ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

বাংলাদেশের জন্য আরও একটি সুসংবাদ। ১৪ মার্চ ২০১২ জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এ রায়ে মায়ানমারের সাথে আইনী লড়াইয়ে ১ লক্ষ ১১ হাজার বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রাসীমা জয়লাভ করেছিল বাংলাদেশ । মায়ানমারের পর ভারতের সাথেও এবার সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি মামলায় বাংলাদেশ জয়ী হল । ভারতের সাথে ২৫ হাজার ৬ শত বর্গকিলোমিটার এলাকার বিরোধ নিয়ে নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের (পিসিএ)রায়ে বাংলাদেশ নতুন ১৯ হাজার চারশ’ ৬৭ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক ভূখণ্ড জয়লাভ করলো। দীর্ঘ চার বছর নয় মাস আইনি লড়াইয়ের পর এ চূড়ান্ত রায় হাতে পেল বাংলাদেশ। সমুদ্রসীমায় নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হল বাংলাদেশের। মহীসোপানে চিত্রিত হলো নতুন মানচিত্র।

এই সালিশি মামলায় (পিসিএ’র) বিচারক ছিলেন পাঁচজন। এদের মধ্যে আদালতের প্রধান জার্মানির প্রফেসর ড. রুডিগার উলফ্রাম। অন্যরা হলেন, ফ্রান্সের জ্যাঁ-পিয়েরে কট, মায়ানমারের থমাস এ ম্যানসা, ভারতের ড. প্রেমারাজ শ্রীনিবাস রাও, প্রফেসর ইভান সিয়েরার। প্রথা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারত একজন করে বিচারক মনোনীত করে থাকে। এদের মধ্যে ভারতের মনোনীত বিচারক ড. প্রেমারাজ শ্রীনিবাস রাও এ রায়ের সঙ্গে কিছু অংশে দ্বিমত পোষণ করেন।

বাংলাদেশের পক্ষে মামলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমুদ্রবিষয়ক ইউনিটের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম ডেপুটি এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের পক্ষে কৌঁসুলি হিসেবে ছিলেন লন্ডনের ম্যাট্রিক্স চেম্বার্সের প্রফেসর জেমস ক্রোফোর্ড এসসি, প্রফেসর ফিলিপ স্যান্ডস কিউসি, এসেক্স কোর্ট চেম্বার্সের প্রফেসর অ্যালান বয়েল, মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পায়াম আকাভান, ওয়াশিংটন ডিসির ফলি হগ এলএলপির পল এস রিখলার ও লরেন্স মার্টিন। অপরদিকে ভারতের পক্ষে এজেন্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবও আইনি উপদেষ্টা ড. নিরু চাধা এবং কো-এজেন্ট ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। ভারতের কৌঁসুলিদলে ছিলেন আর কে পি শংকরদাশ, প্যারিস ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি নানতেরে-লা ডিফেন্সের প্রফেসর অ্যালিয়ান প্যালেট, লন্ডনের স্যার মাইকেল উড, ইয়েল ল স্কুলের প্রফেসর ডাব্লিউ মিশেল রেইসম্যান।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমুদ্রসীমার বিরোধ বিষয়ে ভারতের যুক্তি ছিল সমদূরত্বের (ইকুইডিসট্যান্স) ভিত্তিতে রেখা টানতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের এ যুক্তির বিরোধিতা করে ইকুইটি বা ন্যায্যতার ভিত্তিতে রেখা টানার পক্ষে অবস্থান নেয়। এর পাশাপাশি জ্যামিতিক ‘অ্যাঙ্গেল বাই সেক্টর’ পদ্ধতিতে দাবি জানায় বাংলাদেশ। তবে আদালত দু’দেশের কোন একটি যুক্তিতে না গিয়ে আদালতের নিজস্ব বিবেচনায় সমতার ভিত্তিতে এ রায় দেন। আদালতের এ রায় আন্তর্জাতিক আইনে নতুন দিগন্ত সূচনা হয়েছে। কেননা, এ ধরনের সাহসী সিদ্ধান্ত আজ পর্যন্ত কোন আন্তর্জাতিক আদালত দেননি। এজন্য বাংলাদেশ সরকার ও এদেশের ১৬ কোটি মানুষের পক্ষে পিসিএকে অভিনন্দন জানাই। অভিনন্দন জানায় বাংলাদেশের মানুনীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তাঁর মতো সাহসী নেত্রী না হলে দুইটি প্রভাবশালী দেশের কাছ থেকে ১ লক্ষ ৩০ হাজার বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমা আইনী লড়াইয়ে চিনিয়ে আনা কখনো সম্ভব ছিল না। একই সাথে অভিনন্দন জানাতে চাই সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে কেননা, তার সাহসিকতা ও কুটনৈতিক তৎপরতার ফলেই আজকের আমাদের এ বিশাল অর্জন। একটি তথ্য হয়তো সবার জানা নেই যে ভারতের অগোচরেই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্দেশনায় মামলা করা হয়। ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সালিশি আদালতে আবেদন করে বাংলাদেশ। দীপু মনিই এ মামলার বাদী।
নেদারল্যান্ডসের রাজধানী হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশী আদালতে ২০১৩ সালের ৯ থেকে ১৮ ডিসেম্বর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পক্ষে বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। শুনানি শেষে আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, কার্যবিধির ১৫ ধারা অনুযায়ী ছয় মাস পর এই দুই নিকট প্রতিবেশীর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের রায় দেয়া হয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনার পর মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর সালিশী আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে গত ১৮ ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মামলার শুনানি শেষ হয়। শুনানির ছয় মাসের মধ্যে রায় ঘোষণার কথা জানায় স্থায়ী সালিশী আদালত। অমীমাংসিত সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে মামলা চলার পর রায় পেয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। দুই দেশের জলসীমা শুরু হবে কোত্থেকে, সেটাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধের মূল বিষয়। এছাড়া ভূমিরেখার মূল বিন্দু থেকে সমুদ্রে রেখা টানার পদ্ধতি নিয়েও মতবিরোধ ছিল। সালিশী আদালত দুই দেশের উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক এবং মেমোরিয়াল ও কাউন্টার মেমোরিয়াল বিবেচনা করে রায় দিয়েছে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণ ও সমুদ্রসীমা বিরোধ নিস্পত্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে মায়ানমার ও ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করেন। এবং এ লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু একটি আইনও পাশ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর বিয়োগান্তক হত্যাকান্ডের পর সরকারগুলো এ ব্যাপারে আর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় সবকিছু থমকে যায়। এই কারণে সমুদ্রসীমা উদ্ধারে উদ্যোগগ্রহণ না করায় বাংলাদেশের এই বিশাল ভূখন্ড হাতছাড়া হওয়ার যোগার হয়েছিল। ২০১১ সালের মধ্যে জাতিসংঘে দাবি উত্থাপনের জন্যে শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা ছিল। আগের সরকারগুলোর মতো বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার যদি এ ব্যাপারে নিল্র্প্তি থাকতো তা হলে বাংলাদেশেকে চিরদিনের জন্য এ বিপুল পরিমান সমুদ্রসীমা হারাতে হতো।

বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসারপর এ নিয়ে কুটনৈতিক পর্যায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা মীমাংসার চেষ্টা চালায়। কিন্তু মিয়ানমার ও ভারত এ ব্যাপারে বাংলাদেশের ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা মীমাংসায় এগিয়ে না এসে বাংলাদেশের দাবীকৃত সমুদ্র অঞ্চলে গ্যাস-তেল অনুসন্ধানে কাজে বাঁধার সৃষ্টি করে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার তাতে দমে না গিয়ে সমুদ্রসীমায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অতি দ্রুত সমুদ্র এলাকায় জরিপকার্য সম্পন্ন করা হয়। ২০১০ সালের মধ্যে জরিপ সম্পন্ন করে ২০১১ সালে নির্ধারিত সময়ের আগেই ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘে দাবি উত্থাপন ও পেশ করে। অন্যদিকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি হিসাবে নৌবাহিনীসহ প্রতিরক্ষাবাহিনীকে আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করে সমুদ্রসীমায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন ঘাঁটি করা হয়।
এটা সাদামাটা কোন ব্যাপার নয়, এটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় সাফল্য। ১৯৭৫ সালর পর অনেকেই ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু তাঁদের কেউই এ বিষয়ে সামান্যতম দৃষ্টিপাত করেননি। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর মাধ্যমেই দেশের এত বড় সাফল্য এল। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যে যে ২৮টি গ্যাস ব্লক চিহ্নিত করে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল ভারত ও মিয়ানমারের ডিসপুটের কারণে এতদিন একটি ছাড়া বাকি ২৭টি ব্লকে অনুসন্ধান কাজ স্থগিত রাখতে হয়েছিল। এ ডিসপুটকৃত ২৭টি ব্লকের মধ্যে ভারত ১০টিতে এবং মিয়ানমার ১৭টি ব্লকে তাদের মালিকানা দাবী করে বসে। সমুদ্রসীসানা নিয়ে জয়লাভ করায় এ কোনো ব্লকে আর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আর কোনো বাঁধা থাকল না।

শেষ করবো এই বলেই, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ মামলার রায় নিয়ে কয়েকদিন যাবত বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষায় ছিল। এর আগে একবার রায়ের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ায় অনেকের মনেই উদ্বেগ উৎকন্ঠা ছিল আসলেই রায়টি হবে কিনা। সন্দেহবাতিকগ্রস্তরা ভেবেছেন নাকি ভারতের মতো বিশাল শক্তির দেশ পিসিএ-তে প্রভাব খাটি রায় ওলট-পালট করে দেয়। কিন্তু দুদিন আগেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদের সমাপনী অনুষ্ঠানে দৃঢ় কন্ঠেই বলেছিলেন, ‘ইনশাআল্লা এ মামলায় আমরাই জিতবো।’ শেখ হাসিনার এ যে দৃঢ়চেতনা তাতেই আমাদের বিশ্বাস জন্মেছিল যে রায় আমাদের পক্ষেই আসবে। তবে ভেতরে ভেতরে এমন আশঙ্কাও কাজ করছিল যে, যদি কোন কারণে বাংলাদেশের বিপক্ষে রায় যায় তাহলে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের জোট আবার দেশ বিক্রির জিগির তুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ পাবে। তারা বলবে-মায়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জিতলেও ভারতের প্রতি নতজানু শেখ হাসিনার সরকার মোদী সরকারকে বাংলাদেশের বিরাট এলাকা উপটৌকন দিয়ে এসেছে। শিক্ষিত মানুষ বিষয়টি বুঝলে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিতরা মনে করতো ঠিকই বোঝি শেখ হাসিনা ভারতকে বিশাল এলাকা ছেড়ে দিয়ে এসেছে। যাক এ রায়ের ফলে বিএনপি জামায়াতের সে সুযোগটি আপাতত হাতছাড়া হয়ে গেল।