ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

সামনে কোরবানীর ঈদ, এরই মধ্যে আবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ্যানথ্রাক্স ও ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন থেকে দেশের সিরাগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় এ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ দেখা দেয়। যা গরু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হচ্ছে। প্রতিদিনই কোন না কোনো জেলা বা উপজেলা থেকে এনথ্রাক্স বিস্তারের খবরা খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এ্যানথ্রাক্স যদিও কোন জীবনঘাতি রোগ নয়। তবু এ নিয়ে সারা দেশেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আক্রান্ত রোগীদের প্রায় সবাই ৮ থেকে ১০ দিনের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠছেন।

এ্যানথ্রাক্স কি? বিশেষজ্ঞদের মতে এ্যানথ্রাক্স হলো ‘ব্যাসিলাস এ্যাথ্রাসিস নামক ব্যাবকটেরিয়া দ্বারা ঘটিত একটি প্রাণঘাতি রোগ যা প্রথমত গবাদিপশুদের আক্রান্ত করে। আক্রান্ত পশুদের দ্বারা পরবর্তী পর্যায়ে মানুষ আক্রান্ত হয়। তাই এ্যানথ্রাক্সকে জুনোটিক ডিজিজ বলা হয়। মানুষ থেকে মানুষে এ রোগ ছড়ায় না। জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কক ১৮৭৬ সালে প্রথম ব্যাসিলাস এ্যানথ্রাসিস আবিস্কার করেন। এর জীবাণুগুলো দেখতে অনেকটা রডের মতো লম্বাটে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে গ্রাম-পজেটিভ ব্যাকটেরিয়া বলে। এ ব্যাকটেরিয়া মাটিতে স্পোর তৈরির মাধ্যমে সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং অনাবৃষ্টির পর অতিবৃষ্টিতে মাটিসহ ঘাসের সঙ্গে গবাদিপশুর শরীরে প্রবেশ করে। পশুর শরীরে প্রবেশের পর বিভাজনের মাধ্যমে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়ে এক মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে । আক্রান্তের দেহে স্পোর তৈরি হয় না। মাটি এ স্পোর এক’শ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।’

পরিসংখ্যানে বলছে,‘পশুর তুলনায় মানুষের এ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ শক্তি বেশি। তারপরও প্রতি বছর বিশহাজার থেকে একলাখ পর্যন্ত লোক এ রোগে আক্রান্ত হয়। মানুষের শরীরে এ্যানথ্রাক্স জীবাণু প্রবেশের ২ থেকে ৫ দিনের মধ্যে এর উপসর্গ দেখা দেয়। চর্মের এ্যানথ্রাক্সে চর্মের উপরিভাগ ফুলে লাল ফুসকার আকার ধারণ করে যা পরবর্র্তীতে ক্ষত বা আলসারে পরিনত হয়। ক্ষতের কেন্দ্র কালো বর্ণ ধারণ করে। ক্ষতে কোন ব্যথা থাকে না। মাংসপেশীতে ব্যথা, মাথা ব্যথা, জ্বর বমি বা বমিভাব ইত্যাদি এ রোগের উপসর্গ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে জীবাণু রক্তে মিশে যেতে পারে। শ্বাসনালী বা ফুসফুসের এ্যানথ্রাক্স রোগে দেরিতে চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর বাঁচার সম্ভবনা কম থাকে।’

দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো সূত্রে জানা যায় এ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ এ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদিপশু থেকে এ রোগ মানুষের মধ্যে ছড়ায়। গবাদিপশুই হলো এ্যানথ্রাক্স রোগের বাহক। এই রোগ মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায় না। অসুস্থ গবাদিপশুর শ্লেষ্মা, লালা, রক্ত, হার, মাংস ও নাড়ীবুঁড়ির সংস্পর্শে এলে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এলে এ রোগ অন্যজনের মধ্যে সংক্রামিত হয় না। এ রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে মানুষের শরীরের চামড়াতে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া। যে ক্ষত সাধারণ ক্ষতের মতো নয়। এতে চামড়ায় গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।

সরকার এরই মধ্যে এ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে ভেক্সিনেশনসহ দেশব্যাপী প্রচারনা চালিয়ে এ্যানথ্রাক্স সম্মন্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ওঠেছে যে, সরকারি এ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধ কার্যক্রমে কোন সমন্বিত উদ্যোগ নেই। দ্রুত এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব , রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ গবেষণা কেন্দ্রের কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদের মতে তড়কা বা এ্যানথ্রাক্স নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশের সব সরকারী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এ রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। এ্যানথ্রাক্সে এখন পর্যন্ত কোন মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। তাছাড়া এ রোগে মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে এ্যানথ্রাক্স কোন নতুন রোগ নয়। এর আগে গবাদিপশু, মানুষ ও হাতির শরীরে এ্যনথ্রাক্স দেখা দিয়েছিল। এটি একটি ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগ। এ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। এর জন্য দরকার সতর্কতা ও সঠিক সময়ে যথাযথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কম তাপমাত্রায় মাংস রান্না করলে এতে জীবানু মরে না। বিদেশে মাংস আধাসিদ্ধ করে খাওয়ায় ঝুঁকি রয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে রান্নার সময় যে পরিমান তাপে রান্না করা হয় তাতে ঝুঁকি থাকে না। এ রোগের প্রতিকার হিসাবে উল্লেখ করা করাছে; আক্রান্ত গবাদি পশুর সংস্পর্শে না আসা। খালী হাতে আক্রান্ত পশুকে না ধরা। প্রয়োজনে হাতে গ্লাভস লাগিয়ে বা পলিথিন পেচিয়ে আক্রান্ত গবাদি পশুকে ধরা। এর মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকা। মৃত গবাদিপশুর দেহ মাটিতে পুতে ফেলা, এবং এ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে গবাদিপশুকে প্রতিষেধক টিকা দেয়া।

এ্যানথ্রাক্স নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক মানুষ এনথ্রাক্স আতঙ্কে গরুর সুস্বাদু মাংস খেতে ভয় পাচ্ছে। কেননা, কিন্তু কিছু সংখ্যক অসৎ ও অতি মুনাফালোভী মাংস ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় এ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গবাদিপশু জবাই করে দেশের বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করে এ্যানথক্স বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। স্বাস্থ্য সনদ ছাড়া গবাদিপশু জবাই করে মাংস বিক্রি করার বিধান না থাকলেও তারা তা করছে এবং এ্যানথ্রাক্স বিস্তারে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে তড়িৎ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে দেশে এ্যানথ্রাক্সের ভয়াবহ বিস্তার ঘটতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা আর মাস খানেক পরই মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আযহা। ঈদ-উল-আযহায় মানুষ মহান আল্লাহপাকের উদ্দেশ্যে গবাদি পশু কোরবানী করে থাকে। তাই এ সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ্যানথ্রাক্স দেখা দেয়ায় পশু ব্যবসায়ীসহ দেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সবাই ভাবছে কোরবানীর ঈদের আগে যদি এ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে না আসে তা হলে ঈদের বাজার কোরবানীর পশু বেচা-কেনায় নেতিবাচক প্রভাব পরবে। তাই এখনই এ্যানথ্রাক্স নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সরকার ও দেশের মানুষকে এ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে একযোগে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।