ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

 

বিশ্বকাপের টান টান উত্তেজনা এখন প্রায় চরম পর্যায়ে। অাট দেশের সাতটি ম্যাচের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহা আয়োজন ২০১৪। এখন কোটার ফাইন্যালে উন্নীত অাটটি দেশের মধ্যে যে দেশ তিনটি ম্যাচ জয়লাভ করবে সেই দেশের ফুটবল দলের হাতেই শোভা পাবে এবারের সোনার বিশ্বকাপ। এ পর্যন্ত খেলা যা হয়েছে তাতে তেমন কোন অঘটন ছাড়াই ফেভারিটরা কোটার ফাইন্যালে ওঠেছে। কোয়াটার ফাইন্যালে ব্রাজিল-কলম্বিয়া, আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম, জার্মানী-ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া একে অপরকে মোকাবিলা করবে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ৮৪ বছরের ইতিহাসে এবার যেন বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের সকল উৎসাহ উদ্দীপনায়ই ছাড়িয়ে গেছে। উত্তর আমেরিকার ফুটবলের জন্য জনপ্রিয় দেশ ব্রাজিলে ৩২ দেশের যুদ্ধে এখন টান টান উত্তেজনা। তবে এটা কোন সাধারণ যুদ্ধ নয় বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপার জন্য লড়াই। এই যুদ্ধে হেরে গিয়ে ইতিমধ্যে ২৪টি দেশ তাদের সৈন্যসামন্ত নিয়ে নিজ দেশে চলে গেছে হতাশার গ্লানী নিয়ে। যাকে বলে ‘ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ান’। এই কারণে কোন কোন দেশে যুদ্ধে টিকে থাকতে না পারার কারণে সেনাপতির পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। এই যখন যুদ্ধে হেরে যাওয়া অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অবস্থা তখন আমাদের দেশ সেই যুদ্ধে অংশগ্রহন না করলেও এখানে কিন্তু উত্তেজনার সীমা পরিসীমা নেই। আমাদের দেশের ৮০ ভাগ মানুষই এখন ব্রাজিল না হয় আর্জেন্টিনা এই দুই শিবিরে বিভক্ত। তাই এখানে উত্তেজনার মাত্রাটাও বেশি। খেলাপাগল বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল বা ক্রিকেটের যে কোন বড় আসর বসলেই এদেশের মানুষ তা দারুন উপভোগ করে। হাল আমলে আমাদের এখানে ক্রিকেট খেলা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠলেও ফুটবল খেলাও যে সমান জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, এই বিশ্বকাপ আসরে তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

যাক বিশ্বকাপ ফুটবল এখন শেষ পর্বে। ৩২টা দেশ লড়াই করে শেষ আটে যারা ওঠে এসেছে তারা তাদের ক্রীড়ানৈপুণ্য ও যোগ্যতা প্রমান করেই কোয়াটার ফাইন্যালে ওঠেছে। এখন যে যুদ্ধ আরো কঠিন ও চরম হবে তা স্পষ্ট। তবে সেমি-ফাইন্যালের লড়াইয়ে যাওয়ার আগেই ইউরোপের দুই ফেভারিট জার্মানী ও ফ্রান্স দুই দলের যে কোন একটি দলকে শিরোপা লড়াই থেকে ছিটকে পড়তে হবে। তাই এই দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে এক এক ধরনের হতাশা নেমে এসেছে। কেননা শেষ আটে এই দুই দল একে অপরের মুখোমুখি হবে আগামী শুক্রবার।সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তিনবারের ও একবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জার্মানী ও ফ্রান্স। ওই দিনের খেলায় যে দল হারবে সেই দেশেরই বিশ্বকাপ ফুটবল মিশন শেষ হযে যাবে। আর যারা জয়লাভ করবে তারা উঠে যাবে সেমি-ফাইন্যালে।

তবে আমাদের দেশের ফুটবল ভক্তদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে নিয়ে। যদি কোন অঘটন ঘটে যায় তা হলেই যে তাদের স্বপ্নভঙ্গের হাহাকারে ডুবে যেতে হবে। তবে অনেক বোদ্ধা সমর্থক আছেন তারা চান শেষ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার তুমুল ফুটবল প্রিয় এই দুই দেশের মধ্যে ফাইন্যালটা হোক। আর যারা একেবারে কট্টর সমর্থক তারা এক দল আরেক দলের পরাজয় কামনা করছেন।

তবে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে সেরা ঘটনা কামড় ও অভিনয় পর্ব। এ কর্ম দুটি করে দুই নায়কই এখন খলনায়কে পরিনত হয়েছে। গত বিশ্বকাপেও এমন খল নায়কে পরিনত হয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান। তিনি প্রতিপক্ষের খেলোয়ারকে ষাড়ের মতো গুঁতো দিয়ে ফেলে দিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। আর এবার শুধু কামড় কাণ্ড নয়, অভিনয়ের কান্ড ও ঘটেছে এবং এর জন্য একজনের শান্তি হয়েছে অন্যজনের মাথার ওপর শাস্তির খড়গ ঝুলছে। এই সেরা দুই ঘটরা হলো; বিশ্বকাপে উরুগুয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ ৪ ম্যাচ ও ৯ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হয়েছেন। পাশাপাশি তাকে ৮০ হাজার ডলার জরিমানাও গুনতে হবে। ইতালির ডিফেন্ডার জিওর্জিও চিয়েল্লিনিকে কামড়ের কারণে তার এই দন্ড। আর দ্বিতীয় খলনায়ক হলেন বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলোয়ার হল্যান্ডের রোবেন। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে একদম ইনজুরি সময়ে চলা খেলায় তাঁর নিখুঁত অভিনয় করে পড়ে যাওয়াটা ধোঁকা দিয়েছে রেফারি পেড্রো প্রোয়েঙ্কাকে। আর রেফারিকে বোকা বানিয়ে ফাউল আদায় করাটাই ছিল রোবেনের লক্ষ্য সেটা নিজেও পরে স্বীকার করেছেন তিনি।

তবে দলকে জেতানোর জন্য কৌশলটা কাজে লেগেছে ওই ফাউলের সুবাদে পাওয়া পেনাল্টি থেকে ক্লসজান হান্টেলার গোল করার পর। এ ডাচ্ স্ট্রাইকার স্বীকার করেছেন তিনি প্রথমার্ধেও এমন একটি অভিনয় করে ফাউল আদায় করেছিলেন। রোবেনের এ স্বীকারোক্তি এবার তাঁকে দোষী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সে কারণেই রোবেনকে শাস্তির মুখোমুখি করার চিন্তা-ভাবনা করছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। কেননা, এমন সময় তিনি ওই অভিনয়টা করেছেন যেটা ম্যাচের ফলাফল গড়ে দিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অপরপক্ষ যা আইনের চোখে প্রতারণার শামিল। ফুটবলের মতো বিশ্বকাপের আসরে কিছুতেই এ ধরনের ছলচাতুরী বা প্রতারণা কাম্য হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে লুইস সুয়ারেজের অপরাধের তুলনায় রোবেনের অপরাধও কম নয়। এ অবরাধের জন্য রোবেনেরও উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে বড় বড় ক্রীড়া আসরে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আরো বেশি ঘটার সম্ভবনাকে কিছুতেই উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

এই বলেই শেষ করবো যে কোন বড় ক্রীড়া আসরেই মাঝে মাঝে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে যা খেলার সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। খেলাকে নিতে হবে খেলা হিসেবেই। এতে জয়-পরাজয় থাকবে। জয়ের পাশাপাশি পরাজয় মেনে নেবার মানসিকতাও থাকতে হবে সবার। আর বাংলাদেশে ক্রীড়ামোদী দর্শকদের প্রতি অনুরোধ খেলা নিয়ে বন্ধু-বন্ধব বা আত্নীয় স্বজনের সাথে মনমালিন্য রাগ-বিরাগের সৃষ্টি না হয়। খেলা শেষ হয়ে যাবে কিন্তু সম্পর্কের বন্ধন ছিন্ন হয় না কোনদিন। আর খেলা নিয়ে যেন উচ্ছ্বাসের মাত্রা কখনো ছাড়িয়ে না যায় সে কথাটা সবাইকে মনে রাখতে হবে। যে দল ভাল খেলে জয়লাভ করবে সে দলের হাতেইতো শিরোপা উঠবে এটাই তো নিয়ম তা নয় কি?