ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

শেষ পর্যন্ত  শুরু হলো বহুল প্রতিক্ষিত পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া। ১৭ জুন ২০১৪ চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে ঘটল অপেক্ষার পালা। এখানে উল্লেখ্য যে, মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি হলো চীনের রেল মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। এ চুক্তি অনুযায়ি সহসাই শুরু হবে মূল নির্মাণ কাজ।দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্রে পদ্মা সেতুর যে স্বপ্নের অপমৃত্যূ হতে যাচ্ছিল সেই স্বপ্নকে আবার জাগিয়ে তোলেছেন বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার। পদ্মসেতু যাতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে নির্মান হতে না পারে সে জন্যে বাংলাদেশের দু’একটি রাজনৈতিক দল ও তাদের লালিত গোষ্ঠী দেশবিরোধী আত্মঘাতি ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেছিল।  কিন্তু তাদের সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে বাংলাদেশের দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈদেশিক কোন ঋণ বা সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছেন।  চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে যা বাস্তবায়নের শেষ ধাপ অতিক্রম করলো। চুক্তি মোতাবেক মূল সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হবে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে মোট ব্যয়ের ২৫ দশমিক ৬০ শতাংশ (৩ হাজার ১০৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা) দেশীয় অর্থে ও অবশিষ্ট ৭৪ দশমিক ৪০ শতাংশ (৯ হাজার ২৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা) বৈদেশিক মুদ্রায় (ডলারে) পরিশোধ করতে হবে। এখন শুধু ক্ষণগণনা পালা নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার।

 

আমাদের স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র , অনেক নাটক হয়েছে। কারা কারা এসব ষড়যন্ত্র ও নাটকের কুশিলব তাদের চেহারাও মানুষের স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবলের কাছে  কোন ষড়যন্ত্রই টিকতে পারেনিনি। ২০০৯ সালে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া অন্যান্য দাতা সংস্থার মধ্যে ওই বছরের ১৮ মে জাপানের সঙ্গে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ প্রদান বিষয়ক চুক্তি করে সরকার। ২৪ মে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ১৪ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৬ জুন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা (৬১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এর মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে সবগুলো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শেষ হয়।

 

আমরা সকলেই জানি এই সেতু নির্মাণ নিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে। পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল এই সেতু নির্মানের। মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। সেতু নির্মাণে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি হয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু একসময় সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এই প্রকল্পে। বিশ্বব্যাংকের টানাপোড়েন শুরু হয়। যোগাযোগমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়া হয়। প্রায় সব শর্ত পূরণ করার পরও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। এর সাথে যুক্ত হয় নতুন শর্ত ড. মুহম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু নীতিগতভাবে সরকার এ শর্ত মানতে পারেনি। কিন্তু দেশি-বিদেশি ও ড. ইউনূস শিবিরের নানমুখী ষড়যন্ত্রে ও দুর্নীতির ভূতুরে অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি থেকে সড়ে যায়। বিশ্বব্যাংককে অনুসরণ করে অন্যন্য দেশ ও সংস্থাও সরে গেলে  শুরু হয়েছিল নানা জটিলতা। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে ফিরে আসতে দিতে থাকে অবাস্তব যত শর্ত। এসব শর্তের মধ্যে অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, ড. মুহম্মদ ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদে ফিরিয়ে আনা। বিশ্বব্যাক পদ্মা সেতুতে ফিরে আসতে নানা শর্তের বেড়াজালে কালক্ষেণ শুরু করলে সরকার নিজেদের অর্থায়নেই এ সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয়। নিজেদের অর্থে সেতু নির্মানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে কেন্দ্র করেও এদেশের এক শ্রেণীর সুশীল সমাজেএই বলে নেতিবাচক প্রচারনা শুরু করে যে, এটা আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নির্বাচনী মুলা। কিছুতেই নিজস্ব অর্থয়নে পম্দা সেতুর মতো মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ পড়বে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাংকিং খাত। কিন্তু শেখ হাসিনা একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর তল্পীবাহক সেসব সমালোচকদের মুখে চুনকালি মেখে নিজস্ব অর্থায়নেই এ সেতু নির্মান করতে যাচ্ছেন।

 

যাহোক, সরকারের বিভিন্ন গুরুত্পূর্ণ মন্ত্রীর বক্তব্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ ও প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে ৫টি প্যাকেজে পদ্মা সেতুর কাজ বাস্তবায়িত হবে। এ পাঁচটি প্যাকেজ হলো প্রশক প্যাকেজ মূল সেতু ও রোড এ্যান্ড রেল ভায়াডাকট, যেটির জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করা হলো চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির সঙ্গে। এ অংশের চুক্তি মূল্য ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। দ্বিতীয় প্যাকেজটি হচ্ছে, নদী শাসন কাজ। এ কাজের কারিগরি মূল্যায়ন শেষে ৪টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক প্রস্তাব দাখিলের জন্য আহ্বান করা হয়েছে। এ অংশের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। তৃতীয় প্যাকেজে রয়েছে জাজিরা এ্যাপ্রোচ রোড, টোল প্লাজা ও অন্যান্য ফ্যাসিলিটিজ কাজ। এ অংশের চুক্তি মূল্য ১ হাজার ৯৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। চতুর্থ প্যাকেজে রয়েছে মাওয়া এ্যাপ্রোচ রোড, টোল প্লাজা ও অন্যান্য ফ্যাসিলিটিস। এ অংশের চুক্তি মূল্য ১৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। পঞ্চম প্যাকেজে রয়েছে সার্ভিস এরিয়া-২। এ অংশের চুক্তি মূল্য ২০৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের ১২ জানুয়ারি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে।

 

যতটুকু জানা গেছে, ২০১৮ সালে এই পদ্মা সেতু চালু করা হবে। ইতিমধ্যে পদ্মা সেতু নির্মানের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে গেছে, একই সাথে এ নিয়ে বিরোধ নিস্পত্তি হয়েছে। এপ্রোচ রোড নির্মাণ প্রায় শেষের পথে ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর কিছু কাজ শুরু হয়ে গেছে। দুই পারের অবৈধ স্থাপনা সরানোর জন্য ১০ দিন সময় দেয়া হয়েছিল সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সেসব অবৈধ স্থাপনাও সরিয়ে নিয়েছে সবাই। শীঘ্রই মানুষ এই সেতুর দৃশ্যমান বাস্তবতা দেখতে পাবে। এ সেতু নির্মিত হলে এতে খুলে যাবে দক্ষিণ বঙ্গের স্বপ্নদ্বার। যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা দুর্গম পথের যাত্রী ছিলাম। চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে সেটা অতিক্রম করলাম।’ মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত হবে। এতে ওই ২১ জেলার কয়েককোটি মানুষ উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি এ মেগাসেতু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট অবদান রাখবে।

 

শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের পদ্মা সেতু আদৌও হবে কি না তা নিয়ে দেশের মানুষ হতাশায় নিমজ্জীত হয়েছিল। কিন্তু সরকার বিশেষ করে শেখ হাসিনা দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের কারণেই মূল সেতু নির্মাণের জন্য চীনের সাথের এই ঋণ চুক্তি সম্পন্ন করা হলো। শেখ হাসিনার প্রতি দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস তিনি তার অঙ্গিকার পূরণ করবেন। তাই আর কোন গোষ্ঠীর নতুন ষড়যন্ত্র নয়, নয় আর কালক্ষেপন। সম্ভাব্য সময়ের মধ্যেই এ সেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হোক তা দেখতে চায় দেশের মানুষ।