ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

 

৫ জানুয়ারি ২০১৪ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর সরকারী দল আওয়ামী লীগ দল হিসেবে সরকারের মধ্যেই বিলীন হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের ত্যাগী ও দুর্দিনের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন। এই কারণেই দলেরর চেইন অব কমান্ড অনেকটাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই সুযোগে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ‘চাটারদল’ (বঙ্গবন্ধু দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শ্রেণীকে চাটারদল বলে ডাকতেন) তারা কখনো দলের কোনো কাজে আসে না; দলের সম্পদতো নয়ই বরং বোঝা কিন্তু সময় ও সুযোগ মতো গাছেরটা ও তলারটাও খায়। এরা অনেকটাই পরগাছা, পরজীবী বা শোষক মাছির মতো গাছের বা প্রাণীর সব সুসম খাবার বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তশুষে আশ্রয়গ্রহণকারী গাছ বা প্রাণীকেই নির্জীব ও রুগ্ন করে তোলে। সে রকম এখন আওয়ামী  লীগের ঘাপটি মেরে থাকা ‘চাটারদল’ বা সুযোগ সন্ধানী বা ওয়ান টাইমার যে নামেই ডাকি না কেন তারাই এখন দলের ফন্ট বেঞ্চার আর দুর্দিনের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা বেকবেঞ্চার হিসেবে দল যে হেলে পড়ছে অসহায়ভাবে তা দেখছে। দলের ভেতর এই সুযোগ সন্ধানী ‘চাটারদল’ দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতার পদ-পদবী ও পেশীশক্তির দাপট দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি, টেন্ডারবাজি, দখল, চাঁদাবাজি, গুম অপহরণসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। আর দলের এই দুর্বলতার সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে  তৃতীয় পক্ষ।

 

দলীয় শৃংখলার অভাবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বস্তরে দলের কোথাও ন্যূনতম জবাবদিহিতা নেই। কেন্দ্র থেকে সংগঠনের যথাযথ তদারকী না থাকায় কেন্দ্রের নির্দেশও উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন তৃণমূল নেতারা । যা আরো নগ্নভাবে ধরা পড়েছে মার্চমাসে প্রায় শেষ হওয়া উপজেলা র্নির্বাচনে। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে বিরোধী দলের কাছে আওয়ামী লীগ যেভাবে কুপোকাত হয়েছিল শেষের চার দফা নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে যদি হস্তক্ষেপ করা না হতো আর দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা যদি অভিমান ভুলে নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে না পড়তো তা হলে খবরই ছিল সরকারী দল আওয়ামী লীগের। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ার করণেই দলের ভেতর দুই বা ততোধিক প্রার্থী থাকার পরও নির্বাচনে অধিকাংশ উপজেলায় জয়লাভ করেছে আওয়ামী লীগ।

 

লক্ষ্য করা যাচ্ছে দলের ভেতর জবাবদিহিতার অভাবে সংগঠনের প্রতিটি পর্যায়ে এক একজন দলের ভেতর গ্রুপ সৃষ্টি করে দলের বারটা বাজাচ্ছে। এরাই হলো এখন ঘরের শত্রু বিভীষণ। সারাদেশেই এখন যেন আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগই। তার ওপর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো বিভিন্ন দল থেকে বিশেষ করে জামায়াত-শিবির থেকে আওয়ামী লীগে মাঝে মাঝেই যোগদানের খবর শিরেনাম হচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগের মতো দেশের সর্ববৃহত দলের নেতাকর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা যাচ্ছেনা সেখানে দলে নতুন যোগদানকারী ‘চাটারদলের’ সদস্যদের কিভাবে প্রোভাইড করবে? আওয়ামী লীগ কি এতটাই হীনবল হয়ে পড়েছে যে, জামায়াত-শিবিরের মতো একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক দলের নেতাকর্মীদের দলে ভিড়িয়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে হবে? এ প্রশ্নের জবাব কারো জানা নেই। এ নিয়েও দলের মধ্যে তীব্রভাবে অসন্তোষ কাজ করছে যা অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করা হচ্ছে।

সারাদেশে দলটির মধ্যে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দ্বন্দ্ব-বিবাদের সুযোগ নিয়ে তৃতীয়পক্ষ সরকারকে বিব্রত ও জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলার চেষ্টা করলেও টনক নড়ছে না সরকারী দল আওয়ামী লীগের। দলের মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব আর কাদা ছোড়াছুড়িতে কোন্দলের কারণে সরকারের সব অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের ঘটনা সরকারের ভীতকেই শুধু নাড়িয়েই দেয়নি সারাদেশে দলটির সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা কি পর্যায়ে গিয়ে পৌঁচেছে তা চরমভাবে ফুটে ওঠেছে। নারায়নগঞ্জের ঘটনাটিকে সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ও সাধারণ মানুষ। এ সব বিষয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর অন্যতম সদস্য বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গণমাধ্যমকে বলেছেন,‘ বর্তমান সরকারের ব্যাপক অর্জন থাকলেও গুটিকয়েক দুর্বৃত্তের কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এর দায় আওয়ামী লীগ নেবে না, সরকার নেবে না, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও নেবেন না। আসলে এরা আওয়ামী লীগের নয়, সুযোগ সন্ধানী।’

 

আর ইদানিং হঠাৎ করে দেশে গুম, অপহরণের মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এসব ঘটনার জন্য আঙ্গুল উঠেছে আওয়ামী লীগের দিকেই। সম্প্রতি দৈনিক জনকন্ঠের এক প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগের সাথে বলেছে ‘নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনায় প্রকৃত দোষী এখনও চিহ্নিত হয়নি। খুন-গুম-অপহরণ নিয়ে রাজনীতিতে চলছে দোষ চাপানোর পুরনো ব্লেমগেম। সরকার মনে করছে, নিহত সবাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তাই এ ঘটনায় তৃতীয়পক্ষ অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত জোট জড়িত থাকতে পারে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, এটা আওয়ামী লীগই করেছে। আর ভিকটিমদের অভিযোগের আঙ্গুল এলিট ফোর্স র‌্যাবের দিকে। এমন ত্রিমুখী দোষারোপের রাজনীতির মধ্যেই বিএনপির সুরেই স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের দায় আওয়ামী লীগের কাঁধেই চাপানোর চেষ্টা করছেন- নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগেরই দুই প্রভাবশালী নেতা স্থানীয় সংসদ সদস্য শামিম ওসমান ও মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী। আর এ দুই নেতার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিচ্ছে তৃতীয়পক্ষের ষড়যন্ত্রকারী খুনীরা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রকাশ্য এই দুই নেতার প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করলেও তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং এই দুই নেতার কোন্দল-দ্বন্দ্ব আর কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনায় প্রকৃত খুনীরা নির্বিঘ্নে উদ্দেশ্য হাসিল করে বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। আর আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। এত কিছুর পরও কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে দলটির বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।’

 

সম্প্রতি সহযোগি এক দৈনিকে প্রখ্যাত সাংবাদিক লেখক কলামিস্ট ও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ অমর গানের রচয়িতা আবদুল গফফার চৌধুরী ‘কোথাও সান্তনা নেই, পৃথিবীতে শান্তি নেই আজ’ শিরোমের নিবন্ধে বলেছে, ‘বাংলাদেশ আর কতদিন এভাবে অপরাধ ও অপরাধীদের পুষবে? দেশে আইন আছে, তার শাসন নেই। অপরাধ আছে। শুধু আছে নয়, তার রাজত্ব ক্রমবর্ধমান। কিন্তু অপরাধীর বিচার নেই। অর্থবল ও ক্ষমতাবানদের মদদ থাকলে যে কোন ব্যক্তি যে কোন গুরুতর অপরাধে অপরাধী হয়েও পার পেতে পারেন; সমাজের মুকুটমণি হয়ে থাকতে পারেন। তা না হলে তারেক রহমান, যার বিরুদ্ধে মহাদুর্নীতি, গুম, খুন, সন্ত্রাস, অবৈধ অর্থ পাচারের অসংখ্য গুরুতর মামলা রয়েছে, তিনি কী করে আদালতের জামিন নিয়ে বছরের পর বছর বিদেশে একজন প্রিন্সের মতো বাস করতে পারেন, বিচার ও দন্ড এড়িয়ে চলতে পারেন? কোথায় তাঁর বিচার ও দন্ড? তিনি এখন বিদেশে বসে ‘ইতিহাসবিদ’ সেজেছেন এবং এই অসত্য ইতিহাস চর্চা দ্বারা তিনি অনারারি ডক্টরেট পাওয়ার চেষ্টা করলে (কারণ প্রকৃত ডক্টরেট পাওয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁর নেই) বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটির মূল অপরাধী কারা তা এখনও জানা যায়নি। তবে সন্দেহ করা হয়েছে এটা আওয়ামী লীগেরই দুই গ্রুপের স্বার্থদ্বন্দ্বের ফল।

 

পরিশেষে এই বলেই শেষ করবো, নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যমের খবরে যতটুকু জানা গেছে তা হলো, নূর হোসেন আওয়ামী লীগের সদস্য বা বন্ধু নয়, সে আপাদমস্তক একজন সুবিধাবাদী ‘চাটার দলের’ সদস্য। তার রাজনৈতিক কোন আদর্শ নেই; সুষ্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ বাপরিচয় নেই। একসময় সে জাতীয় পার্টি করত, পরে বিএনপি, এখন আওয়ামী লীগ করছে। বঙ্গবন্ধুর কথা অনুযায়ী নূর হোসেন একজন ‘চাটারদলের’ সদস্য। তাই তার ও তার সহযোগীদের বর্তমান দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে এ জঘণ্য কর্মকান্ডের সাথে যে ই থাকুক খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে, না হলে বাংলাদেশে কোনো দিনই দুর্বিত্তায়নের রাজনীতি বন্ধ হবে না। একই সাথে আওয়ামী লীগের মধ্যে বর্তমানে বিরাজিত যে সাংগঠনিক অব্যবস্থাপনা চলছে তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা না নিলে চুড়ান্তভাবেই দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়তে পারে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ করবে তা আওয়ামী লীগ নেত্রীত্ব দ্রুত ভেবে দেখতে হবে। না হলে এর পরিনতি যে কতটা ভয়াভহ হতে পারে তা অন্যদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই।