ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

শিরোমান দেখেই অনেকে হয়তো আতকে উঠতে পারেন, এটা কেমন কথা-যে মা সন্তানের জন্ম দিলেন তিনি তার সন্তানের মৃত্যু কামনা করবে, এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। আমিও কথাটা বিশ্বাস করতে চাইনি এই কারণে যে মা অনেক আশা করে মাত্র ১০ বছর আগে সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, সে মা কি করে সন্তানের মৃত্যু কামনা করতে পারেন। কিন্তু এটাই সত্য এটাই বাস্তব। তবে এটা কোনো মানুষ্য সন্তান নয়, এ সন্তান হলো একটি বাহিনী নাম। বাংলাদেশের এলিটফোর্স র‌্যাব। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ মাত্র ১০ বছরের ব্যবধান। ২০০৪ সালের স্বাধীনতা দিবসে অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে জাকঝমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে এলিটফোর্স র‌্যাব এর জন্ম দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর আমলেই নিজ হাতে র‌্যাবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’!  আর ১১ অক্টোবর ২০০৪ জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র‌্যাবের প্রশংসা করে অনেক কথা বলেছিলেন। সে হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া এ্যলিটফোর্স র‌্যাবের জন্মদাত্রী জননী, তা ই তো হওয়ার কথা না কি?

র‌্যাব গঠনের পরই বাংলাদেশে প্রথম শুরু হয়েছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা ‘ক্রসফায়ার’ নামক ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।  আমরা পরিচিত হয়েছিলাম ‘ক্রসফায়ার’ নামক শব্দটির সাথে। যে শব্দটির উচ্চারণের সাথে সাথেই অনেকের গা ভয়ে হিম হয়ে যায়। তখন মাত্র দুই বছরের মধ্যেই  র‌্যাবের হাতে তিন শতাধিক মানুষকে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে জীবন দিতে হয়েছিল। এ নিয়ে শুধু দেশেই নয়, সারাবিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় তুলেছিল।তাই র‌্যাবকে ভেঙ্গে না দেয়া পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিমিশনে বাংলাদেশের সৈন্য না নিতে হংকংভিত্তিক দুটি মানবাধিকার সংগঠন জাতিসংঘের কাছে সুপারিশ করেছিল। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সংবাদ ও গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের দৃষ্ট আকর্ষণ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘দিস ইজ আওয়ার কান্ট্রি…’ বিদেশী কারও কথায় কোন বাহিনী প্রত্যাহার করব না। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যা করার তাই করব। ক্রসফায়ার কন্টিনিউয়াস প্রসেস। এটা আইন অনুযায়ীই হচ্ছে। আর র‌্যাব মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে।’

সেই সময়েরর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গেলে র‌্যাব ও ‘ক্রসফায়ার’ ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়াকে। আর তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল প্রকাশ্য সরকারের বিরুদ্ধে ‘ক্রসফারের’ অভিযোগ এনে বলেছিলেন বিরোধীদল তথা আওয়ামী লীগকে ঘায়েল ও ধ্বংস করতেই ক্রসফারার শুরু হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ‘হাওয়া ভবন’ থেকে ক্রসফায়ারে হত্যার জন্য তালিকা তৈরি করে র‌্যাবের তুলে হাতে দেয়া হয়েছে।’ এত এত অভিযোগের পরও তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের তিন বছরপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে খালেদা জিয়া এই বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা বলেছিলেন, ‘দলনিরপেক্ষভাবে সাহসী অভিযান পরিচালনা করছে র‌্যাব। জনগণ র‌্যাবের কারণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। সন্ত্রাসের হার অনেক কমে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অনেকে অন্যদেশে পালিয়ে গেছে।’

শুধু খালেদা জিয়া একাই নন, তাঁর সভাসদরাও এই বাহিনীর কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন তখন। র‌্যাব গঠনের সাত মাস পর ক্রসফায়ারকে জায়েজ করে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ২০০৪ সালের ১ ডিসেম্বর সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে মৃতদের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোন সম্পর্ক নেই। প্রাণরক্ষার জন্য র‌্যাবের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ক্রসফায়ারের সঙ্গে মানবাধিকারের কোন সম্পর্ক নেই। আত্মরক্ষার অধিকার র‌্যাবেরও রয়েছে। ’রাষ্ট্রীয় মদদে র‌্যাবকে দিয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেন স্পষ্টভাষায় বলেন, মানুষের মানবাধিকার থাকে, দানবের কোন মানবাধিকারের প্রয়োজন নেই। আওয়ামী লীগসহ বিদেশীরা চিৎকার করলেও কোন লাভ হবে না। আগামীতে নির্বাচন হবে র‌্যাব বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে। মানুষ র‌্যাবের পক্ষেই রায় দেবে।’ এই হলো র‌্যাবের পক্ষে বিএনপি নেতাদের সাফাই গাওয়ার মাত্র কয়েকটি উদাহরণ।

যাক সে কথা। কিন্তু আসল কথা হলো হঠাৎ করেই র‌্যাবের জন্মদাত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবাউট টার্ন হয়ে র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানালেন কেন? আমরা সবাই জানি র‌্যাবের কিছু কিছু দুর্নাম থাকলে তাদের সফলতাও কম নেই। তিনি যখন সেনাবাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে ক্লিনহার্ট অপারেশন পরিচালনা করেছিলেন তখন সেই ক্লিনহার্ট অপারেশনে নিহতদের ব্যাপারে বলা হতো হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে। সেই অপরেশন নিয়ে অনেক অনেক অভিযোগ থাকলেও বেগম জিয়াই এ হত্যাকান্ডের জন্য ইনডেমনিটি দিয়েছিলেন। তখনতো এর জন্য কেউ সেনাবাহিনী বিলুপ্তির অভিযোগ তোলেনি। অভিযোগ তোলবেই বা কেন? মাথাব্যাথার জন্য তো মাথা কেটে ফেললে হবে না। আর এ ধরনের অভিযোগ করা মূর্খতা ছাড়া অন্য নয়। বাংলাদেশেতো এর আগেও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা এমন ঘটনা ঘটেছে। তখনতো বেগম জিয়া কোনো বাহিনীকে বিলুপ্ত করে দেননি তা হলে এখন কেন র‌্যাবের বিলুপ্তির কথা বলছেন। কেবল নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার কারণেই এ দাবি- এটা মানতে না চাচ্ছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ দেশের রাজনীতি সতেন নাগরিকসমাজ। তারা মনে করেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জের মতো শত শত ঘটনা ঘটেছে। তখন তারা বিচারের বদলে উল্টো ইনডেমনিটি দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থেকেই এমন দাবি আসতে পারে।’ অনেকের মতে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনপূর্ব বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের দেশজুড়ে সৃষ্ট নাশকতা, ভয়াল তান্ডব আর নৃশংস সন্ত্রাস দমনে র‌্যাব প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। জঙ্গীগোষ্ঠীর ব্যাপক নাশকতার পরিকল্পনা সাহসের সঙ্গে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এ এ্যলিট ফোর্সটি। তাই বিএনপি-জামায়াতের ভয় আগামীতেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবর্তে সন্ত্রাসনির্ভর আন্দোলন করতে গেলে এই র‌্যাবই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণেই হয়তো তারা র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি তুলেছে। আমরা কিছুদিন যাবত লক্ষ্য করছি বিভিন্ন টিভির টকশোতে বিএনপি-জামায়াতপন্থী টকশোওয়ালা ও বুদ্ধিজীবীরা আকারে ইঙ্গিতে র‌্যাব বিলুপ্তির কথা বলতে চাইছেন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইসবুকেও ওই ঘরানার লোকেরা সরাসরি র‌্যাব বিলুপ্ত করে দেয়ার কথা বলছে। এ নিয়ে ফেইসবুকে বেশ তর্ক ও পাল্টা তর্কও জমে ওঠেছে। এই টকশো বা ফেইসবুক স্টেটাসওয়ালাদের সাথে বেগম জিয়ার র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি দেখা যাচ্ছে একই সূত্রে গাঁথা।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জাসদ সভাপতি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, র‌্যাবের জন্মদাতা হলেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনিই ক্ষমতায় থাকতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জঙ্গীবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। আর তাঁর সৃষ্ট জঙ্গীবাদের ভয়াল তান্ডবের কারণেই র‌্যাব সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ দুর্ধর্ষ সব জঙ্গীদের দমন করতে সাফল্য দেখিয়েছিল র‌্যাব। মাত্র কিছু দিন আগেও জঙ্গীগোষ্ঠী ও তাদের দোসর জামায়াত-শিবিরের ভয়াল তাণ্ডব-সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করে জনগণের জানমাল রক্ষা করেছে এই বাহিনী। এতদিন পর কিছু সদস্যের দুষ্কর্মের অজুহাতে পুরো র‌্যাবকে বিলুপ্তি করার খালেদা জিয়ার দাবি প্রহসন ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, শুধু র‌্যাব নয়, পুলিশ ও বিজিবির অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে নানা দুষ্কর্মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সশস্ত্রবাহিনীরও কতিপয় সদস্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। হত্যার শিকার হতে হয়েছিল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াকেও। কতিপয় ব্যক্তির দুষ্কর্মের জন্য খালেদা জিয়া কি পুলিশ, বিজিবি ও সশস্ত্রবাহিনীকেও বিলুপ্তির দাবি করবেন? কোন বাহিনীর সদস্যরাই আইনের উর্ধে নয়। অপরাধ করলে সবার শাস্তি হবে এবং হচ্ছে। তাই বলে পুরো বাহিনীকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দুরভিসন্ধিমূলক।

 

জানিনা, বেগম খালেদা জিয়া জনগণের মনে ভাষা পড়তে পারছেন কি না। বেগম জিয়ার এ দাবীকে মানুষতো সমর্থন করছেনই না বরং উল্টোপ্রশ্ন তুলে বলেছেন, শুধু র‌্যাব নয়- পুলিশ, বিজিবিসহ অন্য বাহিনীর সদস্যও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। তাহলে খালেদা জিয়া পুলিশ, বিজিবিসহ সব বাহিনীকেও বিলুপ্ত করার কথা বলবেন? কয়েকজন র‌্যার সদস্যে অপকর্মের জন্য পুরো বাহিনীর বিলুপ্ত করার খালেদা জিয়ার দাবি তাই খুবই হাস্যকর কৌতুক উদ্দিপক। এটা হতে পারে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে এত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েও র‌্যার ও আইনশৃংখলা বাহিনী তৎপরাতার কারণে সরকারের একবিন্দু ঘাম ও ঝরাতে  ব্যর্থতার বাড়াভাতে ছাই পড়েছে। এ প্রসংগে লেজকাটা শেয়ালের গল্পটা প্রাসঙ্গিক হতে পারে…।

সবশেষে এই বলে শেষ করবো, নারায়নগঞ্জের নৃশংস ৭ হত্যাকান্ডের পর বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছেন, এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। তবে এ নৃশংস হত্যাকান্ডের সাথে র‌্যাবের যে বা যারাই জড়িত থাকুক তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়। হোক সে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য কিংবা সরকারের ঘনিষ্ঠ কোন লোক। আমরা চাই দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। আর একটি কথা র‌্যাবের যে সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেছে এবং ইতিমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট যে তিনজন র‌্যাব সদস্যকে গ্রেফতাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের কোন দলীয় লেজুরবৃত্তি আছে কি না তা যথাযথ তদন্ত করে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই। কেননা সরিষার মধ্যেই যদি ভূত থাকে সে ভূত না তাড়ালে আবারও ইতিহাসের কোন জঘন্যতম হত্যাকান্ডের পুনরাবৃত্তি হতেও পারে। আমাদের মধ্যে যে এমন অনেক ভূত আছে যারা সরাসরি একটি গোষ্ঠীর পদলেহনকারী তার কিন্তু অনেক উদাহরণ আছে। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যারা ক্ষমতায় আছে তাদেরকেই।