ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

মাহবুবুল আলম ।।

সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতার দাবী করে আসলেও বর্তমান শিক্ষাব্যাবস্থায় নিয়ে নানা অসঙ্গতি ও এর মান নিয়ে ছাত্র-ছাত্রী, অভিবাবক শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে হাজারো প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। সবারই এক কথা পরীক্ষার ফলাফলে পাশের হার এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেও শিক্ষার মান তেমন বাড়েনি। এ কথা প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ নিয়ে শিক্ষক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা বারবার অভিযোগ করেও কোন কাজ হচ্ছে না।

 

কেবল শিক্ষার মান নিয়ে মানুষই যে কথা বলছে তা নয়। আশ্চর্য হলেও, শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান নিজে। তবে শিক্ষাকে মানহীন বলে উল্লেখ করলেও মন্ত্রী এর জন্য শুধু শিক্ষকদের দায়ী করেছেন। ২০ জুন ২০১৪ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ‘শিক্ষাকে যেন এগিয়ে নিতে পারি সেজন্যই আপনারা। আমরা শতভাগ ঝরে পড়া কমিয়ে ফেলেছি। তারপরও বলা হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে না। আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছেই না। প্রাথমিকে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের কোন অবদান দেখি না।’ কিন্তু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবেন এমন বোদ্ধা মন্ন্ত্রীর এ কথা মানতে নারাজ। কেননা, শিক্ষককে চালান কে? যারা চালান তাদেরকেও এ অভিযোগ থেকে বাদ দেয়া ঠিক নয়। দেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার যে হাল তার জন্য একা শুধু শিক্ষকদের দায়ী করলে চলবে না।

 

শিক্ষার মান বাড়বেই বা কি করে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পরীক্ষার থেকে খাতা মূল্যায়ন এবং সর্বশেষ টেব্যুলেশন ও ফলপ্রকাশে যে তুঘলকী কান্ডকারখানা চলে তা শিক্ষাক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন। দেশের প্রাইমারী স্কুলগুলোর সিংহভাগ স্কুলগুলোতেই কোন  লেখাপড়া নেই। এর মূল কারণ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাধিক্য, শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব। অধিকাংশ স্কুলেই এক একটি শ্রেণীতে ১ থেকে দেড়শ’ শিক্ষার্থী। সেখানে একজন শিক্ষকের পক্ষে কিছুতেই পাঠদান সম্ভব নয়। রোল কল করে ও অন্যান্য কাজ করতে করতেই নিদ্দিষ্ট সময় চলে যায়। এটা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ থেকে নিন্মতম পর্যায় পর্যন্ত সবাই জানে। তবু পরীক্ষার সময় টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হয়, যাতে কেউ পরীক্ষায় ফেল না করে। আর সমাপনী পরীক্ষায় নাকি এমন ও নির্দেশ দেওয়া থাকে শিক্ষার্থরা পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারুক বা না পারুক বা কম পারুক যেভাবেই হোক লিখিয়ে শতভাগ পাশ নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে এমন কথাও চালু আছে, পরীক্ষার খাতায় পাশ মার্ক না ওঠলে সেখানে খাতা মূল্যায়নকারীরাই লিখে পাশ মার্ক দিতে হবে। তারপরও যদি পাশের হার না বাড়ে তা হলে ফলাফল প্রকাশের সময় এভারেজ গ্রেস মার্ক দিয়ে পাশের হার বাড়ানোর অলিখিত নির্দেশ আছে। তাই পাশের হার বাড়লেও এসব ছাত্র-ছাত্রীরা যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয় তখন দৈন্যদশা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। এ কথাটা পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

 

জনকন্ঠ ২০ জুন ২০১৪ মুহম্মদ জাফর ইকবাল  ‘কিছু একটা করি’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে বলেছেন‘,আজকাল পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার একেবারে আকাশ ছোঁয়া, বিষয়টা নিয়ে আমরা সবাই আনন্দ করতে পারতাম এমন কী গর্ব করতে পারতাম। কিন্তু আসলে আমরা সেটা নিয়ে আনন্দ কিংবা গর্ব করি না মুখবুজে হজম করি। তার কারণ যারা পরীক্ষার খাতা দেখেন তাদেরকে অলিখিত কিন্তু কঠিনভাবে মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয় সবাইকে শুধু উদারভাবে নয়, দুই হাতে মার্কস দিতে হবে। বিষয়টি এই দেশের সবাই জানে কিন্তু আমরা খুবই অবাক হলাম যখন টের পেলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটি জানে না! যদি সত্যি তারা না জানেন তাহলে বিষয়টা আরো ভয়ঙ্কর, তার অর্থ এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় নির্দেশের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো করে পরীক্ষা পাসের মচ্ছব বসিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টা নানা কারণে হৃদয়বিদারক, যার সব বিষয়ে জিপিএ ফাইভ পাবার কথা না তাকেও যদি রীতিমতো জোর করে জিপিএ ফাইভ দিয়ে দেয়া হয় তখন তার নিজের সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা হয়ে যায়। যখন এই অতিরঞ্জিত গ্রেড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া দূরে থাকুক পাস পর্যন্ত করতে পারে না তখন তারা খুব খারাপভাবে একটা ধাক্কা খায়। তাদের আত্মবিশ্বাস আত্মসম্মান একেবারে ধূলিসাত হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের এভাবে মানসিক নির্যাতনে ঠেলে দেয়ার কোনো মানে হয় না।’ শুধু বিশেষজ্ঞরাই নন আমাদের দেশের শিক্ষার মান নিয়ে কিছুদিন আগে প্রশ্ন তুলে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ‘ভর্তির হার বাড়লেও কমছে শিক্ষার মান। সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের শতকরা ৭৫ জন বাংলাতেই দক্ষ নয়। ইংরেজী ও গণিতের অবস্থা আরও করুণ। বাংলাদেশে শিক্ষার স্তর বেশ নিচু মানের উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। এ কারণে বাড়ছে না জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও।’

 

সম্প্রতি দৈনিক জনকন্ঠে বিভাষ বাড়ৈ ‘খাতা পুনর্নিরীক্ষণে ধরা পড়ল অসংখ্য ভুল’ শিরোনামে প্রতিবেদনে বলেছেন,‘ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণে সকল বোর্ডেই এবার ফলাফলে অসংখ্য ভুল ধরা পড়েছে। অনলাইন ভর্তিতে রেকর্ডসংখ্যক আবেদনের পর খাতা পুনর্নিরীক্ষণে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে পরীক্ষার্থীদের ফল। সাধারণ আটসহ দেশের ১০ শিক্ষা বোর্ডে খাতা পুনর্নিরীক্ষণে এক হাজার ৬৬২ পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে, যাদের প্রত্যেকেরই ফল আগের তুলনায় ভাল হয়েছে। কেবল তাই নয়, ১০ বোর্ডে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৯০ পরীক্ষার্থী। ৪২৬ শিক্ষার্থী ফেল থেকে নতুন করে পাস করেছে। ফল পরিবর্তন ও জিপিএ-৫ এ দুটি ক্ষেত্রেই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। এখানে খাতা পুনর্নিরীক্ষণে ভুল ধরা পড়ায় ফল পরিবর্তন হয়েছে ৫৯৪ জনের, আর নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬৪ পরীক্ষার্থী। এখানে ফেল থেকে নতুন করে পাস করেছে ৩৬ জন।’

 

তাড়াহুড়া করে ফল প্রকাশ করতে যেয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এ প্রতিবেদনই বলে দেয় পরীক্ষা নিয়ে কি অব্যবস্থাপনা চলছে। শিক্ষানীতিসহ আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কিছু সফলতা থাকলেও এসব অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের সফলতাকে ম্লান করে দিচ্ছে। ম্যানিপুলেট করে পরীক্ষায় পাশের হার বাড়িয়ে দিলেও প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান বেড়েছে এ কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে। কেননা, সম্প্রতি শেষ হওয়া দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এ-প্লাস ও জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের হতাশাজন ফলাফলেই তা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অংগ্রহণকারী জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ৮০ ভাগ ছাত্র-ছাত্রীই ন্যুনতম পাশ মার্ক পায়নি। এ চিত্র কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নয় মেডিক্যাল, বুয়েট থেকে শুরু করে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটলেও শিক্ষার মান যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে এত এত জিপিএ-৫ পেয়ে কি লাভ হলো? যে ফলাফল উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে কোন কাজে আসে না, সে জিপিএ ফাইভ দিয়ে কি হবে।

 

সবশেষে এই বলেই শেষ করবো, পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে আমরা ক্যুয়ানটিটি চাইনা চাই সর্বোচ্চা কোয়ালিটি। পরীক্ষার ফলাফলে যে ক্যুয়ানটিটি ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হতে কোন কাজে আসে না, সেই রকম ক্যুয়ানটিটির আমাদের দরকার নেই। এই ক্যুয়ানটিটি ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদের যেমন কাজে আসবে না, তেমনি কাজে লাগবে না দেশ বিণির্মানেও। এক সময় এরা রাষ্ট্রের সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিনত হবে, এতে করে সমাজ ও রাষ্ট্রে বাড়বে আরো বিশৃংখলা ও অশান্তি। সরকারের পক্ষ থেকে যতদ্রুত সম্ভব তা নিরসনে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী বলে আমরা মনে করছি।