ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বর্তমান সরকারের অঙ্গিকার মোতাবেক বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সংবিধানে উচ্চাদালতের বিচারপতিদের অভিশংসন বা অপসারণের ক্ষমতার বিধান ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ১৮ আগস্ট সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী-সংক্রান্ত বিল মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অভিসংশনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে এতদসংক্রান্ত একটি খসড়া মন্ত্রীসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়। এর পর থেকে সরকারী দল ও বিএনপি ও তাদের মতাদর্শীরা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। প্রস্তাবিত খসড়ায় বিচারপতি অপসারণে বর্তমানে প্রচলিত বিধান ‘জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ থাকছে না। নতুন খসড়ার প্রস্তাবে বিচারপতিদের অভিযোগ অনুসন্ধান, তদন্ত, অভিযোগ ওঠা বিচারপতিদের দক্ষতা-অদক্ষতা যাচাইয়ের আলাদা একটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিচার বিভাগ-সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পৃথক একটি কমিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আইনের খসড়ায়।

এই অনাহুত বিভক্তি প্রসঙ্গে বিষয়টি পরিস্কার করা দরকার যে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘বিচারকদের পদের মেয়াদ’ শীর্ষক ৯৬ অনুচ্ছেদে দুই দফায় উল্লেখ ছিল, ‘প্রমাণিত ও অসদাচরণ বা অসামর্থের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অনুন্য দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাইবে না।’ ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান এক সামরিক ফরমানবলে সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ বাতিল করে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের বিধান ¤্রতিষ্ঠা করেন। এর পর থেকে বাংলাদেশের উচ্চাদালতের বিচারপতিরা সব ধরনের জবাবদিহীতার উর্ধে চলে যান। এ নিয়ে আইন বিচার ও প্রশাসন এই তিন বিভাগের মধ্যে মাঝে মধ্যেই ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে আওয়ামী লীগের গত সরকারের মেয়াদে। তবে ২০১২ সালে তৎকালীন স্পিকার ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের একটি রুলিংকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ উপদেষ্টাম-লীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ সিনিয়র সংসদ সদস্যরা হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণের দাবি তোলেন। সে সময়ই বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হয়।

সেই দাবি ও শেখ হাসিনা সরকারের অঙ্গিকারের ভিত্তিতেই উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের বা অপসারণের ক্ষমতা আবারও জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এ জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ যেসব দেশে সংসদের হাতে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা দেওয়া আছে, সে সব দেশের সংবিধান খতিয়ে দেখাসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করেছে আইন মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় আইন মন্ত্রনালয়ের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় উচ্চআদালতের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় উচ্চ আদালতের বিচারকদের পদের মেয়াদ নির্ধারণ ও তাদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল। ১৯৭৪ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার আমলে সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অভিশংসনের জন্য সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়; এবং চতুর্থ সংশোধনী বাতিল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা বিচার বিভাগের কাছে ন্যস্ত করে সুর্প্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে এ সংক্রান্ত সংশোধনীতে বলা হয় বিচারপতিদের অভিশংসনে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে পারবেন।

১৯৭২ সালের আমাদের মূল সংবিধান নিঃসন্দেহে গণমুখী ছিল। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি। এমনই মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তিনি বলেন, অভিশংসনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্নই ওঠে না। বরঞ্চ বিচার বিভাগ আরও সুসংহত হবে। এ ছাড়া সুপ্রীমকোর্টে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটির মাধ্যমে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদেরই বিচারপতি পদে নিয়োগ প্রদান করা প্রয়োজন। …অভিশংসনের সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। বহুদেশে অভিশংসন আছে, স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়েছে এটা কেউ বলে না। (দৈনিক জনকন্ঠ-৪ সেপ্টেম্বর-২০১৪)

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল সংবাদ মাধ্যমের সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেন,‘১৯৭২ সালের সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসন করার অনুচ্ছেদ (আর্টিকেল) ছিল। কিন্তু সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসে তা বদলে ফেলে। এর পরিবর্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করে। এখন আমরা যা করছি তা হলো অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ যেসব দেশে সংসদের হাতে অভিশংসনের ব্যবস্থা আছে তা খতিয়ে দেখে আমরা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছি।’ তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হোক এমন সিদ্ধান্ত নেবে না, তবে এখানে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে এবং তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দশম জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ১ সেপ্টেমর থেকে শুরু হয়েছে । এ অধিবেশনেই অভিশংসনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণে আনীত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল উত্থাপন ও পাস করা হতে পারে। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় বিলটির খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। তবে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সংসদে বিলটির বিরোধিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় পার্টি সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবের নীতিগত বিরোধিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিলটি সংসদে উত্থাপিত হলে খুঁটিনাটি পরীক্ষা করা হবে। বিরোধী দলের মতোই এর বিরোধিতা করা হবে।

বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ করতেই এই অভিশংসন বিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী শেরেবাংলাস্থ চন্দ্রিমা উদ্যানে স্বেচ্ছাসেবক দলের জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন,‘বিচারপতি অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে একদলীয় শাসন পোক্ত করতে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন উদ্যোগ নিয়েছে। বিচারপতিদের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে আ.লীগএই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল খান। তিনি বলেন, বিচারপতিদের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে আদালতের কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আওয়ামী লীগ বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের হাতে নিচ্ছে। কারণ আইন মাফিক কাজ করলে সেটা যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেই বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতা পাবে সংসদ। এতে করে চাপের মুখে স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের ওপর অত্যাচার-জুলুম, নির্যাতনসহ নানা ধরনের হয়রানিসহ জাতীয় সম্পদ ব্যবহারে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট করেছে। সেইসব অপরাধের বিচার থেকে রক্ষা পেতেই বিচারপতি নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিচ্ছেন তারা।’

বিচারপতিদের অভিশংসন করার জন্য সংবিধান সংশোধন হলে তা আইনের শাসনের পরিপন্থী হবে বলে মন্তব্য করেছেন ডক্টর কামাল হোসেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগ ও সংসদের বিরোধ সাংবিধানিকভাবেই নিষ্পত্তি করতে হবে। ড. কামাল হোসেন বলেন, বিচারপতিদের শাস্তি দিতে সংসদ যদি আইন করে তাহলে তা সুবিচার পরিপন্থী হবে। অন্যদিকে ‘জাতীয় সংসদ ও উচ্চ আদালতের মধ্যে যেন আর কখনো ভুল বোঝাবুঝি না হয় সে জন্য সুপ্রীমকোর্টকেই ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।’ তিনি বলেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে বিরোধীদলের এখনো কোন জোরালো কথা না বলার পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে।’

পরিশেষে শেষ করবো এই বলেই যে, বিচারপতিরাও রক্তমাংসের মানুষ। তারাও রাগ, অনুরাগ বিরাগের বাইরে নয়। অন্যায় করলে যেন সংবিধানের মূল স্তম্বের মধ্যে আইন ও সংস্থাপন বিভাগের যেমন জবাবদিহিতা রয়েছে সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগেরও জবাবদিহিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি। এতে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা রয়েছে। কাজেই বিশ্বের উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও এর চর্চা হলে দেশ ও দেশের মানুষই লাভবান হবে। এ নিয়ে শুধু মাত্র বিরোধীতার কারণে বিরোধীতা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। #####