ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আজকাল পত্রিকার পাতা উল্টালেই জঙ্গীদের দেশের ভিন্ন অঞ্চলে সংগঠিত হওয়ার খবর প্রতিনিয়তই চোখে পড়ছে। এমনও খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে জামায়াত-শিবিরের ছত্রছায়ায় জঙ্গীরা আবার একত্রিত হয়ে দেশের প্রশাসনযন্ত্রসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানার জন্যে জোরে-সোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের সংগঠিত করার কাজে আগের মতোই সার্বিক সহযোগিতা করছে পাকিস্তানী গোয়েন্দ সংস্থা আইএসআই। এসব খবরে দেশের মানুষ আবারও অাতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ তারিখ একদম ফিল্মী কায়দায় কাশিমপুর কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে ময়মনসিংহে নেয়ার পথে জেএমবির দুর্ধর্ষ জঙ্গীরা হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায় সাজাপ্রাপ্ত তিন জঙ্গী বোমারু মিজান, সালেহীন ও রাকিবকে। এ অভিযানের মাধ্যমেই জঙ্গীরা জানান দিয়েছে তাদের সংগঠিত হওয়ার খবর। জঙ্গীদের এ অভিযানের পর পুলিশের সার্চ অপারেশনে পলাতক জঙ্গী রাকিব ধরা পড়লেও বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় রাকিব। এরপরও বাকি দুই জঙ্গী ধরতে পুলিশের পৃথক অভিযান চলতে থাকে। অব্যাহত অভিযানের পরও দীর্ঘ ছয় মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দুই জঙ্গীকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তাদের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত করতের পারেনি পুলিশ, RAB ও গোয়েন্দারা।

বাংলাদেশ ঠিক কবে থেকে জঙ্গীদের টার্গেটে পরিনত হলো, বা ঠিক কবে থেকে এ দেশে জঙ্গীদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে তার সঠিক দিনক্ষণ বলা না গেলেও যতটুকু জানা যায় জামায়াতের গোলাম আযমের আমিরত্বের শেষ ও আব্বাস আলী খানের শুরু থেকে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রসার শুরু হয়। তারও আগে বন্দুকের নলের মুখে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে, স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবিরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করে বাংলাদেশে তাদের অবাধ রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে দেয়ার সুযোগ করে দেয়। সেই সুযোগেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ মদদ ও আর্থিক আনুকুল্যে এদেশে জঙ্গীবাদের কার্যক্রম শুরু হয়। এবং সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে সংবিধানকে ইসলামীকরণের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে সরাসরি বিরোধীতাকারী পরাজিত শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় এদেশে প্রথম জঙ্গীবাদের বিষবৃক্ষ রোপন করা হয় যা বর্তমানে পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়ে আমাদের সকল অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে চাচ্ছে।

জঙ্গীরা আবারও জামায়াত শিবিরের প্রত্যক্ষ মদদে বিভিন্ন নামে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হচ্ছে। আমরা জানি যে জামায়াতের অংশীদারিত্বে ৪ দলীয় জোটের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের ভয়াবহ উত্থান ঘটে। জামায়াতের আমির গোলাম আযমের সময় থেকেই জামায়াতের জঙ্গীবাদের কানেকশন শুরু। পরবর্তীতে চার দলীয় জোটের আর এক শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আজিজুল হক এবং অন্য অংশের ফজলুল হক আমিনীর তত্বাবধানে আফগান ফেরৎ যোদ্ধাদের দিয়ে ও জঙ্গীবাদের প্রসার ঘটানো হয়। আমিনীই প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে হুঙ্কার ছেড়ে বলেছিলেন, ‘ আমরা হবো তালেবান বাংলা হবে আফগান।’ তার এ বক্তব্যের মাধ্যমেই এ দেশে আফগান ফেরৎ তালেবান যোদ্ধাদের স্বাগত জানানো হয়েছিল এবং ঐসব ইসলামী দলগুলির প্রতিষ্ঠিত কওমী মাদ্রাসাসহ অন্যান্য মাদ্রাসায় তালেবান যোদ্ধাদের চাকুরী দিয়ে, অস্ত্র ও বোমাবাজীর ট্রেনিং দিয়ে, ইসলামী শিক্ষার অন্তরালে জঙ্গীবাদ বিকাশের পথ সুগম হয়েছিল। দেশের নুতন প্রজন্মের একটা অংশকে বিভ্রান্ত করে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের নামে তাদের নিকট বেহেস্তের টিকিট বিক্রির মাধ্যমে ‘মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত করে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটানো শুরু করে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগড়িষ্ঠতা না পেলেও জামায়াতে ইসলামের সমর্থনে সরকার গঠন করে তারা। তখন জামায়াত, সরকারে যোগদান না করলেও নেপথ্যে সরকারের অঘোষিত চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে । আর বিএনপিকে সমর্থন দানের বিনিময়ে পরোক্ষভাবে তাদেরকে চাপে রেখে জামায়াত নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে থাকে। সেই সময়েই জামায়াতে ইসলাম ও ইসলামী ঐক্যজোটের সহযোগীতায় আফগান ফেরৎ যোদ্ধারা তাদের নিরাপদ চারণভুমি ও ট্রানজিট হিসাবে বেছে নেয় বাংলাদেশকে। আইএসআই, সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের বেশ কয়েকটি দেশ এদেশের জঙ্গীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। এদের সাথে যুক্ত হয় ভারত ভিত্তিক ইন্ডিয়ান মুজাহিদীন, আইএম ও উলফা এবং পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন জয় ই মোহাম্মদ, আল কায়দা, এবং লস্করই তৈয়বা প্রভৃতি জঙ্গী সংগঠন। তখন তারা কোন এ্যকশনে না গেলেও নামে বেনামে বিভিন্ন জঙ্গী গ্রুপ তৈরী করে অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে যায়।

কিন্তু ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ একুশ বছর পর শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সেই জঙ্গীরা এ্যাকশান শুরু করে এবং তারই অংশ হিসাবে যশোহরে উদীচির অনুষ্ঠানে বোমা হামলার করে দশজন সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা, শতাধিত লোককে আহত করে জঙ্গীরা। তারপর রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে টাইম বোমা আক্রমন চালিয়ে হত্যা করে দশজনকে। ফরিদপুরের নানিয়ার চর গীর্জাও হামলার শিকারে পরিনত হয় জঙ্গীদের। কোটালী পাড়ায় হরকাতুল জেহাদ নেতা মুফতি হান্নান, প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার জন সমাবেশ স্থলে প্রায় পঞ্চাশ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু অলৌকিকভাবে শেখ হাসিনা সে যাত্রায় বেঁচে যান। এ হামলা প্রচেষ্টার মাধ্যমে হরকাতুল জেহাদ নামের জঙ্গীবাদী দলটির চেহারা উন্মোচিত হয় দেশের মানুষের কাছে।

সেই সময় শেখ হাসিনার আমন্ত্রনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকা সফরের সময় আমেরিকার গোয়েন্দারা সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতি সৌধে ক্লিনটনের শ্রদ্ধা জানানোর বিরোধিতা করে রিপোর্ট দেয় যে, ক্লিনটন স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে ওসামা বিন লাদেন এর তালেবান জঙ্গীরা তার ওপর আক্রমন চালাতে পারে। এ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ক্লিনটনের জাতীয় স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। এরপর আওয়ামী লীগ শাসনের একেবারে শেষ সময়ে চাষারায় নারায়নগজ্ঞ আওয়ামী লীগের অফিসে নৃশংস বোমা হামলা চালিয়ে একুশজন নেতা কর্মীকে হত্যা করে তারা।

২০০১ এক সালে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ফলাফল জালিয়াতির নির্বচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এবার আর জামায়াত বিএনপিকে ক্ষমতার বাইরে থেকে সমর্থন না জানিয়ে সরারসরি ক্ষমতার অংশীদার হয় । এই সময় দরকষাকষি করে সমাজ কল্যাণ, কৃষি মন্ত্রনালয় পরে শিল্প মন্ত্রনালয় এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি পোর্টফোলিও বাগিয়ে নেয় জামায়াত। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী প্রথমে কৃষি এবং পরে শিল্প মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন, এবং মহাসচিব আলী আহসান মুজাহিদ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে বাঁধাহীন ভাবে জঙ্গী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। আলী আহসান মুজাহিদ তখন তাদের অনুসারী কয়েক হাজার এনজিওকে নিবন্ধন দিয়ে এনজিও ব্যুরোর মাধ্যমে টাকা পয়সা ছাড় করিয়ে তাদের কর্মী বাহিনীকে গায়ে গতরে হৃষ্টপুষ্ট করে তোলেন। আর মতিউর রহমান নিজামী তার মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন জেটিতে দশট্রাক অস্ত্র খালাস করিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ব বৃহৎ অস্ত্র চোরাচালানের কাজটি করেন। সেই সময়ই বগুড়াতে কয়েক লক্ষ গুলি, অস্ত্রশস্র ধরা পরে। কিন্তু অদৃশ্য এক সুতার টানে এত বড় দুইটি অস্ত্র চোরাচালান মামলা ধামাচাপা পড়ে যায়।

খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধান মন্ত্রীত্বকালে আরো বেপড়োয়া হয়ে ওঠে জঙ্গীরা। এই সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গীদের জন্য হয়ে ওঠে স্বর্ণযুগ। বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠনের আড়ালে বেড়ে ওঠা জঙ্গীরা। খালেদা জিয়ারর এই মেয়াদে জঙ্গীরা বার বার আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার টার্গেট করে। তখন হরকাত-উল জিহাদ হুজির প্রধান মুফতি হান্নানের মার্সি পিটিশনে সুপারিশ করে তার মুক্তির সুপারিশ করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা।

বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের উত্থান নিয়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বিশেষ করে বিশ্বের প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ান ও দি টাইমস এ নিয়ে বেশ কিছু রিপোর্ট করে। ২০০২ সালের ১৫ অক্টোবর দি টাইমস ম্যাগাজিনে এলেক্স পেরির এক এক্সক্লুসিভ নিবন্ধে বলা হয়, এমভি মক্কা নামক একটি জাহাজে চড়ে ১৫০ জন আফগান ফেরত সশস্ত্র যোদ্ধা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই যোদ্ধারাই দেশের মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গী তৈরীতে লিপ্ত হয়। এ জঙ্গীদের সহযোগিতায়ই তৎকালীন সরকার বেছে বেছে আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল নেতাদের খুন করার মিশনে নেমে পড়ে। এ খুনের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শেখ হাসিনা সরকারের সফল অর্থমন্ত্রী- এসএসএস কিবরিয়া, বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা- আহসান উল্লাহ মাস্টার, মমতাজ উদ্দিন, খুলনার- মনজুরুল হক এডভোকেট, সাংবাদিক শামসুর রহমান, বালু প্রমুখ। তারপর থেকে সিনেমা হল, মাজার, উপাসনালয়ে বোমা হামলা করে নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে থাকে। ২০০৪ সালের একুশে আগষ্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার সন্ত্রাস বিরোধী জনসভায় এক জঘন্য কাপুরুষোচিত গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী সমর্থককে হত্যা করে এবং এ হামলায় প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করে। সেই নৃসংশতম গ্রেনেড হামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ধামাচাপা দেয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জজ মিয়া নাটকের অবতারনা করে।

কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’ প্রবাদের মতো ২০০৭ সালে জরুরী শাসনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলাটি পুনরজ্জীবিত করে এবং এ নৃসংশতম হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু ও তার ভাই সহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে জেলে ঢুকায়। যার প্রধান আসামী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। একটা সময়ে এসে বিএনপি-জামায়াত জোটের সৃষ্ট জঙ্গীরা তাদের জন্যই ফ্রাঙ্কেষ্টাইন হিসাবে আবির্ভুত হয়। ২০০৪ সালের ২১শে মে বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বাংলাদেশের নিজের মাতৃভুমি সিলেটে, শাহজালাল(র) মাজার জিয়ারত করতে এসে জঙ্গীদের বোমাহামলার শিকার হন। তিনি ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই বোমা হামলায় তিন চারজন সাধারণ মানুষ নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়।

বিএনপির এই শাসনামলে জঙ্গীরা সবচে বড় মহড়াটি দেয় ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট বাংলাদেশের তেষট্টি জেলার ৫২৭ স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে। এই বোমা হামলায় ২৫০টির মত মামলায় গ্রেফতারকৃত অধিকাংশ আসামী পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদেরকে কোনো না কোনো ভাবে জামায়াত রাজনীতিতে সম্পৃক্ত বলে বলেছে। এ বোমা হামলার মাধ্যমে তারা তাদের শক্তি ও সামর্থ জানান দিয়ে দেশের ভেতর একটা আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বিএনপি সরকারকে বাগে রাখার চেষ্টা করে। এই সময়ে জঙ্গীরা বিএনপি-জামায়াতের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বিশেষ করে জামায়াতে ইসলাম, আজিজূল হক ও ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য তত্বাবধানে আফগান ফেরত যোদ্ধাদের দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের প্রসার ঘটানো হয়।

বিএনপির ওই মেয়াদে বাংলাভাই নামক ফ্রাঙ্কেষ্টাইন সৃষ্টি করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সর্বহারা নিধনের নামে প্রগতিশীলদলের নেতাকর্মীদের ধরে ধরে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তখন দেশব্যাপী এ নৃশংস কর্মকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হলে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছিলেন দেশে বাংলা ভাইয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই; তার সাথে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুর রহমান বাবর (বাঙ্গরেজী নামে খ্যাত) ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন দেশে বাংলা ভাই বা ইংরেজী ভাই বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই, স্বয়ং খালেদা জিয়া বলেছিলেন দেশের ভাবমুর্তি ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী বাকশালীরা এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। অথচ শায়খ রহমান, বাংলা ভাইসহ যাদের ফাঁসি হয়েছে এদের সবাই এক সময় জামায়াতের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে এ সব জঙ্গী সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম বিস্তার করে জঙ্গীবাদী কার্যক্রমকে আরো বেগবান করা হয়েছে বলে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী জরীপে বেরিয়ে আসে।

এভাবেই এরে পর এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় ধীরে ধীরে আমাদের দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে। সে সময় পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত অপরাধ সংক্রান্ত সভা থেকে ৩১টি জঙ্গী ও চরমপন্থী সংগঠনের তালিকা তৈরী করে পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছিল। তার ওপর ভিত্তি করেই হুজি, জেএমবি, জেএমজেবি, শাহাদাৎ আল হিকমার বিভিন্ন উপগ্রুপের নাম সন্নিবেশিত আছে। পুলিশ তদন্তে আরো বেড়িয়ে এসেছে যে, জেএমবি থেকে ইসলাম ও মুসলিম, মুসলিম শরিয়া কাউন্সিল, আল্লার দল প্রভৃতি এবং হুজি থেকে আইডিপি, হরকত উল মুজাহেদীন, তওহীদ জনতা প্রভৃতি জঙ্গী সংগঠনের উপদল সৃষ্টি হয়েছে। যা আসলেই জামায়াতেরই বিভিন্ন ফ্রন্ট।

দেশে জঙ্গী সংগঠনের সংখ্যা নিয়ে, বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও এ সংখ্যা একশোর উপরে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ১২২ টি, গোয়েন্দা সংস্থার মতে পুরো মাত্রায় সংগঠিত রয়েছে ৩৬টি দল। এগুলোর আবার কয়েকটি করে উপদল রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষক আবুল বারাকাতের মতে ১২৫টি, আর কিছুদিন আগে একটি সহযোগীর এক অনুসন্ধানী এক প্রতিবেদনে দেশে ১০০টি জঙ্গী সংগঠনের অস্থিত্ব আছে বলে উল্লেখ করেছিল। এ সব জঙ্গী সংগঠনের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় কর্তৃক প্রাথমিক ভাবে ৪টিকে নিষিদ্ধ ও ১২পি সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংগঠন গুলো হলো-হিজবুত তাওহীদ, আল্লার দল, তওহীদি ট্রাষ্ট, হিজবুত তাহরীর, তামির উদ দীন, বাংলাদেশ ইসলামী সমাজ, উলামা আহঞ্জুমান, আল বাইয়্যানিয়াত, ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি ইত্যাদি। এর বাইরেও তানজিম ইসলামী, ইসলাম ও হরকাতুল মুজাহেদীন, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী দাওয়াত ই কাফেলা, মুসলিম মিল্লাত, শাহাদাৎ ই নবুয়ত, হিজবুল্লা শরিয়া কাউন্সিল, জইশে মোস্তফা, তওহীদি জনতা ও আল তুরা সহ বেশ কিছু সংগঠন।

আওয়ামী লীগের ৯৬-২০০১ শাসনামলে ভারতে বাংলাদেশী জঙ্গীদের অবস্থান ও পুনর্গঠন বিষয়ে সাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মোঃ নাসিম, বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ভারতে এদেশীয় জঙ্গীরা সংগঠিত হচ্ছে বলে তার আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। এবং পরবর্তীতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলকে আদভানীকে অবহিত করলেও ভারত তা তেমন আমলে নেয়নি। কিন্তু সে সময় বাক্ষ্মনবাড়িয়ায় RAB-পুলিশের হাতে আটক দাউদ মার্চেন্ট এবং তার স্বীকাররোক্তির ভিত্তিতে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে তার সহযোগী আরিফ হোসেনকে আটকের পর বাংলাদেশে ভারতীয় জঙ্গী কানেকশনের বিষয়টি আরো বেশী স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের মাফিয়া জগতের গ্যাংষ্টারদের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়; এবং এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ভারতের মোষ্ট ওয়ান্টেড লস্কর ই তৈয়বার জঙ্গী নেতা মাওলানা মোহাম্মদ ওবায়দল্লাহ, এবং তার একনিষ্ঠ সহযোগী এআরসিএফ এর সদস্য বোমা বিশেষজ্ঞ মাওলানা গাজী ওবায়দল্লাকে সাতক্ষিরা থেকে গ্রেফতার করে RAB। তাদের স্বীকারোক্তিতে যে ভয়ঙ্কর তথ্যটি বেড়িয়ে এসেছিল তা হলো বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক মোষ্ট ওয়ান্টেড ভারতীয় ও পাকিস্থানী জঙ্গী আত্মগোপন করে আছে, সাথে আছে আইএসআইয়ের স্থানীয় অনেক এজেন্ট। বাংলাদেশের মৌলবাদী ইসলামী দলগুলোর ছত্রছায়ায় থেকে এরা সবাই মিলে নির্বিগ্নে জঙ্গী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার মতে এখনো তারা আবার পুরনো কায়দায় সংগঠিত হওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

শেষ করবো এই বলেই যে, দেশের সাধারণ মানুষ আজ এই ভেবে আতঙ্কিত যে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে যে ভাবে আবারও জঙ্গীরা সংগঠিত হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশও পাকিস্তান, আফগানিস্থান, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়ার মত জঙ্গীবাদের ভয়ঙ্কর উত্থান ঘটিয়ে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তোলবে। সুতরাং দেশের সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্রিত করে জঙ্গীবাদ বিরোধী প্রচার চালিয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলতে হবে, না হলে এদেশকেও অচিরেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পরিনতি ভোগ করতে হবে, এ কথা আর বলার অপেক্ষ রাখেনা।