ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দেশ যেসব সাফল্য অর্জন করেছে তা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশই করতে পারেনি। এটি নিঃসন্দেহে আমরা যারা দেশকে ভালোবাসি তাদের জন্য অবশ্যই গৌরবের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগোযোগ ভৌত অবকাঠামো বিদ্যুত, জ্বালানী খনিজসম্পদ, নারীর ক্ষমতায়ন বড় বড় দুইটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর সদ্য সমাপ্ত অর্থবৎসরে ৬.০৩ জিডিপি অর্জনস, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ২ হাজার দুইশত কোটি ইউএস ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ প্রায় প্রত্যেকটি সূচকেই যে সাফল্য অর্জন করেছে তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। এই প্রেক্ষিতে দেশি-বিদেশী অনেক অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ, বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মনে করছেন যে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সম্ভবনা খুবই উজ্জল। সেই কারণেই হয়তো জাতিসংঘ এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করে বাংলাদেশকে মডেল হিসেবে তুলে ধরতে চায় জাতিসংঘ।দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, মা ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি মোকাবেলায় ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে সাফল্যের কারণে জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। এজন্য সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মডেল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেই বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে চায় জাতিসংঘ। এই লক্ষ্যে এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘের অধীন তিনটি সংস্থা হতে বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য, শান্তিরক্ষী মিশন ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যে বেড়েছে এসব তা বিভিন্ন সংবাদপত্র ও মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এমডিজি অর্জনেও সফল হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছর মানব উন্নয়ন সূচকে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ এমডিজি পুরস্কার পেয়েছে। এই সময়ে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ‘ই-স্বাস্থ্য’ সেবা চালু করায় সরকারের জাতিসংঘের ‘সাউথ সাউথ’ পুরস্কার পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই কারণেই জাতিসংঘ স্বাস্থ্য সংস্থার অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

এমডিজির সাতটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সাফল্য এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এমডিজি লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে রয়েছে। আগামী ২০১৫ সালের আগেই এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায় বর্তমান সরকার। উন্নয়ন অগ্রগতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০১০ সালে শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে সাফল্য অর্জন করায় জাতিসংঘ এমডিজি পুরস্কার পেয়েছে। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য খাতে গুণগত মান উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করায় আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন, জাতিসংঘের আফ্রিকা-সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কমিশন যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাউথ সাউথ পুরস্কার প্রদান করে।

বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের এখন প্রায় ৮ হাজার ৭শ’ সদস্য রয়েছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ সুদান ও কঙ্গোতে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা খুবই সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ যে কোন পরিস্থিতিতেই এখান থেকে ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে জাতিসংঘে সেনা সদস্য পাঠাতে সক্ষম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তিরক্ষী মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ১২২ সদস্য নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বিভাগের মহাসচিব হার্ভে লাডসুস বাংলাদেশ সফর করেছেন। সফরকালে তিনি গত কয়েক দশক ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অসাধারণ ভূমিকা, কর্ম দক্ষতা ও পেশাগত আচরণের গভীর প্রশংসাও করেন।

জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশে গরিব মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনা, জঙ্গী ও সন্ত্রাস দমন, নারীর ক্ষমতায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও এমডিজি অর্জনে সরকারের সাফল্য তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বল্পোন্নত দেশের সমস্যা, বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব, ইরাক ও ফিলিস্তিন সঙ্কটের মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হবে।

জিইডি প্রতিবেদনে তথ্য মোতাবেক আমাদের প্রিয় দেশ বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ম্ভর। অচিরেই বাংলাদেশ চাল রপ্তানী দেশে পরিনত হবে। শুধু চালই নয় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে মাংস ও ডিমের ক্ষেত্রেও ১৮ আগস্ট দৈনিক জনকন্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে বর্তমানে উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন মেট্রিকটন। সদ্যসমাপ্ত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন মেট্রিকটন (প্রায় ৪০ লাখ টন) চাল ইচ্ছে করলেই রফতানি করা যায়। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ হবে চাল রফতানিকারক দেশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন ছিল ২৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিকটন। সরকার গত মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে চাল উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৩২ মিলিয়ন মেট্রিকটনে। ২০১১-১২ এবং ২০১২-১৩ উভয় অর্থবছরে ৩৩ মিলিয়ন মেট্রিকটনের বেশি চাল উৎপাদন হয়, যা ছিল দেশের ইতিহাসে রেকর্ড।

অন্যদিকে শুধু চালের উৎপাদন নয়, মাংস এবং ডিমের ক্ষেত্রেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে। দেশী চাহিদার অনেক বেশি উৎপাদন হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন বিষয়ে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, গত পাঁচ বছর মেয়াদকালে সরকার দক্ষতার সঙ্গে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করে। এ সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান বিষয় যেমন মোট দেশজ আয়, কর্মসংস্থান, রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি হ্রাস, সামাজিক খাতের দারিদ্র্য নিরসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু নিরাপত্তায় অগ্রগতি এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। কৃষি সরকারে ভর্তুকি, কৃষকদের মাঝে কৃষি যন্ত্রপাতি হস্তান্তর, কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করে তোলাসহ নানা উদ্যোগের ফলই হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন।

এ অর্জন এমনি এমনি অর্জিত হয়নি এ সাফল্য অর্জন করতে কৃষি উপকরণে বিপুল ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে। এ সময়ে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খুলেছেন ৯৫ লাখেরও বেশি কৃষক। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেনি, বর্তমানে উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ হবে চাল রফতানিকারক দেশ।

শেষ করবো এই বলেই শেখ হাসিনা সরকারের অব্যাহত ভর্তুকির কারণেই এসব সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে ভর্তুকি ধরা হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতে বকেয়াসহ ৯ হাজার, বিদ্যুত খাতে সাড়ে ৫ হাজার, জ্বালানি খাতে ৭ হাজার ৯৫০, খাদ্য খাতে ১ হাজার ৭৫৯, রফতানি খাতে ২ হাজার ৭৫০ ও অন্যান্য খাতে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গত চার-পাঁচ বছরে কৃষি খাতে মোট ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। সুতরাং উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে শীঘ্রই আমাদের দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে এ কথা অনেকটাই জোর দিয়ে বলা যায়।