ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

Tarek-Zia-5

জিয়া পরিবার বিশেষ করে খালেদা জিয়া তনয় ও আদালতের মতে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত ও ডজন খানেক গুরুতর মামলার আসামী লন্ডনে পলাতক বা নির্বসিত তারেক রহমানকে কিছুতেই যেন বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। তিনি লন্ডনে বসে প্রায় বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে মনগড়া বিতর্ক সৃষ্টির মরিয়া প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এক একটা বিতর্ক সৃষ্টি করেন, আর এ নিয়ে দেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে সমালোচকরা কেঁচো খুড়তে সাপ বের করে আনেন। তবু কিছুতেই থামতে চাইচ্ছেন না তারেক জিয়া। কয়েক মাস আগে তার প্রায়ত পিতা জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি দাবি করে যে সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন, এবার নতুন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারকে খুনী, অভিশপ্ত; আওয়ামী লীগকে কুলাঙ্গারের দল আর শেখ হাসিনাকে কুলাঙ্গারের নেতা বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরাই শেখ হাসিনার দলের মন্ত্রী ও নেতা। মুজিব হত্যার ক্ষেত্র যারা প্রস্তুত করেছিল তারা এখন শেখ হাসিনার পাশে। ক্ষমতালোভী শেখ হাসিনা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পিতার হত্যাকারী কিংবা হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের সঙ্গে রেখেছেন।’… সম্প্রতি লন্ডনে এক সেমিনারে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে শেখ মুজিবের পরিবার খুনী পরিবার। শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলে সংসদের তৎকালীন ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে সংসদ কক্ষে চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ৩০ হাজার মানুষকে হত্যার জন্য দায়ী শেখ মুজিব। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগই বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ার চালু করেছিল। ক্রসফায়ারে ভিন্নমতাবলম্বী সিরাজ সিকদারকে হত্যা করা হয়।’
…তারেক রহমান আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলের সামনে ৭ খুনের জন্য দায়ী শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল। বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায়ও শেখ কামালের নাম ইতিহাসে লেখা। পিতার মতো শেখ হাসিনাও মানুষ হত্যায় মেতে উঠেছে।

সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত খন্দকার মোশতাককে ‘কুলাঙ্গার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান আওয়ামী লীগকে কুলাঙ্গারদের দল হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘যারা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের প্লট তৈরি করেছেন, মুজিবের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিলেন, মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিলেন শেখ মুজিব ছিলেন স্বৈরাচারী এবং যারা খন্দকার মোশতাকের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেদিন বঙ্গভবনে গিয়েছিল তারাই এখন শেখ হাসিনার চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে; সুবিধা নিচ্ছে। তাহলে কী আওয়ামী লীগ টোটালি একটা কুলাঙ্গার দল? শেখ হাসিনা কুলাঙ্গারদের নেত্রী? মোশতাকের শপথ অনুষ্ঠানে বর্তমান মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, মরহুম কর্নেল (অব.) আবু তাহের, মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন এইচটি ইমাম।’ বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির এই সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এর আগেও দুই দফায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন’ এবং ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট’ বক্তব্য দিয়ে বিতর্কের ঝড় তুলেছিলেন।

লন্ডনে বসে তারেক রহমানের এসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে টেলিভিশনের টকশো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ব্লগে এ নিয়ে নিয়ে যেমন আলোচনা-সমালোচনা বিতর্ক হচ্ছে; তেমনি সারাদেশে চায়ের কাপে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশো’ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি নেতা মেজর (অব:) আক্তারুজ্জামানের টকশোর বক্তব্য ভিডিও ক্লিপটি ছড়িয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে এটিএন নিউজের টকশো’তে বিএনপি নেতা- মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান তার ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন,‘ তারেক রহমানের মত ছেলের মুখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে, মুজিবুর রহমান বলা মানায় না। বেয়াদবি করে তারেক বিএনপিকে ডুবিয়েছে,… এই বেয়াদব ছেলে যদি আমাদের রাজনীতিতে আগামীতে আসে আমি জানি না, বাংলাদেশের কী অবস্থা হবে। আজকে আমার দুঃখ লাগে এই দলটাকে (বিএনপি) সে ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে।’… তিনি আরো বলেছেন,‘তার উচিত (তারেক রহমানের) লন্ডনে বসে এ ধরনের উদ্ধত্যপূর্ণ কথা না বলে বুকের পাটা ও সাহস থাকলে দেশে ফিরে এসে এসব কথা বলুক।’

‘বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন তারেক রহমানকে কুলাঙ্গারদের শিরোমণি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে কুলাঙ্গারের শিরোমণি হচ্ছেন তারেক জিয়া। তার আমলে হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে দেশের তারুণ্যকে দুর্নীতির পঙ্কিলতার মধ্যে নিমজ্জিত করেছিলেন। আমাদের তারুণ্যের নৈতিকতাবোধ ও সংগ্রামী চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য দায়ী তারেক।’ জিয়াউর রহমান নিজেই তার লেখায় বঙ্গবন্ধুকে মহান নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তার ছেলে অর্বাচীনের মতো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। মূলত ১৯৭১ সালে মা খালেদা জিয়ার যে ভূমিকা ছিল তা ধামাচাপা দিতে এসব কথা বলছে সে। … তারা মূলত নির্বাচনের বাস মিস করে সরকার তো দূরের কথা তাদের বিরোধী দলে বসার স্বপ্নও ধূলিস্মাৎ হয়ে যাওয়ায় এসব মন্তব্য করছে। একই সঙ্গে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও দেশে জঙ্গি কার্যকলাপে তাদের সম্পৃক্ততার মুখোশ উন্মোচিত হওয়ায় উল্টা পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে।’

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন,‘ সত্য চাপা দিতেই মা-ছেলের আবোল-তাবোল বক্তব্য- বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা ধামাচাপা দিতেই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান আবোল-তাবোল বকছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও এর প্রধান ইনুকে জড়িয়ে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যের জবাবে তথ্যমন্ত্রী এই প্রতিক্রিয়া জানান। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইনু বলেন, হঠাৎ করে মা-ছেলে কেন জাসদ ও আমাকে নিয়ে আবোল-তাবোল বলছেন? কেন অস্থিরতা প্রকাশ করছেন? বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমান যে জড়িত ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে না পেরে এবং ওই ঘটনা ধাপাচাপা দিতেই তারা আবোল-তাবোল বলছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার জড়িত থাকা এবং তার ‘দুষ্কর্ম’ আড়াল করতেই বিএনপি জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে করে যাচ্ছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘কেবল কুলাঙ্গারের পক্ষেই আওয়ামী লীগকে কুলাঙ্গার বলা সম্ভব। আমার মতো তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন রাজনৈতিক কর্মীর পক্ষে তাঁর বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন মনে করি না। তবে তাঁর বাবা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, মা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন একজন বঙ্গবন্ধু এ দেশে ছিলেন বলেই। বঙ্গবন্ধু খালেদা জিয়াকে অনেক স্নেহ করতেন। ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করে তিনি অমানুষের পরিচয় দিয়েছেন।’

‘আওয়ামী লীগ পুরোটাই একটি কুলাঙ্গারের দল”-লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমান এমন মন্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে ‘দেশের সবচেয়ে বড় কুলাঙ্গার’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, দেশের সবচেয়ে বড় কুলাঙ্গার হিসেবেই দেশের মানুষ চেনেন তারেক রহমানকে। গণ্ডমূর্খ-অর্বাচীন-নরঘাতক এই তারেক রহমান দুর্নীতি-হত্যা-অর্থপাচারের অভিযোগে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। পালিয়ে বিদেশের মাটিতে বসে ওই ‘কুলাঙ্গার’ যতই বাগাড়ম্বর করুক না কেন, ২১ আগস্ট মানুষ হত্যা, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের দায় থেকে সে বাঁচতে পারবে না। তার বিচার হবেই এবং রায়ও কার্যকর হবে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন গণমাধ্যমের সাথে প্রতিক্রিয়ায় বলেন,‘ অর্বাচীন দুর্নীতিবাজ তারেক রহমান ‘কুলাঙ্গার’ এর অর্থ বোঝে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ একজন কুলাঙ্গারকেই চেনেন, সে হলো ওই তারেক রহমান। সে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে ২৪ জনকে হত্যার মামলায় অভিযুক্ত, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত। যে ব্যক্তি হত্যা-সন্ত্রাস-দুর্নীতিসহ দেশকে অস্থিতিশীল করতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহীমের সঙ্গে বৈঠক করে, তার মতো বড় কুলাঙ্গার আর কে হতে পারে। আর আমরা কুলাঙ্গার অর্থ বুঝি যার জন্মের ঠিক নেই। তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার তো জন্মের ঠিক নেই। তাঁর তো ৪/৫টা জন্মদিন। এতেই প্রমাণ হয় কুলাঙ্গার কে। তারেক রহমানের এসব উদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য নির্বাসিত জীবনে থেকে হতাশারই বহিঃপ্রকাশ বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কেননা, জামায়াত ও আইএসআইয়ের পরামর্শে নির্বাচন বয়কট এবং নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে, একই সাথে এই প্রথম সংসদের বিরোধী দলেরও পদ হারিয়ে চরমভাবে হতাশাতায় নিমর্জিত হয়ে ইতিহাস বিকৃতির খেলায় মেতে ওঠে থাকতে পারে।

শেষ করবো এই বলেই। তারেক রহমান নতুন করে ইতিহাস বিকৃতির খেলায় মেতে ওঠেছে। তিনি তার ওই বক্তব্যে বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামাল নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ খুনের মামলার আসামী। অথচ ইতিহাস সাক্ষী যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত খুনের মামলার সাজা ভোগ করা আসামী ছিলেন বর্তমান ২০ দলীয় জোটের শরিক, জাগপার শফিউল আলম প্রধান। তিনি সাত খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছিলেন। সেই সময়ই জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে শফিউল আলম প্রধানের সাজা মওকুফ করে জেলখানা থেকে বের করে এনেছিলেন। শফিউল আলম প্রধানও জেল থেকে মুক্ত হয়ে জিয়ার পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন। আমরা কিছুতেই বুঝতে পারিনা তারেক রহমান হঠাৎ করে কেন কার পরামর্শে ইতিহাস বিকৃতি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবৈধ রাষ্ট্রপতি, স্বৈরাচারী সরকার, রাজনৈতিক নেতা ও শেখ কামালের চরিত্র হননে ব্যস্ত হয়ে ওঠেছেন? তবে সবচেয়ে অবাক ব্যপার হলো তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে শুধু খুনী বলেই ক্ষান্ত হননি তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘পাকিস্তান আমলে সংসদের তৎকালীন ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে সংসদ কক্ষে চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিলেন বলে এবং স্বাধীনতার পর ৩০ হাজার মানুষকে হত্যার জন্য দায়ী শেখ মুজিব বলে অভিযোগ করেন। এতেই তার শিক্ষা-দীক্ষার দৌড় নিয়ে প্রশ্নটি আরো গতি পায়। এসব অনহুত বিতর্ক সৃষ্টি করে যে ব্যক্তি তারেক রহমান তার নিজের ক্ষতি করছেন তা নয়, ক্ষতি করছেন দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপিরও।