ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলী বর্বরোচিত হামলা সকল বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। ইসরাইল সেখানে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। ইসরাইলী এই বর্বরোচি হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠলেও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলী বর্বরতা বন্ধতো হয়ইনি বরং বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষের প্রতিবাদকে উপেক্ষা করে এই পবিত্র রমজান মাসে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বেসামরিক লোকজনসহ নিরপরাধ নারী-শিশুদের ওপর নির্বিচারে বোমা হামলা ও নির্মম নিধনযজ্ঞ চলিয়ে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিকে রক্তাক্ত করেছে।
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জুন মাসে ইসরাইলের তিন কিশোর নিখোঁজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসরাইল হামাস যোদ্ধাদের করে ফিলিস্তিনে হামলার উছিলা খুঁজতে থাকে। এর পর ওই তিন কিশোরের মৃতদেহ উদ্ধার করে ইসরাইলী উগ্রবাদীরা ফিলিস্তিনে তান্ডব চালায়। তারা এক ফিলিস্তিনী কিশোরকে নৃশংস নির্যাতন করে পুড়িয়ে হত্যা করে এবং এর পাশাপাশি ইসরাইলী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস শুরু হলে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইসরাইলী বিমানবাহিনীকে বিমান হামলার নির্দেশ দেন এবং এর সঙ্গে স্থল হামলাও অনুমোদন করেন। ইসরাইলী বিমান হামলার বৈধতা প্রমাণ করতে ইসরাইল হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইল ভূখণ্ডে রকেট হামলার অভিযোগ উত্থাপন করে। সেই রকেট হামলা প্রতিরোধে ইসরাইল বিমান হামলা চালাচ্ছে বলে ইসরাইল বিশ্বমিডিয়ায় প্রচার করে। ইসরাইল ৮ জুলাই থেকে গত এক সপ্তাহ ধরে বার বার বিমান হামলা চালিয়ে বহু নিরপরাধ ফিলিস্তিনীকে হত্যা করেছে।

এ হামলর বিরুদ্ধে ১০ জুলাই ফিলিস্তিনি ঐক্য সরকারের প্রধান মাহমুদ আব্বাস অভিযোগ করে বলেছেন, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। গতকাল তিনি পরিষ্কার ভাবে বলেছেন, “ইসরাইল গাজায় যা করছে তা গণহত্যা। আমাদের ফিলিস্তিনি জনগণের পুরো পরিবারকে হত্যা করার ঘটনা গণহত্যা ছাড়া কিছু নয়।” তিনি আরো বলেন, “আমরা জানি ইসরাইল এই আগ্রাসনের মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করছে না বরং তার অবৈধ বসতি নির্মাণ কর্মসূচিকে রক্ষা করছে।” গাজার ওপর যখন ইসরাইল আকাশ ও স্থল পথে আগ্রাসন চালাচ্ছে তখন মাহমুদ আব্বাস এ অভিযোগ করলেন। মাহমুদ আব্বাস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ইসরাইল ফিলিস্তিনীদের মাটি ও ভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে চায়। ফিলিস্তিনী প্রেসিডেন্টের এমন এক নিরাপত্তাহীনতায় করুণ আশঙ্কা জানানোর পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভীষণ মৌনভাবে ইসরাইলের জুলুম-নির্যাতন অবলোকন করে চলছে। জাতিসংঘ অত্র অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও এ ব্যাপারে কোন কার্যকর পদক্ষেপ এখনও নেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে অস্ত্রবিরতির কথা বলেছেন। ওবামার এ প্রস্তাবে ইসরাইলের প্রতি কোন সোচ্চার দাবি ছিল না, এটি ছিল মাত্র একটি প্রস্তাব। এছাড়াও ফিলিস্তিনের ঐক্য সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, “আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মরক্ষার অধিকার আছে।”

আসুন পাঠক এ পর্যায়ে একটু জেনে নিই কিভাবে ইহুদীবাদী ইসরাইলী রাষ্টের সৃষ্টি হলো। ইতিহাস বলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে অবৈধভাবে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে দিন দিন ইসরাইলের ঔদ্ধত্য চরমে ওঠে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মৌনতার কারণে আস্তে আস্তে ইসরাইল ফিলিস্তিনের ভূখন্ড দখল করে এখন ফিলিস্তিনীদেরই তাদের নিজ ভূখন্ড থেকে সমূলে উৎখাত করার পাঁয়তারা করছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশরা বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ইহুদীদের সহযোগিতার বদৌলতে যুদ্ধ শেষে ইহুদীদের জন্য একটি আবাসভূমি গঠনের গোপন প্রতিশ্রুতি দেয়। তখন ডক্টর থিওডোর হার্জেল ইহুদী ধর্মের রাজনৈতিক সংস্করণ হিসেবে জায়নবাদতত্ত্ব আবিষ্কার করেন- শীঘ্রই তাঁর জায়নবাদী নীতি ভয়ঙ্কর আগ্রাসী, সন্ত্রাসী ও ধর্মীয় মৌলবাদের নৃশংস অধ্যায় রচনা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে জায়নবাদী ইহুদীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদীদের এনে ফিলিস্তিনীদের জমি দখল করে জোর করে ইসরাইল রাষ্ট্র গড়ে তোলে। সেই থেকেই আন্তর্জাতিক সমাজের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জায়নবাদীদের সে নীলনকশা বাস্তবায়িত হয়।

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলী বাহিনীর নির্বিচারে বোমা হামলা ও গণহত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও মানবতাবাদী বিভিন্ন সংগঠন রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে সরকার, বিরোধীদল জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মন্ত্রিসভা। বেপরোয়া ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে জাতিসংঘের কাছে আহ্বান জানাবে বাংলাদেশ। গতকাল ১৪ জুলাই ২০১৪ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই এই নিন্দা জানানো হয়।

ইসরাইলের অমানবিকতা ও নৃশংসতার বিরুদ্ধে সারা বিশ্বে প্রতিবাদের ঝড় ওঠলেও সুপার পাওয়ার আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাবত শক্তিবর্গ তথা বর্তমান বিশ্বের পাশ্চাত্য বৃহৎ শক্তিবর্গের পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ মদদে ইসরাইল তার নৃশংসতা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা মুসলিমবিশ্ব আরবলীগ ওআইসিসহ এবং মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে রোষারেষি ও বৈরিতার সুযোগ নিচ্ছে আমেরিকাসহ প্রাশ্চাত্যশক্তি এবং ইহুদীবাদী শক্তির ধারক-বাহকরা।

গত কয়েকদিনে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অব্যাহতভাবে বিমান, রকেট ও স্থল অভিযান চালিয়ে আসছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে পরিচালিত এই অভিযানে ইসরাইলী বাহিনীর নির্বিচারে বোমা হামলা ও নির্মম গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘ, ওআইসি ও আরব লীগসহ বিশ্বসংস্থাগুলোর দ্রুত এগিয়ে আসবে বলে মনে করছে বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষ। পবিত্র রমযান মাসে ইসরাইলী বাহিনী গাজা উপত্যকাকে মৃত্যুউপত্যকায় পরিনত করেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত নিরপরাধ মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী-শিশু এবং বৃদ্ধও রয়েছে। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ এবং ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজার অসংখ্য বাড়িঘর ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনা। তারা যেন গাজায় পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করেছে।

এ পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে; জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন ফিলিস্তিনে ইসরাইলের নৃশংস বিমান ও স্থল হামলার বিরুদ্ধে তেমন কোন এ্যফেকটিভ বা কার্যকর প্রতিবাদ জানায়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নাভিপিল্লাই বলেছেন, ইসরাইল বেসামরিক ফিলিস্তিনীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মানছে কিনা তাতে সংশয় রয়েছে। তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন, এ ব্যাপারে তদন্ত হবে এবং সে তদন্তে দোষী হলে ইসরাইলের জবাবদিহিতার প্রশ্ন উঠবে। পিল্লাইয়ের বক্তব্য এ বক্তব্য বা বিবৃতি বিশ্লেষণ করলে যে কারোই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, তার এ বক্তব্যটি নিছক কূটনৈতিক, এতে ইসরাইলের ওপর জোরালো কোন চাপ প্রয়োগের কোন আভাস নেই। ইসরাইল যেভাবে বিমান ও স্থল হামলা চলাচ্ছে, তা তদন্তের কথা বলে কালক্ষেপনের উদ্দেশ্য ছাড়া কিছু নয়। তদন্ত ছাড়াই সারা বিশ্ব চর্মচোক্ষে প্রতিদিন ইসরাইলী যে বর্বরতা প্রত্যক্ষ করছে তাতে সিদ্ধান্তে আসা যায়। গত এক সপ্তাহে প্রায় দেড় হাজার ইসরাইলী বিমান হামলায় ফিলিস্তিনের সর্বত্র নারকীয় তান্ডব বিস্তার করা হয়েছে। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে রকেট হামলার অভিযোগে ইসরাইলের বিমান হামলার কথা বলা হলেও পশ্চিম তীরে কেন ইসরাইল বিমান হামলা করছে? জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠিয়ে ইসরাইলের সামরিক অভিযান বন্ধ করা প্রয়োজন এখনই। আমাদের মনে হচ্ছে ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ওবামার নমনীয়তা ইসরাইলী ঐদ্ধাত্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মেরকেল নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোন আন্তর্জাতিক চাপের কাছে ইসরাইল নতিস্বীকার করবে না।

পরিশেষে এই বলেই শেষ করবো ইসরাইলী বাহিনীর এই নির্মম গণহত্যা সাম্প্রতিক সময়ের সকল নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়েছে। ফিলিস্তিনীদের নিজ ভূ-খন্ড থেকে উচ্ছেদ করে ইসরাইলী বাহিনী তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। ফিলিস্তিনের নিরীহ মুসলমানদের ওপর ইসরাইলী হায়েনাদের বর্বর গণহত্যা বিশ্বের মুসলমানকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গত ৮ জুলাই থেকে ইসরাইল উপর্যুপরি বিমান হামলায় ফিলিস্তিনের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা-শিশু-নারীসহ ১৭২ জন সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার ঘর-বাড়ি, বাস্তুভিটা, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মক্তব, ঐতিহাসিক নির্মাণসমূহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। স্মরণাতীত কালে এত ভয়াবহ প্রাণহানি ও স্থাপনার ক্ষতিসাধন হয়নি। এমতাবস্থায় ইসরাইলের করালগ্রাস থেকে ফিলিস্তিনকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক শক্তি এগিয়ে না এসে উট পাখির মতো মরুভূমির বালিতে মুখবুজে সবকিছু প্রশ্রয় দিলে অত্র অঞ্চলে যে ভয়াবহতার সৃষ্টি হবে তা যে একদিন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে তা মুরব্বি রাষ্ট্রসমুহকে ভেবে দেখতে হবে।