ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই ছিল অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কতৃক জামায়াত নেতা কুখ্যাত রাজাকার কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায়কে কেন্দ্র করে ছোট একটি স্ফুটলিঙ্গ থেকে যে অগ্নুৎপাতের সৃষ্টি হয়েছিল সে অগ্নোৎপাতের লাভা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। প্রথম দিন কয়েকজন ব্লগার ও অনলাইন এ্যাকটিভিটস এর শাহবাগ চত্ত্বরে একটি প্রতিবাদী মিছিল থেকে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল; সেই জাগরণ ছিল মিশরের তাহরী স্কয়ারের আন্দোলন থেকে আলাদা। এ আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। গণজাগরণ মঞ্চের এই গণজাগরণ বাংলাদেশের মানুষের ব্যক্তি-পারিবারিক-সামাজিক এমন কি রাষ্ট্রীয় জীবনেও একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে। এ আন্দোলন কেবল একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গর্জে ওঠা শাহবাগ চত্বরের আন্দোলন আকারেই বিশাল ছিল না, স্থায়িত্বের দিক থেকেও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের এই আন্দোলন কায়রোর আন্দোলনকে হার মানিয়েছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার তখন বাংলাদেশে জঙ্গী মৌলবাদের ভয়াবহ অভ্যুত্থান ঠেকিয়েছিলেন। তা না হলে যে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি হতো তা ভাবাই যায় না।

২০১৩ সালে দেশ যখন মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর তান্ডবে বাংলাদেশ যখন ডুবে যেতে বসেছিল তখন অনেকটা উল্কারবেগে গণজাগরণ মঞ্চের অভ্যুদ্বয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুগপৎভাবে একটি বড় ধাক্কা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। তখন হেজাবি’রা (হেফাজতে ইসলাম+জামাত+বিএনপি) মিলে দেশকে একটা বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। তারা নিদর্লীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবির আড়ালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করে দেশকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছিল। সে ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখে তখন কেবলই মনে হচ্ছিল যে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ও দেশপ্রেমের স্ফুরণ আর হয়তো কোনদিনই ঘটবে না। সে রকম একটা পরিস্থিতে গণজাগরণ মঞ্চের মতো তারুণ্যদীপ্ত একটি সংগঠনের জন্ম এ উপমহাদেশেই শুধু নয় বিশ্বের ইতিহাসেও কদাচিৎ ঘটেনা। তাই গণজাগজরণ মঞ্চের উদ্ভব ইতিহাসে সত্যি এটি একটা বিরল ঘটনা। কেননা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ও গঅভ্যুত্থান ছাড়া ’৭১-এর ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি হতো কিনা তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সন্দেহ আছে।

যে জাগরণ মঞ্চ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে আশার আলো জলে ওঠেছিল এবং মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছিল সেই বিশাল জনপ্রিয়তা মঞ্চের নেতৃত্বের একটা অংশকে সম্ভবত বিভ্রান্ত ও উচ্চাকাক্সক্ষী করে তোলে এ উচ্চাকাক্ষাই তাদের মধ্যে বিভক্তি শুরু হয়, এবং এই সুযোগটি কাজে লাগায় দেশের একদল হতাশ ও ব্যর্থ রাজনীতিক। একদিন সত্যি সত্যি প্ররোচণার ফাঁদে পা দেন গণজাগরণ মঞ্চের একটি অংশ। তারা গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে নিজের রাজনৈতিক খরা কাটানোর উদ্যোগী হয়ে উস্কে দিতে থাকেন মঞ্চের বিভক্তিকে। কোন কোন পক্ষের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চকে রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার ও প্রয়াস চালায়। এতে নাকি সিপিবি, গণফোরাম এবং ব্যক্তি হিসেবে ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস এবং প্যাড সর্বস্য দু’একটি রাজনৈতিক দল এবং পতিত ও তাত্বিক নেতা বলে পরিচিত সিরাজুল আলম খান প্রমুখ মঞ্চেরও নেতৃত্বের একটা অংশকে আওয়ামী লীগবিরোধী ভূমিকা গ্রহণে প্ররোচিত করে। এটি বুঝতে দেরি হয়নি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অধিকতর ত্যাগী গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। তারা মনে করে গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তা ও মঞ্চের কাঁধে ভর করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে ওই রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু তাতে তারা সফল না হলেও গণজাগরণ মঞ্চকে বিভক্ত করতে ঠিকই সফল হয়।

গণজাগরণ মঞ্চে এ বহুধাবিভক্তি এতদিন চাপা থাকলেও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিল বিভাগের রায়ের পর এই বিভক্তি আরো প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যদিও আগেই আর্থিক লেনদেন ও নেতৃত্বসহ নানা ইস্যুতে মঞ্চের মধ্যে বিভক্তি শুরু হয়েছিল। সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে তা আরো প্রকোট আকার ধারণ করে। মঞ্চের এই ভাঙ্গন ও বিভক্তি রোধ করার জন্যে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সঙ্কট নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তিন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয় একাধিকবার। এতে কোন লাভ হয়নি। আয়োজকরা বলছেন, কোন পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে ছাড় না দেয়ায় সমঝোতা হয়নি। বাস্তবতা হলো যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে দ্বিমত না থাকলেও এখনও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ মঞ্চের একটি অংশের সঙ্গে সরকারের আঁতাতই এ বিভক্তির জন্য দায়ী বলে মনে করছেন অনেকে। বিভক্তির কারণে মঞ্চের আহ্বানে এখন সাধারণ মানুষের সাড়া মেলে না। দেশের বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনরাও অনেকটা পিছু হটেছেন। কমেছে জনসমর্থন। সর্বশেষ দুই গ্রুপে সংঘর্ষের ঘটনা পর্যন্তও ঘটেছে। আদর্শিক এই আন্দোলন লক্ষচ্যুত হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তবে বিভক্তির কারণ হিসেবে একে অপরকে দোষারোপ করেছেন। গণজাগরণ মঞ্চ এখন বহুধাবিভক্ত। তাই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে।

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপীলের রায়কে প্রত্যাক্ষান করে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মী- সমর্থকরা তিনটি পক্ষ পৃথক প্রতিবাদ সমাবেশ করে। কিন্তু একপর্যায়ে দু’ পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এই বিভক্তির সুযোগে এ্যকশানে যায় এবং উভয় গ্রুপের সমাবেশই অনেকটা পন্ড হয়ে যায়। বর্তমানে কামাল পাশা চৌধুরীর নেতৃত্বে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ তাদের মতো করে প্রতিবাদ সমাবেশ করে যাচ্ছে। অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইমরান এইচ সরকার। তাঁর সঙ্গে আছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্রমৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠন। তৃতীয় গ্রুপের সমন্বয়ক বাপ্পাদিত্য বসু। তার সাথে আছেন ক্রিয়াশীল ছাত্রমৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ, অনলাইন এ্যাকটিভিস্টস নেটওয়ার্ক একাংশসহ আরও কয়েকটি সংগঠন নিয়ে অপরপক্ষ শাহবাগ আন্দোলন।

গণজাগরণ মঞ্চ একদিন এদেশের প্রগতিশীল মানুষকে যতটা আশাবাদী করে তুলেছিল সেই মঞ্চের আজকের এই ভাঙ্গণ ও বিভক্তি মানুষকে ততটাই হতাশ করে তুলেছে। এই বিভক্তি ও ভাঙ্গনে আড়ালে মুখটিপে হাসছে ‘হেজাবি’রা। এই ভাঙ্গনে সারধারণ মানুষের চেয়ে আরও বেশি হতাশ দেশের বুদ্বিজীবীসমাজ। তাই কিছুদিন আগে হতাশার মাঝেও কিছুটা আলো ছড়াতে চেয়েছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। সহযোগী এক দৈনিকে সংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘গণজাগরণ মঞ্চ কি নিভু নিভু আশার প্রদীপ?’ শিরোনামের নিবন্ধে লিখেছিলেন ঢাকার কাগজে দেখলাম, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত মতিউর রহমান নিজামীর (মইত্যা রাজাকার) বিচারের রায় ঘোষণা স্থগিত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ঢাকায় একটি গণমিছিল হয়েছে। খুব বড় নয়, ছোট একটি মিছিল। …হোক ছোট মিছিল, মনে হলো এরা দেশে সেক্যুলার যুব শক্তির প্রতিবাদের কণ্ঠ এখনও সোচ্চার রেখেছে। মিসরের তাহ্রির স্কয়ারের সেক্যুলার যুব জাগরণের মতো একেবারে মিলিয়ে যেতে দেয়নি।… কোন আকস্মিক গণজাগরণই দীর্ঘস্থায়ী হয় না ’।

গণজাগরণ মঞ্চের এ ভাঙ্গনের সুযোগ নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ নিচ্ছে। এ নিয়ে বাজারে নানা গুজব সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বলছেন, জামায়াত ও হেফাজতীদের সঙ্গে সরকারের একটা গোপন সমঝোতার কারণে এরকম রায় হয়েছে একই সাথে অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের দরুন বিচার ঝুলে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি যে এদের রায় ঘোষিত হবে বা বিচার ও বিচারের রায় কার্যকর করা হবে তা যেন কেউ সহজেই বিশ্বাস করতে চাইছে না। আবার অনেকে বলছেন, সরকার এই বিচার সমাপ্ত করবেন ঠিকই তবে, তবে এখন নয়। করা হবে আগামী নির্বাচনের আগের মুহূর্তে। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের এই বিচারকে সরকার তাদের নির্বাচনে জয়লাভের সহজ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন।’

গণজাগেরণ মঞ্চের বিভক্তি ও ভাঙ্গনের সুযোগেই বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন গুজব ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। এই সুযোগকে সর্বোত্তম কাজে লাগাছে তৃতীয় শক্তি যারা কোনদিনই গণজাগরণ মঞ্চের উদ্ভব ও বিস্ফোরণকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। এমতাবস্থায় গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বপর্যায়ে যে ভাঙ্গন ও বিভক্তি দেখা দিয়েছে তার নিরসন হওয়া জরুরী। আমার এ লেখার সাথে সামযস্যপূর্ণ বলে ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ দৈনিক জনকন্ঠের ‘ গণজাগরণ মঞ্চ: ঐক্য চাই শিরোনামের সম্পাদকীয়র অংশবিশেষের এখানে উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করবো আমার আজকের এই লেখা। ‘…সেদিনের শাহবাগের লাখ লাখ মানুষের প্রত্যয়ী অবস্থান, প্রজ্বলিত মোমবাতির শিখা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিল। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সারাদেশ কেঁপে উঠে। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমে দেশের লাখ লাখ মানুষ ফাঁসির পক্ষে তাদের রায় জানিয়ে স্বাক্ষর দিয়েছিল। সেই স্বাক্ষর নিয়ে সংসদ অভিমুখে যাত্রা করে এবং তা তুলে দেয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে। গণজাগরণ মঞ্চের দাবির মুখে সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইন সংশোধন করা হয়।

যে ঐক্য স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের যাত্রা সূচিত হয়েছিল তাতে যে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে তা দুঃখজনক। আদর্শের চেতনায় এ ধরনের বিভক্তি কারও কাম্য হতে পারে না। তাতে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। আপীলে সাঈদীর রায়ের ব্যাপারে যখন সব পক্ষের মনোভাব এক তখন কেন এই বিভক্তি, কেন এই পৃথক সমাবেশ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে যখন সব পক্ষেরই মত অভিন্ন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে যখন তাদের মধ্যে দ্বিমত নেই তখন এই বিভক্তি দুঃখজনক নয় কি? কোন পক্ষেরই তাতে লাভ হবে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোটি কোটি মানুষের মনোবেদনা বাড়বে বৈ কমবে না। দেশবাসী দেখতে চায় সব পক্ষের ঐক্য।’ এ প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে- দৈনিক জনকন্ঠের এই ঐক্যের আহ্বানের প্রতিধ্বনী শোনা যাচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চের বিবাদমান গ্রুপগুলোর নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতেও। কিন্তু তারপরও তারা যার যার অবস্থানে সে সে অনড়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এ ক্ষেত্রেও যে সবার মধ্যেই ইগো কাজ করছে তা স্পষ্ট; এভাবে অনড় অবস্থানে থাকলে কিছুতেই ঐক্য হতে পারে না। সবাইকে বৃহত্তর স্বার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড়া দিয়ে ঐক্য প্রয়াসকে সফল করতে হবে। এটাই আজকের প্রেক্ষপটে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল প্রগতিশীল মানুষের কাম্য।