ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বাংলাদেশের নিরুত্তাপ রাজনীতির মাঠে এখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে দুইজন রাজনৈতিক নেতার দুইটি বই এবং বিএনপি নেত্রী সাবেক সাংসদ পাপিয়া’র জামায়াত-শিবিরকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে বক্ত্যকে কেন্দ্র করে। এই দু’দিন আগেও আওয়ামী লীগের তিনবারের সাবেক এমপি ও একবারের পরিকল্পনামন্ত্রী এ.কে এর লেখা ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ প্রকাশিত গ্রন্থে স্বাধীনতার ঘোষণা ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে বিএনপির নেতাদের মতো বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর মতো করে বিতর্কিত করার চেষ্টা নিয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সমালোচনার ঝড় বইছিল। সেই ঝড় থামতে না থামতেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ তার সদ্যপ্রকাশিত বই ‘ইমারজেন্সি অ্যান্ড দি আফটারম্যাথ: ২০০৭-২০০৮’ নিয়ে দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত তেমন তোলপাড় শুরু না হলেও বিএনপিতে কিন্তু এ বই নিয়ে ইতমধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ তাই বইয়ে আন্দোলন ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে সরাসরি দায়ি করে যা লিখেছেন তা নিয়েই তোলপাড়।

আর এর আগেই ‘ওরা ইসলামের অপব্যবহারকারী’ মন্তব্য করে জামায়াতের নাম থেকে ‘ইসলাম’ শব্দ তুলে দেয়ার দাবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছেন বিএনপির নেত্রী আসিফা আশরাফি পাপিয়া। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতকে নিয়ে পাপিয়ার মন্তব্যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বতো বটেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় তা দেখে ক্ষুব্ধ ও বিব্রত মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও। গত কিছুদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এ সদস্যের একটি বক্তৃতার ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আগে একবার তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সমালোচনা করে ‘তারেক তো ম্যাট্রিক পাস’ মন্তব্য করে ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়লেও এবার বিএনপির সাবেক এ এমপি ধর্ম ব্যবসায়ী জামায়াতীদের চরিত্র উন্মোচন করে রীতিমতো উন্মুক্ত জায়গায় বোমা ব্লাস্ট করেছেন। ওই ভিডিও ফুটেজে পাপিয়া বলেছেন, ‘জামায়াতীরা কোরান শরীফ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভোট চায়। জামায়াতের নাম থেকে ‘ইসলাম’ শব্দটি তুলে দিতে হবে। কারণ তারা ‘ইসলাম’কে অপব্যবহার করছে। তিনি জামায়াত-শিবিরের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ দাড়ি কেটে ফেলেন, টুপি ফেলে জিন্সের প্যান্ট পরেন; আর গ্রামে গিয়ে ধর্ম ব্যবসা নিয়ে মেতে ওঠেন। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই জামায়াত নেতৃবৃন্দকে, তোমাদের লজ্জা থাকা দরকার। ঢাকা শহরে দাড়ি কেটে-টুপি ফেলে, গেঞ্জি-জিন্সের প্যান্ট পরে বিএনপির শেল্টারে খালেদা জিয়ার মিছিলে-খালেদা জিয়াকে নেত্রী মেনে তোমাদের মিছিলে যেতে হয়। জামায়াতীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে পাপিয়া বলেছেন, ‘আপনারা যারা জামায়াতে ইসলামীর নেতা, তারা দিনদুঃখী পরিবারের সদস্য। দিন এনে দিন খেয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী করতে গিয়ে রিক্সাওয়ালার কাছ থেকে এয়ানতের (চাঁদা) পয়সাও নিয়েছেন, সেই পয়সা মেরে আজ অট্টালিকার মালিক হয়েছেন, রাঁধুনি হোটেল বানিয়েছেন। পাঁচ তলার মালিক হয়েছেন, এসি রুমে থাকেন এসব বাংলাদেশের মানুষ জানে।’

পাপিয়া ও ব্যারিস্টার মওদুদের হঠাৎ এই বোধোদয় নিয়েই আমার আজকের এ নিবন্ধের অবতাড়ণা। বিএনপি যখন আন্দেলন খরা ও নানাবিদ; সাংগঠনিক সমস্যায় ধুকছে ঠিক সেই সময়ে বিএনপির এই দুই নেতা কেন এমন অবস্থান গ্রহণ করলেন তা বিএনপির কেউ ভেবেই পাচ্ছে না। এ নিয়ে বিএনপিতে প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে আরেক দ্বন্ধ ও সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিএনপি নেতারা মওদুদের বই নিয়ে সরাসরি মিডিয়ার সামনে কথা বললেও পাপিয়ার সেই ভিডিও ফুটেজের বক্তব্য নিয়ে কিন্তু তেমন কিছুই বলছেন না। কিন্তু জামাত-শিবিরের বাঁশের কেল্লায় এ নিয়ে তুলো ধুনা করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিএনপি প্রধানের কাছে নাকি জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়েছে, পাপিয়া জামায়াতের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক বক্তব্য রেখেছে তা ২০ দলীয় জোটের ঐক্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা পাপিয়ার এ বক্তব্য প্রত্যাহার না হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও নাকি চাপ প্রয়োগ করছে। এইতো গেল পাপিয়ার কথা।

সম্প্রতি সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যাবিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা বাংলাদেশ ইমারজেন্সি এ্যান্ড দ্য আফটারম্যাথ : ২০০৭-২০০৮ শিরোনামে বই প্রকাশিত হয়। বইয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ উল্লেখ করেন জামায়াত, হাওয়া ভবন, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতিই বিএনপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ। খালেদা জিয়ার কাছে ওই সময় তার দু’সন্তান তারেক রহমান ও কোকোর ভাগ্য ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত ছাড়া তিনি কোন প্রকার আলোচনায় যেতে রাজি ছিলেন না। নানা চাপেও তিনি তাদের মুক্তির বিষয়ে অনড় ছিলেন। সে সময়ে দেশের মানুষের নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন কিংবা একজন রাজনীতিবিদের চেয়েও মা হিসেবে দুই সন্তানের মুক্তির বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি উল্লেখ করেন অতিরিক্ত জামায়াতপ্রীতির কারণেই বিএনপি নির্বাচনে পরাজিত হয়। এ ছাড়াও হাওয়া ভবন, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতিও এর পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ফলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে নীরব বিপ্লব হয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা বই নিয়ে বিএনপির ভেতর থেকেই সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এ বই লেখা প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মন্তব্য করেছেন ‘ডিগবাজি, আদর্শহীন ও দলছুট নেতার বইয়ে বিএনপির কিছু যায় আসে না। সরকারকে খুশি করতেই মওদুদ এ ধরনের বই লিখেছেন।’ দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী মওদুদ আহমদের বইয়ের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, মওদুদ নিজের বইতে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি, দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলেকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। নিজেকে বাঁচাতে ও বাড়ি রক্ষার জন্য সরকারকে খুশি করার জন্যই তিনি এ ধরনের বই লিখেছেন। খালেদা জিয়া আপোসহীন, ন্যায়ের পথের পথিক। …দুর্ভাগ্য যে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তাঁর বইতে এমন বক্তব্য কিভাবে এলো? চার দলীয় জোট সরকারের সঙ্গে জঙ্গীবাদের সম্পর্ক থাকলেও তিনি তো সে সময় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। তিনি সবকিছু জেনে থাকলে মন্ত্রিসভা থেকে তাহলে কেন পদত্যাগ করলেন না। তিনি সুবিধাবাদী, দলছুট বলেই তার মুখে এ ধরনের কথা শোভা পায়। কাদের খুশি করার জন্য তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তা জানা নেই।’

এদিকে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনায় সভায় বিএনপির ভাইস গতকাল চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বইয়ের সমালোচনা করেন। একই সাথে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন দলের সাংগঠনিক অবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এভাবে দল চলতে পারে না। এলাকায় অনেক আলোচনা হয়। দলের মধ্যে অনেক কথা আছে যেটা প্রকাশ্যে বলা যায় না। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, হতাশ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। হতাশ হলে রাজনীতি ছেড়ে দিন। এটা বিপদসঙ্কুল পথ। এখানে যুদ্ধ করতে হবে।’

বিএনপি নেতাদের সমালোচনার জবাবে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, তাঁর লেখা এ বই দলের বিরুদ্ধে নয়। দলের সংশোধনীর জন্য লেখা হয়েছে। আশা করি সব ভুলত্রুটি শুধরে নিলে পরবর্তীকালে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারবে। বইটি বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্য। এ বইয়ের বিষয়বস্তু ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে। বইয়ে দেখানো হয়েছে মঈনউদ্দিন, ফখরুদ্দীন সরকার কিভাবে বিএনপির ওপর নির্যাতন করেছে। তিনি দাবী করেন দলীয় অভিব্যক্তি থেকে এ ধরনের বই লেখেননি। বইয়ে যেসব অভিব্যক্তি তুলে ধরা হয়েছে সবই তার ব্যক্তিগত অভিমত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে এ বই লিখেছেন।’
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে কৃষক দলের আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও অনেকটা মওদুদ সাহেবেরই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন ‘নিকট অতীতে আমরা জনগণের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছি। আজকের এই আলোচনা সভায় যারা আন্দোলন সংগ্রামের কথা বলছেন, কিছুদিন আগেও তারা রাজপথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি আমরা রাখতে পারিনি। আমরা মানুষের সাথে প্রতারণা করেছি। দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার কারণে জনগণ আমাদের উপর আস্থা হারিয়েছে। জনগণ আশা করেছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি প্রতিহত করবে। কিন্তু আমরা তা পারিনি। ফলে আমাদের উপর মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মনে করেন, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে অনেক নেতাই সত্যের চেয়ে মিথ্যাই বেশি বলে থাকেন। অনেকে যা বলেন- তা নিজেই বিশ্বাস করেন না। আবার যা বিশ্বাস করেন- তা কখনো বলেন না। কোন মতলব আছে কিনা? এসব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের সর্বত্র নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে মওদুদ আহমদের ‘যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সঙ্গদোষেই বিএনপি ডুবেছে’ এ কথায় বিএনপি নেতারা যতই গোস্বা করুননা কেন এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। বিএনপির প্রগতিশীল অংশ ভয়ে মুখ না খুললেও তাদের অনেকেই পাপিয়া ও মওদুদ সাহেবের বইয়ে লেখা এ সংক্রান্ত বিষয়টি যুগপথভাবে বিশ্বাস অন্তরে ধারন করেন বলেই মনে করি। এটা ‍বিএনপি নেতৃত্ব যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবেন, ততই বিএনপির জন্য মঙ্গল।