ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের পর দেশ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীলই ছিল; কিন্তু হঠাৎ করে দেশে গুম,অপহরণ গুপ্তহত্যাসহ আইনর্শংখলার যে অবনতি ঘটছে তা নিয়ে মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ করেই গুম, খুনসহ অপহরণ বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত দেশের মানুষ। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপহরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে এ অবস্থা চলে আসছে। কখনও কম, কখনও বেশি। এ নিয়ে সরকারও বিব্রত। আর এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের জন্য ‘রেট এ্যালার্ট’ জারি (যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিষয়) মানুষের মধ্যে আরো আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। সারা বিশ্বেই প্রতিদিন কোন না কোন দেশে অপহরণ, গুম ও হত্যাকান্ডের অজস্র ঘটনা ঘটছে। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেও এসসব ঘটনা নতুন নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শত শত মানুষ অপহরণ, গুম ও গুপ্ত হত্যার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার বার বার পুণরাবৃত্তি কোন দেশ, জাতি বা গোষ্ঠী কারোই কাম্য ও সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। তারপরও এ ধরনের ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে।

 

বিভিন্ন সংবাদপত্রে আইন-শৃংখলা বাহিনীর বাহিনীর পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে দেখা যায়, গত ১২ তের বছরে দেশে প্রায় এগারো হাজারের মতো গুম-অপহরণ ও গুপ্ত হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০২ সালে সারাদেশে অপহরণের ঘটনা ১ হাজার ৪০টি। ২০০৩ সালে এই পরিসংখ্যান কমে দাঁড়ায় ৮৯৬, ২০০৪ সালে ৮৯৮, ২০০৫ সালে ৭৬৫, ২০০৬ সালে ৭২২, ২০০৭ সালে ৭৭৪, ২০০৮ সালে ৮১৭, ২০০৯ সালে ৮৫৮, ২০১০ সালে ৮৭০, ২০১১ সালে ৭৯২ ও ২০১২ সালে ৮৫০ অপহরণের ঘটনা ঘটে। সাত বছরে মোট অপহরণের সংখ্যা ৯ হাজার ২শ’ ৮২টি। ২০১৩ সালে অপহরণের সংখ্যা ৮৭৯টি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে অপহরণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১৬৫টি। খুলনা অঞ্চলে ১৫৩, ঢাকা অঞ্চলে ১৪৯, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৩০টি। সবচেয়ে কম ঘটনা ২টি ঘটেছে রেলেওয়ে অঞ্চলে। সিলেট মেট্রোপলিটন শহরে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে মাত্র তিনটি।  এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ২০০২ সালে ১ হাজার ৪০টি। সবচেয়ে কম ২০০৬ সালে ৭শ’ ২২টি। অপহরণের দিক থেকে সবচেয়ে বিপজ্জনক ঢাকা শহর। এই মহানগরীতে অপহরণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি।

 

২০১৩ সালে দেশের গুম অপহরণ এর পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে জানুয়ারি মাসে সারাদেশে অপহরণের ঘটনা ১২১টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১০১টি, মার্চে ৮৫টি, এপ্রিল ১০১টি, মে মাসে ৭৫টি, জুন মাসে ১১২টি, জুলাই মাসে ১০৬টি, আগস্টে ৯৬টি, নবেম্বরে ৭২টি, ডিসেম্বর মাসে ৬১টি অপহরণের ঘটনা ঘটে। ২০১৩ সালে দেশে মোট অপহরণের মধ্যে ১৬৫টি রাজধানীতে। এর পর পরই আতঙ্কিত জনপদসমূহের মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চল। সব মিলিয়ে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে অপহরণ প্রবণতা বেশি। চলতি বছরে ১৯৬ জন অপহরণের শিকার হলেও লাশ মিলেছে ৬২ জনের। র‌্যাবের পরিসংখ্যান তদন্তে দেখা গেছে গুমের মামলার ৪০ ভাগ ভুয়া। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো, বিরোধ, পরকীয়ার কারণে অনেকে আত্মগোপনে থেকে অপহরণের ঘটনা সাজানো হয়। ১০ বছরে ১ হাজার ২০০ অপহৃতকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে জীবিত ১১শ’ আর শতাধিক মৃত। গ্রেফতার করা হয়েছে দুই হাজার অপরাধীকে ’। জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম মহানগরীতে দুটি, খুলনা ও রাজশাহীতে একটি করে। বরিশাল ও সিলেট মহানগরীসহ রেঞ্চে একটিও ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রাম রেঞ্চে ঘটেছে ১৪টি অপহরণের ঘটনা। ঢাকা রেঞ্চে সাতটি, রাজশাহী ও রংপুর রেঞ্চে ৬টি করে, খুলনা ও বরিশাল রেঞ্চে ৩টি করে অপহরণের ঘটনা ঘটে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৫টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ১৮টি। ঢাকা ও রংপুর অঞ্চলে সাতটি করে। সিলেট মহানগরী ও রেলওয়েতে একটিও ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল মেট্রোপলিটন সিটিতে মাত্র একটি করে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে রাজশাহীতে দুটি। মার্চ মাসে সারাদেশে অপহরণের ঘটনা ৭৯টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ১৮টি। ঢাকা অঞ্চলে ১৭টি, ঢাকা মহানগরে ১৫টি, চট্টগ্রামে পাঁচটি, রাজশাহীতে চারটি, বরিশাল ও সিলেট মহানগরীসহ রেলওয়েতে একটিও ঘটনা ঘটেনি। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে অপহরণের ঘটনা দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এপ্রিল মাসে সারাদেশে ৭০টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন শহরে ১৩টি, ঢাকা অঞ্চলে ১৩টি, চট্টগ্রাম, রবিশাল ও সিলেট মহানগরীতে একটি ঘটনাও ঘটেনি। তাছাড়া খুলনা মেট্রোপলিটন শহরে চারটি, রংপুর অঞ্চলে চৌদ্দটি, খুলনা অঞ্চলে নয়টি, বরিশাল অঞ্চলে চারটি অপহরণের ঘটনা ঘটে।

 

তারপরও খুন-গুম-অপহরণ নিয়ে রাজনীতিতে নিয়ে দেশে চলছে দোষ চাপানোর রাজনীতির সেই পুরনো ব্লেমগেম। সরকারী দলের নেতারা বলছেন, নিহত সবাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। তাই এ ঘটনায় তৃতীয়পক্ষ অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াত জোট জড়িত। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, এটা আওয়ামী লীগই করেছে। বিএনপিকে নিশ্চিন্ন করার জন্য সরকার বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপানোর নোংরা খেলা খেলছে। এভাবে বক্তব্য দিয়েই বিএনপির স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের দায় আওয়ামী লীগের কাঁধেই চাপানোর চেষ্টা করছেন।আর ভিকটিমদের অভিযোগের আঙ্গুল এলিট ফোর্স র‌্যাবের দিকে। এমন ত্রিমুখী দোষারোপের রাজনীতির মধ্যেই অওয়ামী লীগ বলেছে, গত ২৮ এপ্রিল ২০১৪ সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির এক সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে গেরিলা হামলার হুমকি দিয়ে বলেছেন ‘আপনাদের ভালর জন্যই বলছি। যদি স্বেচ্ছায় সরে না যান, তাহলে জনগণ চোরাগোপ্তা কর্মসূচীর মাধ্যমে আপনাদের নির্মম পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে। শুধু আহ্বানে এই সরকারের সাড়া মিলবে না, দুর্বার আন্দোলনে নামতে হবে।’

 

খোকার এ হুমকীর পর পরই দেশে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে খোকার গেরিলা হামলার হুমকীর সাথে সাম্প্রতিক সংগঠিত গুম ও হত্যাকান্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কাজেই সরকারকে জনসমাক্ষে ও বিদেশিদের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্যেই পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু দেশের প্রধান দুই দলের দোষারোপের রাজনীতি ও কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনায় প্রকৃত খুনীরা নির্বিঘ্নে উদ্দেশ্য হাসিল করে বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এসব ঘটনার পর্দার আড়ালের কুশীলবরা মুখটিপে হাসছে। যেসব অপহরণ ও গুমের ঘটনা ঘটেছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সিংহভাগ অপহরণ, গুম ও হত্যাকান্ডেরই শিকার হয়েছে বর্তমান শাসকদল আওয়ামী লীগের কোন না কোন পর্যায়ের নেতা-কর্মী- সমর্থক। তাই এটাও ভেবে দেখা উচিত কি কারণে সরকারী দলে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এসব গুম, আপহণের মতো ঘটনায় টার্গেট হচ্ছে।

 

এ প্রসংগে বহুদিন থেকে বাংলাদেশের কুট-রাজনীতি ও কৌশল বিশ্লেষণ করে আসছেন এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানামুখী কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারে বিএনপি ও জামায়াত।  এরই অংশ হিসেবে খুন ও গুম হওয়াদের পরিবারের সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া, দলীয় নেতাকর্মীদের একা না চলার কথা বলে রেডএ্যালার্ট জারির মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং বিদেশী দূতাবাস ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছে সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছে বিএনপি। এভাবেই নানামুখী কৌশল কূটনীতিক ও দাতা গোষ্ঠীর সহানুভূতি আদায় ছাড়াও সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে থাকতে পারে যা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে না।’

 

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও মানবাধিকার নেত্রী এলিনা খান সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলাপকালে বলেন, গুম ও খুনের ঘটনার কারণে এখন আমরা সবাই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। যে বাইরে যাচ্ছে, সে আর র্ফিরবে কিনা? সারাক্ষণ এ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার শেষ নেই। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরাসহ বাকস্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না বলেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, কিছু কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তৎপর হয়, কখনও ঝিমিয়ে থাকে। নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের ক্ষেত্রে অপহৃতদের হত্যার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দেখা গেছে। এমন বাস্তবতার কারণে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। যখন যা করা প্রয়োজন পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সরকারী বাধা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাই মূল কারণ। সন্ত্রাসী কিংবা অপহরণকারীদের দল-মত নির্বিশেষে আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এই মানবাধিকার নেত্রী। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যাহত হলে মানুষ আইন হাতে তুলে নিতে পারে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সাধারণ মানুষকে আইন হাতে তুলে নেয়া থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। দেশে একের পর এক অপহরণের ঘটনায় আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোন কূলকিনারা করতে না পারায় এ ব্যর্থতার আঙ্গুল উঠছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী দিকেই। । আইন-শৃখলা বাহিনীকেও ভাবিয়ে তুলেছে এসব একর পর এক ঘটনা। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে অপহরণের পর সাতজনকে খুনের ঘটনায় তারা রীতিমতো বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।

 

এই বলেই শেষ করবো, গুম-অপহরণ ও গুপ্তহত্যা নিয়ে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা তাতে কেউই নিরাপত্তা অনুভব করছেনা। সবার মধ্যে একই ভাবনা কখন জানি তার সন্তান, স্বামী বা স্বজন অপহরণ-গুম ও গুপ্ত হত্যার শিকার হয়। এ অবস্থায় সরকারের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশবাসীকে  অপহরণ-গুম ও গুপ্ত হত্যার আতঙ্ক থেকে রেহাই দেয়া। সন্ত্রাসী কিংবা অপহরণকারীদের যে দল বা মতেরই হোক কোনো দলীয় বিবেচনায় না করে এসব দেশ ও সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। আর আমাদের দাবি একটাই এ অপহরণ-গুম ও গুপ্তহত্যার আতঙ্ক থেকে আমরা মুক্তি চাই। মুক্তি দিন।