ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিরপ্রধান নির্বাহীপরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী নারায়নগঞ্জের হামিদ ফ্যাশনস গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর নির্বাহী পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দিককে অপহরণের ঘটনানিয়ে বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ায় আলোচনা-সমালোচনা জমে ওঠতে না ওঠতেই অপহরনের মাত্র মাত্র ৩৫ ঘন্টার মাথায় কোনো শর্ত বা মুক্তিপণ ছাড়ায়ই অক্ষত খোলা মাঠে ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনাটি খুবই বিরল ঘটনা। এটিকে অতিনাটকীয়বলে মনে করছেন বিশ্লেষকসহ দেশের সচেতন সাধারণ মানুষ এ অপহরণ নাটকের সফল সমাপ্তিতে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানেরপরিবারসহ দেশের মানুষের মনে যেমন স্বস্তি ফিরে এসেছে অন্যদিকে এ অপহরণ ও অপহরণকারীকে কোনো শর্ত বা মুক্তিপণ ছাড়ায়ই অক্ষত ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনাটি রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে অনেকের কাছেই।

এ বিষয়ে ২০ এপ্রিল ২০১৪ দৈনিক জনকন্ঠে শংকর কুমার দেতার এক প্রতিবেদনেবলেছেন,‘প্রকাশ্যে অপহরণের পর নির্ভয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালিয়েঅপহৃতকে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়ার পর মাংস দিয়ে ভাত খাইয়ে, ভাই-মামাসম্বোধন করে, আবার নিরুদ্বিগ্নে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীতে এসে বিনা মুক্তিপণেফিরিয়ে দিয়ে, নিরাপদে অপহরণকারীদের অন্তর্ধান হওয়ার ঘটনায় দেখা দিয়েছেঅজস্র প্রশ্নকারা কি উদ্দেশে অপহরণ করে মুক্তির ব্যাপারে দরকষাকষিব্যতিরেকেই ছেড়ে দিল অপহরণের ঘটনা রহস্যে ঘেরা গোয়েন্দা কাহিনীকেও হারমানাচ্ছেঅপহরনকারীরা যে সংঘবদ্ধ, দক্ষ ও ক্ষমতাধর-তা অপহরণকাল ও অপহরণের পরঅজ্ঞাতস্থানে অপহৃতকে রাখা এবং অপহৃতকে ফিরিয়ে দিয়ে অপহরণকারীদের নিরাপদেচলে যাওয়ার ঘটনা এটা প্রমাণ দেয়

এ অপহরণ নাটকের প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ অংকের শেষ দৃশ্য পর্যন্ত কি কি ঘটেছিল তার পুরো বিবরণ গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন আবু বক্কর সিদ্দিককাজেই এ নিয়ে বিস্তরিত আলোচনা করে কলেবর বাড়িয়ে লাভ নেই।  ইতোপূর্বে বাংলাদেশে যত অপহরণ হয়েছে, অপহরণের পর কাউকে কাউকে মেরেফেলেছে, কাউকে কাউকে মুক্তিপণ আদায়ের পর ফিরিয়ে দিয়েছে, না হয় আইন-র্শংখলা বাহিনীর হাতে অপহরণকারীরা ধৃত হয়েছে। কিন্তু এবি সিদ্দিক ভাগ্যবানদের একজন যাকে অপহরণের পর জামাই আদরে রেখে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। এমন নজির নিকট বা দূর অতীতে স্থাপিত হয়েছে বলে এ মুহূর্তে আমার মনে আসছেনা।

 

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ডিবির সাবেক ডিসি সৈয়দ বজলুল করিম সংবাদ মাধ্যমের কাছে অভিমত ব্যক্ত করেবলেছেন,‘ সিদ্দিক অপহরণের পর থেকে ঘটনাটি মনিটরিং করে দেখতে পেয়েছি, প্রথম মিডিয়ায়ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে, দ্বিতীয়ত, মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গেপ্রচারের কারনে রাজনৈতিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবিসহ বিভিন্ন মহলেব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তৃতীয়ত, এ কারণে সরকারী প্রশাসনের টনক নড়েছে, চতুর্থ, পুলিশ ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকল ইউনিট ব্যাপক তৎপরতাহয়েছেন, পঞ্চম এতসব তৎপরতার মুখে অপহরণকারীরা অপহৃতকে ছেড়ে দিতে বাধ্যহয়েছে ’।

সৈয়দ বজলুল করিমসাহেব যা বলেছেন, এটা আমার দৃষ্টিতে একটি সহজ সমীকরণ। কেননা, এর আগে ইলিয়াস আলীসহ যে সব অপহরণ সংগঠিত হয়েছে সে সব অবহরণের ক্ষেত্রেও যখন যে সরকার ক্ষমতায় থেকেছে অপহৃতকে উদ্ধার করতে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি। কারণ যে কোন রাষ্ট্রেই অপহরণ বা গুমের মতো সমাজবিরোধী কাজগুলো প্রতিরোধ করতে না পারলে সরকারের ওপরই এর দোষ চাপে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধীরা দেশি-বিদেশি অপশক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য এ ধরনের কাজ করে থাকে। এ প্রসংগে আমার অভিমত হলো এটা কোন সাধারণ অপহরণের ঘটনা নয়। এমন সময় এমন এক ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়েছে যখন জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে আমেরিকার সকল শর্তই পূরণ করা হয়েছে। এই অপহরণের মাধ্যমে সেই গোষ্ঠী আমেরিকাকে এই ম্যাসেজটি পৌছে দিতে চেয়েছে যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে এখনো অনুকূল পরিবেশ নেই। আর যাকে অপহরণ করা হয়েছে তিনি যেমন গার্মেন্টস কারখানার একজন নির্বাহী অপর দিকে তার স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিরপ্রধান নির্বাহীপরিচালককাজেই এমন একজন ব্যক্তিকে অপহরণ বা গুম করতে হবে  যাতে দেশে-বিদেশে হৈঁচৈ পড়ে যায়। শেষ বিবেচনায় যে তাদের পরিকল্পনা সফল হয়েছে তা অপহরণ নাটকের দৃশ্যবলী বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়।

শুধু আমার নয় অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতেও, এটি একটি পরিকল্পিত অপহরণ নাটক। এ নাটকের মাধ্যমে অপহরণকারী ও পর্দার অন্তরালের কুশিলবরা জেনে-শুনে পরিকলিত ভাবেই এমন একটি সময়ে অপহরণ নাটকটি মঞ্চস্থ করলো যখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে আমেরিকায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পূর্ণ কাগজপত্র দাখিল করেছে। কেননা, গার্মেন্টস সেক্টরে শৃংখলা ফিরিয়ে এনে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে দীর্ঘদিন থেকেই যেন কোনো এক রহস্যময় ছায়ার সাথে সংগ্রাম করছে। দেশের মানুষও চাইছে দেশের প্রধানতম এ রপ্তানীখাতটি যাতে কোনভাবেই কোনো অদৃশ্য শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার না হয়। এই খাতটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান রক্তধারা বা চালিকাশক্তি। এটিকে ধ্বংস করে দিতে পারলে একটি কায়েমী সুবিধাবদী শক্তি নিজেদের নাক কেটে হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা ভঙ্গ করতে পারবে। তাই এ খাতটিকে নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই দেশি-বিদেশী নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। এ প্রসংগে অনেকেই বলতে পরেন আমি বোঝি ধান বানতে গিয়ে শিবের গীত গাইছি। কেননা এ অপহরণের সাথে গার্মেন্টস সেক্টর ধ্বংসের কি সম্পর্ক আছে? হ্যা আছে, আর আছে বলেইতো এ প্রসংগের অবতারণা।

বাংলাদেশ পরিবেশে আইনবিদ সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানাহাসান মাধ্যমকে বলেছেন, সুপরিকল্পিতভাবে ওকে আবু বকরকে অপহরণ করাহয়েছেঘটনায় জড়িতরা অত্যন্ত পরিপক্ষআমার আইনগত কাজে যারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিরচেষ্টা করছে তারা আমার স্বামীর অপহরণ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেআবার অন্যরাওজড়িত থাকতে পারেএটা দেখবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীআবার অনেকে বলে, চাঁদাবাজির জন্য আমার স্বামীকে অপহরণ করা হয়েছেকিন্তু তা আমার মনে হয় নাওকে ধরে নেয়ার পর কেউ আমার কাছে কিংবা ওর কাছেও চাঁদা দাবি করেনিসৈয়দা রিজওয়ানাহাসানের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তার দৃষ্টিতেও এটা সাধারণ কোন অপহরণের ঘটনা নয়। কেননা, তাকে অপহরণ করে কোনো মুক্তিপণ বা চাঁদা দাবী করা হয়নি।

এ প্রসংগে শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট আব্দুল মান্নান ২০ এপ্রিল ২০১৪ সহযোগী এক দৈনিকে তাঁর এক নিবন্ধে বলেছেন,‘ …কারণ আবু বকর শুধু সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামীইছিলেন না, তিনি তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গেও জড়িত ছিলেনবর্তমানে বাংলাদেশেরএই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটি নানা সমস্যার ভেতর দিয়ে সময় পার করছেপান থেকেচুন খসলেই যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন নানা রকমের হুমকি দেয়া শুরু করে সাভারে একজন আমিনুল ইসলাম গুম হয়ে নিহত হলেনপরে জানা গেল, তিনি একজনশ্রমিক নেতা ছিলেনএই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকের কাছে এই আমিনুল ইসলামসম্পর্কে জানতে চাইলে সকলে বলেন-অপহৃত হওয়ার আগে তাঁরা তাঁকে চিনতেন না বাঅপহৃত হওয়ার আগে আমিনুল ইসলাম তেমন কোন পরিচিত শ্রমিক নেতাও ছিলেন নাপরেযখন হিলারি ক্লিনটন হতে ড্যান মজিনা সকলে আমিনুল ইসলামের নাম জপ করা শুরুকরল এবং বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা প্রাপ্তির সঙ্গে আমিনুল ইসলামের নামটিওজুড়ে দেয়া হলো তখন জানা গেল আমিনুল ইসলাম হিলারি ক্লিনটনের লবিস্ট ফার্মেরসঙ্গে জড়িত ছিলেনযুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বাণিজ্যিক পার্টনার একেবারে তাদেরদোরগোড়ার দেশ কলম্বিয়াসেই দেশে প্রতিবছর প্রায় দুই শশ্রমিক নেতা অথবাশ্রমিক গুম হয় অথবা আততায়ীর হাতে নিহত হয় কিন্তু সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রতেমন কোন কথা বলে নাসুতরাং আবু বকর ফিরে আসাতে সরকারী মহলে স্বস্তি ফিরেআসারই কথা

কাজেই এ অপহরণ নাটক নিয়ে মানুষ যে সন্দেহ করছে এর মধ্যে রাজনীতিকেও তারা সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন।  কেননা,আবু বকর অপহৃত হওয়ার পর এ নিয়ে যে রাজনীতি শুরু হলো তাকেতো অবশ্যই রাজনীতি বলতে হবে। এ অপহরণ নাটকের পরপরই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়া ঘটনার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এ কথা বলতেও ছাড়লেন না যে, এইসরকারের আমলে কেউই নিরাপদ ননতিনি আরও বললেনএবি সিদ্দিক নাকি তারেক জিয়ার বন্ধু ছিলেনএবি সিদ্দিককে বিএনপিপন্থী বানাতে যেয়ে এও বলেছেন যে, রিজওয়ানার পিতা সৈয়দ মহিবুল হাসান জিয়ার মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী ছিলেনতাই বিএনপি এটাকে ক্রেডিট করতে চেয়েছে তার প্রমাণ খুঁঝতে বিএনপির নেতা-নেত্রী ও অনুসারীদের বক্তব্য থেকেই এর প্রমাণ মিলে। বিএনপিরভারপ্রাপ্ত  মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেকদিন থেকেই তেমন কোন ইস্যু খুঁজে পাচ্ছিলেন নাতাই এ অপহরণকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে মাঠ গরম করতে চেয়েছিলেন।বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভি তো সরাসরিই বলে ফেলেছেন যে, সিদ্দিক আরইলিয়াসকে একই ব্যক্তিরা অপহরণ করেছেআবু বকর নিখোঁজ হওয়াতেবিএনপির অনুসারীরা নানা হমকী-ধমকীও দিচ্ছেন। সবচেয়ে বোমাফাটানো কথা বলেছে বেগম জিয়ারঅঘোষিত উপদেষ্টা, যিনি বুক ফুলিয়ে নিজকে নাস্তিক বলে দাবি করেন সেই ফরহাদ মজহার, আবুবকরের অপহরণে নির্ঘাত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এর হাত আছেতাহলে পাঠক আপনারাই বলুন এই অপহরণের পেছনে মানুষ-জনের রাজনীতির গন্ধ খোঁজতে যাওয়া কি অন্যায়?

পরিশেষে এ কথা বলেই শেষ করবো অপহরণকারী ও গুমকারীরা দেশ ও রাষ্ট্রের শত্রু। এই শত্রুদের খোঁজে বের করার পাশাপাশি এবি সিদ্দিককে যারাবা যে গোষ্ঠীই অপহরণ করে থাকুক না কেন তাদের অবিলম্বেগ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা সকলেই সরকারের কাছে নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তাআশা করি আর তার নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান সরকারের অন্যতমপ্রধান দায়িত্ব