ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বিগত কয়েক বছর যাবত কোমলমতি শিশুদের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে ভর্তি পরীক্ষার সেই ইঁদুর-বিড়াল প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে লটারীর মাধ্যমে ভর্তির যে ব্যবস্থা করেছেন এতে ছোট ছোট শিশু ও তাদের অভিবাবকরা খুশি হলেও খুশি হতে পারেনি কোচিং সেন্টারের মালিকসহ কিছু নামীদামী স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তাদের অভিযোগ ভর্তি পরীক্ষার বদলে লটারীর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির নিয়মে নাকি (তাদের ভাষায়) ভাল ছেলে-মেয়েদের মেধা বিকাশের পথকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিন্তু তাদের এ বক্তব্যের সাথে আমি একমত নই বলেই এ নিবন্ধের অবতারণা।

আমরা সবাই জানি, দীর্ঘদিন থেকে আমাদের দেশের নামীদামী স্কুলগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার নামে বিশাল ‘ভর্তি বাণিজ্য’ চলে আসছিল। এই বাণিজ্যের সাথে কোচিং সেন্টারগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করলেও সাথে সাথে নামীদামী স্কুলগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকা তথা স্কুল পরিচালনা কমিটিও যে দায়ি তা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। এই তথাকথিত ভর্তি বাণিজ্যে অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ নয়, আঙ্গুল ফুলে বট গাছ হয়েছে। আর কোচিং সেন্টারে ঘুরে ঘুরে অভিবাবকরা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ও সর্বসান্ত হয়েছে সেই সাথে তাদের কোমলমতি ছেলে মেয়েরা স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই অবতীর্ণ হয়েছে এক অসম ইঁদুর বিড়াল দৌড় প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে অনেক কোমলমতি শিশুদের মন ভেঙেচুড়ে খান খান হয়েছে যা তাদের পরবর্তী শিক্ষা জীবনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছে। আর কোচিং সেন্টার ও কিছু কিছু তকমাধারী নামীদামী স্কুল ‘ভর্তি বাণিজ্যে’র মাধ্যমে নিজেরদের আখের গুছিয়েছে।

এক্ষেত্রে কোচিং সেন্টাগুলো নামীদামী স্কুলে ভর্তি করে দেয়ার ‘গ্যারান্টি’র প্রতি আকৃষ্ঠ হয়ে  অসহায় অভিবাবকরা পিঁপড়ের মতো ভিড় জমিয়েছে কোচিং সেন্টারের আঙ্গিনায় তাই তারা যেমন ফুলেফেপে ওঠেছে অপর দিকে সেই সব নামীদামী স্কুলগুলো ভর্তির নামে ‘ডোনেশন বাণিজ্য’ করে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের শিকারের জালে আটকে যেমন মোটাতাজা হয়েছে তেমনি অর্জন করেছে সুনামও । তারা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ‘ক্রিম অব দ্য ক্রিম’ সংগ্রহ করে ঘি বানিয়ে সেই সুনাম অর্জন করেছে। আসলে ‘ক্রিম অব দ্য ক্রিম’ সংগ্রহ করে শুধু নামীদামী স্কুল কেন যে কোন অখ্যাত স্কুল বা বিদ্যাপীঠই ভাল ফলাফল করতে পারে। সেটা সবারই জানা।

আমাদের এমন অনেকেরই তথাকথিত অখ্যাত একের অধিক স্কুল পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে। আমি আমার এমন একটি লেখায় নামীদামী স্কুলগুলোর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলাম বেশি নয় শুধু একবার আপনাদের ও আমাদের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের বদলা বদলী করে পরীক্ষা দেওয়ায়ে দেখা যাক কারা কত নামী-দামী স্কুল পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু কেউ আমার সে চ্যালেজ্ঞ গ্রহণ করেনি। যারা অখ্যাত স্কুলগুলো পরিচালনা করে থাকে তাদের এ বিষয়ে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। বছরের শুরুতে ওই সব নামী-দামী স্কুলগুলো ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রথম সারির মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করার পর, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির মেধাবীরা ভর্তি হয় একটু কম নামী-দামী স্কুলগুলোতে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই একেবারে তলানীতে পড়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রদের নিয়েই অখ্যাত স্কুলগুলোকে চলতে হয়। এটাই হলো বাস্তবতা।

সেই কারণে ভর্তির ক্ষেত্রে ‘ভর্তি পরীক্ষার’ বদলে লটারী পদ্ধতি চালু হওয়ায় সেই সব নামী-দামী স্কুল ও কোচিং সেন্টারগুলোর আতে ঘা লেখেছে। তাই তারা সমসুরে সুর তোলেছে যে, এ পদ্ধতি বহাল থাকলে নামী-দামী স্কুলগুলোতে মেধার সংকট দেখা দেবে। তাই তারা বর্তমান ভর্তি পদ্ধতির বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লেগেছে। নামী-দামী স্কুলোর অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকরা পরোক্ষভাবে স্বীকার করছেন যে, মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থাৎ যারা বাসা থেকে বাবা-মা গৃহশিক্ষকের সহায়তায় লেখাপড়া নিজেরাই শিখে নেয়- তাদেরকেই ভর্তি পরীক্ষার সাহায্যে বাছাই করে স্কুলে ভর্তি করেন। অর্থাৎ মেধাবীদের মেধাবী হওয়ার পেছনে স্কুল কিছু করবে না বা করলেও রুটিন পাঠ চালিয়ে যাবে, স্কুলের খ্যাতি ঐ বাবা-মা এবং শিক্ষার্থীরা নিজেরাই বাড়িতে যথেষ্ট পরিমাণ পড়াশোনা করে পরীক্ষায় ভাল ফল অর্জন করে নিয়ে আসবে। এই গেল এক দিক, কিন্তু বড় দিকটি হচ্ছে সেই ভর্তি বাণিজ্য বা ডোনেশন বাণিজ্য। এ বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের পকেট ফাঁকা হতে শুরু করেছে বিধায় বর্তমান ‘ভর্তিতে লটারী পদ্ধতি বাতিল কেরে আবার পরীক্ষা পদ্ধতি ফিরে যাওয়ার জন্য চিৎকার করছে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো ‘মাধ্যমিক স্কুলগুলোর যেগুলোতে ১ম শ্রেণীতে শিশুরা ভর্তি হয়, সেখানে বিশেষ করে, ঢাকা শহরের খ্যাতিমান স্কুলগুলো লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির ফলে ভর্তি হওয়া মেধাহীন শিশুদের নিয়ে মহাসমস্যায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন, এ ধরনের পরোক্ষ সাঈকারোক্তি সবাইকে অবাক করেছে। শিশুরা ১ম শ্রেণীতে কোন কিছু না শিখেইতো ভর্তি হবে। ১ম শ্রেণীর বর্ণপরিচয়, সংখ্যা পরিচয় স্কুলের শিক্ষকই তাদের শেখাবে। যদি শতকরা ৮০-৯০ জন এক বছর পর এসব প্রাথমিক শিক্ষা শিখতে না পারে, তাহলে এ ত্রুটি তো শিক্ষকের ওপর বর্তায়, কোনক্রমেই শিশুর ওপর নয়’।

কাজে আমরা মনে করি এটা তাদের অন্যায় আবদার। কেননা, নতুন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে ‘লটারী পদ্ধতি’ চালু হওয়ায় লাভবান হয়েছে হাজার হাজার অভিভাক ও কোমলমতি শিশুরা। ভর্তি পরীক্ষার নামে ‘ভর্তি ও ডোনেশন বাণিজ্য’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মুষ্টিমেয় কিছু স্কুল ও কোর্চিং সেন্টারগুলোর আর্থিক ক্ষতি হলেও লাভ হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ ও কোমলমতি শিশুদের।