ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

দীর্ঘদিন থেকে দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা পচনশীল খাদ্যদ্রব্যকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মাছ-মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ও ফলমূলে জনস্বাস্থের‌ জন্য ক্ষতিকর কার্বাইডসহ নানা ধরণের বিষাক্ত রাসয়নিক পদার্থ বা ক্যামিকেল মিশিয়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফলে মানুষ দিনে দিনে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন বা কার্বাইড মেশানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেছিল। আর দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রতো প্রায়  প্রতিদিনই ফরমালিন বা কার্বাইড নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ছাপাচ্ছেই। কিন্তু এতে কোন কাজ হচ্ছে বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। বরং দিনে দিনে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে এই দুইটি বিষাক্ত রাসয়নিক দ্রব্য মিশানোর যেন প্রতিযোগিতা চলছে। এ নিয়ে আমিও বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় বেশ ক’টি নিবন্ধ লিখেছি। কিন্তু ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী’।

যাক সে কথা, যে ফরমালিন নিয়ে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই সেই ফরমালিন এখন দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান প্রধান নেতা-নেত্রীদের মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে রাজনীতিতে যোগ হয়েছে নতুনমাত্রা। তবে এ বিতকর্ জনস্বার্থে নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোন দল কতটা পচেছে বা কোন দলকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে সে বিতর্ক জমজমাট। এ বিতর্কে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। তবে রাজনীতিতে পচে যাওয়ার বিষয়ে বিতর্কে সূত্রপাত করেছেন বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াই। গত ২৪ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বর্তমান মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগকে পচতে সময় দিয়েছি। ভাল ভাবে পচার পরই আন্দোলনের কর্মসূচি দেব।’ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার এ কটাক্ষের জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফর থেকে ফিরে। আর জবাবটা দিয়েছেন এভাবে,‘ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন নিজেই পচছেন। তাকে ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখা হচ্ছে।’ আওয়ামী লীগ বা বর্তমান সরকার আরো পচলে বিএনপি না এ প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পচলোটা কে? নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উঁনি নিজেই তো পচে যাচ্ছেন, এখন তো সব জায়গায় ফরমালিন। ফরমালিন দিয়ে তাকে তাজা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করছি। না হলে এত কথা উঁনি কিভাবে বলছেন।’

এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে দেশের বর্তমান রাজনীতি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ থেকে মাঝারী সারির নেতারাও জড়িয়ে পড়ছেন এ অনাকাঙ্খিত বিতর্কে। আর টকশো’তেও চলছে রমরমা আলোচনা। পতিত স্বৈরাচারী এরশাদও সামিল হয়েছেন এ বিতর্কে। তিনি বলেছেন,‘ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি চলে গেলে রাজনীতিতে ফরমালিন থাকবে না, দেশে খুন-গুম-অপহরণ বন্ধ হবে।’

কলাম লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাসুদা ভাট্টি  ৩ জুন ২০১৪ দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত তার ‘পচা ও ফরমালিন প্রসঙ্গ’ শিরোনামের নিবন্ধে এ প্রসংগে বলেছেন,‘ কিন্তু ফরমালিন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী…যে কথাটি বলেছেন তা যেন সকল কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ আরেকটু পচুক তারপর তিনি জোর আন্দোলনে নামবেন। …রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যি সত্যিই পচে যায় তাহলে কী ঘটনা ঘটে তা আমরা দেখেছিলাম ১/১১’র কালে। …জানি না, বেগম জিয়া সেই পরিণতির কথাই ভাবছেন কি না, তাহলে আমাদের বলতেই হবে যে, প্রধানমন্ত্রী পচে যাওয়া বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার যে প্রসঙ্গটি তুলেছেন তা যথার্থই হয়েছে। কারণ, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে সত্যিই পচে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত জামায়াতে ইসলামের মতো একটি সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এবং প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে দলটি সত্যিকার অর্থেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। …কিন্তু প্রশ্ন আরও আছে, আওয়ামী লীগকেই বা এরকম কথা শোনার পর্যায়ে নেমে আসতে হচ্ছে কেন? বেগম জিয়া ক্ষমতায় আসলে গোপালগঞ্জের নাম মুছে দেবেন, কাজেই সেরকম কথা হয়ত তার মুখ থেকে বের হতেই পারে। কিন্তু দেশের মানুষের সামনে আওয়ামী লীগ কি প্রমাণ করতে পারছে যে, তাদের হাতে দেশের মানুষ নিরাপদ? কিংবা তারা এখনও জনগণের রাজনীতিই করছে?…দলের কিছু দুষ্কৃতিকারী নেতার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়েছে। গণমাধ্যম সোচ্চার হয়েছে, সত্য-মিথ্যে মিলিয়ে দেশের মানুষের সামনে আওয়ামী লীগকে সত্যিকার অর্থেই ‘পচানোর’ চেষ্টা করেছে। নারায়ণগঞ্জ বা ফেনীর ঘটনা যদি না ঘটত তাহলে বেগম জিয়া যেমন ও কথা বলার সুযোগ পেতেন না তেমনই দেশের সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীন হতো না। দুঃখজনক সত্যি হলো, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সকল অপকর্মের দায় নিতে হয় শেখ হাসিনাকে…’।

কেবল মাসুদা ভাট্টিই নয় আরো অনেকে রাজনীতিতে ফরমালিন বিতর্ক নিয়ে লিখেছেন। এ ধারা হয়তো আরও কয়েকদিন চলবে তারপর সব ইস্যুর মতো এটিও চাপা পড়ে যাবে অন্যান্য ইস্যুর স্তুপে। তবে এই বিতর্কে একটি কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, রাজনীতিতে পচন ধরলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে তা আমরা অতীতে বহুবার দেখেছি। বর্তমানেও দেখছি। আমরা দেশে সুস্থ্যধারার রাজনীতি চাই পচনের রাজনীতি চাই না। রাজনীতিকে যে যত গালমন্দই করুন না কেন, মানুষের শেষ ঠিকানা কিন্তু রাজনীতিই। রাজনীতি ছাড়া কোন জাতি বা রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে না। একমাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে পারে, অন্য কোন তন্ত্রে-মন্ত্রে নয়। আমি কি বলতে চেয়েছি বিদগ্ধ পাঠকেরা নিশ্চয় অনুধাবন করেছেন।