ওস্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমানসাদেক হোসেন খোকাসহ দলেরঅনেক সিনিয়র নেতা যখন একে একেতাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যান, তখন থেকেই তিনি দলীয় নেতাদের ওপর আস্থা হরিয়ে ফেলেন। এরপর আব্দুল মান্নান ভুইয়াকে বহিষ্কারের পর খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব করে তাঁর ওপর আস্থা রেখেছিলেন।কিন্তু ২০১১ সালের১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার মারা যাওয়ার পর তিনি আশাহত হনএরপরই তারেক রহমানের পছন্দের লোক হিসেবে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্তমহাসচিবের দায়িত্ব দিয়ে তাঁর ওপর ভরসা রাখতে শুরু করেন খালেদা জিয়াকিন্তুদশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খালেদা জিয়ারনির্দেশমতো রাজপথের আন্দোলনে কোন ভূমিকাই রাখতে পারেননিবরংমির্জা ফখরুল নিজেই পালিয়ে গিয়ে রাজপথের আন্দোলনে মাঠে থাকা নেতাকর্মীদেরহতাশ করেনএতে খালেদা জিয়াও তারেক রহমান ও তার অনুসারীরা মির্জা ফখরুলের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।

 

একসময়ের বিএনপি নেত্রীর আস্থাভাজন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ওপর আস্থা রেখে তাকে আইনগত দিক দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১০ সালে মওদুদেরপরামর্শে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে বাড়ি ছাড়া হওয়ারপর খালেদা জিয়া ব্যারিস্টার মওদুদের ওপর শুধু মওদুদের ওপর আস্থাই হারাননি চরম ক্ষুব্ধ হনএ বিষয়টি বুঝতে পেরে চালাক ব্যারিস্টার মওদুদও কৌশলে খালেদা জিয়ার কাছ থেকে দূরে সরে থাকা শুরু করেনদশম জাতীয়সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন সরকারবিরোধী লাগাতার আন্দোলনের ছকখালেদা জিয়ার হাতে তুলে দিয়ে  ব্যারিস্টার মওদুদ বিদেশে চলে যানবিদেশে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গেযোগাযোগও রাখেননি তিনিআর এখনতো এই বহুরূপী আইনজ্ঞ খালেদা জিয়ার সাথে রহস্যময় আচরণ করছেন।

ওয়ান ইলেভেনের সময় বিএনপির রাজনীতি থেকে খালেদা জিয়াকে মাইনাসের অন্যতম রূপকার ছিলেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। কিন্তু ‍ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে তারেক বিহীন ঢাকা মহানগর বিএনপির ভেঙেপড়া সাংগঠনকে পনর্গঠনের লক্ষ্যে সাদেক হোসেন খোকার অতীত কর্মকান্ড ভুলে অনেকটা রিরুপায় হয়েই আবার ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি সাদেক হোসেন খোকাকে বেছে নিতে হয় খালেদাজিয়াকেকিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সরকার হঠানোর আন্দোলনে দা, কুঁড়াল, কালতা, জুইত্যা নিয়ে মাঠ দখলের ঘোষণা দিয়ে হিরু হতে চেয়েছিলেন, এ ঘোষণা যে তার জন্য বুমেরাং হয়েছে তা বুঝতে পেরে পালিয়ে যান খোকা। কিছুদিন পালিয়ে থাকার পরগ্রেফতার হয়ে কারাবন্দী হন তিনিরাজধানীতে আন্দোলন চাঙ্গাকরারপরিবর্তে নেতাকর্মীদের একা আন্দোলনের মাঠে ফেলে পালিয়ে যাওয়াকে মেনে নিতে পারেননি বিএনপি নেত্রী। পরবর্তীতে তার গ্রেফতারকেও সন্দেহের চোখে দেখেন খালেদা জিয়াতাই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ ঢাকা মহনরগর বিএনপির নেতৃত্ব বদলের গোপনে কাজ চলছে জানতে পেরে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে সাদেক হোসেন খোকা নিজেই ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বসেন।

 

সাদেক হোসেন খোকার পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ওপর ভরসা করতেপারেননি বিএনপিচেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকেননা, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে শুরুকরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনে কোনভূমিকা পালনতো করেনইনি বরং ঢাকা মহানগরীর দায়িত্ব নিয়ে সাদেক হোসেন খোকার সাথে সব সময়ই কোন্দলে ব্যস্ত থেকে দলের আরো বারটা বাজিয়ে ছেড়েছেন।

 

তাই আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে ঢাকা মহানগরীর নেতাকর্মীদের আন্দোলনের মাঠে সম্পৃক্ত করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চুড়ান্ত চেষ্টা হিসেবে ব্যবসায়ীদেরমাঠে নামানোর কৌশল হিসেবে তাঁরউপদেষ্টা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টুকে মাঠে নামান। কিন্তু আবদুল আউয়াল মিন্টু কিছুদিন দৌড়ঝাঁপ করে ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ করারপ্রণান্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তিনি হেফাজতি নেতাদের আর্থিক লজিষ্টিক সব ধরনের সাহায্য সহযোহিতা করেন। এমনকি ৫ মের হেফাজতিদের আন্দোলন সফল হলে ৬ মে ২ শতাধিক গরু জবাই করে মেহমানদারী করার দায়িত্বও নেন। এ জন্য তিনি কয়েক কোটি ঢাকা  ঢালেন বলে জনশ্রুতি আছে। কিন্তু আন্দোলনের চুড়ান্ত পর্যায়ে একদিন হঠাৎ তিনি নিজেই গ্রেফতার হয়ে যানআবদুল আউয়াল মিন্টুপ্রধানমন্ত্রীর একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার আত্মীয় হওয়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সনখালেদা জিয়া আবদুল আউয়াল মিন্টুর গ্রেফতার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তার ওপরও আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

  
সরকার হঠাতে তিনি অনেকটাই ভরসা করেছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকেরপ্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. ইউনূসের ওপর ড. ইউনূসও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে বিএনপিকেজিতিয়ে দেয়ার কৌশল নিয়েছিলেনএজন্যে তিনি প্রকাশ্যে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনায় সরব হয়ে মাঠ গরম করে তোলতে চেয়েছিল। তার ভরসা ছিল বিশ্বের সুপার পাওয়ার আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে আমেরিকার রাষ্ট্রদূক ম্যাজেনাকে অনেকটাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছিলেন। তার ভরসা ছিল আমেরিকা সর্বশক্তি নিয়ে ড. ইউনূসের পাশে দাঁড়াবে এবং বিএনপিকে পুনরায় ক্ষমতায় অধিস্ষ্ঠিত করবে। আওয়ামী লীগও শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে ড. ইউনূসেরকৌশল মাঠে মারা যায়। সঙ্গত কারণেই ড. ইউনূসের ওপরও আস্থা হারিয়ে ফেলেন বিএনপিচেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া

 

সকলের ওপর আস্থা হারিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলের ভাইস-চেয়ারম্যানশমসের মবিন চৌধুরী ও উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদ, রিয়াজ রহমান ও ড. ওসমানফারুকসহ কয়েকজন নেতার ওপর আস্থাস্থাপন করে আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে চেয়েছিলনে। তার বিশ্বাস ছিল এসব নেতা বিদেশী কূটনীতিকদের কাজে লাগিয়ে যে কোন মূল্যে নির্দলীয়সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেনকিন্তু তা করতে না পারায় এসব নেতাদের ওপরও চরমক্ষুব্ধ হনবিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া।

বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের আহ্বানকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করে সরকারও গঠন করে ফেলে। বিএনপির আশা ছিল এ সরকারকে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দাতাগোষ্ঠী কিছুতেই মেনে নেবে না; এবং ১৯৯৬ সালের মতো বিএনপির মতো মাসখানেকের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে এবং সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি-জামায়াত সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগকে উচিত শিক্ষা দেবে। কিন্তু বিএনপি সে স্বপ্ন অচিরেই দুঃস্বপ্নে পরিনত হলো। কেননা, ইতিমধ্যেই আমেরিকা, ব্রিটেন , জার্মানী তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা ১০ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ঘঠিত শেখ হাসিনা সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে এই সরকারের সাথে কাজ করতে তাদের সমর্থনের কথা জানিয়ে দিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

এমতাবস্থায় চরম হতাশ বিএনপি নেত্রী অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। তিনি আর কারো ওপরই আস্থা বা ভরসা রাখতে পারছেন না। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবর ও প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দলের সিনিয়র নেতাদের ওপর ভরসা করতে না পেরে এখনতিনি দলের বাইরে কিছুবিএনপি-জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে নিয়মিত পরামর্শ নিচ্ছেনখালেদা জিয়াএ সরকার ও বর্তমান নির্বাচনকমিশনের অধীনে কোন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না বহাল থাকতেও চলমান উপজেলা নির্বাচনে কিছু বুদ্ধিজীবীর পরামর্শেই বিএনপি অংশনিয়েছে বলেবিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে।বর্তমানে খালেদা জিয়ার আস্থায় বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীর নাম শোনা যায় তারা হলেন, এক সময়ের বাম তাত্ত্বিক কমিনিষ্ট নেতা ফরহাদ মাজহার, হাল আমলে বুদ্ধিজীবী ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষ ড. পিয়াস করিম, ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, ড. মাহবুবউল্লাহ, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মনিরুজ্জামানসহ কয়েক সাংবাদিক নেতা।

সাদেক হোসেন খোকার পদত্যাগের ঘোষণার পর দলের এ নাজুক অবস্থায় এসব বুদ্ধিজীবীর পরামর্শেই বিএনপির স্থায়ী কমিটিরসদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আ স ম হান্নান শাহর ওপর ঢাকা মগানগরীর দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলন খালেদা জিয়া;কিন্তু হান্নান শাহ ঢাকা মহানগরীর নেতৃত্ব নিতে নিজের রাজনৈতিক বলয়ে তার অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাই হান্নানশাহর ওপরও আস্থা বা বিশ্বাস রাখতে পারছেন না বিএনপি নেত্রী ও তার লেন্ডনে নির্বাসিত পুত্র

বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে এ পরিস্থিতিতে দলের পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিলকরার উপর জোর তাগিত দিয়েছেন বিএনপি নেত্রীর।  যার ওপর আস্থা বিশ্বাস ও ভরসা রাখা যায় এমন কোন সিনিয়র নেতাকেমহাসচিবের দায়িত্ব দিতে চান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াএ জন্য তিনিএকজন উপযুক্ত নেতা খুঁজছেন বলে সূত্র জানিয়েছেতবে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা এখনপর্যন্ত এ ধরনের কোন নেতার নাম খালেদা জিয়ার কাছে দিতে পারছেন নাখালেদাজিয়ার পাশাপাশি লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেকরহমানও তাঁর মা ভরসা রাখতে পারেন এমন একজন নেতার সন্ধান পাননি। সবার  ওপর আস্থা হারিয়ে সাবেক দুইবারের প্রধানমন্ত্রী  বেগম খালেদা জিয়া এখন চরম আস্থার সংকটে ভোগছেন; এটা আমার কথা নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।